তর্পণে প্রণত মসী

নির্বিকল্প ব্যায়াম সাধক তাপস ভট্টাচার্য

ব্যায়ামজগতের মনস্বী ব্যক্তিত্ব, সুলেখক, সুবক্তা প্রয়াত তাপস ভট্টাচার্যকে আমরা অনেকেই প্রায় ভুলতে বসেছি এবং নবীন প্রজন্ম তো জানেইনা ওঁর নাম। ভারতের সোনার ছেলেমেয়েরা যখন অলিম্পিকসে গোল্ড, সিলভার বা ব্রোঞ্জ মেডেল জিতছে অসম্ভব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে, দারিদ্র্যকে জয় করে, ক্রীড়া জগতের নোংরা দলাদলিকে ছাপিয়ে; অলক্ষ্যে ক্ষীদ্দার মতো কোচের যখন কোনির মতো সাঁতারুদের বা শিবার মতো ঘুগনি বিক্রি করা বক্সারদেরকে তুলে আনছে তখন কেনই বা বাদ দেব বাংলার এই কোচ বা সাধকদের!! কেন বললাম একথা!? একটিই কারণ – এশিয়ার প্রথম বিশ্বশ্রী মনোতোষ রায়ের শিক্ষাগুরু ছিলেন তাপস ভট্টাচার্য (ব্যায়ামাচার্য বিষ্টু ঘোষের জিমনেসিয়ামের ট্রেনার ছিলেন)।

অবশ্যই, এর সাথে একটি পার্থক্যও রয়েছে। শুধু ব্যায়াম চর্চা বা bodybulding নয়, প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়াও তাপসবাবু ব্যায়াম সংক্রান্ত শিক্ষাপ্রণালীর সাথে যুক্ত ছিলেন ঘনিষ্ঠভাবে। তাঁর প্রত্যক্ষ অভিভাবকত্বে অধুনালুপ্ত ‘ব্যায়ামচর্চা’ নামক একটি পত্রিকা চলতো যাতে সংকলিত থাকতো নানা প্রকারের প্রবন্ধ – খেলার খবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল প্রচারিত ‘Health and Strength’ পত্রিকার মতো। (তৎকালীন যুগে ‘Health and Strength’, Mr. America -এর ন্যায় বহু পত্রিকা প্রচলিত ছিল)।

শ্রী তাপস প্রসাদ ভট্টাচার্যের জন্ম হয় মার্চ ২৫, ১৯১৮ সালে। প্রথম জীবনে, তিনি পড়াশুনো করেন ভাটপাড়া বিদ্যালয়ে। তাঁর পিতা শ্রী হরিচরণ ভট্টাচার্য (কাব্যরত্ন) ছিলেন নিষ্ঠাবান সংস্কৃত পন্ডিত, প্রগাঢ় পান্ডিত্যের পাশে তাঁর অতুলনীয় রসবোধ তাঁকে ‘চুঁচূড়ার দাদাঠাকুর’ নামে প্রভূত পরিচিতি এনে দিয়েছিল। তাঁর মাতার নাম হল শ্রীমতী নলিনীবালা দেবী।

চুঁচূড়ার সোম ট্রেনিং একাডেমী থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন তাপস প্রসাদ, ভর্তি হন চন্দননগরের প্রসিদ্ধ ডুপ্লে কলেজে। ছোট থেকেই বিভিন্ন ক্রীড়া যথা জিমন্যাস্টিক্স, ফুটবল, সাঁতার প্রভৃতিতে পারদর্শিতা থাকায় তিনি ফুটবল খেলাটি গোলরক্ষক হতেন। জিমন্যাস্টিকসে প্রথম বা দ্বিতীয় হতেন প্রায়ই। ব্রতচারী আন্দোলনের জনক শ্রী গুরুসদয় দত্তের তিনি ব্রতচারীর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন এবং প্রবল অধ্যাবসায়ের জোরে অচিরেই তিনি তার প্রথম শ্রেণীর শিক্ষক হয়ে ওঠেন।

কিন্তু এইসবের মধ্যে থেকেও তাঁর প্রবলতম অনুরাগ ছিল দেহসৌষ্ঠব ও দেহচর্চার প্রতি। ১৯৪১ – ৪২ সালে তাপসবাবুই ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ দেহী; তখনও Indian Bodybuilding Federation-এর জন্ম হয়নি। সেই সময় তাপসবাবু বঙ্গীয় প্রাদেশিক দেহসৌষ্ঠব প্রতিযোগিতায় প্রথম হন। পরবর্তীকালে, Indian Bodybuilding Federation-এর জন্ম হলে তিনি হৈয়ে ওঠেন তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

বিষ্টু ঘোষের জিমনাসিয়ামের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তাপস বাবু, এ কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রচার বিমুখ, অর্থলোভ মুক্ত, আদর্শবাদী এই ব্যক্তির সাথেও তাঁর গুরুর ঘোরতর বিবাদ হয়; ফলতঃ, তিনি অবিলম্বে ত্যাগ করেন ghose’s gymnasium. কি হয়েছিল মূলত বা সেই বিরাগের ঘটনাটি কিরকম? ভারতশ্রী ও বিখ্যাত ব্যায়ামবীর শ্রী কমল ভান্ডারী তখন উঠতি বয়সের bodybuilder..প্রতিযোগিতায় নিরপেক্ষ বিচারে তাপসবাবু কমলবাবুকে ভারতশ্রীর জন্য মনোনীত করেন। গুরু বিষ্টু ঘোষ চেয়েছিলেন তাঁর আখড়ার একটি ছেলে ভারতশ্রী হোক। দৃঢ়চেতা তাপসবাবু সহমত হন না; শেষে jury বসিয়ে বিচার করা হয়। এরপর কোনোদিন আর তাপসবাবু বিষ্ণুচরণ ঘোষের আখড়ায় যান নি। গুরু নিজে যেচে জাপান যাওয়ার আগে অভিমানী শিষ্যের শুভেচ্ছা প্রার্থনা করে চিঠি লেখেন।

‘ব্যায়ামচর্চা’ নামক পত্রিকায় তিনি ছিলেন সম্পাদক এবং তাতে নিয়মিত লেখক রূপে উপস্থিত থাকতেন তৎকালীন যুগের প্রখ্যাত ব্যায়ামবীরের ও যোগবিদেরা, যথা আয়রনম্যান নীলমণি দাস, আয়রনম্যান নীরদ সরকার প্রমুখ। তাপসবাবু নিজে শ্রী মুষল নামে লিখতেন, ব্যায়ামবিদের সংকীর্ণতা, অন্যায় কার্যকলাপ নিয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করতেন। অবশ্য এই নিয়ে তাঁকে কম ঝামেলায় পড়তে হয়নি। কিন্তু তাপসবাবু ছিলেন একরোখা, অকুতোভয়। তিনি লক্ষ্য করেন কিভাবে বিভিন্ন ব্যায়ামবীর রাতারাতি যোগী হয়ে যান শুধুমাত্র অর্থের লোভে, ব্যায়াম অপেক্ষা যোগাসনের শিক্ষাদানে বেশী অর্থ উপার্জনের লোভে। এবং যোগ সম্বন্ধীয় বই লিখে বিক্রি করতে আরম্ভ করেন। এই বিকৃতির বিরুদ্ধে তিনি ‘যোগ জোগাড়’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই বিখ্যাত অথচ বিতর্কিত প্রবন্ধের একটি অংশ – “যোগ ব্যায়াম হল এমন একটি ব্যায়াম যার দ্বারা প্রচুর আয় সম্ভব, কারণ এটি সম্পূর্ণ ভারতীয়। আমাদের দেশের কত লোক সারাজীবন ডাম্বেল, বারবেল প্রভৃতি পাশ্চাত্য পদ্ধতি প্রচার করে শেষ জীবনে Yoga ভক্ত হয়ে পড়েছেন। যোগের দোকান খুলেছেন। আগে যাঁরা bodybuilding শেখাতেন, যুবসমাজকে সুন্দর, সুদেহী হতে অনুপ্রাণিত করতেন হঠাৎ তাঁরা যোগী হয়ে পড়লেন কেন?’ প্রসঙ্গত, বলা ভালো এই লগ্নে যে যোগের ব্যবসার বিরোধী ছিলেন আয়রনম্যান নীরদ সরকার।, বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ। শ্রী মনোহর আইচ তাঁর ৯০ বছর বয়স অবধি weight training করে গেছেন।

