সাদাকালো রঙমাখা

কিছু ওয়েবসিরিজ ও সাদা কালো ধুসরের মিলমিশ

এই আলোচনার শুরুতেই আমাদের ফিরে যেতে হবে নব্বই দশকের গোড়ায় যখন উদার অর্থনীতির হাত ধরে আমাদের দেশে পণ্যমনস্কতার অনুপ্রবেশ ঘটলো । এই পণ্যমনস্ক সংস্কৃতিতে স্বচ্ছন্দ দর্শকের রুচিতে দৃশ্যত একটি পরিবর্তন এলো । মূলধারার হিন্দি ছবিতে তখনও পর্যন্ত শাদা – কালোর একটা বিভাজন ছিলো —- আমরা জানতাম নায়ক ভালো লোক , ভিলেন খারাপ লোক , নায়ক ভিলেন দ্বারা অত্যাচারিত হলেও শেষ পর্যন্ত যাবতীয় প্রতিকুলতাকে অতিক্রম করে জিতে যায় । হিন্দি নব্যতরঙ্গের ছবি করিয়েরা যার পুরোভাগে শ্যাম বেনেগাল , গোবিন্দ নিহালনি ইত্যাদি পরিচালকেরা ছিলেন তাঁরা এই একমাত্রিক চরিত্র বিভাজনের প্রবল বিরোধী ছিলেন , যদিও তাঁদের ছবি বৃহত্তর দর্শকসমাজকে তেমনভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি । নয়ের দশকে কনজিউমারিজমের এই আগ্রাসী অনুপ্রবেশ ব্যক্তিমানুষের নৈতিকতার ধারণাতে একটা আমূল পরিবর্তন এনে দিলো । নেহেরুভিয়ান সমাজতান্ত্রিক মতবাদের অবসানে আমরা পেলাম এক নব্য পুঁজিবাদি দৃষ্টিভঙ্গী । হিন্দি ছবিতে খলচরিত্রেরা আগেও জনপ্রিয় ছিলো ।

গব্বর সিং , শাকাল , মোকাম্বো ইত্যাদি চরিত্রদের আমরা আইকনিক হয়ে উঠতে দেখেছি , কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তা ছিলো খলচরিত্র হিসাবেই । নয়ের দশক থেকে এই পরিবর্তিত দর্শকরুচির কথা মাথায় রেখেই নায়ক এবং খলনায়কের মধ্যে এই বিভাজনরেখাটা ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে ওঠার একটা প্রবণতা দেখা দিলো । ১৯৯৩ এর কাল্ট ছবি বাজিগরে আমরা দেখি নায়ক নির্দ্বিধায় তার প্রেমিকাকে বহুতলের ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় । এর অব্যবহিত পরে মুম্বইয়ের পপুলার ছবির অন্যতম বড়ো প্রোডাকশন হাউস যশরাজ ফিল্মস যাঁরা মূলত রোম্যান্টিক ছবির জন্য পরিচিত তাঁদের ব্যানারে তৈরি ডর ছবিতে আমরা শাহরুখ খানকে পেলাম এক স্টকারের চরিত্রে । আশ্চর্যজনকভাবে শাহরুখের চরিত্রটি নায়ক সানি দেওলের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিলো । এরপর পরপর আসে বান্টি আউর বাবলি ( ২০০৫ ) , গুরু (২০০৭ ) , কামিনে ( ২০০৯ ) । এইভাবে হিন্দি ছবিতে অপনায়কদের আমজনতার মধ্যে শুধু অ্যাকসেপটেন্সের একটা জায়গাই তৈরি হয় না দর্শকেরা তাদের আইডিয়ালাইজ করতেও শুরু করে ।

