– শ্রী অত্রিজ ঘোষ
ভারতবর্ষ নিয়ে যদি বলতে শুরু করতেই হয় তাহলে আমার ক্ষেত্রে শুধু গুণগান গেয়ে মানুষকে দেশের স্বার্থে তৈরি করাটা কোনো কাজে দেবে না, বরঞ্চ নিজের দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলা এবং তার সমাধান বার করা সেটা হলো আমাদের দেশ এবং জাতির দায়িত্ব, আর যদি আধুনিক ভারতবর্ষের যদি সবথেকে বড় সমস্যা নিয়েই বলতে হয়, তাহলে সেটা হবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা।না! আমি সেই একই ভাষণ দেবোনা আরো নতুন স্কুল চাই, কলেজ চাই, শিক্ষক চাই এইসব। হ্যাঁ আমি মানছি আমাদের দেশেএইসব critical infrastructure এর অভাব এখনো কিছুটা আছে, কিন্তু যদিও সেটা পুরোন করি তাহলেও কিন্তু সেই ঘাটতি পুরোন হবে না জীবনেও।
কিন্তু ঘাটতিটা কিসের? সেটা হলো শিক্ষার মানের। হ্যাঁ ঠিক বলছি, এবার যদি এটাকে আরো একটু ভালো করে বলি, তাহলে বলবো কিভাবে একটা বাচ্চা শিক্ষা পাচ্ছে, কি শিক্ষা পাচ্ছে, আদপেও এইগুলো উপযোগী কিনা এইসব প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলো করার কারণ হলো, আমাদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা যেটা Macaulay system বলে থাকি সেটা আজকের যুগে এসে কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদি সত্যি কথা বলি তাহলে বলতেই হবে যবে থেকে এই ব্যবস্থা ভারতে এসেছে, তবে থেকে এটা একপ্রকার অপ্রাসঙ্গিকই। এর যদি কারণ দেখি তাহলে বলতেই হবে ভারতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভারতের দর্শন তৈরি হয়েছিল।
ভারতীয় দর্শনের মূল ভিতই হলো সব কিছুকে নিয়ে চলা, মানে সর্ব! সবাইকে accept করা। তাই প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাতে সব বিষয়েরই জ্ঞানপ্রদান করা হতো এবং সেই জ্ঞানের সাথে অন্য জ্ঞানগুলোর সম্পর্ক স্থাপন করা। দ্বিতীয় কারণ হলো Macaulay system এর আসল ব্যাপারটাই ছিলো ভারতে ভারতীয়দেরই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দাসে পরিণত করা, যাদের বলা হয় কালো চামড়ার সাহেব।
এরা ভারতের জ্ঞান থেকে ছিন্নমূল হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গুণগান গাইবে। তাছাড়া Macaulay system critical thinking ability কে পুরো শেষ করে দেয়, যেটা ভারতের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল। অবশ্য যদিও Macaulay system এর কিছুটা করতে পেরেছিল, কিন্তু এই ব্যবস্থাতেই কিন্তু পড়াশোনা করে ভারতবর্ষে বহু লোক ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য লড়াইও করেছিল এবং শেষমেশ ১৫ই অগাস্ট ১৯৪৭এ Transfer of Power করিয়ে ছেড়ে ছিলো। কিন্তু তারপর যে যে Education Commission গুলো বসে যেমন Radhakrishnan Commission, Mudaliyar Commission, Kothari Commission প্রমুখ এরা ভারতে শিক্ষাব্যবস্থাকে হয়তো কিছুটা ঠিক করেছিল, কিন্তু কোথাও এরা যেন একটা সেই চির পরিচিত Extension of Macaulay system হয়ে দাঁড়ালো, কারণ এদের clause গুলো যেন সেই Wood’s Despatch, বা Macaulay system এর মতো critical thinking ability কে নিয়ে নাড়াচারা করার দিকে গেলই না।
