আমার ইতিহাসস্বভূমি ও সমকাল

বাঙালির শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের ইতিহাস – ৩য় ভাগ

(পূর্বের সংখ্যার পর)

– সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

⚫⚪ প্রথম ভাগ ⚪⚫

🔶 দেব বংশীয় শাসন 🔶

সেন বংশীয় শাসনের শেষে সমগ্র বৃহৎ বঙ্গ জুড়ে দেব বংশীয় রাজন্যবর্গের শাসন শুরু হয়।

ত্রয়োদশ শতকে ভারতবর্ষে যবন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধে বঙ্গজ কায়স্থ দেববংশের গুরুত্ব প্রচুর । দেব বংশীয় রাজা দামোদরদেব যে তিন তাম্রলিপি খোদাই করিয়েছিলেন তা থেকে এই রাজবংশের ইতিহাস জানা যায়। দামোদরদেবের চট্টগ্রাম তাম্রলিপি থেকে এই রাজবংশের প্রথম তিন রাজার কথা জানা যায়। এই রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন পুরুষোত্তমদেব। তিনি ছিলেন গ্রাম-প্রধান। তাঁর পুত্র মধুমথন বা মধুসূদনদেব ছিলেন এই রাজবংশের প্রথম সার্বভৌম রাজা। তিনি “নৃপতি” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। দিল্লি সালতানাতের আক্রমণে এবং সেনবংশীয় শাসনের শেষদিকের বিভেদ এ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাংলাকে পুনরায়  ঐক্যবদ্ধ করে এক স্বাধীন “বাঙ্গালা সাম্রাজ্য” প্রতিষ্ঠা হয় দেববংশের শাসনকালে । ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব দেব রাজবংশের শাসনে মধ্যযুগে বাংলায় ৩৬ শ্রেণীয়কুল সমন্বয়ে ও তিন-ভূখণ্ডকে একত্রিত করে এক অখণ্ড ভৌগোলিক রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও এক ঐক্যবদ্ধ ‘বাঙ্গালী’ জাতিস্বত্ত্বার নির্মাণ সম্ভব হয়। বাংলা ভাষার প্রভূত উন্নতি হয় এই সময়ে এবং এই উন্নতির যে শ্রেয় দেওয়া হয় হুসেন শাহী সুলতানদের তা প্রকৃতপক্ষে দেব বংশীয় রাজন্য দের প্রাপ্য । শুধুমাত্র শাহী সালতানাত কে মহান প্রমাণ করার জন্য আমাদের ইতিহাস থেকে দেব বংশ কে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।

🟠 মহারাজা দামোদর দেব 🟠

পরমভাগবত রাজা মধুসূদন দেব এর পুত্র অরিরাজচানূরমাধব মহারাজা দামোদর দেব ছিলেন দেব বংশের চতুর্থ নৃপতি এবং মহাপরাক্রমশালী যোদ্ধা।

তিনি কাশীবিজয়ী পরমসৌর গৌড়েশ্বর বিশ্বরূপ সেন এর সামন্তরাজা রূপে সমতট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল শাসন করতেন। তাঁর মহিষী কন্দর্পদেবীর পাকামোড়া তাম্রশাসন থেকে তাঁর যুদ্ধজয়ের বিষয়ে অনেক বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় । তিনি “অরিরাজ-চানূর-মাধব-সকল-ভূপতি-চক্রবর্তী” উপাধি গ্রহণ করেছিলে। কুমিল্লা তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, তাঁর রাজ্য আধুনিক বাংলাদেশের কুমিল্লা-নোয়াখালি-চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রসারিত ছিল।

⚔️ -: ইজউদ্দিন খিলজির আক্রমণ প্রতিহত এবং গৌড়নগরী বিজয় :-⚔️

১২৪৪ এ রাঢ় বঙ্গীয় রাজন্যবর্গ একত্রিত হন রাজা উত্তর বা প্রথম হামীর রায় এর নেতৃত্বে এবং খিলজির ছল করে দখল করে নেওয়া রাজনগর বা লক্ষনৌর দুর্গ মহা বিক্রমে যুদ্ধ করে পুনর্দখল করে নেয়।

