– শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত
যখন Guddi ছবিতে ‘গুড্ডি’র লিপে আমরা পেয়েছিলাম ‘আজা রে পরদেশী’ , তখন হৃষিকেশ মুখার্জির সেই যুগান্তকারী ছবিতে এ গানের উপস্থাপনা আর Madhumati-র মূল সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য শুধু জয়া ভাদুড়ী আর বৈজয়ন্তীমালা-র অভিনয়ের ব্যবধানেই সীমাবদ্ধ ছিল না;সীমাবদ্ধ ছিল না শুধু রঙিন ও সাদা-কালোর তফাতেই; শুধু আউটডোর ও ইনডোর লোকেশনের ফারাকেও নয়; শুধু এক নায়িকার ঝরনার স্রোতের সঙ্গে নেচে চলা আর অন্য নায়িকার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লিপ-সিঙ্ক করার পার্থক্যেও নয়।
একাধারে,এ ছিল এক প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি, যা ধরা পড়েছিল Hrishikesh Mukherjee-র নির্মিত ছবিতে— চলচ্চিত্র মহারথী Bimal Roy-এর ‘চেলা’ বলে খ্যাত ছিলেন যিনি ;আর অন্যদিকে সঙ্গীত পরিচালক Vasant Desai যেন সুরের মাধ্যমে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানইয়েছিলেন Salil Chowdhury-কে। Do Bigha Zamin ছবির মাধ্যমে ভারতীয় পর্দায় এক ঝড় তুলে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিভাবক যে বিমল রায়, তিনি দর্শক ও শ্রোতাদের হৃদয়ে—পাঠক ও লেখকদের মননে—চিরকাল বেঁচে থাকবেন বহু ক্ষেত্রেই এক পথপ্রদর্শক হিসেবে।
সলিল চৌধুরীর -র নাম উচ্চারিত হলেই নারী-পুরুষ সকলেই অনিবার্যভাবে গুনগুন করে উঠতে থাকেন— Barkha bahar aayi, Papi bichhua, Itna na mujhse tu pyar badha, Suhana safar, Mausam kahe pukar ke, Ganga aaye kahan se, Aye mere pyare watan…
অন্যদিকে বহু সঙ্গীত পরিচালক পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন যে ‘সলিলদা’ ছিলেন এক অসামান্য সুরকার; তুলনাহীন সঙ্গীত পরিচালক; অর্কেস্ট্রার সুরবিন্যাসে অনায়াস যাঁর দক্ষতা; ভারতীয় লোকসঙ্গীত ও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের অভিনব মেলবন্ধনের এক অনন্য রসায়নবিদ; কোরাল সংগীতের অগ্রদূত; এবং ভারতীয় গণআন্দোলনের প্রতিবাদী গানের প্রবর্তক।
আমি বরং আজ একটু কম আলোচিত একটা দিক নিয়ে কথা বলি— Salil Chowdhury-র ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। আমি যখন ‘মারফি রেডিও’ নামের এক বাক্সে ‘বিবিধ ভারতী’ শুনতে শুরু করি, তখন থেকেই শুনে আসছি Shankar-Jaikishan, Sachin Dev Burman, Laxmikant-Pyarelal, Kalyanji-Anandji, Naushad, Hemant Kumar এবং Salil Chowdhury-র নাম। বিস্মিত হয়েছিলাম, আরও অনেকের মতোই, যখন শুনলাম যে —যাকে আমি ‘ সলিল কাকু’ ব’লেই জানি,তিনিই B. R. Chopra-র Kanoon ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। গানবিহীন এই ছবিটি ছিল এক বিস্ময়—যে সময়ে হিন্দি ছবিতে ছয় থেকে আটটি গান প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল; তাহলে শূন্য-গানের ছবিতে সলিলদার ভূমিকা কী? তিনি সুর দিয়েই নির্মাণ করেছিলেন টানটান উত্তেজনা। তীব্র করেছিলেন আবেগের মূর্চ্ছনা। আর রহস্য-থ্রিলারের কেন্দ্রীয় আবহকে করেছিলেন আরও গভীর।