তাহলে এহেন অবস্থায় যখন Commission এর পর Commission করেও মূল সমস্যাকে সমাধান করতে একপ্রকার অক্ষম হচ্ছে যেটা হলো শিক্ষারমান ও উপযোগিতা এবং যখন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বারোটা বাজার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তখন এই সঙ্গীন অবস্থা থেকে বাঁচাবার উপায় একজন মানুষ দেখিয়ে গেছেন। তিনি আর কেউ নন, একমাত্র স্বামী বিবেকানন্দ।
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নিজের বই “আমার ভারত অমর ভারত” বইতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য বেশ কিছু সমাধান দিয়ে গেছেন যেটা যদি আজকে কায়মনোবাক্যে অনুসরণ করা হয় , তাহলে হয়ত সত্যি ভারত অমর ভারতই হবে, কিন্তু যাই হোক সেই সমাধানে আসার আগে স্বামীজি জ্ঞানকে কিভাবে দেখে সেটা একবার আলোচনা করি।
স্বামীজি মানুষকে বলতেন পূর্ণ জ্ঞানী, অর্থাৎ মানুষ সবটাই জানে, সে এই জ্ঞানটা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে, কেবল সে সেই জ্ঞানটা উন্মোচন করতে পারে না। সেটা উন্মোচন করাটা এক শিক্ষকের কর্তব্য। এখানে পূর্ণজ্ঞান বলতে কিন্তু তিনি যেটা বলছেন সেটা হলো যে জ্ঞানটা সে তার শিক্ষক থেকে পায়ে সেটার Pattern ঘেঁটে তার থেকে নতুনভাবে উন্মোচন করা, তাঁর বোধটা, আর এই জ্ঞানটা তার মনের মধ্যেই থাকে, এখানে বলে রাখা দরকার মন মানে হৃদয় নয়, এটা হলো মানুষের consciousness, এই consciousness মানুষ অর্জন করতে পারে যখন সে নিজেকে শান্ত রাখতে পারে তার যে প্রাণবায়ুটা থাকে সেটাকে আয়ত্ত করে, বহু মহামানব বলেছেন মনের স্থান বায়ুতে।এই বায়ুকে বাগে পেলেই মনকে বাগে পাওয়া যাবে, যেটা সে যোগ প্রাণায়াম প্রভৃতির সাথে করতে পারে। কাজেই যে কোনো শিক্ষা নিতে গেলে আগে নিজেকে ধীরস্থির রাখাটাই ছাত্রের মূল কর্তব্য, তবেই ছাত্র সেই পূর্ণজ্ঞান পেতে পারে।
তো এই হলো স্বামীজির চোখে মানুষ এবং জ্ঞান। এবার আসা যাক আধুনিক শিক্ষার সমস্যাগুলোতে যেটাতে আমরা স্বামীজির দেখানো পথেই সমাধান করতে পারি কিনা। প্রথমে যে সমস্যাটা নিয়েই আলোচনা করবো সেটা হলো ছাত্রছাত্রী কি শিখছে এবং সেটা তার উপযোগী কিনা? এখানে বলতেই হবে স্বামীজি বলেছেন, প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষকে এমনভাবে তৈরী করা যাতে তার ইচ্ছা সৎবিষয় থাকে এবং সে যেন সফল হয়। এর থেকে কি বোঝা যায়? মানুষকে এখানে এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে সেই মানুষ শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়েই বসে রইলো না, তার মধ্যে যাতে ইচ্ছেশক্তি নামক পদার্থটা যাতে জন্মায় এবং সে যাতে এক যন্ত্রচালিত মানুষ না থাকে, যেটা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা বাচ্ছাগুলোকে বানাচ্ছে ,যার ফলে দেখবেন মুক্তচিন্তার মানুষের যেন বড্ড অভাব হচ্ছে এই সময়তে এবং নতুন আবিষ্কারকের অভাবও যেন পড়েছে, স্বামীজির ভাষায় “বাষ্পচালিত ইঞ্জিন বা জাহাজ”। এখানে স্বামীজি ইতিবাচক হওয়ার শিক্ষা আত্মনিরভর হওয়ার শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেছেন এবং দুর্বল হওয়ার শিক্ষাকে বর্জনের ডাক দিয়েছেন যার ফলে Critical thinking ability টা জন্ম নেবে এবং এটা তখনি করা যাবে যখন সে প্রকৃত শিক্ষক পাবে, এখানেও স্বামীজি তার বক্তব্য রেখেছেন।
