আমার ইতিহাসস্বভূমি ও সমকাল

বাঙালির শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের ইতিহাস – ২য় ভাগ

(পূর্বের সংখ্যার পর)

– সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

🟠সম্রাট নয়পাল ও সম্রাট তৃতীয় বিগ্রহপাল:-

মহীপাল এর পর পাল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন সম্রাট নয়পাল। পিতার তৈরি বারাণসী অবধি বিস্তৃত সাম্রাজ্যকে তিনি উত্তরে হিমালয় অবধি বিস্তৃত করেন, আজকের নেপাল দেশের নাম এসেছে সম্রাট নয়পাল এর নাম থেকেই।

নয়পাল শুধু মহাবীর রাজন্য নয় ছিলেন শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঁর সভা অলঙ্কৃত করতেন প্রখ্যাত চিকিৎসক চক্রপাণি দত্ত। তাঁর আমলে গয়াধামের জনার্দন মন্দির ও বিষ্ণুপদ মন্দির এ নৃসিংহ মূর্তি স্হাপিত হয়। সম্রাট নয়পাল অত্যন্ত সম্মান করতেন সোমপুরা মহাবিহারের আচার্য এবং প্রখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান কে। আচার্য অতীশের সাথে প্রায়ই বিভিন্ন আলোচনা করতেন নয়পাল।

সম্রাট নয়পাল যুদ্ধ মাতৃকা চর্চিকা(চামুণ্ডা) র উপাসক ছিলেন। সেই সময় পাল সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ধ্বনি ছিল “নমশ্চচর্চিকায়ৈ”

নয়পালের রাজত্বের শেষদিকে কলচুরিরাজ লক্ষ্মীকর্ণ দেব গৌড় আক্রমণ করেন। নয়পালের জেষ্ঠ পুত্র যুবরাজ তৃতীয় বিগ্রহপাল এর নেতৃত্বে গৌড়ীয় সৈন্যবাহিনী কলচুরিরাজ কে পরাজিত করে এবং অতীশ দীপঙ্কর এর মধ্যস্থতায় এক সন্ধি হয় এবং তৃতীয় বিগ্রহপাল এর সাথে কলচুরিরাজ এর কনিষ্ঠ কন্যা যৌবনাশ্রী র বিবাহের কথি হয়। যদিও কলচুরিরাজ সন্ধি ভেঙে কন্যার স্বয়ম্বর এ যুবরাজ বিগ্রহপাল কে আমন্ত্রণ না করায় তিনি গিয়ে যৌবনাশ্রী কে তুলে নিয়ে আসতে যান, ফলস্বরূপ আরও একটি যুদ্ধ হয় এবং এই বার ও বিগ্রহপাল এর সেনাপতিত্বে কলচুরি পরাজিত হয় এবং যৌবনাশ্রী পাল সাম্রাজ্যের রাজমহিষী হন।

পিতার মৃত্যুর পর তৃতীয় বিগ্রহপাল রাজা হন। যৌবনে তিনি সেনাপতি হিসেবে দুইবার কলচুরিরাজ কে পরাজিত করেন। তাঁর রাজত্বকালে চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য এবং উড়িষ্যারাজ মহাশিবগুপ্ত যযাতি আক্রমণ করেন। দুই আক্রমণ ই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিরোধ করেন তৃতীয় বিগ্রহপাল।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন সংক্রান্ত বিবাদ শুরু হয় এবং পাল রাজ্য দুর্বল হতে থাকে।

 

 🟠 সম্রাট রামপাল:-

পাল সাম্রাজ্যের শেষ উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন রামপাল। তাঁর আমলে কৈবর্ত রা এক ভীষণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অত্যন্ত ক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং দক্ষতার সাথে এই বিদ্রোহ দমন করেন সম্রাট রামপাল। একসময় বারেন্দ্র ও পালদের হাতছাড়া হয়ে যায়, সামন্তদের একত্রিত করে সম্রাট রামপাল বারেন্দ্র পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন, এই সামন্তদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিজয়সেন যিনি পরবর্তীতে সেন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রামপালের সভাকবি ছিলেন সন্ধ্যাকর নন্দী, তিনি “রামচরিত” রচনা র জন্য পরিচিত।