উদার অর্থনীতি , আই টি সেক্টরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ইত্যাদির জন্য একটি শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দর্শকশ্রেণী তৈরি হয় । এঁদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বড়ো বড়ো শহরগুলিতে মাল্টিপ্লেক্স তৈরি হয়, সিঙ্গল স্ক্রিন উঠে যেতে থাকে । মুম্বইয়ের বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতারা বুঝতে পারছিলেন এই যে মাল্টিপ্লেক্স অভিমুখী দর্শক , এঁদের রাজ সিমরানের অবাস্তব প্রেমের গল্প দিয়ে সন্তুষ্ট করা যাবে না । আবার এঁরা ঠিক সেই অর্থে নন মেইনস্ট্রিম ছবির সংবেদী দর্শক নন । এই সময়ে আমরা পেলাম একগুচ্ছ প্রতিভাবান পরিচালক , প্রদীপ সরকার , দিবাকর ব্যানার্জি , সুজিত সরকার , সুজয় ঘোষ , অনুরাগ বসু , অনুরাগ কাশ্যপ , জোয়া আখতার , মেঘনা গুলজার প্রমুখদের এবং বাংলায় পেলাম ঋতুপর্ণকে , একটু পরে সৃজিতকে । এঁরা ছবির মান এমন একটা জায়গায় বাঁধলেন যে এই মাল্টিপ্লেক্সগামী দর্শক মনে করলো “ আহা কি চমৎকার শিল্পসম্মত , রিয়েলিস্টিক ছবি দেখলাম “ । আবার গড়পড়তা দর্শকের সেন্সিবিলিটির এতটাও উপরে বাঁধলেন না যে দর্শককে ছবির রসগ্রহণ করতে বিন্দুমাত্রও পরিশ্রম করতে হয় । বাস্তবধর্মী চিত্রনাট্য , নিপুণ পরিবেশনা , একগুচ্ছ অমিত প্রতিভাশালী অভিনেতার চমৎকার অভিনয় — এর অভিঘাত এতোই তীব্র ছিলো যে করণ জোহরের মতো পরিচালক যিনি আই ক্যান্ডি ছবি বানাতে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁর ছবিতেও আমরা বিবাহিত সমকামী পুরুষের সমস্যা বা সদ্য বিবাহিত মহিলার অতৃপ্ত যৌন বাসনার মতো বিষয়বস্তু পেলাম যা হিন্দি মেইনস্ট্রিম ছবিতে আগে অকল্পনীয় ছিলো ।

২০১০ এ মুক্তিপ্রাপ্ত সৃজিতের হিট ছবি অটোগ্রাফ নিয়ে আলোচনা করলে দর্শক মানসিকতার এই পরিবর্তনটা ভালো করে বোঝ যাবে । সৃজিতের অটোগ্রাফের কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভব্রত প্রতিষ্ঠিত নায়ক অরুণ চ্যাটার্জিকে নিয়ে সত্যজিত রায়ের নায়কের পুনর্নির্মাণ করতে চায় । ছবির কাজ চলাকালীন অরিন্দম এক দূর্বল মুহূর্তে শুভব্রতর বান্ধবী শ্রীনন্দিতার কাছে তার একটি কাস্টিং কাউচের অভিজ্ঞতার কথা স্বীকার করে যা ঘটনাচক্রে রেকর্ড হয়ে যায় । শুভব্রত সেই ক্লিপিংসটিকে নিজের ছবির পাব্লিসিটির জন্য ব্যবহার করে । এই ঘটনায় অরুণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে , শ্রীনন্দিতা শুভব্রতকে ছেড়ে চলে যায় । এই ঘটনায় শুভব্রত কিন্তু নিজেকে কখনই অপরাধী বলে মনে করে না কারণ সে বিশ্বাস করে End justifies the means . ছবির শেষে আমরা দেখি সে অরুণের বিরোধী ক্যাম্পের কোন প্রযোজকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাফল্যের সিঁড়িতে উঠতে চায় । ছবির শুরুতে যে শুভব্রত ট্যাক্সির কাঁচ নামিয়ে ভিখারিকে ভিক্ষা দিয়েছিলো ছবির শেষে সে সেই ভিখারিটির মুখের ওপর কাঁচটা তুলে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না । সত্যজিতের চারটি ছবি নায়ক , সীমাবদ্ধ , জন অরণ্য , অরণ্যের দিনরাত্রিতে আমরা চারজন মুখ্য পুরুষচরিত্রকে পেয়েছে যাদের নৈতিক স্খলন হয় , কিন্তু শুভব্রতর সঙ্গে তাদের মূল তফাত হলো তারা তাদের স্খলন নিয়ে সম্পূর্ণ সচেতন , তাদের সাফল্য তাদের নিয়ত পীড়িত করে ।

