রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

কা নয়, ১৯৫৫ সালের আইন নিয়েই রাজনীতি তুঙ্গে

নাগরিকত্ব প্রদানে কেন্দ্রের নয়া নির্দেশিকা

কেন্দ্রের একটি নতুন নোটিশ জারি হওয়ার পর উদেশ্য প্রণোদিত রাজনীতি শুরু হয়েছে। বুঝে বা না-বুঝে দু’ভাবেই শুরু হয়েছে আবার জটলা। কেন্দ্রের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন কেন্দ্রিক নোটিশকে ২০১৯ সালের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে সমাজে একটা অস্থিরতা সৃষ্টির প্রয়াস শুরু হয়েছে। শুরুতেই এই বিভ্রান্তিকর প্রক্রিয়া থেকে পাঠক- নাগরিককে প্রকৃত সত্য জানানো দরকার। শুরুতেই  সাফ বলে নেওয়া দরকার যে কেন্দ্রের এই নোটিশের সঙ্গে সিএএ- এর কিছুমাত্র যোগ নেই।

গত শুক্রবার, অর্থাৎ ২৮ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সেকশন-১৬’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কয়েকটি মানুষকে নাগরিকত্ব প্রদানে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশিকা জারির ঘটনা এই প্রথম রাজ‍্যের নির্দিষ্ট কিছু জেলায় বসবাসরত আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নয়। একই ভাবে ২০১৬ সালে দেশের সাতটি রাজ‍্যের স্বরাষ্ট্র সচিব এবং সেই সাতটি রাজ‍্যেরই ১৬ টি জেলার কালেক্টরদের নাগরিকত্ব প্রদানে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিল কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে। সেই একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি ২০১৮ সালেও দেশের কয়েকটি রাজ‍্যের নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার জন্য জারি করা হয়েছিল কেন্দ্রের তরফে। ঠিক একই ধাঁচের নোটিফিকেশন ২০০৩-০৪ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে গুজরাট এবং রাজস্থানের জন্য জারি করা হয়েছিল। এই বিশেষ নির্দেশিকা কোনোভাবেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন-২০১৯ (সিএএ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। হয় বিজ্ঞপ্তি না পড়ে আর নয় না বুঝে আর নয়তো জলঘোলা করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই  উদ্দেশ‍্যপ্রণোদিত ভাবে সিএএ-এর সঙ্গে এই নোটিফিকেশনকে জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রয়াস চালানো হচ্ছে। সিএএ নিয়ে রাজনীতির জলঘোলা আগেও কম হয়নি।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রকাশিত নোটিফিকেশনে বলা হয়েছে, গুজরাটের চারটি জেলা মোরবি, রাজকোট, পাটান, ভাদোদরা, ছত্তিশগড়ের দুটো জেলা দুর্গ ও বালোদাবাজার, রাজস্থানের পাঁচটি জেলা জালোর, উদয়পুর, পালি, বারমের, সিরোহিয়া, হরিয়ানার একটি জেলা ফরিদাবাদ এবং পঞ্জাবের একটি জেলা জলন্ধরে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে এসে বসবাসরত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, পার্সি, জৈন এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যারা রয়েছেন তারা এবার ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের সুযোগ পাবেন। সিটিজেনশিপ রুল ২০০৯- এর অধীন আবেদনকারীরা চাইলে অনলাইনেও নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত‍্যানন্দ রাই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিলেন, গত এক দশকে ২১ হাজারেরও বেশি বিদেশিদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে। কেন্দ্রে মনমোহন সিংহ সরকারের আমলেও অসংখ্য মানুষকে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে। তথ‍্য অনুযায়ী ২০১০ সালে ২৩২ জন বিদেশিকে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ২০১১ সালে ৪৩৫ জনকে, ২০১২ সালে ৫৫৩ জনকে, ২০১৩ সালে ৫৬৩ জনকে, ২০১৪ সালে ৬১৭ জনকে এবং ২০১৫ সালে ১৫,৪৭০ জনকে ভারতীয় পাসপোর্ট প্রদান করা হয়েছে। এর  পাশাপাশি ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৬ সালে ১,১০৬ জনকে, ২০১৭ সালে ৮১৭ জনকে, ২০১৮ সালে ৬২৮ জনকে এবং ২০১৯ সালে ৯৮৭ জনকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জমি চুক্তি ২০১৫-এর অধীন বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক লোককে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির ফলে ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-এর সেকশন-৭’এর অধীনেও ১৪,৮৬৪ জনকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।