রামপাল এর পরবর্তী সময়ে পাল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বারবার বিদ্রোহে জর্জরিত হবার পর শেষ পাল রাজাদের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

রামপালের অন্যতম প্রধান সামন্ত ও রাঢ়ের শাসক বিজয়সেন শেষ পালরাজা মদনপাল কে বিতাড়িত করে পালবংশের পতন ঘটান এবং সেনবংশীয় শাসন শুরু হয়।

 

🔶সেন যুগ 🔶

সেনবংশীয় শাসনকাল বাংলার ইতিহাসের অন্যতম মাহেন্দ্রক্ষণ। এই সময় একাধারে যেমন রাজকার্যে বাংলা ভাষা গুরুত্ব পেতে থাকে তেমনিই এইসময় আধুনিক বাংলা লিপির বিকাশ সম্পূর্ণ হয়।

আবার এই সময়েই সুজলা সুফলা বঙ্গ ভূমিতে শুরু হয় বৈদেশিক ম্লেচ্ছ আক্রমণ, যা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিরোধ করেন সেন রাজন্যগণ।

সেনরাজা দের নিয়ে অনেক ভুল তথ্য পরিবেশিত হয় সাধারণ মানুষের কাছে।

 যার মধ্যে অন্যতম একটি হল সেনরাজা রা এসেছিলেন দক্ষিণ ভারত থেকে। সেন শিলালিপি তে উল্লিখিত “কর্ণটদেশ” ও “দক্ষিণ” শব্দগুলিকে অনেকেই ভুলব্যাখ্যা করেন যে সেন রা এসেছিলেন কর্ণাটক থেকে। কিন্তু ব্যাপার টি আসলে তা নয়। যদি সেনরা দক্ষিণ ভারত থেকেই আসতেন তবে তাদের লিপি কখনোই গৌড়ীয় প্রাকৃত র পরবর্তী রূপ অর্থাৎ বাংলা লিপির মতো হতো না, হতো দক্ষিণ ভারতীয় লিপির মতো। অনেকের মতে সেনরাজা রা রাঢ়বঙ্গ থেকে এসেছিলেন এবং রাঢ় যেহেতু তৎকালীন বঙ্গের রাজধানী গৌড়ের দক্ষিণে অবস্থিত তাই দক্ষিণ থেকে আসেন বলা হয়, এছাড়াও কর্ণট বলতে অনেকে কর্ণসুবর্ণ মনে করে থাকেন। এই অনুমানের পিছনে যুক্তিস্বরূপ বলা যায় যে সমগ্র বঙ্গে সাম্রাজ্য বিস্তারের পূর্বে সেনরাজারা রাঢ়বঙ্গের সামন্ত হিসেবে ছিলেন দীর্ঘকাল, তাই একথা বলাই যায় যে সেনরাজারা দক্ষিণ ভারত থেকে আসেননি বরং তাঁরা আসেন রাঢ় অঞ্চল থেকেই।

 

🟠 সম্রাট বিজয় সেন:-

পরমেশ্বর পরমভট্টারক অরিরাজ বৃষভ শঙ্কর গৌড়েশ্বর মহারাজাধিরাজ বিজয় সেন ছিলেন সেন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তবে তাঁর আগে তাঁর পিতামহ সামন্ত সেন ও পিতা হেমন্ত সেন এর নাম পাওয়া যায়, যাঁরা পাল সাম্রাজ্যের অধীনে রাঢ়বঙ্গের সামন্ত ছিলেন।

পালরাজা রামপাল এর সময়কালে বিজয় সেন ছিলেন সবথেকে ক্ষমতাবান সামন্ত এবং রামপাল যখন বারেন্দ্র পুনরূদ্ধার এ যান তখন সামন্ত রূপে বিজয়সেন তাঁর সঙ্গে যান এবং যুদ্ধজয় শেষে ফিরে রাঢ়বঙ্গ কে স্বাধীন ভাবে শাসনের দায়িত্ব পান।