এই একই ভূমিকাই তিনি পালন করেছেন সেসব ছবিতেও, যেগুলোতে ছিল বহুল-গাওয়া গান—স্রষ্টার খ্যাতিতে নিজে ঢাকা পড়ার ভয় না রেখেই। ১৯৫৩ সালে Bimal Roy-র Do Bigha Zamin ছবিতে গল্প-চিত্রনাট্য-সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি বোম্বাইয়ে নিজের প্রথম স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এরপর আসে Chhota sa ghar hoga (Naukri) এবং Mera man bhula bhula (Biraj Bahu)-র মতো সারল্যে ভরা অথচ মর্মস্থল নাড়িয়ে দেওয়া গান। তবু নির্দ্বিধায় তিনি সুর করেছিলেন বিমল রায় প্রোডাকশনের চিরন্তন ট্র্যাজেডি Devdas-এর ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর— কোনও টাইটেল কার্ড এ কোনো নামোল্লেখের দাবী না রেখেই।
আবেশময়। সংযত। অনুরণনময়।—এইভাবেই তার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরকে অভিহিত করা হয়েছে। নীরবতার কার্যকর ব্যবহারে তিনি প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন আর-এক গানবিহীন থ্রিলারে— B. R. Chopra-র Ittefaq-এ। একই বছরে তিনি সুর দেন Basu Chatterjee-র Sara Akash-এ, যেখানে ছবির-ভিতরে-ছবি অংশে ছিল একটি প্রায় বিস্মৃতিযোগ্য গান। কিন্তু এই ছবিই সূচনা করেছিল এক দীর্ঘ সম্পর্কের, যার ফল— Rajnigandha phool tumhare, Kai baar yun hi dekha hai, Jaane mann jaane mann, Na jaane kyoon, Ye din kya aaye…—যা Rajnigandha ও Chhoti Si Baat-ছবির তন্ত্রীতে অঙ্গাঙ্গী হয়ে আছে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে Salil Chowdhury-র সুরের রসায়ন সবচেয়ে দীপ্ত হয়েছে ‘বিমলদা’র জন্য সুর বাঁধার সময়—যেমন Parakh ও Kabuliwala। অথবা বন্ধুস্থানীয় —Hrishikesh Mukherjee (Musafir, Chhaya, Anand), Sombhu Mitra (Jagte Raho), Nabendu Ghosh (Trishagni), এবং Basu Chatterjee-দের জন্য সুর করা সত্তরের দশকের ছবিগুলির ক্ষেত্রেও। তবে পঞ্চাশের দশকে যখন Naukri ও Biraj Bahu বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়, তখন Mehboob Khan-এর প্রযোজনা Awaaz এবং লেখরাজ ভাকরির Tangewali ও Naqab-ই তাঁকে বোম্বাইয়ে টিকে থাকতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল।
মুম্বইয়ে এত বছর কাটিয়েও তিনি মাত্র একটি মারাঠি ছবিতে সুর দিয়েছিলেন— Soonbai। ভাষা যে অন্তরায় ছিল না, তা প্রমাণ ত তিনি (Chemmeen/1966)-র Pennale Pennale এর মতো গানের ক্ষেত্রেই করে দিয়েছেন। Chemmeen-এর সেই মালয়ালম গান মুম্বইয়েও যেন জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছিল। তার জনপ্রিয়তা K. J. Yesudas-কে জাতীয় তারকায় পরিণত করে; Ramu Kariat পান গোল্ডেন লোটাস; আর ছবিটি মালয়ালম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
“তবলা থেকে সরোদ, পিয়ানো থেকে পিকোলো”— বলেছিলেন Raj Kapoor—প্রায় সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্রেই ছিল তাঁর অনায়াস বিচরণ। গানের কথার চেয়ে পরিস্থিতির মেজাজ ও চরিত্রাবেগকেই তিনি অগ্রাধিকার দিতেন। হয়তো সেই কারণেই তার সুর সহজেই স্থান পেয়েছিল সাধারণ মানুষের অত্যন্ত সাবলীল গুনগুনানিতে।আর স্থান করে দিয়েছিল K. J. Yesudas, S. P. Balasubrahmanyam এবং Hridaynath Mangeshkar-এর মতো গায়কদের একদম সামনের সারিতে। এমনকি Azhiyatha Kolangal, Kokila, Chairman Chalamayya, Aparajeyo-তেও কাহিনির সঙ্গে তার গভীর সহানুভূতি এবং বাঁশি-পিয়ানোর অভিনব অর্কেস্ট্রেশন ভাষার বাধা অতিক্রম করে ছবির আবহের সঙ্গে রচনা করল এক অনুপম সাযুজ্য । অভিনব বিন্যাস ও পরিশীলিত কর্ড-প্রগ্রেশন দর্শকের হৃদয়তন্ত্রীতে সাড়া জাগিয়ে তার সুরকে কেবল সঙ্গীত নয়—ছবির এক চরিত্র, বরং স্তম্ভে পরিণত করেছে যখনই তা পড়েছে সলিল চৌধুরীর হাতে।
টেক্সচার, টোন ও গঠনের অভিনবত্বে নির্মিত Mila hai kissi ka jhumka, Kahin door jab din dhal jaye, Maine tere liye hi saat rang ke, Munna bada pyara, Ja re ud jaa panchhi—আজও যে কোনও অন্তাক্ষরীর আসরে অনায়াসে বিচরণ করে ভিন্ন ভিন্ন তিন চারটি প্রজন্মের ঠোঁটে ।
কাছের মানুষদের ভালবাসার ‘সলিলদা’ নামক অমিত প্রতিভাশালী মানুষটি আসলে সঙ্গীতেই বেড়ে উঠেছিলেন। বলা ভাল সঙ্গীতেই জন্ম তাঁর। বাবা জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী, পেশায় আসাম চা বাগানের ল্যাবরেটরির ডাক্তারের ছিল সঙ্গীতের নেশা।নিজে ভাল ক্ল্যারিওনেট বাজানোর পাশাপাশি পাশ্চাত্য সংগীতের দিকপালদের রেকর্ডের বিরাট সংগ্রহও ছিল তাঁর।সেই থেকেই চাবাগানের শ্রমিকদের কণ্ঠমেলানো পাহাড়ী সুরের পাশাপাশি মোৎজার্ট,বিটোফেনের সঙ্গেও পরিচয় নিবিড় হতে থেকেছিল তাঁর গোটা স্কুলজীবন জুড়ে।এরপর দর্শন শাস্ত্র পড়তে কলকাতায় আসা,
মামার সঙ্গে থাকা আর পড়শি ছেলেদের সঙ্গে গান আর নাটকের দল বাঁধা। জীবনের সেই তরুণ পর্বে আদর্শবান ছেলেটির কোথায় থাকবে, কি খাবে – এসব ভাবনাকে ছাপিয়ে IPTA.র আদর্শে নিজেকে সঁপে দেওয়াই মূল হয়ে উঠেছিল,যার ফলশ্রুতিতে এই নবীন সঙ্গীত নির্মাতা হয়ে উঠেছিলেন ঐকতান আর গণ – এই দুই ভিন্নধারার সঙ্গীতের ক্ষেত্রেই এক পথপ্রদর্শক।
