Uncategorized

বিশ্বভারতী: ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

– শ্রী অত্রিজ ঘোষ

 

আধুনিক ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস ঘাঁটলে হয়তো খুব কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসবে যেগুলো চিরাচরিত ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে নতুন ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে বা পুরোনো ভারতীয় ব্যবস্থার সাহায্যে দেশে শিক্ষার আলো ছড়াতে সক্ষম হয়েছে।তাদের মধ্যে যদি অন্যতম কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয় তাহলে অচিরেই সেটা হলো শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্টিত বিশ্বভারতী। আমি বিশ্বভারতীর কথা এইজন্যই বলছি কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু প্রথম যে Macaulay system এর বাইরেও একটা পড়াশোনা হয় সেটা কে প্রাকটিক্যাল ভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিল এবং সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিন্তু বহুদিগ্গজকে প্রসব করেছিল সে সত্যজিৎরায় হোক বা আঞ্জেলো দেফস্কাই হোক, এরা কিন্তু প্রত্যেকেই এই বিকল্প ব্যবস্থার এক একজন উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিশ্বভারতীর ইতিহাস নিয়ে মোটামুটি যদি ঘাঁটা যায় তাহলে এটা বলতেই হয় যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবর্ষ কিন্তু ১৯২১ সাল কিন্তু এই পথচলা আরো আগে থেকে শুরু হয়। আসলে ১৮৬৩ সালে যেটা শান্তিনিকেতন বলে জানি সেখানে প্রথম শুরু হয় দুটো ছাতিম গাছের নিচে এক উপাসনাস্থল ও তার বাগানবাড়ি হিসেবে, যার প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ একর জমির উপর। জমিটি আসলে পান তিনি রায়পুরের সিংহ পরিবারের থেকে যেটার মূল্য ছিলো কেবল ১টাকা। পরবর্তী সময় ১৮৮৮ এই জমিতে স্থাপিত হয় ব্রহ্মবিদ্যালয় এবং তাঁর সাথে একটি লাইব্রেরি আর ১৯০১ সাল থেকে মাত্র পাঁচজন ছাত্রকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেন তার ব্রহ্মচর্যাশ্রম যা ১৯২৫এর পর নাম হয় পাঠভবন, ধীরে ধীরে তারপর এখানে যুক্ত হয় আরো দুটো ভবন, সঙ্গীতভবন ও কলা ভবন এবং এইভাবেই শুরু হয় বিশ্বভারতীর যাত্রা যেটা পরে ১৯৫১ সালে হয়ে ওঠে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজ ১৩০০একর এর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নেয়, শুধু জায়গার দিক থেকেই নয়, পড়াশোনা ও চিন্তাধারার দিক থেকেও।

এইটা হলো বিশ্বভারতীর মোটামুটি ইতিহাস। এবার আসা যাক বিশ্বভারতী এমন কি করলো যার জন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমি বিকল্প ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র বলতে পারি? যাঁরা শান্তিনিকেতন গেছেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাটা কিন্তু কোনো ক্লাসরুমের বদ্ধ ঘরে চলেনা, উল্টে ওদেরকে খোলা আকাশের নিচে পড়াশোনা করানো হয়, দেখলে মনে হয় যেন ওরা একটা গুরুকুলের পরিবেশে পড়াশোনা করছে, আসলে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বাচ্চাদের পড়াশোনাকে কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাখতে চাইতেন না, তিনি জানতেন শিশুমনে মুক্তচিন্তার জন্ম দিতে গেলে তাকে মুক্তভাবেই রাখতে হবে, যেটা প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, তা ছাড়া খোলা আকাশের নিচে পড়াশোনার ফলে, ছাত্রছাত্রী কিন্তু পরিবেশের সাথে নিজেকে আরও ভালো করে পরিচয় করাতে পারবে যেটা ক্লাসরুমে বসে হয় না। আসলে বিশ্বভারতী কিন্তু প্রাচীন গুরুকুল ব্যবস্থার উপর জোর দিয়ে থাকে, তাই জন্য দেখবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য কিন্তু কলকাতা বা তার আশেপাশের জায়গা না দেখে সেটাকে বীরভূমের শান্ত পরিবেশের মধ্যে স্থাপন করাটা উপযোগী মনে করেছিলেন।

বিশ্বভারতীর আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে এটিকে আধুনিক ভারতের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বলে গণ্য করা যেতেই পারে যেখানে কারিগরী শিক্ষার বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছিল। প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্যে মানুষকে শুধু যে মুক্তচিন্তাই উপহার দিয়েছিলেন তা কিন্তু নয়, তাছাড়া মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার দিশাও দিয়েছিলেন, এখানকার কৃষিবিজ্ঞানের ডিপার্টমেন্ট হোক বা টেক্সটাইল ডিপার্টমেন্ট বা স্কাল্পচার ডিপার্টমেন্ট, এইগুলো সবই কিন্তু মানুষকে আত্মনির্ভর হওয়ার শিক্ষা দেয়, যাতে করে মানুষ পরনির্ভরশীল না থেকে নিজের হাতে তার নিজের একটা সংস্থান সে করতে পারে।প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে বিশ্বভারতী কিন্তু ভারতে প্রথমবার কৃষিবিজ্ঞান এমনকি হর্টিকালচারের উপর জোর দিয়েছিল।