রামপালের পুত্র মদনপাল তাঁর পূর্বপুরুষদের ন্যায় ক্ষমতাবান ছিলেন না। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজয়সেন গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। এরপর তিনি শুরু করেন এক এক করে ক্ষমতা ও সাম্রাজ্য বৃদ্ধি। বিজয় সেন এর স্ত্রী ছিলেন রাঢ়ের শুরবংশীয়া। তাই সমগ্র রাঢ় তার অধীনে ই ছিল। উড়িষ্যার বাঙালি মাহিষ্যবংশীয় রাজা অনন্তবর্মন চোড়গঙ্গ র সাথে তাঁর মিত্রতা ছিল তাই বল্লালচরিত গ্রন্থে সম্রাট বিজয় সেন কে “চোড়গঙ্গ-সখা” বলা হয়েছে।

দেওপাড়া প্রশস্তি অনুসারে তিনি নান্য, বীর, রাঘব ও বর্ধন কে পরাজিত করেন, গৌড়ের রাজাকে পালাতে বাধ্য করেন এবং কলিঙ্গ ও কামরূপ এর রাজাকে ও পরাজিত করে এক বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

এক্ষেত্রে উল্লিখিত নান্য হলেন রাজা নান্যদেব, মিথিলার শাসক; বীর সম্ভবত হলেন বীরগুণ, রামপালের সামন্তচক্রের একজন এবং কোটাতবী অঞ্চলের শাসক; বর্ধন হলেন কৌশাম্বী র শাসক দোপ্রবর্ধন বা মদনপালের সামন্ত গোবর্ধন; আর রাঘব হলেন রাঘববর্মন চোড়গঙ্গ, অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ র পুত্র।

এই সমস্ত রাজা ও সামন্তদের পরপর পরাজিত করে বিজয় সেন এক বিরাট অঞ্চলে নিজ রাজত্ব স্থাপন করেন।

বিজয়সেন যখন স্বাধীন নৃপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন তখন পালদের আরও এক প্রাক্তন সামন্ত বর্মন বংশ, বঙ্গ (দক্ষিণ পূর্ব বাংলা, অধুনা বাংলাদেশ) অঞ্চলে    স্বাধীন ভাবে শাসন করছে, এই অবস্থায় বিজয়সেন ও বর্মনদের মধ্যে সংঘাত হয় এবং বিজয়সেন এর নেতৃত্বে বঙ্গ অঞ্চল ও সেন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

বিজয়সেন প্রায় ৬২ বছর রাজত্ব করেন, রাজত্বকালের শেষ দিকে তিনি কলিঙ্গ ও কামরূপ অঞ্চল ও জয় করেন।

কলিঙ্গে তখন রাঘববর্মন চোড়গঙ্গ রাজত্ব করছিলেন, তিনি বিজয়সেন এর সাথে নিজ পিতার সন্ধি ও মিত্রতা ভুলে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন। তখন যুবরাজ বল্লাল সেন এর নেতৃত্বে গৌড়ীয় সেনা কলিঙ্গ আক্রমণ করে ও অধিকার করে নেয়।

কামরূপ জয়কালে হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ করে গৌড়ীয় সেনার সেনাপতিত্ব করেন সম্রাট বিজয়সেন এর সপ্তদশ বর্ষীয় পৌত্র লক্ষ্মণ সেন। কামরূপ এ সম্ভবত রাজা বৈদ্যদেব এর কোন এক উত্তরাধিকারী কে পরাজিত করেন।

“অদ্ভুতসাগর” গ্রন্থ অনুসারে বল্লাল সেন তাঁর পিতার রাজত্বকালে ই সেনাপতি হিসেবে মিথিলা জয় করেন ও নান্যদেব কে পরাজিত করে তাকে সেন সাম্রাজ্যের সামন্ত হিসেবে রাখেন।

সম্রাট বিজয়সেন এক বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি ও শাসন করেন দীর্ঘকাল। তিনি অত্যন্ত সুশাসক রূপে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ছয় দশকের শাসন শেষে তাঁর পুত্র সম্রাট বল্লাল সেন সিংহাসনে আরোহণ করেন।

