সাদাকালো রঙমাখা

আভিজাত্যের তিন নায়ক –

বিগত ৩৫-৪০ বছরে আরও বহু কিছুর সঙ্গে বাঙ্গালী তিলে তিলে যা খুইয়েছে,তার নাম আভিজাত্য। এর কারণ হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের ‘কাপুরুষ’খ্যাত বিমল গুপ্তের সেই বিখ্যাত উক্তি – বাঙ্গালীর মরাল ফাইবারটাই হারিয়ে গেছে।তার শিল্প,রাজনীতি, কাব্য,চিত্র,সঙ্গীত,ক্রীড়া,চলচ্চিত্র সবকিছু থেকেই হারিয়ে গেছে। কেন হারালো,তার কারণ বিশ্লেষণ এই লেখার উদ্দেশ্য নয় যদিও,তথাপি এক কথায় বলতে গেলে বলা যায় যে, চরিত্র গঠন না হওয়া। অগ্নিযুগ,পুলিনবিহারী দাস,রাসবিহারী বসু,বিনয় সরকার প্রভৃতি মানুষকে চর্চ্চা থেকে বিসর্জন যার মূল কারণ।

প্রসঙ্গে ফিরি।
আভিজাত্যহীনতা
আভিজাত্য শব্দের পরিচায়ক যা বা যেগুলি, বাংলা চলচ্চিত্রে সেগুলির অসামান্য portrayal করে গেছেন যে কজন অভিনেতা, ‘আভিজাত্য’ শব্দ আর তাঁদের appearance সমার্থক হয়ে বাংলা ছবিকে অলংকৃত করেছে মধ্যে ষাট অব্দি। এই ঘরানার মধ্যে এই পর্বে তিন অভিনেতাকে নিয়েই কথা বলি বরং।ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল,কমল মিত্র।

হতেই পারেন তাঁরা রোমান্টিক নায়ক নায়িকার বাবা, মামা,মেশো অর্থাৎ গুরুজন স্থানীয়।পার্শ্বচরিত্র। কিন্তু যে আলো নায়ক নায়িকার ওপর সরাসরি প’ড়ে চোখ ঝলসে দিতে পারে, এই অভিনেতারা পার্শ্বচরিত্র হয়ে এমন এক এলিমেন্টের ভূমিকা পালন ক’রে গেছেন যাতে সেই আলো diffused হয়ে নায়ক নায়িকাকে ক’রে তোলে মোহনীয়।

আসি এই বাবা,মামা,মেশোদের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে সরাসরি।
শিক্ষার প্রাখর্য,যা কিনা কখনই উচ্চকিত নয়,বরং ব্যক্তিত্বের ভার স্বভাবমাধুর্য অন্তরের বিশ্লেষণী ক্ষমতা আর গভীর দর্শন দ্বারা মার্জিত স্পষ্ট উচ্চারণ,আত্মবিশ্বাসী, স্নেহময় অথচ দৃঢ়চেতা এবং স্ট্রং মরালিস্ট।
কিছু ক্ষেত্রে স্নেহময়ের পরিবর্তে কঠোর, অনমনীয় হলেও আত্মবৈশিষ্ট্যে অনস্বীকার্য।

সপ্তপদী ছবির ছবি বিশ্বাসের কথাই যদি ধরি। ধর্মভীরু বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ক্রীশ্চান মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে মেনে নিতে না পেরে যেদিন এসে দাঁড়ান রিণা ব্রাউনের দরজায়, ধীরে ধীরে দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করেন, ‘can I speak to Rina Brown’ – আজকের সেক্যুলার বাঙ্গালীর চোখেও এই বৃদ্ধের আত্মপরিচয়, ধার্মিকতা, বংশপারম্পর্য্যে শুদ্ধতা রক্ষার আপ্রাণ প্রয়াস কোথাও অলঙ্ঘ্য হয়ে ওঠে।