আধুনিক ব্যবস্থাতে যে শিক্ষকরা হচ্ছেন তাদের যেন কর্তব্যই হলো যেন তেন syllabus শেষ করে ছাত্রদের পরের ক্লাসের জন্য প্রস্তুত করা, ফলে ছাত্র/ছাত্রী কী শিখলো সেটার উপর নজর দেওয়া হলোই না! স্বামীজি এখানে বলেছেন “গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করা গোছ শিক্ষা দেওয়াটা তুলে দিতে হবে।কেউ কাউকে শেখাতে পারে না”। উনিএটাও বলেছেন বেদান্ত অনুযায়ী মানুষের মধ্যে পূর্ণজ্ঞান থাকে, যেটা আমি ওপরেই বলেছি, প্রকৃত শিক্ষকের কর্তব্যই হলো কেবল সেই অন্তর্নিহিত বোধের উম্মোচন করা যাতে ছাত্র সেই পথ ধরে তার pattern follow করে জ্ঞান অর্জন করে নিতে পারে। কাজেই এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশে এইরকম প্রকৃত শিক্ষকদের আনতে হবে সামনে যাঁরা syllabus এ মুখে না গুঁজে, ছাত্রদের পূর্ণজ্ঞানের দীক্ষা দিয়ে মানুষ তৈরী করতে পারবেন। শুধমাত্র “Mitochondria is the powerhouse of our cell” এই মার্কা বুলি আউড়িয়ে তোতাপাখি বানাবে না। স্বামীজি এই বিষয় শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্কের বিষয়টাতে জোরও দিয়েছেন যার মূলটাই হলো ভালবাসা আর সম্মানের উপর দাঁড়িয়ে, ভয়ের উপর নয়।
স্বামীজি এখানে আবার গণশিক্ষার কথাও ভালো করে বলে গেছেন, যেটা ভারতবর্ষে একটা বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং সেটা শুধুই স্কুল-কলেজ দিয়ে পূর্ণ হবে না অথবা খালি online শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে পূরণ হবেনা। স্বামীজি ভাল করে এখানে বলেছেন, শিক্ষকের প্রয়োজন গ্রামে গ্রামে, গঞ্জে গঞ্জে এমনকি সবথেকে দুর্গম জায়গাতে যাওয়া যাতে সেখানকার মানুষ যাঁরা স্কুল-কলেজে যেতে অক্ষম তাদেরকে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া যায় ।যদিও এখানে MOOC (Modern Open Online Course) অথবা SWAYAM এর মত সরকারি initiative কাজ করছে তবুও এখানে এমন ব্যবস্থা আনা দরকার যাতে এই সমস্যার সমাধান আরো ভালো করে করা যেতে পারে।
স্বামী বিবেকানন্দের মহৎ চিন্তার আর এক দিশা হল – নারীশিক্ষা।
আমাদের দেশে কোথাও যেন নারীশিক্ষার একটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে, এখানে এটার কারণ ও আমি বলব নারীশিক্ষা নিয়ে এবং তা হল প্রত্যন্ত মানুষের মধ্যে গণশিক্ষার অভাব! আসলে শিশুর প্রথম শিক্ষক হলো তার মা এবং শিশু তার প্রথম শিক্ষাটাই পায় তার মার কাছে।
এখানে শ্রদ্ধেয় জয়দীপ মহারাজের একটা কথা বলতেই হয়। তিনি বলেছিলেন যে শিশু মূল জ্ঞান পায় তার মার থেকে এবং সেটাও সন্তান যখন মার গর্ভে থাকে, কাজেই বুঝতে পারছেন এখানে মার শিক্ষিতা হওয়াটা কত প্রয়োজন। কাজেই এখানে আরো ভালো করে গণশিক্ষার মতো স্ত্রীশিক্ষার প্রসার কতটা করতে হবে, দরকার পড়লে প্রত্যন্ত থেকে প্রত্যন্ততর গ্রামে পৌঁছে দেওয়াটা কত দরকারী, স্বামীজি এ ব্যাপারে বলেছেন যে শুধু পুজো দিয়ে একজন নারীর চরিত্রকে গঠন করা যায় না, তাই তাদেরকে বিজ্ঞান, দর্শন, ভাষা, অঙ্ক প্রভৃতি বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া দরকার যাতে বর্তমান সময় সে সাবলীল হতে পারে।
NEP 2020 তে একটা বিষয়ে রউপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিলো কিন্তু কার্যত সেটাতে একটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে আর সেটা হলো মাতৃভাষায় শিক্ষা। আসলে সবার ক্ষেত্রে তো ইংরেজি বা হিন্দিতে শিক্ষা দেওয়া চলে না, তাই এর উপায়টা স্বামীজি খুব সহজভাবেই বলেছেন চলতি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া এবং সেটা কেন দরকারী সেটা নিয়েও।তিনি বলছেন বুদ্ধ থেকে শুরু করে তাঁর গুরুদেব শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব সবাই এই চলতি ভাষায় শিক্ষা দেওয়াতে জোর দিয়েছেন, তার কারণ, চলতি ভাষায় সাধারণ মানুষের মনের ভাবটা ফোটানো যাবে যেটা হয়তো বিদেশী ভাষা দিয়ে সম্ভব হবেনা তাই এই বিষয় এখন থেকে যদিনা ঠিক মতো জোর দেওয়া যায় তাহলে ভারতবর্ষে হয়তো সবার কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে না।
স্বামীজি সোজা কথায় আরেকটি বিষয়ে তাঁর বইতে ভাল করে বলেছেন যেটা পরবর্তী সমস্যা, যার বিশেষ আলোচনা তার প্রতিকারে খানিক সাহায্য করবে। বর্তমান সময়ে রাজ্য, দেশ এবং বিশ্বে সর্বত্র চাকরির অভাব ভালোভাবে ফুটে উঠেছে, এবং ক্রমবর্ধমান। সেটা বাড়তেই থাকবে, এর প্রতিকার একটাই হয়, নিজে ব্যবসা শুরু করো, নয়তো self employed হয়ে যাও, যার অর্থ হলো কারিগরী শিক্ষাতে জোর দেওয়া। স্বামীজি Practical Knowledge এর উপর অনেকটাই জোর দিয়েছেন। তিনি বারবার বলেছেন Technical Education এর কথা, যেটা ভাল করে সবাইকে দিলে, একপ্রকার পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে না। এই স্বনির্ভরতার শিক্ষা ছাত্রদের দিলে বেকারত্বের সমস্যার অনেকখানি সমাধান হবে বলেই স্থির বিশ্বাস।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কোথাও যেন মানুষকে তার সংস্কৃতি থেকে ছিন্নমূল করে দিয়েছে এটা আমি ভালো করে দেখেছি।এর একটি অনন্য উপায় স্বামীজি দিয়েছেন, তিনি অনেকবার বলেছেন স্কুলের দেখভাল যাতে ভাল করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানদের দেওয়া হয়, বিশেষ করে মন্দিরের হাতে, এর ফলে স্কুল চালাতে অনেক সময় যে অর্থের দরকার পড়ে আর যার অনেকটা ভার ছাত্রের পরিবারের উপর পড়ে বিশেষ করে গরীব মানুষের উপর সেটাও কমবে আর দ্বিতীয়ত, মন্দিরের বা মঠের শিক্ষকের কাছে ছাত্ররা ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি এবং ব্রহ্মচর্য যেটা ছাত্রজীবনের একটা মূল অঙ্গ সেটাও শিখবে।
মোট কথা বলতে গেলে স্বামী বিবেকানন্দ কিন্তু বর্তমান শিক্ষাক্ষেত্রের যে সমস্যাগুলো আছে তাঁর অনেকটাই কিন্তু সমাধান “আমার ভারত অমর ভারত” বইতে দিয়েছেন, চাইলে পড়তেই পারেন, কিন্তু শুধু পড়ে লাভ হবে না যদিনা তার সিকিভাগও কাজে লাগানো যায়। তবে NEP 2020 তে তাঁর অনেকটা থাকলেও সেটা তারা পূর্ণভাবে কিন্তু কাজে লাগাতে অক্ষম হচ্ছে, কাজেই যা করার আমাদের নিজেদেরই সরকার ও শিক্ষাক্ষেত্রগুলোকে জোর দিয়ে করিয়ে নিতে হবে। জানুয়ারি মাস-টাসেই মহানমানব, স্বামী বিবেকানন্দর জন্মমাস, কাজেই এই লেখার মাধ্যমে এটিই আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখক পরিচিতিঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত।