 

🟠 সম্রাট বল্লাল সেন:-

পরমশৈব পরমভট্টারক অরিরাজ নিশঙ্ক শঙ্কর গৌড়েশ্বর মহারাজাধিরাজ বল্লাল সেন তাঁর পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন। সিংহাসন আরোহণ কালে তিনি যথেষ্ট বয়স্ক ছিলেন এবং ১৯ বছর রাজত্ব করেন।

পিতার সেনাপতি হিসেবে তিনি মিথিলা জয় করেন এবং পরবর্তী কালে মগধ জয় ও করেন। তিনি নিজের পিতার ন্যায় শৈব ছিলেন। তবে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে পরমভক্ত শাক্তসাধক ছিলেন । বরেন্দ্রভূমে গৌড়চণ্ডী বা জহুরাকালী মন্দির ও রাঢ়ভূমে রাঢ়শ্বর দেউল শিবমন্দির তাঁর অনন্য নির্মাণ । এছাড়াও তিনি বারেন্দ্র অঞ্চলে নিজ শাসন কে আরও শক্তিশালী করে তোলেন।

বল্লাল সেন এর স্ত্রী ছিলেন রামাদেবী, একজন চালুক্য বংশীয় রাজকন্যা। এর থেকে প্রমাণ হয় যে চালুক্য দের সাথে সেন রাজবংশের সুসম্পর্ক বজায় ছিল ।

অত্যন্ত কম সময় রাজত্ব করলেও বল্লাল সেন এক সুশাসন গড়ে তোলেন। পুত্র লক্ষ্মণসেনের জন্মকাল থেকে তিনি নতুন বৎসর লক্ষ্মনাব্দ বা লক্ষ্মণ সংবৎ প্রচলন করেন যা মিথিলা অঞ্চলে আজও প্রচলিত । সম্রাট বল্লাল সেন অত্যন্ত সাহিত্যানুরাগী ছিলেন, নিজে কবিও ছিলেন। তাঁর লেখা “দানসাগর” ও “অদ্ভুতসাগর” গ্রন্থ তাঁর লেখক হিসেবে ক্ষমতার পরিচয় দেয়।

বৃদ্ধ বয়সে তিনি রাজত্ব নিজ পুত্র সম্রাট লক্ষ্মণ সেন এর হাতে দিয়ে দেন।

 

🟠সম্রাট লক্ষ্মণ সেন:-

ধর্মগুরু পরমভট্টারক অরিরাজ মদন শঙ্কর পরমনরসিংহ গৌড়েশ্বর মহারাজাধিরাজ লক্ষ্মণ সেন নিঃসন্দেহে সেন সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি, দিগ্বিজয়ী বীর এবং মহান শাসক।

গঙ্গাতীরে তরবারি চালনা শিখে ও বিক্রমপুরে হস্তীপৃষ্ঠে যুদ্ধ চালনা শিখে মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি নিজ পিতামহ বিজয়সেন এর হয়ে কামরূপ জয় করেন। পিতামহ ও পিতার সেনাপতি রূপে কামরূপ, কলিঙ্গ, মগধ, গয়া, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, কনৌজ প্রমুখ বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

তাঁর সম্বন্ধে একটি শ্লোকে বলা হয়-

 ভ্রূক্ষেপাদ্ গৌড়লক্ষ্মীং জয়তি বিজয়তে কেলিমাত্রাৎ কলিঙ্গান্

চেতশ্চেদিক্ষিতীন্দোস্তপতি বিতপতে সূর্যবৎ দুর্জনেষু

স্বেচ্ছাম্লেচ্ছান্ বিনাশং নয়তি বিনয়তে কামরূপাভিমানম্

কাশীভর্তুঃ প্রকাশং হরতি বিহরতে মুর্ধ্নি যো মাগধস্য।।

শরণ রচিত শ্লোকটির বঙ্গানুবাদ এইরকম:

