তর্পণে প্রণত মসীরাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

বিপ্লবী শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সীর জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকতা ও বিপ্লব সাধনা

১২৫তম জন্মবর্ষে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ – 

 

বিপ্লবী বি.ভি-দল-এর সদস্য, সুভাষবাদী জনতার অন্যতম সংগঠক এবং ‘রাখাল বেণু’–পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক শ্রী সত্যেন চৌধুরী লিখছেন “সত্যরঞ্জনের সমগ্র জীবন-ইতিহাসে যে প্রচণ্ড ভাবশক্তি, রাজনৈতিক কৃতিত্ব আর স্বদেশ সৈনিকের বীর্য্য লুক্কায়িত ছিল তা সর্বসাধারণের বোধগম্য ছিল না। এর একমাত্র কারণ হল তাঁর উচ্ছ্বাসহীন সংগঠন শক্তি ও আবেগহীন মন্ত্রগুপ্তির অসাধারণ প্রয়োগ। এরই সাহায্যে তিনি হেমচন্দ্র, দেশবন্ধু এবং সুভাষচন্দ্রের বিপ্লব আয়োজনকে সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করেছেন—সার্থক করেছেন–সিদ্ধ করেছেন।”

মহান বিপ্লবী শ্রীসত্যরঞ্জন বক্সী বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বরিশাল জেলার বাঁথি গ্রামে ১৮৯৭ সালের ১৬ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। বরিশালের গাভা স্কুল থেকে ম্যাট্রিস্কুলেশন পরীক্ষায় [১৯১৩], ১৯১৫ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আই.এ পরীক্ষায়, ১৯১৭ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে ইংরাজীতে অনার্সসহ বি.এ পরীক্ষায়, ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজী সাহিত্যে এম.এ পরীক্ষায় এবং ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আইন পরীক্ষায় [বি.এল] উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁর ছাত্র জীবনের সমাপ্তি এবং বৈপ্লবিক রাজনৈতিক ও কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯২৩–এ ‘ফরওয়ার্ড’ দৈনিক কাগজের সহ-সম্পাদকরূপে তাঁর সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত। গোড়াতেই “Dumb million” এবং “Asiatic Federation” শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রবন্ধদ্বয় নিয়ে বেশ হৈচৈ পড়ে যায়। স্বয়ং চিত্তরঞ্জন দাশ “Asiatic federation” প্রবন্ধ পড়ে সত্যরঞ্জন বক্সীকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন ‘you have given words to my thought’–আমার চিন্তাধারার বাস্তব রূপ দিয়েছ তুমি––আমি সত্যি খুশী হয়েছি। তৎকালীন সম্পাদক শ্রী মৃণালকান্তি বসুকে ডেকে দেশবন্ধু বলেছিলেন আমাদের স্বরাজ্য পার্টি ও অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাপারে যে সব সম্পাদকীয় লেখা হবে তাতে যেন সত্যরঞ্জনের কলম প্রাধান্য পায়। দেশবন্ধুর ইচ্ছাতেই তিনি ক্রমশ স্বরাজ্যদলের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মে জড়িয়ে পড়েন।

১৯২৩-২৯ সময়ে ‘Forward’ পত্রিকা সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই যুগে ফরওয়ার্ড পত্রিকায় নানা বৈদেশিক খবর প্রকাশিত হতে শুরু করে – বিশেষত পরাধীন জাতিগুলির মুক্তি সংগ্রামের ছোট-বড় খবরগুলি। তা ছাড়াও মাতৃভূমি থেকে নির্বাসিত হয়ে ভারতীয় বিপ্লবীগণ—যাঁরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে সেই সব দেশে  ভারতের স্বাধীনতাকামী সংগ্রামের সম্পর্কে কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার খবর ‘বিশেষ সংবাদদাতা’ নিয়োগ করে প্রকাশিত করাও হতো। দ্বিতীয়ত প্রবাসে বসবাসকারী বিপ্লবীদের লেখাপত্র ও চিঠিপত্রাদি প্রকাশ করে তাঁদেরকে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা। এবং তৃতীয়ত ‘বিশেষ সংবাদদাতা’ র কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে তাঁদের আর্থিক কৃচ্ছতার আংশিক সুরাহার ব্যবস্থা করা। শ্রীসত্যরঞ্জন বক্সীর কলমের দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এতখানি বিশ্বস্ততা অর্জন করেছিল যে দেশবন্ধুর কলকাতায় অনুপস্থিতিতে কোন রাজনৈতিক বিবৃতি প্রদানের অধিকারও তিনি প্রদান করেন। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর ১৯২৬ সালে সত্যরঞ্জন ‘Forward’-এর সম্পাদক [ঘোষিত সম্পাদক] নিযুক্ত হন এবং সেই সময় ফরওয়ার্ড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন শ্রী শরৎচন্দ্র বসু। সম্পাদক হিসাবে “seditious” লেখার অপরাধে ১৯২৯ ও ১৯৩১ সালে তিনি দু’বার অভিযুক্ত হন। প্রথম বারে হাইকোর্টের শেষ নির্দেশে তিনি ১৫ দিন এবং দ্বিতীয় বারে ১ বছরের উপর কারারুদ্ধ থাকেন। ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত কলকাতার কাছে ডানকুনিতে এক ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনার বর্ণনায় ‘Horrified Spectator’-শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টে জনসাধারণের শিয়রে ওঠেন। রেল কর্তৃপক্ষ কাগজের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে এবং আদলতে দেড় লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণের আদেশে ফলে রাতারাতি নাম পালটে ‘Liberty’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং এর সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছিলেন শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সী। কিন্তু রাজরোষের কোপে পড়ায় পুনরায় নাম পালটে ‘Advance’ এবং পরে ‘Nation’ পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করেছিল। অর্থাৎ একাধিকবার বাধা-বিপত্তি এবং সিডিশন-এ অভিযুক্ত হয়েও শ্রীসত্যরঞ্জন বক্সী তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতায় কলমের সঙ্গে আপোষ করেননি।

