বিনোদনসংস্কৃতি

নির্মেঘ আকাশের নক্ষত্র –

– শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত

স্মৃতি নাকি সবসময়ই আনন্দের উৎস। অতীতের ঘটনা, অভিজ্ঞতা, নানা মুহূর্ত ফিরে মনে করলে নাকি মন ভরে ওঠে সুখে; কারণ সেইসব স্মৃতি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রিয়, স্নিগ্ধ কিছু ঘটনার কাছে।

কিন্তু স্মৃতিচারণ কি সবসময়ই স্বস্তিদায়ক? হয়তো নয়। তবু স্মৃতিভ্রংশের মতো দুঃখজনক আর কিছু নেই—সেই নির্মম ব্যাধি, যা ভালোবাসা, হাসি আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সমস্ত স্মৃতিকে মুছে দেয়। এমন পরিণতি আমরা আমাদের চরম শত্রুর জন্যও কামনা করব না। তাই, এখানে আমি যে সমস্ত ঘটনার কথা স্মরণ করব, তার সবই হয়তো গর্ব করার মতো নয়; তবুও আমি গর্বিত যে, এই সবকিছুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটক। ছোটবেলা থেকেই এই নামটি আমার কানে আসত। ১৯৬৬ সালে বিমল (রায়) জেঠু মারা যান। সেই বছরই বাবা অতিথি-অধ্যাপক হিসেবে পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (FTII)-এ পরিচালনা বিভাগের ছাত্রদের চিত্রনাট্য রচনা পড়াতে যেতে শুরু করেন। তখন অবশ্য ঋত্বিক ঘটক FTII ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

আমাদের বাড়িতে সকাল, দুপুর, রাত—প্রতিটি খাবারের টেবিলেই সিনেমা ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়। কারণও ছিল যথেষ্ট। বিজয়দা দিল্লি ছেড়ে এসে সুধেন্দু রায়ের সহকারী শিল্প-নির্দেশক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। সুভেন্দা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে সুশীল মজুমদারের সঙ্গে লাল পাথর ছবির কাজে সহকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন। বাচ্চুদা তখন বাসু চ্যাটার্জির সহকারী। আর পাটনার অমল কাকু ছিলেন হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের টিমের একজন নিয়মিত সদস্য।

এরপর ছিলেন FTII-র সেই সব প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, যাঁরা নিয়মিত ২, পুষ্পা কলোনি-তে আসতেন—বিকাশ দেশাই, অরুণা রাজে, কাভিয়া, বাভারিয়া, শ্যামল সেনগুপ্ত…। আবার আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন নাদিয়াদওয়ালাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কয়েকজন কাশ্মীরি। অসিত কাকু, চন্দ্রিমা পিশি, কলিন মেসো, পল কাকু, নাজির চাচা, মধুপ আঙ্কল—ঠিক আছে, তাঁদের এই স্মৃতিচারণের বাইরে রাখাই যায়। কিন্তু জেঠিমা, বাসুদা, রিংকিদি, জয়—অর্থাৎ বিমল রায়ের নিকট ও বৃহত্তর পরিবারের মানুষদের আমি কোনোভাবেই বাদ দিতে পারি না। সেই পরিবারেই ছিলেন সুধীশ ঘটক।

যা শুনেছি

কী অপূর্ব গল্প বলার ক্ষমতা ছিল তাঁর! সুধীশ ঘটক বিদেশে চিত্রগ্রহণের বিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন। সম্প্রতি কোথাও পড়লাম, ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল বোম্বে ডকে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ‘ফ্লোটিং বোমা’ বিস্ফোরণ এবং তার পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ ক্যামেরাবন্দি করতে পেরেছিলেন একমাত্র তিনিই। (সামরিক পুলিশের বাজেয়াপ্ত করা সেই ফিল্ম রিলের কিছু অংশ বহু বছর পরে সংবাদচিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছিল—এমনটাই পড়েছি।)

যে সন্ধ্যাগুলোতে এই জেঠু আমাদের বাড়িতে আসতেন, আমি ঘুমিয়ে পড়লেও উঠে বসে বলতাম, “জেঠু, প্লিজ! একটা গল্প বলো না!” তাঁর গল্প বলার জাদু ছিল এমনই যে, আমি মুহূর্তের মধ্যে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতাম। একটি গল্প দিয়ে শুরু করে তিনি কখন যে দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয় গল্পে পৌঁছে যেতেন, তা টেরই পেতাম না।

একদিন সন্ধ্যায় সুধীশ জেঠু এমন এক আন্তর্নাক্ষত্রিক পৃথিবী-যমজ-এর গল্প বলছিলেন, যেখানে সবকিছুই “একই রকম, অথচ সম্পূর্ণ উল্টো”। সেদিন বাবা-ও গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁদের দু’জনের আলোচনা গড়িয়ে গেল ছায়াপথ, মহাকর্ষ, আর সময়ের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে। ফলত, আমার আগ্রহ হারিয়ে গেল, আর আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। বহু-বহু বছর পরে, যখন ‘আমি ও আমি’ (Me and I-এর মূল বাংলা সংস্করণ) ২০০৩ সালে প্রকাশিত হল, তখন বুঝতে পারলাম—তার বীজ লুকিয়ে ছিল সেই গ্যালাকটিক টুইনস-এর গল্পেই। ততদিনে আমি জেনে গিয়েছি, সুধীশ জেঠুর এক ছোট ভাই ছিলেন, যাঁকে সবাই ভাবা কাকা নামে চিনতেন।

গল্প বলা, গল্প লেখা, এই পৃথিবীর মানুষদের নিয়ে কাহিনি নির্মাণ করা—আবার পৃথিবীর বাইরের জীবন নিয়েও কল্পনার জাল বোনা—এই অসাধারণ সৃজনশীলতা যেন সুরেশচন্দ্র ঘটকের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের রক্তেই প্রবাহিত ছিল। অবশ্য এই উপলব্ধিটাও আমার পরে হয়েছিল, যখন আমি মহাশ্বেতা দেবীর অরণ্যের অধিকার, রুদালি এবং হাজার চুরাশির মা পড়ি। যখন তাঁর বাবা যুবনাশ্ব ঘটক এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ স্থান সম্পর্কে জানতে পারি।

কলকাতায় এসে সুনেত্রা ঘটক আমার বন্ধু হয়েছিলেন। আশিস ঘটকের কন্যা সুনেত্রা আমাদের খুব তাড়াতাড়িই, ২০১৭ সালে, ছেড়ে চলে যান। তবে বিদায় নেওয়ার আগে তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে পরমব্রত (বাবাই)-এর জন্য লিখে গিয়েছিলেন ‘একদিন যেও না হারিয়ে’।

(লেখক পরিচিতি – শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত – ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রাক্তন আর্টস এডিটর, মাস কম্যুনিকেশন এবং ফিল্ম এপ্রিসিয়েশনের শিক্ষিকা, গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনার সাথে যুক্ত। তিনি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)-এর সদস্য ছিলেন; জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন: তিনি জাতীয় পুরস্কার প্রাপক।)