সুরু স্রষ্টা নচিকেতা ঘোষের জন্ম শতবর্ষ আমরা পেরিয়ে এসেছি ২০২৫ এই। গত ২৮ শে জানুয়ারি তিনি ১০১ বছরে পড়লেন।সমুদ্রে পা ভিজিয়ে, সমুদ্রে খুশিমত স্নানের আনন্দে মাতোয়ারা হন অজস্র মানুষ প্রতিনিয়ত। কিন্তু সাগরতলের রত্নভান্ডার নিয়ে, তার বিপুলতা নিয়ে নিছক ভাবার অবকাশটুকুও যেমন সেই অসং খ্য স্নানামোদী মানুষের ভীড়ে ক্কচিৎ এক বা আধ জনের হয়ে থাকে, কিন্তু, তাদের যোগ্যতা কতটুকুই বা. তেমনই এক সুরমুগ্ধ, সুরবিস্মিত শ্রোতার বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদনের আশ, প্রয়াস নিয়ে এই রত্নভান্ডারের একটি মণিকণাকে মাথায় ঠেকাবো।
বৈচিত্র্য আর প্রাচুর্যের সমারোহ দেখতে হলে নচিকেতা ঘোষের সুরারোপিত চলচ্চিত্রগুলির কথা সর্বাগ্রে আসে। তার মধ্যে একটি হল ‘পৃথিবী আমারে চায়’। প্রতিটি গান যেন বাগদেবী সৃজিত এক একটি মূর্চ্ছনা, এক অসামান্য সাঙ্গীতিক দলিল। তারই মধ্যে ‘কেউ নয় সাহেব বিবি’ গানটি একেবারেই অন্য এক ধারার গান।প্রতিবাদের গান ত বটেই। কিন্তু প্রতিবাদের গান ত আরও অনেকগুলিই আছে ছবি জুড়ে,তবে হঠাৎ এই গানটি আলাদা করে নজর কাড়ে কেন!!?..
ভ্যাগাবন্ড, ভিখিরিদের আস্তানা এক পার্কে হঠাৎই তীক্ষ্ণ হারমোনিয়ামের আওয়াজ কানে এসে লাগে। বানজারা গোত্রীয় এক যুগল নারীপুরুষ কাঁধে ঝোলানো বাক্সের রিড বাজিয়ে গাইতে গাইতে সামনে আসেন। এর আগে এই পার্কে প্রতিবাদের অনেক গান গেয়েছেন শিক্ষিত,ভদ্র যুবক উত্তম। ঘরছাড়া, মন্দভাগা,ভুখাপেটদের চোখে জোনাকির আলোটুকু জ্বালিয়ে রেখেছে যে গান।সে সব গানে ঝড়ের পূর্বাকাশের থমথমে নাদ আছে, সে সব গানে তুফানের প্রলয়গতি আছে,সে সব গানে আঁধার ভাঙা ভোরের প্রবল শক্তি আছে। আর এই সবটাই গাঁথা হয়ে আছে সুরের সুলালিত্যে, যন্ত্রানুষঙ্গের স্নিগ্ধগম্ভীর প্রয়োগে আর পরিমিত অভিব্যক্তিতে।
“সবাইকে আজ বলব ডেকে
আমার সাথে চলবে কে কে
হাত মিলিয়ে বলতে হবে
চাই না কোনো দয়ার দান”
মেঘের মন্দ্রনাদ থেকে যেন বজ্রপাতের তারসপ্তকে সুরের সুনির্দিষ্ট আরোহন।
কিম্বা,
“হাজার পতন অভ্যুদয়ে
বিশ্ব চলে দিগ্বিজয়ে
ভয় কিরে মন ঘূর্ণিবাতাস ঘুচায় অবসাদ
ঊর্মিমুখর জীবন সাগর শোনায় শঙ্খনাদ
মরণজয়ী জীবন এসে বাড়িয়ে দেবে হাত”
এ গানের সুরেও ঊর্মিমালার ওঠাপড়ার নির্দিষ্ট ছন্দ নিপুণভাবেই বহমান।
“ঘুর্ণিহাওয়ায় চাঁদ ঢেকে যায়
ফুলের মধু গন্ধ হারায়
স্বপ্নরঙিন প্রগলভতার শোন রে আর্তনাদ
এগিয়ে চলার দিন এসেছে তাই এত সংঘাত”
আঁধারপথের সাবধানবাণী যেখানে, সেখানেও সুরের গতিপথ সুলালিত্যের হাতে বাঁধা থাকে।
আর এই সবটাই হয়,কারণ গানগুলি একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত দুর্ভাগা,অনাহারী,কপর্দকহীন কিন্তু সুশিক্ষিত, ভদ্র,পরিশীলিত যুবার কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হয়।
আসি এবার আলোচ্য গানটির প্রসঙ্গে। ‘কেউ নয় সাহেব বিবি’। এ গানের key line যেটি, সেটি যে বার্তা বহন করে, বাংলা ছবিতে এ ধরণের প্রয়োগ নি:সন্দেহেই প্রথম।শিক্ষিত, মার্জিত যে বাঙালী দর্শক বাংলা ছবিতে মূলত কাব্যধর্মী মেলোডি আশ্রয়ী,অথবা ভাবগম্ভীর বা ভক্তিগানেই অভ্যস্ত থেকেছেন,অথবা ক্কচিৎ কমেডি গানের আনন্দে স্মিত হেসেছেন, সেই দর্শকের শ্রবণকে এক দারুণ ধাক্কা দেয় এই Key line টি। ‘বখশিশ চাই না মালিক, হিসাবের পাওনা চাই” – আর এই ধাক্কার প্রয়োজনেই হেমন্তকণ্ঠের মাধুর্য বা সুললিত সুরের বদলে এ গানে নচিবাবু আনেন ঢাকনা খোলা হারমোনিয়ামের তীক্ষ্ণ বাদন। অঅপেক্ষাকৃত ভিন্ন টেক্সচারের আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনেন শ্যামল মিত্রের সঙ্গে। কাওয়ালী ঢং এর সুরের আঙ্গিকে যখন গৌরিপ্রসন্ন লিখিত কথাগুলি,
“ডর কেন তুফান দেখে আসমান হবেই রে নীল
…..
আঁখিদীপে দে না জ্বেলে হিম্মতেরই রোশনাই
……
কালো ঐ রাতের শেষে লুকিয়ে আছে রে ভোর
সমুখের পথের বাঁকে মিলবে মানিক রে তোর
দুনিয়ায় সবার মত তোমার আমার আছে রে ঠাঁই
বখশিশ চাই না মালিক,হিসাবের পাওনা চাই”
বসে,
পূর্বোক্ত গানদুটির গীতিকার শ্রী বিধায়ক ভট্টাচার্য ও শ্রী বিমল ঘোষের লেখনীর ভারের পাশে যেন অপেক্ষাকৃত নবীন,তরুণ গীতিকার গৌরিপ্রসন্নের কলম শানিত ফলা হয়ে ঝলসে ওঠে।
আর সেই শানিত ফলায় সুরের আলো ফেলেন সুরকার নচিকেতা।প্রতিবাদের ঝলক, সমানাধিকারের ঝলক, ন্যায্য পাওনার দাবির ঝলক।
অধিক বাক্য নিষ্প্রয়োজন। পাঠককে অনুরোধ করি, আরও একবার গানগুলি শুদ্ধ শ্রবণে শুনতে, আর প্রণত হতে শ্রী নচিকেতা ঘোষের প্রতিভার সম্মুখে|

শ্রীমতী দোলন ঘোষ বিগত ১০ বছর যাবৎ আকাশবাণী এফ এম এ উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তৎসহ দীর্ঘদিন ধরে তিনি চলচ্চিত্র গবেষণায় নিবিষ্ট ও নিজস্ব স্বাধীন ব্যবসার সাথেও যুক্ত।এবং বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের এক সক্রিয় কর্মী।