এই সময় ইজউদ্দিন খিলজি বঙ্গভূম আক্রমণ করে। সম্রাট বিশ্বরূপ সেন এর আদেশ পেয়ে সমতটাধীশ মহারাজা দামোদর দেব এক বিশাল কৈবর্ত নৌবাহিনী নিয়ে খিলজির বিরুদ্ধে দাঁড়ান। করতোয়া নদীর পূর্ব পাড় ঘিরে ফেলে বঙ্গীয় নৌবাহিনী। দুই দিক থেকে খিলজিদের সাঁড়াশি আক্রমণ করে এবং বিশাল তিরন্দাজ বাহিনী নিয়ে অজস্র তিরবর্ষণ করে খিলজিদের পরাজিত করেন মহারাজা দামোদর দেব।ক্রমশ পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে তিনি সসৈন্যে গৌড়নগরে প্রবেশ করেন । গৌড়নগর বিজয় করে ১২৭ টি প্রাচীন ভগ্ন মন্দির সংস্কার করে পুনঃস্থাপন করেন ও সনাতনধর্মের বিজয়প্রতিষ্ঠায় জগদীশ্বর মহাবিষ্ণুর উদ্দেশ্যে বৃহৎ উপাসনা ও মহোৎসব সম্পন্ন করেন। পাকামোড়া তাম্রশাসনে বঙ্গাক্ষর এ উল্লেখ আছে:- “খ্যাতো গৌড়মহীমহোৎসবময়ং চক্রে পুনশ্চ শ্রিয়া” অর্থাৎ তিনি গৌড়ের নষ্টশ্রী উদ্ধার করে মহোৎসব করেন।

🟠 মহারাজাধিরাজ দশরথ দেব/ রাজা দনুজ রায় 🟠

শ্রীবিষ্ণুর আশীর্বাদধন্য রাজা দামোদর দেব পর তাঁর মহাবলী ততোধিক পরাক্রমশালী পুত্র অরিরাজদনুজমাধব পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ দশরথ দেব সিংহাসনে বসেন যিনি ইতিহাসে রাজা দনুজ রায় নামেই অধিক পরিচিত। দনুজ রায় ছিলেন পিতার সুযোগ্য পুত্র। তাঁর আমলেই সেনবংশীয় শাসনের অবসান হয় এবং দেব বংশীয় শাসন সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দেব বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি।

⚔️ -: গৌড় বিজয় :- ⚔️

আরাধ্য শ্রীমন্ননারায়ণ এর আশীর্বাদ ধন্য মহারাজা দশরথ দেব গৌড়েশ্বর মধুসেন এর সামন্ত নৃপতি রূপে ১২৭২ সালে গৌড় নগরী তে সনাতনী বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় দনুজ রায়ের আদবাড়ি তাম্রশাসন থেকে।

⚔️ -: বিক্রমপুর বিজয় :- ⚔️

ইতিমধ্যে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে পড়ে। গৌড়েশ্বর মধুসেন এর মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে কলহ বাঁধে, এবং সাভারের সেনবংশীয় রাজা ধীমন্ত সেন বিক্রমপুর অধিকার করার প্রচেষ্টা করতে থাকেন। এমতাবস্থায় অন্তর্দ্বন্দ্ব র সুযোগ নিয়ে লখনৌতি র গর্ভনর মুঘিসুদ্দিন তুঘ্রাল সুবর্ণগ্রাম দখল করে নেয়।

দক্ষ রাজনীতিবিদ, মহাপরাক্রমশালী মহারাজা দনুজ রায় এই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ এর কথা বুঝতে পেরে বিক্রমপুর আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। এই যুদ্ধে দেবপক্ষের হয়ে সেনাপতিত্ব করেন ধীমন্ত সেনের পুত্র মহাবলী যোদ্ধা পরমস্কন্দ রণধীর সেন। উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে জোড়া আক্রমণে এবং সেনাপতি রণধীর সেন এর দেবসেনাপতি কার্তিকের ন্যায় বীরত্বের সামনে সেন বংশের পতন ঘটে এবং বিক্রমপুর দেব শাসনের অন্তর্গত হয়। রণধীর সেন দেব বংশের সামন্ত হিসেবে সাভার অঞ্চল ও ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অঞ্চল শাসন করতে থাকেন।

