শক্তিচর্চাস্বভূমি ও সমকাল

রুদ্রনারায়ণ মাহাত্ম্য

 

 -শ্রী সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম খণ্ড:-

জয়জয় মহামায়া দেবী রাজবল্লভী মাতা
তব কৃপায় শুরু করি গৌরবের গাথা।
জয় হোক মহাপ্রভু গৌরচন্দ্র প্রেমের আধার
আদর্শে তব দূর হোক অজ্ঞানের আঁধার।।

বন্দনা করি প্রথম বঙ্গমাতার প্রতি
বীরেদের জন্মভূমি আর্যাবর্তের স্থিতি।
শুন শুন সর্বজনে শুন দিয়া মন
ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজকাহিনী করিব বর্ণন।।

প্রথম পুরুষ সদানন্দ, রায়মুখটি নাম
ভরদ্বাজ মহাবিপ্র রাজ্য পেলেন দান।
রাজবল্লভী মূর্তি স্থাপন করেন পূজা করে
রাজবলহাট আজও তাঁর কীর্তি আছে ধরে।

পুত্র তাঁহার শ্রীমন্তবীর, মান্দারণ করেন জয়
তরবারিতে তাঁহার ইসমাইলের মুণ্ডচ্ছেদ হয়।
বীর মহেন্দ্র যুদ্ধজয়ে রাখেন কীর্তি সারা
দেবনারায়ণ দর্পনারায়ণ বংশেবীরের ধারা।।

সিংহাসনে মহাতেজা রাজা উদয়নারায়ণ রায়
হোসেন সুলতানের হইলো তিনবার পরাজয়।
ভার্যাসহ চৈতন্যদেবের লইলেন তিনি দীক্ষা
ধর্মশক্তি সমাবেশে রাজ্য হইলো রক্ষা।।

বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি রাজা রুদ্রনারায়ণ
প্রজার কাছে পিতৃতুল্য, শত্রুর চোখে শমন।
বৃষস্কন্ধবূঢ়্যোরস্ক, শান্তিতে তিনি ধীর
ভুজায় তাঁর মহাবল, বীরশ্রেষ্ঠ বীর।।

অসি চালনায় শ্রেষ্ঠ তিনি, যুঝে মহাকালসম
ব্যাখ্যা করিব তাহার কিবা ক্ষমতা মম।।
বীরত্বে তাঁহার তুলনা নাই, সুনাম সারা দেশে
রুদ্রনারায়ণ নামে শত্রু কাঁপে শেষে।।

মুক্তবেণী সঙ্গমতটে সপ্তগ্রাম নগরী
ধর্মস্থান বাণিজ্য দ্বার, নাহি তাহার জুড়ি।
পাঠান সুলতান দখল করে রাখে সেই স্থান
মন্দির পড়ে ভেঙে, পূণ্যভূমি হলো ম্লান।।

সমাচার শুনে মহারাজা অগ্নিশর্মা ক্রোধে
কলিঙ্গপতি আসিয়া যোগ দিলেন যুধে।
করাল বাহিনী যাঁহার রাজীবলোচন সেনাপতি
মহারাজের তুল্য তিনি বীর বড় অতি।।

তরবারি সব শোণিতে রক্তিম হয়ে আসে
প্রচণ্ড যুদ্ধে পাঠানদের পতন হলো শেষে।
ভগ্ন মন্দির সব গড়ে ওঠে পুনরায়
গজগিরিঘাট তৈরি করলেন রাজায়।।

পাঠান শক্তি আবার আসে মান্দারনে
স্বয়ং রুদ্রনারায়ণ এবার আসিলেন রণে।
ভুরিশ্রেষ্ঠ মল্লভূম দুইয়ে হইলো একত্রিত
শতশত পাঠান মস্তক করিল কর্তিত।।

কতলু খান পলায়ন করে হাতে নিয়ে প্রাণ
শতগুণে হইলো বৃদ্ধি রুদ্রনারায়ণের মান।
মোগলরা করিল মিত্রতা, সন্ধি গড়ে ওঠে
ভুরিশ্রেষ্ঠ প্রভুত্ব আরও দৃঢ় হয়ে ফোটে।।

দ্বিতীয় খণ্ড:-

যুদ্ধবিগ্রহে ব্যস্ত রাজা ফিরলেন শেষে ঘরে
জীবন এইবারে প্রজারহিতে, কার্য শুরু ত্বরে।
কাটাশাঁকড়ায় মহাদেব হইলেন অধিষ্ঠান
রাজসভায় সকল গুণীজন পেলেন নিজ স্থান।।

রাজার হৃদয় মাঝে তবু এক দুঃখের ছায়,
সন্তানহীন জীবনে কভু শান্তি নাহি পায়।
বলিলেন মহাজ্ঞানী ভট্টাচার্য হরিদেব কুলগুরু
হে রাজন তব ইচ্ছা পূরণ হবে শীঘ্রই শুরু।