কিন্তু অটোগ্রাফে আমরা দেখি শুভব্রতর প্রতি পরিচালকের স্পষ্ট প্রশ্রয় আছে এবং একজন উচ্চাকাঙ্খী যুবক যে নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতে ন্যূনতম কুন্ঠাবোধ করলো না তাকে কিন্তু বাঙালি দর্শক রিজেক্ট করলো না , বরং তার সাথে সে নিজেকে রিলেট করলো , তার সাফল্যকে সে সেলিব্রেট করলো । কারণ পণ্যমনস্ক সংস্কৃতি তাকে শাখিয়েছে যে এমন সফল মানুষকেই আইডিয়ালাইজ করতে হয় । যে ধরণের দর্শক এই ছবির টার্গেট তারা এমনভাবেই সফল হতে চায় । যে নৈতিকতা নায়কের অরিন্দম , সীমাবদ্ধের শ্যামলেন্দু , অরণ্যের দিনরাত্রির অসীমকে বা জন অরণ্য’র সোমনাথকে পীড়িত করে তাকে এই দর্শক নৈতিক শুচিবায়ুগ্রস্ততা মনে করে ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে । এই প্রবণতাই ধীরে ধীরে এক দশক পর অনৈতিক নয় অপরাধপ্রবণ নায়কের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করার প্রবণতার জন্ম দেবে । হিন্দি ছবিতে সেই প্রবণতা আসবে আর একটি বিখ্যাত ছবিকে দিয়ে — অনুরাগ কাশ্যপের গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর । সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু ভিন্নতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে ।

অলডাস হাক্সলে তাঁর বিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ডে যে ভবিষ্যতের পৃথিবী কল্পনা করেছিলেন সেখানে নাগরিকদের নিখরচায় পর্ণোগ্রাফি শুধু দেখানো হতো না , দেখার সময় তা অনুভব করার সুবন্দোবস্তও ছিলো । আমরা এখনও অতটা উন্নতি করতে পারিনি ঠিকই কিন্তু পর্ণোগ্রাফিক কন্টেন্ট চলচ্চিত্রে বিশেষত ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যে কাজ হচ্ছে , যেখানে সেন্সারের নজরদারি অনেকটাই শিথিল সেখানে বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে গেছে । এতে যাঁরা দেশ চালান তাঁদের ভারি সুবিধা হয় কারণ পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত নাগরিক রাষ্ট্রব্যবথার হাজারটা অসংগতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার কোন তাগিদই অনুভব করে , সে এই পর্ণোগ্রাফিতেই বুঁদ হয়ে থেকে । এখন সমস্যা হলো যেকোন পর্ণোগ্রাফিক কন্টেন্টই ভীষণভাবে রিগ্রেসিভ এবং মিসজিনিস্ট এবং তা সবসময় একধরণের টক্সিক ম্যাসকুলিনিটিকে এনডোর্স করে । ভারতবর্ষের মতো দেশে যেখানে ঘরে ঘরে মিসজেনির চাষ হয় সেখানে যেকোন মিসজেনিস্ট কন্টেন্টকে দর্শকেরা যে উদ্বাহু হয়ে সেলিব্রেট করবেন তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কি আছে !