এমনই সময়ে একদিন পাড়ায় ‘সিরাজদৌল্লা’ নাটকের অভিনয়ে সলিলের সঙ্গে প্রথম দেখা বন্ধুর বোন জ্যোতির। সরকারি আর্ট কলেজে চিত্রকলার ছাত্রী জ্যোতিকে পড়াবার দায়িত্ব এল আর সেইসঙ্গেই এল প্রেমও।তাঁদের বিবাহের দিনেই যেন উপহারস্বরূপ এল বম্বে থেকে বিমল রায়ের টেলিগ্রাম। বম্বে গিয়ে বিমল রায়ের ইউনিটে যোগ দিলেন সলিল। জন্ম হল ভারতীয় ছবির ইতিহাসে এক চিরন্তন ক্লাসিক ‘দো বিঘা জমিন’ এর।
১৯৫২র শরৎকালে যখন বম্বেতে পা রাখলেন সলিল, বয়স মাত্র ২৮। যদিও বাংলায় ততদিনে তাঁর পরিচিতি হয়েই গেছে। তাঁর গল্প ‘রিক্সাওয়ালা’ ইতিমধ্যেই ছবি হয়েছে সত্যেন বসুর পরিচালনায়।আবার ও দিকে ‘গাঁয়ের বধু’র মত আলোড়ন ফেলে দেওয়া গান প্রতিটি মানুষের চোখে মেলে ধরেছে দুর্ভিক্ষের ভয়াল রূপ। এই গানের বর্ণনায় ১৯৪৩ এর সেই কৃষক বধু যে এক মুঠো ভাতের আশায় তার ভরন্ত গ্রাম্য জীবন,সংসার -সব ছেড়ে আরও অযুত মানুষের সঙ্গে পা মিলিয়ে আসে কলকাতায় আর ঠাঁই পায় মৃতদেহের স্তুপে, প্রতিটি শ্রোতার মনে এক স্থায়ী বিষাদ প্রতিমা হয়ে রয়ে গেল।
এ ছাড়াও, তাঁর ‘রানার’,’পাল্কী চলে’, ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’ ‘ও আলোর পথযাত্রী’ মাঝির গান,কৃষকের গান, রিক্সাওয়ালার গান,পাল্কী বেহারার গান প্রশ্নাতীতভাবেই কালজয়ী।ঘাম রক্ত ঝরিয়েও অকথিত,অনুল্লিখিত রয়ে যাওয়া মানুষকে নিয়ে সলিলের গান রচনার মূল কিন্তু নিহিত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা সেই IPTA.র সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রেই।রাতের আঁধার,বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করে রানারের তীরবেগে ছুটে চলা এক নতুন ভোরের আভাস আনল গানে গানে – যার নাম স্বাধীনতা।
এই জাগরণধর্মী গানই ক্রমে ‘গণসঙ্গীত’ হিসেবে অভিহিত হতে শুরু করল।মূলত সামাজিক সচেতনতার উদ্দেশ্যে নির্মিত হলেও গানে রীতি ও পারম্পর্য্যের সঙ্গে মাত্রা ও ছান্দিক গঠন নিয়েও নীরিক্ষার নান্দনিক ছাপ রাখলেন সলিল; ফলত মানুষের মনে সামাজিক সচেতনতার স্তর পেরিয়ে আরও গভীর,সুদুরপ্রসারি ও মর্মস্পর্শী হল এ গানের প্রভাব এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়,শ্যামল মিত্র,মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ তৎকালীন প্রথম সারির গায়কেরা প্রত্যেকেই সলিল গানে নিজেদের অনন্য কণ্ঠের ছাপ রাখলেন।
রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতির পরে গণসংগীতই বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য চিহ্নিতকারী এক বিশেষ ধারা হিসেবে উঠে এসেছিল। চলচ্চিত্রে ব্যাবহৃত গান ব্যাতীত এই ধারার গানের পরে আর কিছু সেভাবে আসে নি বেসিক গানের ক্ষেত্রে; অনেক পরে যে ধারায় যুক্ত হয়েছে সুমন অঞ্জন নচিকেতা কর্তৃক গীত ‘জীবনমুখী’ গান।কাব্যের গভীরতা আর সমাজ দর্শন – এই দুইয়ের মিশেলে তৈরী জীবনমুখী গান গ্রাম শহর জুড়ে যাপিত মধ্যবিত্ত জীবনের যে ছবি এঁকে দেয় তা আসলে কোথাও যেন সেই ‘জাগরণের গানের আবহকেই এগিয়ে নিয়ে চলে।সংগ্রামী, বিপত্তিকর জীবনের মাঝেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা ‘বেঁচে থাকার গান’ এর পথ প্রস্তুত হয়েছিল সেই পর্ব থেকেই।
IPTAর মত বৈপ্লবিক মঞ্চ পেয়ে সলিল চৌধুরীর পক্ষে তাঁর গান, নাটককে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়াটা সহজ হয়েছিল।হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে তুমুল জনপ্রিয়তায় পৌঁছে দেবার পাশাপাশি হেমন্ত সলিলের এই যৌথ সঙ্গীতপ্রয়াস জন্ম দিয়েছিল ‘পথ হারাবো বলেই এবার’ ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম’ ‘ দুরন্ত ঘুর্ণি’ জাতীয় চিরন্তন,কালজয়ী কিছু গান। এই গানগুলি যদি সলিলের দার্শনিক স্বত্ত্বার প্রকাশ হয়, অন্যদিকে তাঁর ব্যাঙ্গাত্মক ছড়া ‘কান কাটার ছড়া’ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করেছিল। ‘কান’ শব্দটি নিয়ে অসাধারণ ‘pun’ করেছিলেন।ব্যাপারটি ছিল এরকম, ‘কানপুর’ শহরে একটা ‘কানের দোকান, যেখানে বৃটিশ সরকারের সময়ে ‘ডানকান’ নামের মন্ত্রী গেলেন ‘বাঁ কান’ কিনতে।সেখানে শুনলেন তাঁর প্রয়োজন মিটবে দিল্লীতে গেলে।দিল্লী,অর্থাৎ রাজধানী।পরাধীন অবস্থাতেও এবং বিশেষ করে লাল কেল্লায় তিরঙ্গা উত্তোলনের পরেও। সেখানে গিয়ে দেখলেন যে সেখানকার সব মন্ত্রীরাই আসলে ‘দু কান কাটা’।
তাঁর ‘এই রোকো,পৃথিবীর গাড়িটা থামাও’ গান বিনোদন জগতের আড়ম্বরসর্বস্ব,মস্তিষ্কহীন, সূক্ষ্মতাহীন, দেখনদারির স্রোতে গা ভাসানোর বিপক্ষে এক প্রবল বৈপ্লবিক প্রতিবাদ।
IPTA তে তখন দিকপালদের মেলা।গীতিকার কবি কাইফি আজমি থেকে শাহির লুধিয়ানভি।ঋত্বিক ঘটিক থেকে মৃণাল সেন,বলরাজ সাহনী থেকে রবিশংকর।রবিশংকরের সঙ্গে যৌথভাবে সলিল আর এক যুগান্তকারী কাজ করলেন।১৯৫১ এ অল ইন্ডিয়া রেডিওয় হিন্দুস্থানি আর কর্ণাটকী সংগীতের সমন্বয়ে সৃষ্টি করলেন তাঁরা ‘বাদ্য বৃন্দ’,। ভারতবর্ষের দুর্লভতম বাদ্যযন্ত্রের ব্যাবহার গাঁথা রইল এক অমূল্য সাঙ্গীতিক সৃজনে।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য অর্কেষ্ট্রার মূর্চ্ছনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রবি শংকর পিয়ানোর চাবি আর রাগের আরোহ অবরোহের বিন্যাস করেছিলেন।অন্যদিকে সলিল চৌধুরী ও ‘ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার’এ এই একই প্রয়োগ করতে লাগলেন তিনি।১৯৫৭ এ রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে কয়্যার সত্যজিৎ রায়ের পৃষ্ঠপোষণা পেয়েছিল বলে শোনা যায়।এ ছিল বাংলা সংস্কৃতির সেই অমূল্য সময় যেখানে পাড়ার ছেলেরা মিলে নিয়ম করে এমন কিছু সাংস্কৃতিক প্রয়াস নিত যা গুণমানে অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলতে পারত আন্তর্জাতিক স্তর।