‘মুক্তিসংঘ’ এবং বিপ্লবী বিভি-র অন্যতম সর্বাধিনায়ক শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষ সম্পর্কে শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সীর মাতুল ছিলেন এবং ছাত্রজীবনেই তিনি শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষের কাছে বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হন এবং বিভি-র বিপ্লবাত্মক কার্যকলাপ রূপায়ণে এবং নূতন নূতন দৃঢ়চেতাসম্পন্ন নিষ্ঠাবান বিপ্লবী কর্মী সংগ্রহে তিনি সর্বদা বিভি-র সর্বাধিনায়ককে সাহায্য করেছেন। বস্তুত শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষ ও শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সী উভয়েই শ্রী সুভাষচন্দ্রের সংস্পর্শে এসেছিলেন এবং মূলত তাঁদের প্রচেষ্টাতেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুপ্ত সমিতিগুলির সূদূরপ্রসারী প্রভাব ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে শ্রী সুভাষচন্দ্র বসুও প্রত্যক্ষ উপলব্ধি গ্রহণে সক্ষম হন এবং ১৯২৮ সালে কলিকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে নেতাজী ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ কোর-এর প্রবর্তন করেন। এই ভলান্টিয়ার্সদের সৈন্যদের মত কুচকাওয়াজের শিক্ষা দেওয়া হয়। কলিকাতায় তথা সমগ্র বঙ্গের যুবকদল সৈনিকের কায়দায় মার্চ করিবার ও চলাফেরা করবার নেশায় মাতিয়া ওঠে এবং অধিবেশন শেষ হবার পরও সেই উন্মাদনা অটুট ছিল। বস্তুত শ্রী হেমচন্দ্রের নির্দেশেই বাংলার জেলায় জেলায় ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত মেদিনীপুরে নূতন পদ্ধতিতে দল গঠনে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৩০ থেকে ৩৪-এর মধ্যে বিভি-র দলের বিপ্লবীদের দ্বারা বেশ কয়েকটি সার্থক সশস্ত্র বৈপ্লবিক কর্ম সম্পন্ন হয় এবং বিপ্লবী অনেকেই শহীদের মৃত্যু বরণ করেন। বিনয়-বাদল-দীনেশ-অনাথ-মৃগেন-ব্রজকিশোর-রামকৃষ্ণ-নির্মলজীবন-মতি-ভবানী প্রমুখ শহীদগণ ছিলেন বিপ্লবী বিভি দলেরই সদস্য। শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষ ও শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সী উভয়েরই কর্ম পরিকল্পনায় ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বৃহত্তর বিপ্লবের  ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল। ১৯৩২ থেকে ৩৮ সাল পর্যন্ত শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সী বিনা বিচারে ডেটিনিউ হিসাবে বক্সা ও দেউলি জেলে আটক ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভির অনেক নেতাই [শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষ, শ্রী মণীন্দ্র কিশোর রায়, শ্রী সত্যেরঞ্জন বক্সী] ছিলেন {এপ্রিল ১৯৪০-ডিসেম্বর ১৯৪০} জেলে।  জেলে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বিভির বিপ্লবীদের পরামর্শ চলে এবং এই যুদ্ধের সুযোগ গ্রহণে সকলেই সম্মত হন। জেলে আমরণ আনশন-শুরু করলে  শ্রী সত্য বক্সী ও শ্রী সুভাষচন্দ্র উভয়েই সামায়িকভাবে স্থাস্থ্যরক্ষার যুক্তিতে মুক্তি লাভ করেন। মুক্তিলাভের কিছুদিনের মধ্যেই শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সী ও বিভি-র অন্যান্য বিপ্লবীদের পরিকল্পনামাফিক শ্রী সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের পরিকল্পনা সাধিত হয়। সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেই বিভির বিপ্লবীরা [শ্রীহেমচন্দ্র ঘোষ, সত্যরঞ্জন বক্সী, মেজর সত্যগুপ্ত] দেশবাসীকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পরিকল্পনা সম্পাদনে সচেষ্ট হন। ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের তরফে নেতাজীর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সীকে ১৯৪২-এর মে মাস গ্রেপ্তার করে দিল্লীর লালফোর্টে কারারুদ্ধ করে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। নেতাজী সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁর মলদ্বারে রুল দিয়ে অত্যাচার চালানো হয় এবং পাশবিক দৈহিক নির্যাতনে তাঁর একটি চোখের মণিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়ান্দাদের নৃশংস অত্যাচার সত্ত্বেও এই ক্ষীণকায় রুগ্ন মানুষটির থেকে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কিত কোন তথ্য সংগ্রহে সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল পুলিশ।

