তর্পণে প্রণত মসীশাশ্বত সনাতন

নমস্য চান্না – ১

– শ্রী অর্ণব মুখোপাধ্যায় ও শ্রী অখিল কুমার নন্দী

 

(এটি নিছক কোন সাধারণ গ্রামের কাহিনী নয়। এ আখ্যান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় অবস্থিত এক তথাকথিত অখ্যাত চান্না গ্রামের, যা বঙ্গের সশস্ত্র বৈপ্লবিক সংগ্রামের ও শক্তিচর্চার আশীর্বাদ ধন্য। ইতিহাস এই পবিত্র ভূমির প্রতি যত্নবান হয়নি, সরকারী নির্দেশে তার সাথে প্রতারণাই করেছে প্রতি মূহুর্তে। আজ সেই অজানা আখ্যান জনসমক্ষে উপস্থিত করার সময় আগত।)

রাঢ়বঙ্গের বর্ধমান জেলার গলসী থানার অন্তর্গত চান্না এক অখ্যাত গ্ৰাম হলেও, ঐতিহ্য, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে একটি আদর্শ গ্ৰাম হিসাবে বঙ্গবাসীর জনমানসে ভারত ভূমির স্বকীয় গৌরবকে বৃদ্ধি করেছে এই ছোট্ট তৃণগুল্মে ভরা গ্ৰামটি। বর্ধমান শহর থেকে প্রায় ১৪ কি.মি. দূরে, খানা জংশন রেলস্টেশন থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে খড়ি নদীর পারে অবস্থিত সবুজাবৃত গ্ৰামটি বর্ধমান অধিবাসীদের একান্ত হৃদয়ের সম্পদ। গ্ৰামের পশ্চিম প্রান্তে সাধক কমলাকান্তের মাতুলালয় জেলা সংস্কৃতি পরিষদের স্মৃতি ফলকে দীপ্তিমান। গ্ৰামের উত্তর প্রান্তে মা বিশালাক্ষীর মন্দির ও সাধকের সিদ্ধাসন, গ্ৰামের বীরশ্রেষ্ঠ সন্তান বাংলা তথা ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী শ্রী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (শ্রীমৎ স্বামী নিরালম্ব) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত “আশ্রম চান্না” গ্ৰামের শোভাবর্ধন করছে। বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবের অন্যতম বীর সৈনিক ঋষি অরবিন্দের পদধূলি ধন্য এই গ্ৰামের উত্তরে পূর্ব বাহিনী খড়ি নদীর তীরে প্রেম, ভক্তি ও জ্ঞানের ত্রিবেনী সঙ্গমে গঠিত “আশ্রম চান্না” একাধারে বাংলার সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

জনশ্রুতি আছে, একদা গ্ৰামে চন্দন গাছের আধিক্য থাকার ফলে, পূর্বে এর নাম ছিলো ‘চন্দনা’। চন্দনা থেকে কালে কালে অপভ্রংশ হয়ে ‘চন্ননা’ এবং বর্তমানে ‘চান্না’ নামটি এসেছে। দীর্ঘ দিন এই গ্ৰামে বাস করছেন ব্রাহ্মণ, কুমোর, কামার, তাঁতি, নাপিত, আগুরি, ডোম, গোয়ালা, আদিবাসী সহ একাধিক গোষ্ঠীর হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। বর্তমানে গ্ৰামের জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজারের অধিক। গ্ৰামে একটি পাড়া ব্রাহ্মণদের, দুটি আগুরি ও বাগদিদের, একটি পাড়ায় বসবাস করেন মেটে গোষ্ঠীভুক্ত মানুষ এবং ৫ পাড়া জুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের (সাঁওতাল) বসবাস। ৫০০ ব্রাহ্মণ, ৫০০ আগুরি, ৬০০ বাগদি ও মেটে এবং ১৫০০ আদিবাসী সম্প্রদায়ের (সাঁওতাল) মানুষ বাস করেন এই গ্ৰামে। তবে এই গ্ৰামের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারাটি বেশ প্রাচীন। বহুকাল আগে বেশ কয়েকটি টোল ছিলো, গ্ৰামবাসীদের দাবি, কাশী এবং নবদ্বীপ থেকে বেশ কিছুজন পণ্ডিত একসময় এখানে এসেছিলেন। গ্ৰামটি দুপ্রান্ত উঁচু। খড়ি নদীর ধার থেকে গ্ৰামের অন্তর্ভাগের দিকে ভূমির উচ্চতা ক্রমশই কমেছে, জমিগুলি ধাপে ধাপে নেমে এসেছে। গ্ৰামের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষরেই প্রধান জীবিকা হলো কৃষিকাজ বা খেতমজুরি। দুই থেকে আড়াই শতাংশ মানুষ ব্যবসায়ী। অবশিষ্ট গ্ৰামবাসীগণ চাকুরিজীবী। কৃষিকাজ এক সময় বৃষ্টির উপর এবং খড়ি নদীর জলের উপর নির্ভর করত। বর্তমানে সাবমার্সিবল পাম্পের সাহায্যে বছরে দু’বার ফসল উৎপাদন করা হয়। মূলত, গ্ৰামের অর্থনীতি কৃষিকার্যের উপরেই নির্ভর করছে। ফলত, গ্ৰামবাসীরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নন।