স্নেহময় মামারূপে ‘ক্ষণিকের অতিথি’র ছবিবাবুকে মনে করুন। কপর্দকহীন হয়ে বিপর্যস্ত ভাগ্যকে মেনে নেবার পূর্বক্ষণে যখন তিনি তাঁর অনাথা ভাগ্নির বিবাহ স্থির করেন,এবং তারই struggling প্রেমিককে ডেকে আর ক দিন বাদেই নিলাম হতে যাওয়া তাঁর প্রিয় গাড়ীটিতে করে গড়ের মাঠে যেতে যেতে সব অবস্থা জানিয়ে,তাঁর অসহায়তা ব্যক্ত করে পরম বন্ধুর মত খোলাখুলি আত্মসমর্পণ করেন, তখন বুক মুচড়ে গেলেও বাচনভঙ্গির অদ্ভুত মায়াময় আধিপত্যে সেই সর্বস্ব হারাতে বসা মানুষটিকে একেবারেই ভিলেইন ভাবতে ইচ্ছে করে না। কারণ, পরিণয়ের পরণতির পথে বাধা হলেও তিনি যেভাবে বারবার ভাগ্নির প্রেমিকের কাছে তাদের ‘বন্ধু’ত্বকে সসম্মান স্বীকারোক্তি দেন, তা-ই যেন পরম পাওয়া হয়ে থাকে ডাক্তারি ছাত্র বিমল অর্থাৎ নির্মল কুমারের তরুণ করুণ চোখে।

‘শুন বরনারী’র প্রবল রাশভারি ‘উদাসীন’ এর মালিক বা ‘পথে হল দেরী’র রীতিমতো নাক উঁচু উচ্চবিত্ত দাদু,যিনি বিপরীতে সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত মেধাবী যুবকটিকে ফুৎকারে নস্যাৎ করে দিতে পারেন তাঁর অর্থ,বংশগৌরব,অবস্থান ইত্যাদি সবকিছু দিয়ে – আমরা,অর্থাৎ দর্শকও যেন বাক্যহীন হয়ে যাই তাঁর ব্যক্তিত্বের ছ্বটায়।

আবার ‘চাওয়া পাওয়া’র দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী সংবাদপত্র সম্পাদককে যখন তার এমপ্লয়ী হেলায় তাঁর বিরাট অঙ্কের প্রাইজমানি চেক ফিরিয়ে দেন,এবং তিনি তা গ্রহণও করেন, সে মূহুর্তের ছবি বিশ্বাসের অভিব্যক্তি আরও বহুগুণ শ্রদ্ধাশীল করে তোলে দর্শককে তাঁর প্রতি।

‘জলসাঘর’এর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।কারণ বিশ্বম্ভরের চরিত্রটির সাহায্য না হিয় তিনি পেয়েছিলেন এ ছবিতে, ‘গলি থেকে রাজপথ’ ছবির কথা মনে করুন তবে। ধনকুবের, প্রাজ্ঞ, বর্ষীয়ান মানুষটিকে যখন দুই ভ্যাগাবন্ড পকেটমার লাগাতার মিথ্যে ব’লে, ব্যাবসার মূলধন হিসেবে টাকা নিয়ে চলে, এবং তিনি সমস্তটা বুঝেও কিচ্ছু না ব’লে তাদের সঙ্গে হৃদ্যতা বাড়িয়ে চলেন,আমরা অবাক হই। কিন্তু ছবির একপর্যায়ে যখন তিনি তাদের বাড়ীতে ডেকে আরও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন,তাঁর স্ত্রী দেন তাদের মাতৃস্নেহ, আর এই দুই যুবক নিজেদের পাপবোধে,হীনম্মন্যতায় মাটিতে মিশে যেতে যেতে সব অপরাধ স্বীকার করে নেয়, তখন সত্যিই মনে হয় যে ভাগ্যিস এমন মানুষ কেউ আছেন, যাঁরা এভাবেই গলির আঁধারপথিককে হাত ধ’রে নিয়ে আসেন আলোর রাজপথে।