১৯৪৬ সালে গান্ধিজীর হস্তক্ষেপে হৃদযন্ত্রের ব্যাধিতে আক্রান্ত বিপ্লবী শ্রীসত্যরঞ্জন বক্সীকে সরকার  প্রেসিডেন্সি জেল থেকে মুক্তি দেয় কিন্তু নেতাজীর নির্দেশমত অন্তর্ধানের [১৯৪১-এর ১৬ জানুয়ারি] সময়ে থাকা ১৬এ প্রিয়নাথ মল্লিক রোড সালের [১৯৩৮-১৯৮৩ সালের ৮ই জানুয়ারি, {জেলের দিনগুলি ব্যতীত} আমৃত্য তিনি ১৬এ প্রিয়নাথ মল্লিক রোড-এ [পরের দিকে ১৬বি প্রিয়নাথ মল্লিক রোড এই বাড়িরই পিছনের দিক]বাড়িতেই অবস্থান করেন।

জেল থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত শ্রী সত্যরঞ্জন বক্সী আজীবন কঠিন আর্থিক দুর্দশায় জীবন অতিবাহিত করেন। কিছুটা তাঁর স্বেচ্ছাকৃত এবং কিছুটা খণ্ডিত ভারতবর্ষে স্বাধীনভাবে কোন কাগজে কাজ না করতে অসমর্থ হবেন মনে করে সবরকম আহ্বান ও সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও ১৯৪৮ সালে কিছু সময়ের জন্য তিনি শরৎচন্দ্র বসুর “Nation” পত্রিকায় এবং শরৎচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড সোস্যালিস্ত অরগানাইজেশনে-এর কার্যালয় ‘গিনি হাউস’ ১৩১ নং বউবাজার স্ট্রিট-এ ইংরাজি সাপ্তাহিক পত্রের সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন।  “The Socialist Republic” নামে সাপ্তাহিক পত্রিকার ৪র্থ সংখ্যায় তিনি ভারত-বিভাগের বিরুদ্ধে লিখলেন “ A country is not a commodity to be slied off at leisure or pleasure. It is a soulful entity, it is sentiment. It is no use to appear simple and truthful and say it was all a blunder…….. Poland history should have been a warning to all of us, high and low. Historians say partition of Poland meant “destruction” of the country. They were a “monstrous robbery.” We have all about us the elements of a bigger tragedy. Courage, vision, character, statesmanship—all will be needed in ample measure to overcome and defeat our self-stultification.” Vol. I. No 4, 15 November 1947.

কিন্তু দেশবন্ধু ও সুভাষচন্দ্র সহযোগী শ্রী সত্যরঞ্জন তাঁদের ব্যতীত কারও কাছেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে অসমর্থ হন এবং অত্যন্ত আর্থিক অনটন সত্ত্বেও কারও থেকে সাহায্য গ্রহণে অস্বীকার করেন। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের [ দুই পুত্র সুধাংশু, সুবীর রঞ্জন এবং চার কন্যা লীলা, শেফালি, গীতা, লীনা] নিয়ে পারিবারিক নানারূপ বিপর্যয়ের মধ্যে প্রায় কপদর্কহীন অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করেন। পশ্চিমবঙ্গ ও ভারত সরকার বহু চেষ্টা করেও তাঁকে কোনরূপ আর্থিক সাহায্য গ্রহণ প্রদানে ব্যর্থ হন।

বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-নেতাজীর শিক্ষাদর্শ ছাত্রদের মধ্যে উজ্জীবিত করার জন্য তিনি জগদীশচন্দ্র সিংহ [বেলগাছিয়া ভিলা]-এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “নেতাজী মহাবিদ্যালয়” এলগিন রোডে। পাশ্চাত্য প্রভায় প্রদীপ্ত হয়েও সত্যরঞ্জন বক্সী ভারত-আত্মাকে অনুধাবন করেছিলেন গীতার মহান আদর্শে। ভারতীয়  বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেন তাঁর সম্পর্কে লিখছেন “ সত্যদাকে যাঁরা জানেন তাঁরা এ কথাটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন যে, দুঃখের কাছে তিনি কোনদিন নতি স্বীকার করেন নি। দুঃখ যখন তীব্র দহনজ্বালা নিয়ে তাঁকে দগ্ধ করতে চেয়েছে তিনি সমগ্র শক্তি নিয়ে সে দুঃখের অগ্নিশিখাকে নির্বাপিত করেছেন।” তিনি নীরবে যা করেছেন, দলের ছেলেমেয়েদের যে নির্দেশ দিয়েছেন এমনকি রোগশয্যা থেকে মাঝে মাঝে যা বলেছেন তা থেকে পরিষ্কার যে স্বাধীনতা সংগ্রামের যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল—যে অধ্যায় পরিণতি লাভ করেছিল নেতাজীর আজাদ হিন্দ্‌ বাহিনীর সশস্ত্র অভিযানে—মহাবিপ্লবের এই অধ্যায়টি বাদ দিলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই ইতিহাস-এর সূচনা দেখা যায় মহাবরেণ্য বিপ্লবী শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষের কর্মকাণ্ডে এবং সর্বশেষ অধ্যায়টি ছিল স্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সেই বাহিনীর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সর্বাধিক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হল কোহিমা দখলের লড়াই। সেই সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে ইতিহাস থেকে মুছে দেবার ঘৃণ্ণ প্রচেষ্টা আজও চলেছে। শ্রী সুধীররঞ্জন বক্সী আপোষহীন নায়কের ন্যায় ছাত্রাবস্থা থেকে শ্রী হেমচন্দ্র ঘোষ ও শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু-র সহযোগী হয়ে মন্ত্রগুপ্তির আদর্শে একনিষ্ঠভাবে এই সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন। তাঁর  রাজনৈতিক সাংবাদিকতার আদর্শ ও বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবনের সাধনার আদর্শকে অনুধাবন করতে হলে তাঁর সমগ্র সংগ্রামী বিপ্লবী জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি আমাদের জানা দরকার। কিন্তু খণ্ডিত স্বাধীনতাকে একরকম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নেতাজীর সত্ত্বার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করেছিলেন।

 আজ তাঁর আর্বিভাবের ১২৫তম বর্ষের আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী শেষ করি তাঁরই লেখার উক্তি দিয়ে ‘আমরা মিলেছি এক মায়ের ডাকে’ শিরোনামে তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধের শেষে লিখছেন “……… জননী, দেশমাতা, জগন্মাতা, আজ তোমার ধূলির তিলক পরেছি ভালে। দুর্যোগের মায়ার আড়ালে দেখেছি নিত্যের জ্যোতি। সত্যের আনন্দরূপ নিয়েছে মুরতি। বন্দেমাতরম্‌। আমাদের আজ প্রতীক্ষা দেবীর আবির্ভাবের জন্য। এই আবির্ভাব সার্থক করার জন্য যুগে যুগে আমাদের দুয়ারে দূত এসেছে। আজ আবার পূজারী অর্ঘ হাতে বলছে—ত্বং শ্রীস্ত্বমীশ্বরী ত্বং হ্রীস্ত্বং বুদ্ধির্বোধলক্ষণা। বন্ধনমুক্ত রাজ-রাজেশ্বরী মূর্ত্তিতে মা প্রতিভাত হও। জননী জাগো। নূতন প্রভাতের সূর্য্য এসেছে। এসেছে রূদ্র বেশে—হয়তো এসেছে হাসিভরা ঔজ্জ্বল্যে। পূজারী সেই পরম লগ্নের প্রতীক্ষায়। জগৎ জাগুক, নয়ন খুলে করুক নূতন জীবন লাভ। মনে প্রাণে, শারীরিক উৎকর্ষে, অন্তরের সাধনায়, মন্দিরের দ্বারের এই প্রত্যাশা আজ উজ্জ্বল হউক, সার্থক হউক—এই প্রত্যাশ্যায় এ ধূলায় রাখিনু প্রণতি।……”

 বিশেষ কৃতজ্ঞতা –এই লেখাটির জন্য শ্রী নিশীথরঞ্জন রায়, শ্রী শঙ্করীপ্রসাদ বসু ও শ্রী সত্যেন চৌধুরী সম্পাদিত ‘রাখাল বেণু’ প্রকাশিত ‘সত্যরঞ্জন বক্সী’ সঙ্কলন গ্রন্থের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এই গ্রন্থটি দিয়ে সাহায্য করেছেন শ্রী শুভাশিস চৌধুরী।

Leave a Reply