পরবর্তীতে তিনি বিমল রায়ের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বম্বে ইউথ কয়্যার’।পেরি ক্রস রোডে সলিল চৌধুরীর বাড়ীতে তখন লতা মঙ্গেশকর,আশা ভোঁশলে,তালাত মাহমুদের প্রায়শ যাতায়াত।সঙ্গে থাকতেন গীতিকার শৈলেন্দ্র, রাজেন্দ্র কৃষ্ণা,বিশ্বামিত্র আদিল,প্রেম ধাওয়ানের মত মানুষেরা, যাঁরা লোকসংগীত ও সমকালীন গায়কীর মধ্যে বলিষ্ঠতার সঞ্চার করতে কণ্ঠসঙ্গীতে বহুস্বর প্রয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।
‘গানের সঙ্গেই ছিল সলিলের প্রতিক্ষণের বসবাস’- জ্যোতি কাকিমা আমাকে একবার বলেছিলেন। ‘সলিল আপন ম’নে গুণগুণ করতে করতে ঘরে পায়চারী করত,বোধহয় যে দৃশ্যে গানটার প্রয়োগ হবে,সেই দৃশ্যের কথা গভীরভাবে ভাবত তখন। আর বিমল দা’র মত পরিচালক থাকলে ত রেকর্ডিং এর আগে প্রচুর আলোচনা হত”।জ্যোতি কাকিমার এই কথাগুলো এত বছর পরে মনে পড়লে একটা কথাই মনে হয়, স্বামীর সাফল্যই ছিল কাকিমার একমাত্র আনন্দ।স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী কালে যখন আবেগী মূর্চ্ছনার জায়গায় দ্রুতলয়ের beat এর ব্যাবহার এল, যেখানে কেবলই ক্রোধের, অস্থিরতার,তাৎক্ষণিকতার বিস্ফার, কাকিমা সে গানের মধ্যে আর কোথাওই তাঁর স্বামীসৃষ্ট সুরের অনুরণন খুঁজে পেলেন না।
আজও,সেই হিপ হপ অনুপ্রাণিত বাংলা র্যাপ ‘অধিকার কেড়ে নেওয়া মানুষের হাহাকার চিৎকার’ এর কথাই তুলে ধরে। আর্থ রাজনৈতিক সামাজিক অবিন্যস্ততা আর অবিশ্বাসের ফলস্বরূপ আজকের ‘Gen zee’র মধ্যে তৈরী হওয়া প্রবল অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঁচতে তাই অনেকেই ফিরে তাকাচ্ছে এই মহাপ্রতিভার দিকে,যিনি সত্যিই তাঁর সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন। তাঁর শতবর্ষ স্মরণে প্রকাশিত ডাকটিকিট,কলকাতা থেকে মুম্বই,মাদ্রাজ থেকে কানাডা জুড়ে তাঁর স্মৃতিতে হয়ে চলা অসংখ্য কনসার্টট,BFTCC কর্তৃক সূচিত তাঁর নামের স্মারক পুরষ্কার, মিলিতভাবে সেই কালজয়ী সলিলের কথাই বলে না কি??
(লেখক পরিচিতি – শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত – ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রাক্তন আর্টস এডিটর, মাস কম্যুনিকেশন এবং ফিল্ম এপ্রিসিয়েশনের শিক্ষিকা, গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনার সাথে যুক্ত। তিনি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)-এর সদস্য ছিলেন; জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন: তিনি জাতীয় পুরস্কার প্রাপক।)