এই গ্ৰামকে শস্য শ্যামলা করে তুলেছে খড়ি অথবা খড়্গেশ্বরী নদী। গ্রীষ্মে যেমন খড়ির জল কমে হাঁটু সমান হয়ে যায় তেমন বর্ষার সময় দু’কূল ছাপিয়ে বন্যাও হয়। তবে খড়ির বন্যায় খুব একটা ক্ষয়ক্ষতির কথা শোনা যায় না। বরং দু’পাড়ের জমিতে পলি পড়ে চাষের কাজে উপকার হয় বলেই জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। আবার গ্রীষ্মের সময় স্যালোর মাধ্যমে খড়ি থেকে জল তুলে কৃষিকাজ করা হয়। পূর্ব বর্ধমান জেলার বুদবুদ থানার মানকর অঞ্চলের মাড়ো গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে এক জলাশয় থেকে উৎপত্তি লাভ করে খড়ি নদী প্রায় ১৪০ কিমি দীর্ঘ পথ প্রবাহিত হয়ে ধাত্রীগ্রামের কাছে ভাগীরথী নদীতে মিলিত হয়েছে। খড়ি নদীর উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি হল, কালাচাঁদ গোঁসাই নামে এক নিঃসন্তান শাক্ত ব্রাহ্মণ পূজা করে দেবী মহামায়াকে সন্তুষ্টা করেন। দেবী বালিকা রূপে প্রকট হন, যার গায়ের রঙ খড়ির মতো সাদা। দেবী ব্রাহ্মণের বাড়ি এলেও, ব্রাহ্মণী উচ্ছিষ্ট খাবার দেওয়াতে একসময় দেবী ব্রাহ্মণের বাড়ি ত্যাগ করে চলে যেতে থাকেন। ব্রাহ্মণ দেবীকে নিবৃত্ত করতে পিছনে ছুটতে থাকেন। অবশেষে ধাত্রীগ্রামের নিকট দেবী ভাগীরথীতে ঝাঁপ দেন। দেবী যে পথে গিয়েছিলেন, তাই নদীর গতিপথ হয়ে যায়। আর দেবী ডাইনে-বামে এঁকেবেঁকে গিয়েছিলেন, তাই খড়ি নদীর গতিপথ আঁকাবাঁকা। খড়ি নদীর উৎপত্তি স্থলে একসময় দেবী খড়্গেশ্বরীর মন্দির ছিল। এখনও পৌষ সংক্রান্তিতে খড়ি নদীর উৎসস্থলে নামকীর্তন হয়। বর্তমানে খড়ির জল শুকিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কারণে তাই চান্না গ্ৰামের বাসিন্দাদের চাষাবাদে সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে গ্ৰামীণ অর্থনীতি এখন বিপর্যস্ত।