আগে ধরুন , আজ থেকে দশ পনেরো বছর আগেও কি আমরা যৌনগন্ধী গালাগালি দিতাম না , দিতাম । কিন্তু তা বলতাম ঘনিষ্ঠ বৃত্তে এবং কথাটা বলার সময় জানতাম যে এভাবে কথা বলাটা সামাজিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী । আজ কিন্তু অসংকোচে , নির্দ্বিধায় চার অক্ষরের গালাগালিগুলি আমরা শুধু দিইই না , সামাজিক মাধ্যমে যেখানে আমার পরিচয় যে কেউ জানে সেখানে অসংকোচে ন্যূনতম প্ররোচনায় টাইপ করে লিখে ফেলি । এই ছবি বা ওয়েব সিরিজগুলি আমাদের প্রচ্ছন্নভাবে এই বার্তাই দেয় যে আলফা মেল হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্তই হলো ক্রমাগত সেক্সিস্ট গালি দিয়ে যাওয়া । তাই কোন চরিত্র দশটা কথায় ছটা গালাগালি দিলেও তাকে আমরা কন্ডেম করি না বরং তাকে আইডিয়ালাইজ করি । তাই ব্যবহারিক জীবনে নিজের টক্সিক ম্যাসকুলিনিটিকে প্রকাশ করতে গিয়ে এমন অকৃপণভাবে গালাগালি দিতে কুন্ঠাবোধতো করিই না , বরং আমরা রীতিমতো শ্লাঘবোধ করি ।

এরপরে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো এইসব মাল্টিপ্লেক্সগামী দর্শক যাঁরা মূলত এই ধরণের ছবি বা ওয়েব সিরিজের niche দর্শক তারা অধিকাংশই নিউক্লিয়ার পরিবারের সদস্য এবং আক্ষরিক অর্থেই শিকড়হীন । আমাদের ছোটবেলায় পাড়া বলে একটা বিষয় ছিলো , তাতে প্রাইভেসির অভাব হয়তো অনুভূত হতো কোন কোন সময়ে , কিন্তু সেই পাড়ার বাসিন্দারা একটি বর্ধিত পরিবারের মতো ছিলেন । এতে একটা সুবিখা ছিলো এই ভাবে একটা বৃহৎসংখ্যক অভিভাবকের অভিভাবকত্বে থাকাটা একটা স্বাস্থ্যসম্মত ডেটারেন্টের কাজ করতো । তাতে একটা নৈতিকতাবোধ তৈরি হতো । বেশ মনে আছে আমার ছোটবেলায় আমি একবার একটা হলে ঢুকে কোন একটা হিন্দি ছবির পোস্টার দেখছিলাম , তাই দেখে এক পাড়াতুতো কাকা কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন । তাতে বাড়ির লোক বিরক্ত তো হয়ই নি , উলটে সেই কাকার কপালে জুটেছিলো প্রশংসা , আর আমার কপালে জুটেছিলো মার । কিন্তু আজ যে আবাসনে আমি থাকি এই কাজটা যদি আমি করি , বা আমার সন্তানের সঙ্গে কেউ করে তাহলে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী । ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি অতি সচেতন হতে গিয়ে আমরা পারিবারিক সম্পর্কগুলোর শুদ্ধতা নষ্ট করে দেখেছি । তাই এই বহুল প্রচারিত ওয়েব সিরিজগুলোতে প্রতিনিয়ত সমস্ত পারিবারিক সম্পর্ককে যখন দুমড়ে মুচড়ে বিকৃত করে দেখানো হয় আমরা এতটুকুও অস্বস্তিবোধ করি না ।

দ্বিতীয়ত পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদের সূত্র ধরেই বলি পর্ণোগ্রাফি সবসময়েই ইনসেস্টকে সেলিব্রেট করে । আজ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তাই এই ধরণের নিষিদ্ধ সম্পর্ককে অপ্রয়োজনে বারবার ব্যবহার করা হয় । তৃতীয়ত আজকাল মানুষ ছবি দেখে ফোনে অথবা ল্যাপটপে এবং তার অ্যাটেনশন স্প্যান একটা মাছির মতো । তার জন্য প্রতি মুহূর্তে একটা চমক না থাকলে দর্শকের অভিনিবেশকে যে ধরে রাখা যাবে না তা এই সিরিজগুলির নির্মাতারা বিলক্ষণ জানেন তাই গল্পে টুইস্টের অছিলায় পারিবারিক সম্পর্কগুলিকে এতটাই অসুস্থ ভাবে দেখান যে মনে হয় পারিবারিক হিংসা বোধহয় আজকাল খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলে প্রতিভাত হয় । হালের বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কতগুলো ওয়েব সিরিজের একটা তালিকা দিলাম যেখানে এই ধরণের ইনসেস্ট এবং পারিবারিক হিংসাকে চিত্রায়িত করা হয়েছে । 