মহাদেব মন্দিরে যখন উৎসবের ধারা,
ক্ষুধার্ত শিশু কান্না তোলে মায়ের সাথে সারা।
প্রহরীর আঘাতে রক্তাক্ত হলো শিশুর দেহ
রাজার হৃদয় বিদীর্ণ যেন বুঝিলনা কেহ।।

ক্রোড়ে তুলিয়া শিশুকে খুলিলেন ভাণ্ডারের দ্বার
আজি থেকে গরীব দুঃখীদের সমান অধিকার।
দেখিয়া সব এক সাধু আশীর্বাদ দিয়ে যায়
যোগ্য সঙ্গিনী ও সন্তান পাবে, দুঃখ হবে ক্ষয়।।

একদা রুদ্রনারায়ণ চড়িয়াএক ছিপে
দ্রুতগতিতে চলেছেন কাটশাঁকড়া অভিমুখে।
দেখিলেন এক অপরূপা নারী বর্শা ধরিয়া হাতে
অশ্বপৃষ্ঠে চলিতেছে মহিষের সাথে সংঘাতে।।

যুবতীর বর্শায় মহিষ হইলো ভূপতিত
দৃশ্য দেখিয়া মহারাজ হইলেন অভিভূত।
রমণীর চক্ষুদ্বয়ে জ্বলিতেছে রুদ্রবহ্নি
অশ্বপৃষ্ঠে আসীন যেন স্বয়ং মহিষঘ্নি।।

নৌকা থামিয়ে রাজা আসিলেন রমণী সম্মুখে
প্রশ্ন করিলেন তিনি, পরিচয় জানিতে উন্মুখে।
মহারাজারে চিনিয়া রমণী করিলেন প্রণতি
দীননাথ সুতা বলিয়া পরিচয় দিলেন রাজার প্রতি।।

ফিরিয়া আসিলেন রাজা কাটশাঁকড়া মন্দিরে
হরিদেবেরে দিলেন সঞ্চার যত ছিল হৃদের গভীরে।
রুদ্রনারায়ণের কথা শুনিয়া ভট্টাচার্য বিশিষ্ট
দীননাথের নিকট যাবেন বলে করিলেন আশ্বস্ত।।

দুর্গাধীপ দীননাথ বিবাহ প্রস্তাবে আপ্লুত অতি
ভবশঙ্করী কন্যা তাঁহার দিলেন শর্ত মহারাজের প্রতি।
সম্মুখ সমরে যে পুরুষ তাঁহারে পরাজিত করিবে
ভবশঙ্করী তাঁহাকে স্বামী বলিয়া মানিবে।

সব শুনে হরিদেব বিধান দিলেন একসাথে
ভবশঙ্করীর শর্ত পূরণ হলো রুদ্রনারায়ণের হাতে।
এক আঘাতে পশুবধে পূরণ হয় শপথ,
জবামালা গলায় দিয়ে শুরু প্রেমের রথ।।

রুদ্রনারায়ণ ভবশঙ্করী বাঁধা পড়লেন বিবাহবন্ধনে
শুরু হলো নতুন দুর্গ গড়ভবানীপুর স্থাপনে।
হেন কালে কোল আলো করে আসিলেন প্রতাপনারায়ণ
আনন্দের সীমা নেই মহারাজার উৎফুল্ল মন।।

পঞ্চবৎসর পর রুদ্রনারায়ণ রাখিলেন দেহ
সত্য কী তবে ভুরশুটে বীর রহিল না কেহ?
এই বলিয়া শেষ করিলাম রুদ্রনারায়ণ গাথা
পর খণ্ডে শোনাইব ভবশঙ্করীর কথা।।

শুন হে সর্বজনে করিয়া মনোযোগ
শাণ্ডিল্য বংশোদ্ভূত বিপ্র কুলে মহাযোগ।
মহা সামন্তবংশ, বন্দ্যোপাধ্যায় নাম
যুদ্ধে মহাবীর, গড়ভবানীপুর ধাম।

সেই কুলের উত্তরাধিকারী মহাকালের দাস
সৌম্যদীপ নাম ধরি করি এই কাব্য প্রকাশ।
কলম ধরি ভক্তিভরে লিখি বীরগাথা,
মহারাজা রুদ্রনারায়ণ এর অমর যশ কথা।

দুর্গাপুর নিবাসী করি বীর রসের সঞ্চার
বঙ্গভূমির ইতিহাস করি সর্বত্র প্রচার।
যদি থাকে দোষ ত্রুটি ক্ষমা করো সর্বজনা
রাজবল্লভীর কৃপায় পূর্ণ হোক এই রচনা।।

 

 

লেখক পরিচিতি:-

পদার্থবিদ্যা স্নাতক MBA পাঠরত বঙ্গের সঠিক ইতিহাস সন্ধানী ও প্রচারক;
গৌড়ীয় ওয়ারিয়র্স পরিচালক ও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স এর একনিষ্ঠ সদস্য;
চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী শক্তিচর্চায় নিবেদিত এক বাঙ্গালী যুবক ||