তথ‍্য বলছে, নির্যাতনের ভয়ে ভারতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করা লোকেদের সময়ে সময়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের বিশেষ ব্যবস্থার অধীন নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজটি চলছে। অন্ততঃ গত দশ বছরের তথ্য তাই বলছে। তারই  অঙ্গ হিসেবে শুক্রবার (২৮ মে,২০২১) প্রকাশিত নোটিফিকেশনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দেশের পাঁচটি রাজ‍্যের ১৩ টি জেলায় আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে এসে বসবাসরত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষকে নাগরিকত্ব প্রদানে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বলা বাহুল্য, এই বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ২০১৯-এর কোনোও যোগসূত্র নেই।

কেন্দ্রের নোটিশে বলা হয়েছে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সেকশন ১৬-র অধীনে এই নির্দেশ দেওয়া হলো। নাগরিকত্ব আইনের সেকশন ৫-এ নাগরিকত্বের জন্য রেজিস্ট্রেশন এবং সেকশন ৬-এ নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জেলাশাসক কিংবা স্বরাষ্ট্রসচিবরা আবেদন পরীক্ষা করবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, আবেদনপত্রগুলির পরীক্ষা করবেন সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক কিংবা স্বরাষ্ট্রসচিবরা। পাশাপাশি এই আবেদন এবং সরকারের রিপোর্ট অনলাইনে কেন্দ্রের কাছে পাঠাতে হবে। এ ব্যাপারে অফিসে তাদেরকে আলাদা করে হাতে লেখা প্রমাণও রাখতে হবে। জেলাশাসক কিংবা স্বরাষ্ট্রসচিবরা এব্যাপারে আবেদনকারীদের নাগরিকত্বের জন্য সার্টিফিকেট দেবেন।

উল্লেখ্য, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ২০১৯ বা সিএএ একটি কেন্দ্রীয় আইন। এবং আইনটি গোটা দেশের সর্বত্র সমানভাবে প্রযোজ্য। আরও মনে রাখা খুব জরুরি, নাগরিকত্বের বিষয়টিতে কেন্দ্র সরকার একক ক্ষমতার অধিকারী ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী। তাই নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কোনো কেন্দ্রীয় আইন সমস্ত দেশের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। সিএএ রুলস বাস্তবায়নে কেন্দ্র সরকারের পক্ষে বিলম্ব ঘটছে বটেই। কেন্দ্র সরকারের পক্ষে সিএএ রুলস বাস্তবায়নে সম্প্রতি আরও সময় চেয়ে নেওয়া হয়েছে সংসদীয় কমিটির কাছে। দেশের কোভিড মহামারি পরিস্থিতির কারণেই রুলস বাস্তবায়নে বিলম্ব দেখা দিয়েছে বলে কেন্দ্রের পক্ষে আবেদনে জানানো হয়েছে।

আর হয়তো নাগরিকত্ব আইন আনতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কয়েকটি রাজ্যের কয়েকটি জেলায় ১৯৫৫ সালের আইন নিয়েই নয়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। কিন্তু এই নিয়েই শুরু হয়ে গেছে ২০১৯ এর পুনরাবৃত্তি, অর্থাৎ ঘোলা জলে মাছ ধরা।

(প্রবন্ধটি ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে প্রতিবেশী আসাম রাজ্যের জনপ্রিয় “দৈনিক প্রান্তজ্যোতি” তে)

Leave a Reply