⭕ -: দিল্লি-বাঙ্গালা চুক্তি :- গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজা দনুজ রায় কে উঠে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ ⭕

১২৮০ সালে মুঘিসুদ্দিন তুঘ্রাল দিল্লি সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং সুবর্ণগ্রাম দখল করে নেয়। এমতাবস্থায় একদিকে বঙ্গেশ্বর মহারাজা দনুজ রায় অন্যদিকে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন উভয়ের সাথে তার শত্রুতা হয়।

বলবনের একার পক্ষে তুঘ্রাল কে হারানো সম্ভব ছিল না, সুবর্ণগ্রাম নদী অঞ্চল সেখানে হারাতে গেলে প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী নৌবাহিনীর, যা বাঙ্গালা সাম্রাজ্যের কাছে ছিল। তাই বলবন মহারাজা দনুজ রায় এর সাথে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলায় এসে গিয়াসউদ্দিন বলবন মহারাজা দনুজ রায় এর সাক্ষাৎ ও মিত্রতা প্রার্থনা করেন। মহাপরাক্রমশালী মহাবীর বঙ্গসম্রাট দেবান্বয়কুলপ্রদীপ মহারাজা দনুজ রায় সন্ধির শর্ত দেন যে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন কে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানাতে হবে সভা মধ্যে তবেই তিনি মিত্রতায় রাজি হবেন। এই শর্তে বলবন মহাসমস্যায় পড়েন, দিল্লির সুলতানের পক্ষে বাংলার কাফের রাজাকে এভাবে সম্মান দেখানো চলে না, অথচ বঙ্গসম্রাট দনুজ রায়কে সম্মান অভিবাদন না দেখালে চুক্তি সম্ভব হবে না।

এই অবস্থা থেকে সুলতানকে রক্ষা করে তুঘ্রাল অভিযানের সেনাপতি মালিক ইখতিয়ারউদ্দিন নেকতারস। নেকতারস পরামর্শ দেয় সুলতান আগে থেকেই একটি বাজপাখি হাতে নিয়ে দরবারে বসে থাকবেন। এরপর সম্রাট দনুজমাধব এলেই সুলতান উঠে দাঁড়িয়ে বাজপাখিটি উড়িয়ে দেবেন। সবাই ভাববে, সুলতান বুঝি পাখি ওড়াতেই উঠে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এই পথে বঙ্গাধিপতি সম্রাট দনুজমাধব’কে সুলতানের অভিবাদন জানানোও হয়ে যাবে। বুদ্ধিদাতা এরজন্য সুলতানের কাছ থেকে পুরস্কার পেলেন।নিরুপায় বলবন বাধ্য হলেন “রাই এ বাঙ্গালা” মহারাজা দনুজ রায় কে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাতে। দিল্লির সুলতান যে হিন্দু রাজাকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাতে বাধ্য হন তাঁকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের সর্বাধিক প্রতাপশালী হিন্দু শাসক বলাই যায়।

এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় জিয়াউদ্দিন বারানি র লেখা “তারিখ ই ফিরোজশাহী” এবং ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার এর “The Delhi Sultanate” গ্রন্থে পাওয়া যায়।

⚔️ -: দিয়ার ই বাঙ্গালাহ র যুদ্ধ :- ⚔️

সুলতান বলবনের অবশ্য সন্ধিচুক্তি র পরেও মহারাজা দনুজ রায় এর রাজ্যের ওপর লোভ ছিলো। বলবন তার সেনাপতি নাসিরউদ্দিন বোগরা খান কে দিয়ার ই বাঙ্গালাহ জয় করতে পাঠান। কিন্তু মহাবলী বঙ্গীয় দেবসৈন্য অতি সহজেই বোগরা খান কে পরাজিত করে এবং বোগরা সম্ভবত পালিয়ে যায়।