পাহাড়ী সান্যাল প্রসঙ্গে বলতে বসলে ত বলা শেষ হবারই নয়। ঐ বেঁটেখাটো চেহারা হলে কি হবে, লখনঊ এর জলহাওয়ায় মানুষ অতুলপ্রসাদ সেনের সাহচর্যে সংগীতশিক্ষা, শাস্ত্রীয় তালিম,আবার ওদিকে তুখড় ইংরেজি,ফরাসী, ঊর্দু – এ হেন মানুষ আভিজাত্যের বর্ণময়তায় আলোকিত হবেন না ত কি আজকের খরাজ, রজতাভরা হবেন!???… সূর্যতপা বা রাজকুমারী ছবির মামার কথা মনে করুন। যখনই দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ছায়াদেবীর দাপটে নায়িকা প্রায় ম্রিয়মান, একটুকরো সুশীতল ছায়ার মত মামা বারবার তাদের সহায় হোন।তা সে তিনি কোট প্যান্টেই থাকুন আর নিখাদ ধুতিপাঞ্জাবীতেই থাকুন। অগ্নিসংস্কার ছবির কথা স্মরণে আসে?..মানসিক সমস্যার রোগী অনিল চট্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা এমনভাবেই করেন,যার পুরো দায় গিয়ে পড়ে উত্তম কুমারের ওপর। সেই মানসিক রোগের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ডাক্তার পাহাড়ি সান্যাল। যেভাবে তিনি মানসিক বিকলনের যাবতীয় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে ছায়া দেবীকে অর্থাৎ অনিল চ্যাটার্জির মা কে কনভিন্স করেন সঠিক সাক্ষ্য দিতে,এবং একই সঙ্গে ছবিবাবু যেভাবে তাঁকে মাতৃহৃদয়ের আকুলতা আর নৈতিক দর্শনের তুল্যমূল্য বিচার করে ন্যায়ের পক্ষেই তাঁর সাক্ষ্যবাণী আদায় করে নেন, তা এক কথায় অমূল্য।

‘সবার ওপরে’র ‘প্রসাদ দা’র কথা ম’নে আছে?? আদালতে নিরন্ন অসুস্থ শংকরের পক্ষে জামিনদার কেউ আছেন কিনা জিজ্ঞেস করা হলে যে সুপুরুষ ভদ্রলোকটি উঠে জানান যে তিনি আছেন এবং পরিচয় হিসেবে বলেন ‘আমি হাইকোর্টের একজন অ্যাডভোকেট এবং ‘ভারতী’ সংবাদপত্রের সম্পাদক।’বোধহয় জামিন হিসেবে আমি নির্ভরযোগ্য’ – তখন গোটা আদালত কক্ষের উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের চোখে যে সসম্ভ্রম বিস্ময় ছেয়ে যায়, এটাই পাহাড়ি সান্যাল এর মত অভিনেতার Aura..

আবার ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবির কর্ণেল পাহাড়ি সান্যালকেই যদি ধরি। একটু যেন বোহেমিয়ান এই মনোচিকিৎসক যে কূটনৈতিকতায় গোটা হসপিটালের সবটা পরিচালনা করেন, মনোরোগী থেকে নার্স – প্রত্যেককেই কৌশলে handle করেন – এবং শেষ দৃশ্যে ভারসাম্যহীন রাধা মিত্রের সামনে নিথর দাঁড়িয়ে নিজের সমস্ত অপারগতা, না বোঝা নীরবে মেনে নেন, তাতে দর্শক যতই যন্ত্রণাবিদ্ধ হোক না কেন,কর্ণেলের প্রতি সম্মান, ভালবাসা কোথাও এতটুকুও টোল খায় না।

ভিন্ন ধারার ছবি ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র পাহাড়ীবাবুকে যদি দেখি। অর্থবান, posh, গুণী বৃদ্ধ পিতার আপাত বৈশিষ্টাবলীর তলায় আরও যে পরিচয়টা তাঁর latent হয়ে থাকে,তা হল তাঁর দারুণ আধুনিকমনষ্কতা। তাঁর অত্যাধুনিকা মেয়ে ও বিধবা পুত্রবধুকে যেভাবে যে জীবনপ্রণালীতে আমরা দেখি, যে সপ্রতিভতায় তিনি অচেনা একদল তরুণের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিতে পারেন, তার পিছনে একটাই কারণ কাজ করে, তা হল পাহাড়ী বাবুর সপ্রতিভতা।

 

 

(পরবর্তী পর্বে)