আগামীশাশ্বত সনাতন

নালন্দা মহাবিহার: প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনার এক অনন্য উপায়

– শ্রী অত্রিজ ঘোষ

সময়টি ১৮১১ বা ১৮১২ খৃষ্টাব্দ । কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনের এক বোটানিস্ট, স্যার ফ্রান্সিস বুখানন হ্যামিল্টন তখন বিহারের রাজগিরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিলেন, ওখানে বেশি দুরে নয়, কাছেই একটা জায়গায় স্থানীয় গ্রামবাসীদের নজরে পড়েছিল কিছু হিন্দু ও বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষের যার দিকে তার নজর ঘুরেছিল । পরবর্তীকালে জায়গাটাতে তিনি একটা সার্ভে করেছিলেন; সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন এটি এক সাধারণ বৌদ্ধ বা হিন্দু মন্দির বা মঠ। আসলে তিনি তখন জানতেন না যে তিনি যে সাধারণ মন্দির বা মঠের উপর সার্ভে করেছিলেন সেটি আসলে জগদ্বিখ্যাত নালন্দা মহাবিহার যা ১২০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে বখতিয়ার খিলজীর তরবারির আঘাতে ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল।

শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে যখন এই সিরিজ চালু করেছিলাম তখন এর পরিসমাপ্তি নিয়েও খানিক ভাবনাচিন্তা করেছিলাম তাই যখন এপ্রিল মাসে “শিক্ষা তুমি কার ?” প্রবন্ধটা লিখছিলাম তখনই মনে পড়ে গেল নালন্দার কথা, আসলে শিক্ষাক্ষেত্র কার হাতে থাকবে এবং কে এর পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে সেটা নিয়ে আলোচনার সময় প্রাচীন ভারতবর্ষের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল তখনই নালন্দা সম্পর্কে লেখাটা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং বর্তমান ভারতবর্ষ নালন্দা থেকে যা শিখতে পারে বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্র কার হাতে থাকা উচিত সেই বিষয়, তবে শুধু নালন্দা কেন? বিক্রমশিলা, বিক্রমপুর, ওদান্তপুর, তক্ষশীলা প্রমুখ সব একই ধাঁচে চলত, যেভাবে নালন্দাও নিজেকে সামলে রেখেছিল । কিন্তু তার আগে নালন্দার ইতিকথাতে কিঞ্চিৎ মনোনিবেশ করা যাক।

ইতিহাসের যদি আমরা সাহায্য নিয়ে থাকি তাহলে এটা মনে করা হয় যে ৪১৫ থেকে ৪২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিশেষ করে ৪২৫ খ্রিস্টাব্দের সময়কালীন নালন্দা মহাবিহারের স্থাপনা করা হয় গুপ্ত সম্রাট কুমারগুপ্তের রাজত্বে । চৈনিক ভূপর্যটক হিউয়েন সাঙ বা আই সিঙ এর লেখা অনুযায়ী, এই মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা সক্রাদিত্য যাকে আধুনিক ইতিহাসবিদরা সম্রাট কুমারগুপ্ত বলেই ধরে চলেন।

এই নালন্দা সম্পর্কে বলতে গেলে বৌদ্ধ ও জৈনদের পুঁথিগুলোতে এই জায়গার উল্লেখ পেয়ে থাকি, ভগবান তথাগত এই স্থানে তখন তার ধর্ম প্রচার করেন দুটি আমগাছের নীচে এবং ভিক্ষু শারিপুত্র এই স্থানেই নির্বাণলাভ করেন, নিকায় সংগ্রহ অনুযায়ী সম্রাট অশোক এখানে এক বৌদ্ধবিহারের স্থাপনা করেন, তবে তার কোন নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমরা পাইনি। যাই হোক কুমারগুপ্তর পরে বুধগুপ্ত, তথাগতগুপ্ত, নরসিংহগুপ্ত প্রমুখ সম্রাটদের হাত ধরে নালন্দা একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল।তারপর মহারাজা হর্ষবর্ধন এবং পালসম্রাটদের পৃষ্টপোষকতায় নালন্দা সারা ভারতবর্ষে তাঁর জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল। মহারাজা হর্ষবর্ধন যখন কন্যকুব্জাধিপতি হন তখন হিউয়েন সাঙ নালন্দায় ছাত্র হিসাবে ভর্তি হন এবংপড়াশোনা করেন। এখানেই আচার্য্য শীলভদ্র তাঁর গুরু হন এবং হিউয়েন সাঙমক্ষ দেবনাম নিয়ে থাকেন।বৌদ্ধধর্মচর্চা,জ্যোতিষ,ব্যাকরণ,তন্ত্র,অঙ্ক,ন্যায়াশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাপ্রদান প্রচলিত ছিল।