⚔️ -: সুবর্ণগ্রাম পুনর্দখল :- ⚔️

১২৮৩ তে মুগিসউদ্দিন তুঘ্রাল সুবর্ণগ্রাম দখল করে নেয়। সুবর্ণগ্রাম ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বন্দর এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ নগর, তাই মহারাজা দনুজমাধব সুবর্ণগ্রাম পুনর্দখলের পরিকল্পনা করতে থাকেন। এই সময় বিহার লখনৌতির দিল্লি সালতানাতের গর্ভনর ফিরোজ শাহ ও রুকসউদ্দিন কাউসের মধ্যে বিহারের দখল নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় যা গৃহযুদ্ধের আকার নেয়।

এই সময় আরাকানের তৎকালীন শাসক রাজা মিং হেট্টে র সাথে মহারাজা দামোদর দেব মিত্রতা স্থাপন করেন। আরাকান ও বাংলার মিলিত মহাশক্তিশালী বিধ্বংসী নৌবাহিনী সোনারগাঁও এর সালতানাত শিবির আক্রমণ করে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের দক্ষিণ সীমান্তে বঙ্গজ দেবসৈন্য সুবর্ণগ্রামের দুদিকে একটি প্রতিরোধক প্রাচীন নির্মাণ করে । মেঘনা নদীর উত্তরপথে চন্দ্রদ্বীপ থেকে দেবসৈন্য অগ্রসর হয় ও সোনারগাঁও এর দক্ষিণসীমান্তে সুলতানি সেনার সাথে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের তৃতীয় দিনে চট্টগ্রামের দেবসৈন্যর সাথে বিশাল আরাকানি নৌবাহিনী একসাথে সোনারগাঁও আক্রমন করে ও সোনারগাঁও পুরোপুরিভাবে ঘিরে ফেলে। এরকম দুরবস্থায় সুলতানি সেনা পরাজয় স্বীকার করে।

মহারাজা অরিরাজদনুজমাধব দামোদর দেব বরিশাল অঞ্চলে চন্দ্রদ্বীপ নামক এক নগর প্রতিষ্ঠা করেন যা পূর্ববঙ্গে স্বতন্ত্র হিন্দু রাজ্য হিসেবে স্বাধীনতা ধরে রেখেছিল বহু কাল।

দনুজ রায় এর পরবর্তীকালে দেব সাম্রাজ্য কিছু দুর্বল হয়ে পড়ে, বাঙ্গালা সাম্রাজ্যের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করে সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়ে যান মহারাজাধিরাজ দনুজমর্দন রামনাথ দেব।

🟠 মহারাজাধিরাজ দনুজমর্দন রামনাথ দেব 🟠

চন্দ্রদ্বীপের দেব বংশীয় কুলীন কায়স্থ সম্রাট, ৩৬ শ্রেণীয় অখণ্ড বাঙ্গালী জাতিসত্তার অন্যতম নির্মাতা, বঙ্গজ কায়স্থ কুলের গোষ্ঠিপতি, পরমশাক্ত চন্ডীসাধক মহারাজাধিরাজ ” দনুজমর্দন ” রামনাথ দেব প্রকৃত অর্থে ছিলেন দেব বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক। পালবংশীয় গৌড়েশ্বর ধর্মপাল ও সেনবংশীয় গৌড়েশ্বর বল্লাল সেন এর ন্যায় তিনিও কুলীনপ্রথার সংস্কার করেন। তাঁর রাজত্বে চন্দ্রদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয় বাকলা সমাজ যেখানে সমগ্র বৃহৎ বঙ্গের বহু পণ্ডিত এবং ব্রাহ্মণ গিয়ে অবস্থান করেন। নবদ্বীপ অঞ্চলে বিভিন্ন টোল ও গুরুকূলে ব্রাহ্মণগণের শাস্ত্রচর্চায় সনাতন সংস্কৃতি নবউদ্যমে বিকশিত হতে থাকে । শিখরভূম রাজ্যের কুলগুরু আচার্য পদ্মনাভ, ‘পদচন্ডিকা’খ্যাত পন্ডিত বৃহস্পতি মিশ্র, কবি কৃত্তিবাস ওঝা প্রমুখ দিকপালগণ নবহট্টে রাজা দনুজমর্দনদেবের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। মহারাজা রামনাথ দেব এর শাসনকাল প্রকৃত অর্থেই ছিল রামরাজ্য এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কবি কৃত্তিবাস ওঝা মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রী রামচন্দ্র এর বন্দনায় রচনা করেন অষ্ট কাণ্ডবিশিষ্ট ” শ্রীরাম পাঁচালি “

⚔️ -: সেনাবাহিনী সংস্কার :- ⚔️

মহারাজা রামনাথ দেব পুনরায় এক অতীব শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন। ঘটক কারিকাগণের বিবরণে দেখা যায় দনুজমর্দন রাজ্য মধ্যে দুর্গ তৈরি, অশ্বারোহী, হস্তী ও নৌ-সৈন্য বৃদ্ধি করে বাইরের আক্রমণ থেকে তিনি বাঙ্গালাকে রক্ষ করেন। বিহার-লক্ষ্নৌতির সুলতানদের চেয়ে তার নৌবাহিনী অধিক শক্তিশালী ছিল। রাজধানীর চারদিকে তিনি বৃহৎ দুর্গ নির্মাণ ও পরিখা খনন করেন। রাজধানী বাকলা শহরের সুরম্য অট্টালিকা, মন্দির ও রাস্তা নির্মাণ করেন। মহারাজা দনুজমর্দনদেব মধ্যযুগে দিল্লি সালতানাতের আক্রমণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাংলার বিভিন্ন ভূখণ্ড বিজয় ও একত্রিত করার নির্মাণ করেন অখন্ড ‘বাঙ্গালা সাম্রাজ্য’ । শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম, বঙ্গ, রাঢ়, বরেন্দ্র আদি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল একত্রিত করে তিনি সনাতনী শাসনব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করেন।

⭕ -: নিজ মুদ্রা প্রচলন :- ⭕

ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এর মতে, সেসময়ের ভারতবর্ষে পেশোয়ার থেকে কামরূপ পর্যন্ত কেবল দনুজমর্দনদেব ই একমাত্র হিন্দু নৃপতি যিনি স্বাধীন মুদ্রা প্রচলন করতে পেরেছিলেন। এহেন ক্ষমতা তৎকালীন সময়ে আর কারো ছিল না। পাণ্ডুয়াতে উৎকীর্ণ মহারাজ দনুজমর্দনদেব এর মুদ্রায় একতলে বঙ্গলিপিতে উল্লিখিত “শ্রীচণ্ডীচরণপরায়ণ” ও অন্য তলে রাজার নাম।

⚔️ -: সপ্তগ্রাম দখল এবং রাঢ়বঙ্গ বিজয় :- ⚔️

রাঢ়বঙ্গে এই সময় উত্থান ঘটে গোপভূম ভাল্কি রাজ্যের মহাবীর সদগোপ রাজা মহেন্দ্র সিংহ র। রাঘব সিংহ ভল্লুপাদের বংশজ মহেন্দ্র সিংহ স্বাধীন নৃপতি রূপে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন এবং বৈদেশিক আক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। ১৩৫৫ সালে তিনি জামতাড়ার যুদ্ধে ইলিয়াস শাহের সিপাহসালার সৈয়দ বর্মন কে পরাজিত করেন।

অন্যদিকে তাম্রলিপ্ত সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজা হিজলিপতি হরিদাস ভৌমিক ও অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। ১৩৭১ এ সেকেন্দার শাহ রাঢ়বঙ্গে আক্রমণ করেন কিন্তু হিজলির কাছে বিশাল কৈবর্ত নৌবাহিনী নিয়ে রাজা হরিদাস ভৌমিক তাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন এবং শাহ পলায়নে বাধ্য হয়।