তাপসবাবু বলতেন, ‘আমার সাধনা আমি বিক্রয় করিনা।’ তিনি নিজের বাড়িতে প্রতি রবিবার শত শত ছাত্রছাত্রীকে ব্যায়াম শেখাতেন বিনামূল্যে। ক্ষেত্রেই তাঁর তীক্ষ্ণতা দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর লেখায়, “………কলকাতার বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎসাহী যুবকগণ অখ্যাত শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যখন তাদের শিক্ষার চরম সোপানে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যোগ্যতার পরিচয় দিতে আরম্ভ করে তখনই কোন কোন বিখ্যাত মানুষের শ্যেনদৃষ্টি তাদের উপরে এসে পড়ে। নিরলস স্বার্থ ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের দ্বারা গ্রামের ছেলেদের যাঁরা গড়ে তোলেন তাঁরা কিন্তু সারাজীবনই বঞ্চিত এবং অখ্যাত হয়ে থাকেন। অজ্ঞাত প্রতিষ্ঠানের উন্নতিশীল গ্রাম্য যুবক যখন কেতাদুরস্ত বিশিষ্ট মানুষের আহ্বানে চাঞ্চল্য প্রকাশ করে অতীতের কথা ভুলে কেবলমাত্র আত্মোন্নতির জন্য আত্মবিক্রয় করে তখন তারা একবারও ভাবতে পারে না, কিভাবে গ্রামকে তারা বঞ্চিত করল।…হে তরুণ ব্যায়ামী, তোমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা কর। জেনে রাখ, যৌবন বেশীদিন থাকে না, যৌবন থাকতে থাকতে ভবিষ্যতের ভিত গেঁথে নাও। সবাই তোমাদের যৌবনকে, নিজেদের স্বার্থে লাগিয়ে মুনাফা লোটার চেষ্টা করবে। তারপর – আমার মতো আত্মবিলাপ ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না – অতএব, সাবধান।”

তাপসবাবুর অগণিত ছাত্রছাত্রীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হুগলীর শ্রী সরোজ নন্দী, হুগলীশ্রী ও জাতীয় বিচারক (yoga & bodybuilding) শিশির চক্রবর্তী, Mr. Greater Calcutta সমীর দে, ভারতশ্রী দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায়, ভারতশ্রী তুষার শীল, যোগেন্দ্র অমর নন্দী, ওমর বড়ুয়া, যোগসুন্দরী কাঞ্চন বসু।

প্রতি রবিবার সকাল ৮টা থেকে আরম্ভ হতো ব্যায়াম ও যোগাসনের ক্লাস। প্রখ্যাত যোগবিদ ও সন্ন্যাসী শ্রী শ্রী শিবানন্দ সরস্বতী, লৌহমানব শ্রী নীলমণি দাস, Ironman নীরোদ সরকার, ভূপেশ কর্মকার,বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ, ভারতশ্রী ক্ষিতীশ চট্টোপাধ্যায় ( মনোহর আইচের শিষ্য)প্রমুখদের সাথে সখ্য থাকায় ব্যায়ামের প্রচার প্রসার তৎকালীন সময়ে এগিয়ে যায় জনসাধারণ ও যুবকদের মধ্যে।

এতো ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রচন্ড। তাপসবাবুর নিজের কথায়, যাঁরা ব্যায়ামচর্চা করেন তাঁদের মধ্যে কলমচর্চা করতে খুব কম মানুষই জানেন। তিনি শরীরচর্চা করতেন বলে সাহিত্য ভাবনা থেকে যে দূরে অবস্থান করতেন, তা নয়। উনি নিজের বাড়িতে সমসাময়িক অনেক সাহিত্যিকের রচনাবলী বাঁধিয়ে রাখতেন। ছেলেমেয়েদেরও দেদার বই পড়াতেন। নিজে প্রথম শ্রেণীর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে চাকরি করতেন কিন্তু চাকরী সামলেও ছুটে যেতেন দূরদূরান্তে ব্যায়ামের অনুষ্ঠানে। এক কথায়, আদ্যন্ত প্রচার বিমুখ, অর্থলোভ মুক্ত আদর্শবাদী এক সাধক ছিলেন তিনি। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন Mr. India/ভারতশ্রী শ্রী দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায়।

দুর্গাদাসবাবুর নিজের কথায়, বর্তমানে ব্যায়াম জগতের এত অস্বচ্ছতা ও পঙ্কিলতার মধ্যে দরকার তাঁর মতো এক ব্যক্তিত্বের। স্বার্থলোভীদের লোলুপতা হয়তো খ্যাতির ঝলমলে রোশনাই থেকে দূরে রেখেছে তাঁকে। “শ্রী ধারীরা” মধ্যে থেকে তিনি হয়তো আড়ালে থেকেছেন। অনেক “শ্রী” রা খেতাবের জোরে তাকে সরিয়ে দিয়েছেন.. তাই আজ তাঁর নামে না আছে কোন রাস্তা না আছে কোন মূর্তি। কিন্তু প্রকৃত উত্তরসূরীদের কাছে তিনি ঠিক পৌঁছে যান। ঠিক আমার মতো অর্বাচীনের কাছে যেমন তাঁর জীবনী চলে এলো, ঠিক তেমন ভাবেই ব্যায়াম সাধক শ্রী তাপস ভট্টাচার্য এই লেখার মাধ্যমে আরও অগণিত পাঠকের কাছে পৌঁছে যাবেন। 

সামান্য কিছু সংযোজন: 

ব্যায়ামাচার্য বিষ্টু ঘোষ একবার তাঁর দলবল নিয়ে চুঁচুড়াতে এলেন। Bodybuilding show হবে, হঠাৎ প্যান্ডেলে লেগে গেল আগুন। সবাই নিরাপদে বেরিয়ে এলেও বাঁচলো না বিষ্টুবাবুর একমাত্র নাবালক পুত্র। (প্রথম) সেদিন গুরুর পাশে দাঁড়িয়ে শিষ্য যেভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তা এক কথায় – অভূতপূর্ব।

বিষ্টুবাবু শিষ্যের বাড়ি এলেন। তাপসবাবুর বাবার রসভাষা শোনার জন্য বসলেন তাঁর বাবারই ঘরে। স্যুট পরে থাকায় চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হল। এদিকে পন্ডিতমশাই তো নীচে বসে। বিষ্টুবাবু বসতে ইতস্তত করছেন দেখে পন্ডিতমশাইয়ের সহাস্য উক্তি, ” বসো বিষ্টু। গুরুদ্রব্য (ভারী দ্রব্য) যে সর্বদা তলাতেই থাকে।”

বিশ্বশ্রী মনোতোষ রায়ের অভিন্নহৃয় বন্ধু ছিলেন তাপসবাবু। মনোতোষ রায়ের ছেলে অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত তৎসহ অভিনেতা শ্রী মলয় রায় তাঁর বিয়ের পর আশীর্বাদ নিতে এসেছিলেন তাপস কাকুর কাছে।

তাপসবাবুর মৃত্যুর খবর সমস্ত সংবাদপত্র, রেডিওতে প্রচারিত হয়। প্রকাশিত হয় – “মনোতোষ রায়ের গুরু শ্রী তাপস ভট্টাচার্য চুঁচুড়ায় তাঁর নিজ বাসভবনে পরলোকগমন করেছেন।” পরে জানা যায়, ওই ভাবে সংবাদ প্রকাশ করার জন্য নির্দেশটি বিশ্বশ্রীর (মনোতোষবাবুর) নিজের ছিল।

তথ্যসূত্র: শ্রী মৃন্ময় ভট্টাচার্য (পুত্র)
শ্রীমতী শিক্তা গোস্বামী (কন্যা)

Leave a Reply