এই হচ্ছে নালন্দার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। কিন্তু এবার আসা যাক, আজকের ভারতবর্ষ নালন্দার কাছ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং তার দেখাশোনার জন্য অর্থসাহায্য কী ভাবে পেতে পারে,তা শেখার বিষয়। প্রথমত, নালন্দা কোনভাবেই কোন সরকার বা ব্যক্তিবিশেষের অধিনস্ত ছিল না, শুধু নালন্দা কেন কোন বিহার বা মঠ সেই সময় কোন ব্যক্তিবিশেষের মালিকানাধীন ছিলো না।উল্টে এদেরকে দেখাশোনার ভার পড়তো মঠের সদস্যদের দ্বারা, হ্যাঁ রাজা বা সাধারণ মানুষ হয়তো পৃষ্ঠপোষণ করতেন কিন্তু ওই পর্যন্তই। বাকি মঠের চালনা থাকতো মহাবিহারের আচার্য্য ও উপাচার্যদের হাতে। আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও এটা করা যেতে পারে যেখানে একটা ট্রাস্ট করতে হবে যার সদস্যরা হবেন কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আচার্য্য ও শিক্ষক এবং ছাত্ররা যাঁরা স্কুল বা কলেজটার দেখাশোনা করবে । কোন একজন ব্যক্তির জায়গায় সবার ক্ষেত্রে ভোটাভুটি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, যেটা নালন্দা মহাবিহারে হয়েছিল।

এতক্ষণের বিষয় ছিল – মালিকানা ক্ষেত্র । এর না হয় একটা ব্যাবস্থা হলো, কিন্তু অর্থসাহায্য ! এক্ষেত্রে হয়তো মুক্তহস্তে দান-দক্ষিণাতে চলতে পারে, ব্যবস্থাও চলতে পারে যেটার মূল্য সেই ট্রাস্ট ঠিক করতে পারবে, তবে আরও একটা উপায় আছে যেটা প্রাচীন ভারতবর্ষে ছিলো, প্রাচীন ভারতবর্ষে নালন্দার জন্যরাজাবা উচ্চবর্তী পরিবাররা কিন্তু ভূদান ও গ্রামদান দিতেন। রাজা হর্ষবর্ধন কিন্তু ২০০টা গ্রাম নালন্দাকে দিয়েছিলেন তার দেখভালের জন্যে, কিন্তু আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রামদান বা ভূদানের প্রয়োজন হবে না, এই ট্রাস্টগুলো যদি নিজেদের কর্মশালা অথবা যেইগুলো টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি তাঁরা যদি নিজেদের ফার্ম বা টেকসেন্টারগুলোও যদি প্রতিষ্ঠা করতে পারে যেখানে শুধু নিজেদের ছাত্রছাত্রীই নয় সবাইকে কর্ম দেওয়া হবে তাছাড়া এদের এই কাজগুলো যেমন লক্ষীওঘরে আনবে তেমনি এই টেক ফার্মগুলো পরবর্তীকালে দেশের গবেষণার অগ্রগতিতেও নতুন পথ দেখাবে । ননটেকের জন্যঅবশ্য যেরকম বিশ্বভারতীতে আছে, নিজের কামারশালা, গোশালা এমনকি কিচেন গার্ডেনের মতো স্কুল কলেজে এইগুলো করা যায়, ।

এতে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চালানোর খরচ উঠে আসবে তেমনই ছাত্রছাত্রীরা hands on experience ও পাবেএবংআত্মনির্ভরশীল হয়েও উঠবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এর দুটো ও মিশিয়ে কাজ করা যেতে পারে; ফলে আরো ভালো ফল পেতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, কিন্তু এর জন্য সদিচ্ছা ব্যতীত আর কিছুই লাগবে না।

নালন্দা হয়তো আজ থেকে ৮২৬ বছর আগে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু তার প্রভাব আজ ভারতবর্ষের এবং সারা পৃথিবীর উপর রয়ে গেছে। ২০১০ সালে আবার নতুন করে নালন্দার পুনর্জন্ম হয়েছে পুরোনো নালন্দা মহাবিহারেরকাছেই, যার প্রথম উপাচার্যই ছিলেন ডঃ অমর্ত্য সেন। সে যাইহোক তবে এই দুটো নিয়ম যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মানতে পারে, তাহলেই তাঁরা এই মালিকানা ও পরিচালনার বিষয়টাতে এক নতুন দিশা পেতে পারে।

( লেখক পরিচিতিঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত )