তর্পণে প্রণত মসী

আভিজাত্যের তিন নায়ক – ২

(পূর্বের সংখ্যার পর)

 

পাহাড়ী সান্যালের ‘সূর্য্যতপা’র কথায় আসি। সেখানেও এক দুর্ল্যঙ্ঘ প্রাচীরের মত ছায়াদেবী। অসহায়া, নিরাশ্রিতা,একক মাতৃত্বের দায়িত্বস্বরূপ সপুত্র সন্ধ্যা রায় তাঁর বাড়ীতে খুবই সঙ্কোচের সঙ্গে থাকেন। সেখানে একমাত্র আশ্রয় তার এই ‘মামা’। রাজকীয় বাড়ির রাজকীয় যাপন,আদব কায়দা। সঙ্গে তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার দীপেন্দ্রর ব্যক্তিত্ব যেন প্রতি মূহুর্তেই আহত করে চলে।সেখানে কোমল মলমের মত,রৌদ্রদগ্ধ দিনের ছায়ার মত আবার অপরিণত মনের দিশাহীন জিজ্ঞাসায় প্রাজ্ঞ,গভীর,মননশীল যে উত্তর আসে ‘মামাবাবু’র কাছ থেকে, তা যেন সেই রাজকীয় আবহের সঙ্গে নিতান্ত সাধারণ মেয়েটির মানিয়ে নেবার পথ সুগম করে।

এই ধারায় আলোচ্য তৃতীয় অভিনেতা অবশ্যই কমল মিত্র।

বর্ধমানের বনেদী বংশে জন্ম। খেলাধুলায় ছিল আগ্রহ। প্রথমজীবনে যোগ দেন মিলিটারীতে। সেই মিলিটারি মেজাজ অক্ষুণ্ণ রেখেছেন অভিনীত ক্লাসিকগুলির প্রায় বেশীরভাগেই।

‘দেয়া নেয়া’র বাবা কমল মিত্র আর ছেলে উত্তম কুমারের বিতর্কের অংশ নিয়ে অনেক মিম,কার্টুন ইত্যাদি বেরিয়ে চলেছে। এটাই কোথাও প্রমাণ করে এই দৃশ্যের বিপুল জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা। তার কারণ কি শুধুই উত্তম? কখনোই নয়। অমন সুকুমার ছেলের শিল্পীসত্তার পিষে মারতে চান যে বাবা, সেই বাবা কমল মিত্রসম লৌহকঠিন না হলে চলেই বা কি করে?কন্ট্রাস্ট দুই চরিত্র বলেই না দৃশ্য এত জমাট,এত বর্ণময়।ছবির শেষভাগে যখন জানা যায় যে কমল মিত্রের ছেলে অভিজিৎই ড্রাইভার হৃদয়হরণ, ফুল স্যুট পরে সিঁড়ির হাতল ধরে নেমে এসে কমল বাবু, সামান্য মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের সামনে গিয়ে বলেন, ‘ড্রাইভারিও করেছ তাহলে!!? তোমারও ত জেদ বড় কম নয়” আর এই শক্ত চোয়াল জেদেই যে আসলে শিল্পপতি বাবার মন জয় করে ফেলেছে জনপ্রিয় গায়ক অভিজিৎ, তা মূহুর্তে দর্শককে ছুঁয়ে যায়। বাবা জানান, ‘আমি আমার মত বদলেছি। গান তুমি গাইবে”। দর্শক ভাবতে থাকে, কাকে ফুল মার্ক দেবে.. নায়ক উত্তম নাকি নায়কের কাছে নতি স্বীকার করা বাবা..উত্তম আপ্লুত হয়ে বাবার পা ছুঁলে,পিঠে হাত দিয়ে বাবা বলেন, ‘আর তার সঙ্গে কাজ কারবারও একটু দেখো বাবা’ – এই যে আপসহীনতার গজদন্ত মিনার থেক নেমে এসে ছেলের সঙ্গীত প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়েও বাবা যে তাঁর যুক্তিতে অর্থাৎ ব্যাবসার কাজকর্ম দেখার প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থানেই রইলেন,এতে কোথাও তাঁর অবস্থান এতটুকুও নত হল না, বরং প্রবল আভিজাত্যে যেন যুক্ত হল পিতৃস্নেহের রঙীন পালকটিও।

‘বিভাস’ ছবির তারকেশ্বর ডাক্তারের কথা মনে আছে?.. গ্রামের জোতদার গোত্রীয় এক ডাক্তাত,যাঁর আপাত পরিচয়ের আড়ালে আছে এমনকিছু যাকে ডরিয়ে চলে গোটা গ্রাম। বাড়ীতে তাঁর স্ত্রী দীর্ঘকাল বাকস্তব্ধ। কম্পাউন্ডার বিভাসের নম্র প্রশ্নের আড়ালে লুকোনো প্রতিস্পর্ধায় তারকেশ্বর ডাক্তারের ভিতরে লুকোনো শ্বাপদ দাঁতনখ বের করলেও, তাকে কৌশলে ঢেকে রেখে,কেবল আড়চোখে তাকিয়ে একাসনে বসে অন্নগ্রহণ সুসম্পন্ন করেন। 

ছবির শেষ দৃশ্যে যখন তাঁর মেয়েকে সেই চিরকাল নীরব থাকা স্ত্রী প্রতিবাদী হয়ে বিভাসের হাতে তুলে দেন মেয়েকে। ভগ্ন বিধ্বস্ত কমল মিত্র তাঁর কিছু আগেই দেখেছেন নিজের কুশপুত্তলী পুড়তে। চশমাটা খুলে নিয়ে মুখটা সামান্য ঘোরান কেবল; আর মনে হতে থাকে যেন সমস্ত অপকর্ম ফিকে হয়ে যায় এই প্রতাপ,এই আভিজাত্যের সামনে।

‘সবরমতী’ ছবিতে বিরাট কোম্পানির সর্বময় কর্তা।

লঞ্চ কিরা নতুন প্রোডাক্ট বাজারে সাড়া ফেলতে না পারায় যেভাবে পাহাড়ী সান্যালকে তিরষ্কার করতে থাকেন,আর ডিজাইনার,মিডিয়া,পাবলিসিটি,সেলস প্রভৃতি টোটাল মেকানিজমের ভূমিকা কি হওয়া উচিত ছিল তা বলতে থাকেন, আমরা অর্থাৎ দর্শককুল পাহাড়ি বাবুর মত ভাল মানুষের অকারণ হেনস্থায় যতটা ব্যাথিত হই, ঠিক ততটাই চমৎকৃত হই কমল মিত্রের, ‘আজকের ভাষায়’ একজন টিপিক্যাল হাই লেভেল কর্পোরেট বসের চরিত্রের নিখুঁত চিত্রণে।