১) মীর্জাপুর — ছেলে বাপকে ক্ষমতার লোভে খুন করতে যায় । শ্বশুর ব্যভিচারী পুত্রবধূকে ব্ল্যাকমেইল করে তার সঙ্গে উপগত হতে বাধ্য করে । স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম – আমাজন প্রাইম
২) গুরগাঁও — ভাই বোনকে সম্পত্তির লোভে খুন করে । স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম — নেটফ্লিক্স
৩) রাইকার কেস — এক উচ্চাকাঙ্খী মা শেষ পর্যন্ত দুই সন্তানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভে খুন করে । স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম – ভূট
৪) রাত আকেলি হ্যায় – সৎ মা এবং সৎ ছেলের অবৈধ সম্পর্ক । জেঠার দ্বারা ভাইঝির ধর্ষণ । স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম – নেটফ্লিক্স
৫) সিটি অফ ড্রিমস – দিদি ভাইকে রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভে খুন করে । স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম – ডিজনি প্লাস হটস্টার ।
৬) বিচ্ছু কা খেল – সৎ মা সৎ ছেলের সঙ্গে ষঢ়যন্ত্র করে স্বামীকে খুন করে এবং অন্য ছেলেকে সিডিউস করতে থাকে । স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম – জি ফাইভ ।

উল্লু , কুকু টিভিজ , ফ্লিজ মুভিজ অল্ট বালাজি গোছের প্ল্যাটফর্ম যেখানে খোলাখুলি সফট পর্ণ দেখানো হয় তার কথা ছেড়েই দিলাম তথাকথিত বনেদি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেই এইরকম প্রচ্ছন্ন পর্ণোগ্রাফি দেখানো হচ্ছে তার ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যায় । এখন কেউ বলতেই পারেন এই ধরণের অবৈধ সম্পর্ক বা পারিবারিক হিংসার ঘটনা কি হয় না । নিশ্চয়ই হয় । তাহলে তাই নিয়ে ছবি করলে অসুবিধা কি আছে । কিন্তু আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে যে এই ধরণের সম্পর্ক ,এই ধরণের হিংসা কিন্তু aberration , ব্যতিক্রম । কিন্তু আজ যখন ব্যতিক্রমকে বারবার প্রোমোট করা করা হয় এবং গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ সেই ব্যতিক্রমী বিকৃতিকে ক্রমাগত সেলিব্রেট করতে থাকে তখন আশপাশের পৃথিবীর সুস্থতা বা স্যানিটি নিয়েই মনে প্রশ্ন উঠে যায় । মীর্জাপুরে একটি চরিত্র গোলু একজন স্মাগলারের সঙ্গে বিডিএসএম করে কারণ তাতে তার নিজের ড্রাগসের ব্যবস্থায় সুবিধা হবে — এভাবে নিজের যৌনতাকে ব্যবহার করে পুরুষকে ম্যানিপুলেট করাটাকে নির্মাতারা যতই নারীর ক্ষমতায়ন বলে দেখাতে চান না কেনো তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের ওপর ঘটা অত্যাচারেরই একটা ভিন্নতর ভাষ্য । যেকোন পর্ণোগ্রাফিক কন্টেন্টেই ইন্সেস্ট থাকে কারণ তা মানুষকে টিটিলেট করে ।

আগে লোকে পর্ণোগ্রাফি দেখতো লুকিয়ে লুকিয়ে , একরাশ অপরাধবোধ নিয়ে , কারণ সে জানতো যা সে দেখছে সেটা দেখা অন্যায় । কিন্তু আজ গরিষ্ঠ সংখ্যক দর্শক যখন এই ধরণের পর্ণোগ্রাফিক কন্টেন্টকে সেলিব্রেট করেন , এই ধরণের চরিত্রগুলি যারা পৃথিথিবীর যাবতীয় সম্পর্ককে নিজের স্বার্থের জন্য দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে দ্বিধাবোধ করে না তাদের আইডিয়ালাইজ করেন , তখন এই পৃথিবীতে আমার সন্তানের নিরাপত্তার জন্য আমার চিন্তা হয় । অবাক লাগে যখন দেখি অজস্র প্রতিভাবান মানুষ দিনের পর দিন ধরে এই বিষয়গুলি নিয়ে ছবি করে যাচ্ছেন । 