পূজা-পার্বণ: বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, “বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ”। আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় শহর এবং শহরতলিতে এই আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি বিলুপ্তপ্রায়, কিন্তু গ্ৰামবাংলায় গেলেই আমরা আমাদের শিকড় খুঁজে পাই বিভিন্ন পূজোর আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। বাংলার অধিকাংশ গ্ৰামই এখনও অবদি তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সেরকমই চান্না গ্ৰামে বছর শুরু হয় বৈশাখ মাসে সূর্যদেবের প্রখর দাবদাহের মধ্যে সম্পদ নারায়ণ পুজো দিয়ে আর শেষ হয় চৈত্রের শেষার্ধে চড়কপুজোর মাধ্যমে। গ্ৰামের মাঝখানে অবস্থিত গ্ৰামবাসীদের প্রাণকেন্দ্র হলো এক বটগাছ, গ্ৰীষ্মের শেষে জৈষ্ঠ্য মাসে উক্ত গাছটির পাশে অধিষ্ঠাত্রী দেবী রক্ষাকালী মায়ের পুজো হয়। আষাঢ় মাসটি গ্ৰামবাসীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং খুশির সময়। কারণ আষাঢ় মাসের শুল্কা নবমী তিথিতে গ্ৰামের আরাধ্য দেবী মা বিশালাক্ষীর ধুমধাম করে পূজা হয়। বিশালাক্ষী হলেন এই গ্ৰামের উপাস্য দেবী। যিনি ভারতীয় সংস্কৃতির একজন লৌকিক দেবী, বহুযুগ ধরেই এই দেশে তিনি পূজিত হচ্ছেন। কতদিন আগে কে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না বটে, তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী, বর্ধমান নবাবের দেওয়ান মানিক রামবাবু ও গ্ৰামেরই বিনোদরাম চক্রবর্তী মহাশয় দু’জন মিলে বিশালাক্ষী দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে মন্দিরের ভিতরে কোনো মূর্তি নেই, বেদীর উপর সুদীর্ঘ লেলিহান জিহ্বা সমেত পাঁচটি মাতৃমুণ্ড রয়েছে। প্রতিটি মাতৃ-মস্তকই লাল চেলি দিয়ে সুন্দরভাবে আবৃত। প্রতিটি মাতৃ-মস্তকই ধোঁয়া খাইয়ে কালো করা এবং টেরাকোটায় নির্মিত। প্রবাদে আছে, মা বিশালাক্ষীরা আট বোন। এর মধ্যে পাঁচ বোন এনাক্ষী, দ্বিরাক্ষী, বিশালাক্ষী, রক্তাক্ষী এবং সুলোচনা চান্নায় বিরাজমান। পদ্মাক্ষী ও কোটরাক্ষী থাকেন গৃহী থানার অধীনস্থ সারুল গ্ৰামে এবং অবশিষ্ট ত্রিলোচনা বা বাসুলি নামের এক বোন বীরভূমের বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাসের জন্মস্থানে রয়েছেন। গ্ৰামবাসীদের দাবি, বর্ধমানের তৎকালীন রাজা তেজচাঁদ বিশালাক্ষীর নিত্যসেবার জন্য চাষযোগ্য জমি, ডাঙা ও পুকুর-সহ প্রায় ১০০ বিঘা জমি প্রদান করেছিলেন। সেই জমির আয় থেকেই আজও এই পূজা চলছে এবং সারাবছরই মা অধিষ্ঠান করে আছেন এই গ্ৰামে। আষাঢ় মাসের পূজোর আগের দিন গ্ৰামের মাঝে পুরোনো মন্দিরের স্থান থেকে ঢাক, ঢোল, সানাই, বাজিয়ে ফুলের দোলা বের হয় এবং সারা গ্ৰাম প্রদক্ষিণ করে খড়ি নদীর ধারে বিশালাক্ষী মন্দিরের কাছে পৌঁছায়। সেইদিন রাতেই পুজো হয় মায়ের। তবে গ্ৰামবাসীরা তার পরেরদিন মাকে পূজা দেন। মন্দিরের অবস্থান দেখলেই অনুমান করা যায় যে, বহুকাল আগেই এই স্থান ছিলো গাছপালা ঘেরা গভীর অরণ্য। বিশালাক্ষী হলেন অনার্য গোষ্ঠীর দ্বারা পূজিতা এক দেবী এবং জঙ্গলেই তিনি চিরকাল অধিষ্ঠান করেন। মন্দিরের পিছনের দিকে একটি স্থানে অনুমানের ভিত্তিতে একটি বেদী আছে, যা বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের অনুমানের উপর ভিত্তি করে তৎকালীন বর্ধমানের মহারাজা নির্মাণ করেছেন এবং সম্ভবত এই স্থানেই সাধক কবি কমলাকান্ত সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।

এর ডানপাশেই সাঁওতাল সম্প্রদায়ের আরাধ্য মারাং বুরুর মন্দির অবস্থিত। আষাঢ় মাসের শুল্কা নবমী তিথিতে প্রথমে এই মন্দিরের পুজো সম্পন্ন হয় এবং শূকর বলি হওয়ার পরই বিশালাক্ষীর পূজা আরম্ভ হয়। দেবীর সম্মুখদিকে প্রায় ৫০ টিরও অধিক ছাগবলি হয়। গ্ৰামের মধ্যে মেলা বসে। তবে মন্দিরের আদিরূপ এখন আর নেই। ভক্তদের অর্থে মন্দিরটি নতুন রূপে সজ্জিত হয়েছে এবং আশেপাশের অঞ্চলটি ঘেরা হয়েছে। এখানে পাশেই ভৈরবনাথের একটি মন্দির আছে, যা নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশালাক্ষী পুজোর দিন রঙ-বেরঙের জিনিসপত্র, মুখরোচক খাবার আর নাগরদোল্লার চাকচিক্যে গ্ৰামবাসীদের সারাবছরের ক্লান্তির কিছুটা অবসান ঘটে। ধুমধামের সাথে এই পূজা যেন প্রতিটি গ্ৰামবাসীকেই এক সুতোয় বাঁধতে সক্ষম হয়। বিশালাক্ষীর উদ্দেশ্যে গ্ৰামের প্রত্যেকটি পরিবার জৈষ্ঠ্য এবং পৌষ মাসে ব্রত পালন করেন। আষাঢ়ের রেশ শ্রাবণ মাস অবধি চললেও গ্ৰামের চাষিরা কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। ভাদ্রে সব বাড়িতেই লক্ষীপূজার মাধ্যমে শরতের আগমন ঘটে গ্ৰামে।

(ক্রমশ)

Leave a Reply