বিশ্বভারতীর আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো – পল্লী সংগঠন বিভাগ। এই বিভাগ কিন্তু ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেই তৈরি হয়েছিলো যার মূল লক্ষ্যই হলো গ্রাম ও গ্রাম্যসমাজকে ভালো করে বোঝা এবং তার সার্বিক উন্নতির জন্য যা যা করণীয় সেটার শিক্ষা দেওয়া, এর অন্তর্গত হলো শিল্পসদন যেখানে গ্রাম্যসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত করার শিক্ষা দেওয়া হয় কারিগরী শিক্ষার মাধ্যমে এবং পল্লী চর্চা বিভাগ যার মূল উদ্দেশ্যই হলো গ্রাম্য সমাজের উন্নতির শিক্ষা দেওয়া, বলতে গেলে বিশ্বভারতী দেশের মধ্যে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যাঁরা কিন্তু গ্রামের মানুষকে কীভাবে সবদিক থেকে শশক্ত করা যায় তার শিক্ষাটা শিখিয়ে চলেছে এবং ছাত্রছাত্রীদের কিভাবে স্থানীয় লোকেদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা যায়, কিভাবে তাদের খেয়াল রাখা যায় তার শিক্ষা দিয়েই চলেছে।

বিশ্বভারতীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভবন যদি বলা হয় তাহলে নিশ্চই সঙ্গীত ভবন ও কলাভবন কে তো বলতেই হবে, যেখানে শুধু যে সঙ্গীত ও নানারকমের কলা যেমন, ছবি আঁকা বা মূর্তি বানানো যে শেখানো হয় তাই নয়, এমনকি সেইগুলো যাতে সংরক্ষণ করা যেতে পারে সেই বিষয়েও শিক্ষা দেওয়া হয়, আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝেছিলেন যে একটি দেশের মুল পরিচয়টা লুকিয়ে আছে তাঁর শিল্প ও কলাতে তাই সেটা যদি উঠে যায় তা হলে সেই দেশের পরিচয় বলতে আর কিছু থাকেনা তাই সেগুলো যাতে সংরক্ষিত হয় এবং সেই জ্ঞান যাতে পরবর্তী প্রজন্ম পায় তাই সেই শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যেটা Macaulay system ভেঙে দিয়েছিল, এবং তাতে তাকে সাহায্য করেছিলে ননন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজের মতো মনীষীরা যাঁরা না থাকলে বোধহয় এটা একলা ওনার জন্য সম্ভব হত না।

রবীন্দ্রনাথঠাকুর ভাষার বিষয়টাতে যেহেতু খুব জোর দিতেন তাই কিন্তু বিশ্বভারতীতে ভাষা শিক্ষার ব্যাপারটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয় উঠেছিল, এখানে শিক্ষকরা সাধারণত মাতৃভাষা মানে বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেওয়াতে জোর দেন কারণ তারা মনে করেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা দিলে তা বহু মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। তাছাড়া ভাষা নিয়েও এদের নিজেদের বিভাগ তো আছেই, শুধু যে বাংলা, ইংরেজি বা হিন্দি, যার জন্য আলাদা করে হিন্দি ভবনই আছে তাই নয়, বিদেশী ভাষা যেমন চিনা, জাপানি, তিব্বতী, তামিল, মারাঠি, ওড়িয়া, জার্মান, ফরাসি, প্রভৃতি ভাষা শিক্ষাতে জোর দেওয়া হয়।

আমরা শান্তিনিকেতন গেলে একবার না একবার নিশ্চই বিশ্বভারতীর কাঁচ মন্দির তো দেখেই এসেছি এবং জানিও যে ওখানে প্রতি বুধবার উপাসনা হয়, বিশ্বভারতীর এই উপাসনাগুলো দেখে ভাবা উচিত হবে না যে এইগুলো আমাদের স্কুলের সেই assembly hall এর সেই উপাসনার মতো যেখানে সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে সেই শুকনো বক্তৃতা শোনানোর পর ছেড়ে দিলো।

উপাসনার সময় সেই উপাসনা গৃহে সবাইকে একসাথে বসানো হয় এবং যারা উপাসনার সময় মুল বক্তা থাকেন তিনি এমনভাবে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলবেন যেন মনে হবে তিনি যেন খুব আপন হয়েই এই কথাগুলো বলছেন এবং সেই বিষয়গুলো কিন্তু বেশিরভাগটাই শুধু যে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এটাও নয়, অনেক সময় উপনিষদ নিয়েও আলোচনা ও পর্যালোচনাও হয়। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা বেদ-উপনিষদের বিষয়ে শুধু যে জানছে তাই নয়, সেইগুলোর ব্যাপারে পর্যালোচনা করার একটা জায়গাও পাচ্ছে এবং এর ফলে তৈরি হচ্ছে নিজের সংস্কৃতির প্রতি একটা সম্মানও, আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যতইব্রাহ্ম হন না কেনো, ব্রাহ্মসমাজ যে বেদ আর উপনিষদের মূল্যবোধের উপর দাঁড়ানো এটা আমাদের সকলকেই মানতে হয়।

বিশ্বভারতীর বিষয় নিয়ে বলবো আর তার উৎসব অনুষ্ঠান নিয়ে বলবোনা এটা কি কখনও হয়। ওখানে যদিও এখনকার স্কুল-কলেজের মতো দামালপনা বা বিকৃত মানসিকতা এটা দেখবেন না বরঞ্চ প্রতিটা উৎসব ও অনুষ্ঠানের একটা গভীর সম্পর্ক আছে ভারতীয় চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির।আমরা সকলেই হয়তো পৌষমেলা, বসন্ত উৎসব বা বর্ষামঙ্গলের কথা জানি যেগুলো প্রতিটা এক একটি ঋতুকে আহ্বান জানাচ্ছে, কিন্তু এর মধ্যে আমার প্রিয় উৎসব যদি বলতেই হয় তাহলে তা নিঃসন্দেহে হবে আনন্দবাজার, যেটা কিনা মহালয়ার দিন পালিত হয়।কলকাতাতে যখন আমরা শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে চন্ডিপাঠ ও মহিষাসুরমর্দিনী দিয়ে শুরু করি বা তর্পণ করি, শান্তিনিকেতনে মহালয়া পালিত হয় অন্যভাবে, বিশ্বভারতীতে ভোরবেলায় রেডিওর আওয়াজে নয়, বরঞ্চ ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভাঙে কিন্তু এর আসল মজাটা হয় বিকেলবেলায়, তখন বিশ্বভারতীর গৌড়প্রাঙ্গণে বসে আনন্দবাজারের মেলা যেটা কিনা ছাত্রছাত্রীরা নিজেরা বসায়, স্টল থেকে শুরু করে পশরাগুলো সব নিজেরাই তৈরি করে এবং তা তারা নিজেরা বিক্রি করে এবং ব্যবসায়িক লাভ বিশ্বভারতীকে দান করা হয়, যেটা বিশ্বভারতীর দ্বারা আশেপাশের গ্রামে গরীব-দুঃখী মানুষদের ভরণপোষণ ও তাদের উন্নতির জন্য ব্যবহার করা হয়। এই নিয়ম কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চালু করেছিলেন গরীব ছাত্রছাত্রীদের জন্য যাতে তারা দুর্গাপুজোর সময় একটু ভালো করে আনন্দ করতে পারে। এটাই হলো বিশ্বভারতী – তার এই পার্বণের মধ্যে দিয়ে শুধু যে মানুষ মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনই হচ্ছে তাই নয়, তার সাথে নিজের সংস্কৃতির সাথে জুড়ে রাখার এবং গ্রাম্য সংস্কৃতিকে শশক্ত করার প্রচেষ্টাও দেখা যায় যেটা Macaulay system এর একদম উল্টো।

আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ক্ষান্ত হতে চেয়েছিলেন তাই নয়, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় যাতে ভারতীয় সংস্কৃতি, সভ্যতা ও দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে সেটার জন্য তিনি চরম প্রচেষ্টাও করেছিলেন, এবং সত্যি বলতে তিনি বিফল হয়নি। বিশ্বভারতী এখনো তাঁর ideals আর vision বহন করে এবং আগামীতেও করে যাবে। আগেরবার আমি স্বামী বিবেকানন্দের চোখে শিক্ষার উন্নতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম এই ‘কাঞ্জিক’ -এ, বিশ্বভারতী তার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে কিছুটা হলেও সক্ষম হয়েছে, এবং সেইজন্যই বোধহয় শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক জড়ো হয়না, বিদেশ থেকেও লোকে এখানে Macaulay system এর বিকল্প ব্যবস্থাতে পড়াশোনা করতে আসে।তাই জন্যই বোধহয় ২০২৩ সালে ইউনেস্কো একে “World Heritage Site” হিসেবে গণ্য করে।বিশ্বভারতীর মুল মন্ত্র হলো “যত্র বিশ্বং ভবত্যেক নীড়ম” অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব একটি নীড় বা ছোট বাসা, সেটাই বিশ্বভারতী করে দেখিয়েছে, এবং আমি আশা করবো আগামীতে তারা তাদের এই মুক্তচিন্তাধারাকে আরো বিকশিত করবে এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো Macaulay system কে বর্জন করে বিশ্বভারতীর মুক্তচিন্তাধারাকে আত্মস্থ করবে।

 

লেখক পরিচিতিঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত।