সাদাকালো রঙমাখা

‘ভারতবর্ষের সঙ্গীতঃ তত্ত্বে ও অনুভবে’ – একটি সরল নিরীক্ষণ – ২

(পূর্বের সংখ্যার পর)

-বিশাখদত্ত

 

সঙ্গীতের নৃতাত্ত্বিক উৎসমুখ নিয়ে একটু ভাবব্যঞ্জনা পূর্বে হয়ে গেল। খুব বেশী তাত্ত্বিক রূপরেখা সৃষ্টি আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি যথাসম্ভব সরল ভাষায় সহজ করে সহজ কিছু চিত্রাঙ্কণ করার চেষ্টা করেছি যাতে পাঠকের কাছে আমার বক্তব্যের নির্যাসটি বিনা জটিলতায় আস্বাদনের উপযুক্ত হয়। জানিনা কতটা সাফল্য আমি পেয়েছি। সে বিচারের দায়ভার পাঠকের হাতে।

বৈশ্বিক সঙ্গীতের দৃশ্যপট অঙ্কন এই আলোচনা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নয়। আমরা ভাবব ভারতবর্ষের সংগীতের ধারা নিয়ে। কোথায় আমরা শুরু করেছিলাম, কিভাবে আমাদের বিকাশ শুরু, কোথায় আমরা এগুলাম, কোথায় পিছোলাম ইত্যাদি প্রসঙ্গে আমরা ক্রমে অগ্রসর হব। গোড়াতে এখানেও বলে রাখি খুব তত্ত্বগত ও উপাত্তিনর্ভর লেখা লিখছি না। যারা উপাত্ত চান তারা অনায়ােসই অন্যত্র তা পেয়ে যেতে পারেন। এখানে আমি কেবল মাত্র আমার আহৃত যৎসামান্য জ্ঞান ও অনুভূিতর ওপর দাঁড়িয়ে লিখছি।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে গীত দেশে দেশে প্রচলিত আছে এটা অনুমেয়। আমি কেবল ‘গীত কথাটা উল্লেখ করলাম। গীত ভারতবর্ষে সংগীতের একটা উপাদান মাত্র। তিনটি উপাদান একত্রে সঙ্গীতরূপ ধারণ করে। তারা হল গীত, বাদ্য ও নৃত্য। তবু আলোচনার সুবিধার্থে ‘সঙ্গীত’ শব্দটিকেই আমি ব্যবহার করব। আমার ধারণা সংগীতের এই ত্রিত্বমূলক সংজ্ঞা বৈদিক কালের নয়।কিন্তু আমাদের  শুরু করতে হবে বৈদিক কাল থেকে। বেদের যুগই আমাদের প্রথম প্রণালীবদ্ধ শাস্ত্রমুখী গায়নের যুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নানা মুনির মতে।  তার আগেও নিশ্চয় সঙ্গীত বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তা কেমনছিল  সে সম্বন্ধে আমাদের বিস্তৃত জ্ঞানার্জনের উপায় নেই। বৈদিক যুগের বেলায় তা আবার আছে। ঐতিহাসিক প্রমান্যতাকে আমরা ভিত্তি করলাম। বৈদিক যুগের গীত পরম্পরারূপে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সংরক্ষিত হয়েছে মৌখিক প্রশিক্ষণের (Orally transmitted) মাধ্যমে গুরুমুখী ধারায়। যার জ্বাজ্জ্বল্য দৃষ্টান্ত ঋক ও সাম। ঋক শব্দের আক্ষরিক অর্থ মন্ত্র যা সাধারণত ছন্দবদ্ধ, (‘ছন্দ’ -যা একটি বেদাঙ্গও বটে) আর সাম শব্দের অর্থ গান। বেদ কোন লেখ্য আকারে গ্রন্থিত শাস্ত্র নয় এ কথা আমরা সকলেই জানি। গুরুমুখে শিষ্যগণ যেভাবে শেখে যুগ যুগ ধরে সেটাই পারম্পর্য্য রক্ষা করে বয়ে চলেছিল এবং কালের এক বিন্দুতে এসে আমরা তার একটা লিখিত রূপ ধরতে পেরেছি।  অতএব অনুমান করা যায়- যা এখন পাচ্ছি সেটা অতি সামান্যই হয়ত হবে।শ্রবণের মাধ্যমে বাহিত হয়েছে ও লব্ধ হয়েছে বলে বেদকে আমরা ‘শ্রুতি’ বলি। ভারতীয় সঙ্গীতকেও তাই বলি আমরা আজও। আমাদের সঙ্গীতেরও বহুকাল কোন লেখ্য-পরম্পরা ছিল না। যেমন পাশ্চাত্যের রয়েছে বহু আগে থেকেই।  এতে আমাদের বিশেষ উপকার কিছু হয়নি। প্রায় আড়াই’শ বছর আগে বিটোভেন কি সুর করেছেন তার হদিস আমাদের আছে, কিন্তু বিটোভেনের সমসাময়িককালে এ বাংলায় নিধুবাবু কি সুর করে গেছেন কোন গানে তার কোন সংরক্ষণ হয়েছে কি? হয়নি। পুরাতনী গান বলতে আমরা যা শুনি তার প্রায় সকল গানই বহু পরের সুরারোপ বলে বিতর্ক আছে। কেন না আমরা লেখ্যরূপে সঙ্গীতের রূপরেখা বেঁধে রাখার কৌশলটি তখনো রপ্ত করতে পারিনি।  আমরা এখন যে স্বরলিপি পদ্ধতি পাচ্ছি তা আরও অনেক পরে বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডেজি উদ্ভাবন করেন। আমাদে দেশের সঙ্গীত বরাবরই সেই পুরাতন বৈদিক ধারায় শুনে গাওয়া ও মনে রেখে বাঁচিয়ে রাখার প্রক্রিয়াতেই ছিল।

আবার বৈদিক প্রেক্ষাপটে ফিরি। বৈদিক সূক্তপাঠ যা এক ধরণের গায়নশৈলী তার, এবং সামগানেরও ভিন্ন ভিন্ন ‘ঘরানা’ ছিল। এখনো আছে গুটিকয় যতটা জানি। ‘ঘরানা’ শব্দটি অধুনাতন হলেও বোঝানোর সুবিধার্থে অনেক আগেভাগেই লিখলাম। সেইসব ঘরানাগুলোর পঠন বা গায়নরীতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আমরা পাই লিখিত আকারে উপস্থাপিত গ্রন্থে। উপলক্ষ বিশেষে বা ক্ষেত্রবিশেষে একই সূক্ত বা সামগানের ভিন্নভিন্ন উপস্থাপনাও লক্ষিত হয়। আজও এই রীতি জীবিত আছে বেদজ্ঞ পন্ডিতমহলে। এমনকি বেদপাঠের আলাদা ঘরানা আজও বিদ্যমান। এই ভিন্নতাগুলোর অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করলে একটা ব্যাপার অন্তত বোঝা যায় – বৈদিক মন্ত্রপাঠ আজকের দিনের মণ্ডপে মণ্ডপে পুরোহিত মশাইয়ের মন্ত্রপাঠের মতন কতগুলো লিখিত শব্দ উচ্চারণ করে যাবার মতন সহজ বিষয় নয়। এর একটা নান্দনিক শিক্ষণ ছিল। মন্ত্রপাঠন মূলত মন্ত্রগায়ন হত বৈদিক যুগে। এবং তার ছন্দপ্রকরণ প্রভৃতি নিয়েও ব্যাকরণনির্ভর চর্চা ছিল তা ‘বেদাঙ্গ’ নির্ণীত করেছে। এই ছন্দ ও গায়নরীতির যে শাস্ত্রবদ্ধ দিঙ্নির্ণয় সেখানেই আমাদের বর্তমান ভারতের শাস্ত্রীয়-উপশাস্ত্রীয় এমনকি আপাতদৃষ্টিতে অশাস্ত্রীয় আধুনিক গানের শেকড়ও লুকিয়ে রয়েছে।

 

(লেখক পরিচিতি – মার্গসঙ্গীত শিক্ষার্থী। বাংলা ভক্তিগীতি, বিশেষত শাক্তপদাবলী ও শাক্তধারার সঙ্গীত নিয়ে মননশীল মানুষ। সাহিত্য ও দর্শন অনুরাগী।)

 

(পরবর্তী সংখ্যা)

Leave a Reply