মেইনস্ট্রিম বলিউড বাজারের মনস্তত্ব খুব ভালো বোঝে । সে তাই সবকিছুকে একটা ছকে ফেলে দেয় । তারপর সেই ছকে অজস্র একই ধরণের ছবি তৈরি করে যেতে থাকে । এই বক্তব্যের সত্যতা আমরা বুঝতে পারবো যদি আমরা একটি ছবি এবং একটি ওয়েব সিরিজকে প্রতিতুলনায় রাখি । একটি গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর অপরটি মীর্জাপুর ।
১) মীর্জাপুরের কালিন ভাইয়া আর মুন্নার সম্পর্কটা গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের রামধীর সিং আর জেপির সম্পর্কের মতো । দুই জায়গাতেই বাপ ছেলেকে অপদার্থ বলে মনে করে আর দুই জায়গাতেই ছেলে বাপকে খুন করতে চায় । দুটি ছবিতেই দুজন বহিরাগত , গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরে ফয়জল আর মীর্জাপুরে কম্পাউন্ডার এই কাজে তাদের সহায়তা করে ।
২) রামধীর সিং এর কাছের লোক এহসান কুরেশি সর্দার খানকে খুন করতে ব্যর্থ হয় ও সেকথা রামধীরের কাছে গোপন করে । পরে এই সর্দার সিংহই রামধীরের কাছে প্রধান শত্রু হয়ে ওঠে । প্রায় একইরকম ভাবে কালিন ভাইয়ের বডিগার্ড মকবুলের ভাইপো বাবরও প্রথমে গুড্ডু আর বাবলুর আর পরে গুড্ডু আর গোলুর বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে ওঠে ।
৩) গ্যাংস ওফ ওয়াসিপুর এবং মীর্জাপুর দুটিই প্রতিশোধের গল্প । গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরে ফয়জল খান আর মীর্জাপুরে গুড্ডু আর গোলু যথাক্রমে রামাধীর আর কালিন ভাইয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে যায় ।
৪) গ্যাংস ওফ ওয়াসিপুরে ফয়জল শামসেদের স্ক্র্যাপ আয়রনের ব্যবসায় পার্টনার হয় পরে সে ইকলাখের সঙ্গে ব্যবসায় নামে । একইভাবে গুড্ডু আর গোলু প্রথমে লালার সঙ্গে বেআইনি আফিমের পরে শরদ আর মুন্নার সঙ্গে ব্যবসায় নামে । দুই ক্ষেত্রেই এই রোজগারের টাকাতেই তারা যথাক্রমে রামাধীর আর কালিন ভাইয়ার সঙ্গে টক্কর দিতে সমর্থ হয় ।

একটা কথা স্পষ্ট যে এইভাবে মেইনস্ট্রিম বলিউড এই তথাকথিত রিয়েলিস্টিক ওয়েব সিরিজকেও একটা ফর্মুলায় ফেলে দিয়েছে । এপিসোড পিছু একান্নটা খিস্তি , অবৈধ সম্পর্ক , বীভৎস ভায়োলেন্স , সমকামীতা ( হোমোইরোটিক রিলেশনকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এতটা হোমোফোবিক ভাবে দেখানো হয় তা আর কহতব্য নয় ) এবং পারিবারিক হিংসাকে মিশিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একের পর এক ওয়েব সিরিজ তৈরি হয়ে চলেছে , এবং আমজনতা তা হাঁ করে গিলছে — এই পরিস্থিতি শুধু চিন্তার দৈন্য নয় যে সার্বিক অসুস্থতাকে সূচীত করে তা সত্যিই আশঙ্কার বিষয় ।

Leave a Reply