বসুধারাজনীতি

‘ধুরন্ধর’, সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী

-শ্রীমতী অবন্তিকা ঘোষ

ধুরন্ধর রিভেঞ্জ অর্থাৎ ধুরন্ধর সিনেমাটার সেকেন্ড পার্ট ও এক মাসের বেশি হল রিলিজ হয়ে গেছে। এবং অবশ্যই তার সঙ্গে সিনেমার গল্প, গল্পের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার কি সম্পর্ক, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতার রেটিং সবকিছু বিশ্লেষণ হয়ে গেছে মোটামুটি। তার সঙ্গে সদ্য শেষ হলো কেন্দ্রীয় বাহিনীর সুরক্ষা কবচের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ভোট পর্ব। বাড়ির পাশে ভোট গ্রহণের বুথ হয়েছিল। খুব কাছ থেকে ৪-৫ দিন ধরে তাদের সচেতনতা ও প্রতিটি ভোট প্রদানকারীর প্রতি সহানুভূতির সঙ্গে কর্মদক্ষতা দেখলাম। এছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু সেনাবাহিনীর বন্ধু বান্ধব থাকার দরুন প্রতিদিন তাদের জীবনযাত্রার গল্প শুনতে পাই। তাই ভাবলাম একটু অন্য আঙ্গিকে দেশের সুরক্ষা সম্পর্কিত বিষয়টাকে দেখা যাক। এ এক অনন্তকালের শুম্ভ নিশুম্ভের লড়াই । সৃষ্টির আদি থেকে চলছে, অনন্তকাল ধরে চলবে।

পার্থক্য শুধু একটাই ভারতের সেনাবাহিনী মানবতাকে বাঁচানোর তাগিদে লড়ে, আর অপরপক্ষ মানবতাকে ধ্বংস করার জন্য লড়ে। দু পক্ষের কাছেই ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতম অস্ত্র থাকে। একদল সেই অস্ত্র তুলে নেয় নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও ১৪০ কোটি দেশবাসীর জীবন সুরক্ষিত করার জন্য অপরপক্ষ নিজেদের স্বার্থের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সেনাবাহিনী শুধুমাত্র উর্দি পরিহিতরাই হয় না। উর্দি বিহীন এরকম হাজার হাজার দেশের ছেলে রয়েছে যারা তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়ে জেনেশুনে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে করতে ভয়ংকর, নিষ্ঠুরতম অজানা মৃত্যুকে বেছে নিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়টুকু ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। এতটা নির্ভেজাল আত্মত্যাগ যাদের মধ্যে রয়েছে তাদের আর যাই হোক নিজেদের কর্মের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য অথবা নিজেদের অবদানের প্রমাণ রাখার জন্য কোন রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন অন্তত হয় না। ব্যাস শুধু এইটুকু সত্যিই ঘুমন্ত দেশবাসীর জানা উচিত ধুরন্ধর সিনেমা টা দেখে। সিনেমা যখন তৈরি হচ্ছে তখন তার লাভজনক ব্যবসার উদ্দেশ্যও থাকবে। কিন্তু 24 25 বছর বয়সে আত্মত্যাগের এই চরমতম নিদর্শনগুলোকে আমরা যেন কোনভাবেই ছোট না করে ফেলি।

আর হ্যাঁ একটা কথা বলা খুব প্রয়োজন। যা এই সিনেমার একটা মূল বিষয়বস্তু ছিল। নৃশংসতা। নৃশংসতা শেখার বিষয়। বৃহত্তর স্বার্থে নৃশংসতা শেখা উচিত। কারগিল যুদ্ধের ২৩ বছরের সৌরভ কালিয়ার কথা মনে পড়ে? যাকে বিনা যুদ্ধে সীমান্তে কর্তব্যরত অবস্থায় তার আরো কিছু সঙ্গীর সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ জাস্ট অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে কিছুদিন পরে তার যৌনাঙ্গ থেকে শুরু করে সারা দেহটা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ফেরত দিয়েছিল।

যা ১৯৪৯ সালে তৈরি হওয়া জেনিভা কনভেনশনের চূড়ান্ত পরিপন্থী। ভারত মায়ের এরকম হাজার হাজার সৌরভ কালিয়া দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে যাদের গল্প আমাদের অজানা। তাই নৃশংসতা অবশ্যই শেখা উচিত। কারণ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রটা মাখনের চামচ মুখে দিয়ে পরিচালিত ও সুরক্ষিত থাকে না। সপ্তাহের শেষে ccd তে বসে ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্রিটিসিজম করা যেতেই পারে কিন্তু কচ্ছের রানে ১২ ঘন্টা লাগাতার নোনা জলে পা ডুবিয়ে যাদের সীমান্ত পাহারা দিতে হয় অথবা লাদাখের মাইনাস ৪৫° সেন্টিগ্রেডে অক্সিজেনের অভাবের মধ্যেও সারা শরীরে কম করে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি ওজন নিয়ে অস্ত্র হাতে যাদের বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয় তাদের থেকে ভালো ধর্মযুদ্ধের কথার কেউ বোঝে না। যেখানে ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার মূল মন্ত্রই হচ্ছে – বলিদান পরম ধর্ম।

(লেখক পরিচিতি – সমাজ বিশ্লেষক ও প্রাণী সুরক্ষা কর্মী)