এমতাবস্থায় রাঢ়বঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সপ্তগ্রাম বন্দর ছিল শাহীদের দখলে। এই বন্দর পুনর্দখল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। সেজন্য মহারাজাধিরাজ মহেন্দ্র দেব (দনুজমর্দনদেব এর পিতা) মহারাজা মহেন্দ্র সিংহ এবং রাজা হরিদাস ভৌমিক এক মহাবলী ত্রিশক্তি জোট গঠন করেন, মহেন্দ্র দেব এর পক্ষে তাঁর জেষ্ঠ মহাপরাক্রমশালী পুত্র দনুজমর্দন রামনাথ দেব যুদ্ধে যোগ দেন । ১৩৭২ র শেষ দিকে হিজলিপতি রাজা হরিদাস ভৌমিক সপ্তগ্রামের দক্ষিণ সীমান্ত আক্রমন করেন এবং তাম্রলিপ্ত বন্দরের নৌপথ সম্পুর্ন বন্ধ করে দেন । ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা মহেন্দ্র সিংহ ওলায়েতে সাতগাঁ আক্রমন করেন এবং উত্তর সীমান্ত সম্পুর্ন বন্ধ করে দেন। ফলে ইলিয়াস শাহী রাজধানীর সাথে সাতগাঁর সমস্ত সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায় । এই অবস্থায় পূর্বদিকে গঙ্গানদী পাড় করে রাজা দনুজমর্দনদেব এর বিশাল নৌবাহিনী সপ্তগ্রাম আক্রমণ করে । এহেন পরিস্থিতিতে তিনদিক থেকে আক্রান্ত অবস্থায় সুলতানি শাসনের পতন হয় ও সপ্তগ্রামে দেববংশের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। রাঢ়বঙ্গে নবহট্টে দেব বংশীয় শাসনকেন্দ্র তৈরি হয়।

দেব বংশীয় সময়কাল বাংলার ইতিহাসের অত্যন্ত সমৃদ্ধ সময়। শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য সমস্ত দিক থেকে এসময় উন্নতি হয়। এমনকি সেন আমলের শেষদিকে মুদ্রা মান অত্যন্ত কমে যায় এবং কড়ি ও ব্যবহার হতে থাকে মুদ্রা হিসেবে। কিন্তু দেব বংশীয় শাসনকালে মুদ্রা মান আবারও উর্দ্ধগতি লাভ করে এবং দেবযুগে বঙ্গজ বণিককুলের বাণিজ্যযাত্রা নতুন পথে শুরু হয় ও নৌবাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার হয় । সেনযুগে সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়কে নির্বাসন দেওয়াতে বাণিজ্যের অবস্থা ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু দেববংশের শাসনে বাঙ্গালার ৩ শ্রেণীসম্বলিত চতুর্জাতি বণিককুল – সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক, শঙ্খবণিক ও কাংস্যবণিক দের সম্মিলিত সঙ্ঘের বাণিজ্যযাত্রা শুরু হয়। বহির্বাণিজ্যের উন্নতিতে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, বঙ্গজ মুদ্রার মান উন্নত হয় ও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বঙ্গসম্রাটের নামাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রার ব্যবহার শুরু হয়। এই সময়ের বিভিন্ন তাম্রশাসন, মুদ্রা এ বাংলা লিপি ব্যবহার করা হতো এবং বিভিন্ন গ্রন্থ বাংলায় রচিত হয় যা দেব বংশীয় রাজাদের বাংলা ভাষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম প্রমাণ।

মহারাজা দনুজমর্দনদেব সমগ্র জীবন যবন আক্রমণ প্রতিরোধ করেছেন, কিন্তু তাঁর পরবর্তী কালে দেব সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে থাকে এবং চন্দ্রদ্বীপে একটি স্বতন্ত্র হিন্দু রাজ্য হিসাবে থেকে যায়।

 

(লেখক পরিচিতি: পদার্থবিদ্যা স্নাতক, সঠিক ইতিহাস সন্ধানী ও প্রচারক, চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী, শক্তিচর্চায় নিবেদিত এক বাঙালি যুবক)

Leave a Reply