তিনি(লক্ষ্মণসেন) ভ্রুক্ষেপমাত্রে গৌড়লক্ষ্মীকে জয় করেন; শুধুমাত্র কেলির দ্বারা কলিঙ্গ বিজয় করেন। তিনি চেদীরাজের চিত্তপীড়ার কারণ।  দুর্জনের জন্য তিনি  প্রখর সূর্যস্বরূপ। স্বেচ্ছায় ম্লেচ্ছবিনাশ করেন; কামরূপের অভিমান খর্ব করে তাকে বিনয়ী করেন। কাশীরাজের যশের প্রকাশ হরণ করে মগধরাজের মস্তকে বিহার করেন।

সম্রাট লক্ষ্মণ সেন ছিলেন উগ্র মাধব নৃসিংহ এর পূজারী এবং তাঁর নেতৃত্বে “রাধামাধর্বোজয়ন্তী” যুদ্ধ ধ্বনি তে রণমত্ত বাঙালি সেনাবাহিনী সমগ্র উত্তর ভারত অধিকার করে নেয়।

সম্রাট লক্ষ্মণ সেন “মারাঙ্কমল্লদেব” উপাধি গ্রহণ করেন।

মহাপরাক্রমশালী দিগ্বিজয়ী হয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুশাসক, প্রজাদের কষ্টে সর্বদা সাহায্য করতেন। এছাড়াও নিজ পিতার ন্যায় সাহিত্যানুরাগী এবং কবি ছিলেন। উমাপতি ধর, শরণ এর মত পন্ডিত ও কবিরা তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করতেন। তিনি “লক্ষ্মণাব্দ” প্রবর্তন করেন যা প্রায় ৪০০ বছর কার্যকর ছিল।

কিন্তু মহাপরাক্রমশালী মহাবীর হওয়া সত্ত্বেও উনিশ শতকের কিছু বিকৃত পত্রিকার দ্বারা মিথ্যে প্ররোচনায় অত্যন্ত অন্যায়ভাবে মহারাজের চরিত্রহণন করা হয় যে সম্রাট লক্ষ্মণ সেন নাকি ভীতু কাপুরুষ ছিলেন, বখতিয়ারের সতেরোজন অশ্বারোহী নিয়ে আক্রমণ দেখে তিনি ভয়ে পালিয়ে যান ও সমগ্র বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, যা একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ও অপব্যাখ্যা। বাস্তবে সম্রাট লক্ষ্মণ সেন বখতিয়ার খিলজিকে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত করে পালাতে বাধ্য করেন ।

ঘটনাটি প্রকৃতপক্ষে অন্য:-

এই মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ভ্রান্ত গল্পটি প্রথম বলেন মিনহাজ উস সিরাজ, যিনি ১২৪৪ সালে প্রথম বাংলায় আসেন, বখতিয়ারের আক্রমণের প্রায় ৪২ বছর পর এবং ১২৬০ এ নিজের বই “তওকত ই নাসিরি” তে এই মিথ্যা গল্প লেখেন। যদিও সেখানেই তিনি আবার বখতিয়ারের আক্রমনের ৬০ বছর পরেও সমগ্র বাঙ্গালতেই সেনবংশের শাসন প্রত্যেক রাজাদের নামসহ লিপিবদ্ধ করেছেন ।

১২০৩ সালে নদীয়া আক্রমণের আগে কাঁকসা আক্রমণ করে বখতিয়ার এবং সেন সামন্ত কঙ্ক সেন রায় কে ছল করে পরাজিত করে। এরপর প্রায় ৫০,০০০ সৈন্যসহ বখতিয়ার নদীয়া আক্রমণ করে, এর পূর্বেই পুন্ড্রবর্ধনের কিছু এলাকা ও ধ্বংস করেছিল বখতিয়ার। বখতিয়ারের নদীয়া আক্রমণ কালে লক্ষ্মণ সেন নদীয়ার একটি সাধারণ বাড়িতে বিশ্রাম করছিলেন। তখন কোন সেনাবাহিনী ছিল না, তাঁর সাথে শুধুমাত্র কিছু দেহরক্ষী ও জেষ্ঠ্যপুত্র যুবরাজ মাধবসেন ছিলেন। এই অবস্থায় হঠাৎ বখতিয়ার আক্রমণ করে, তখন দেহরক্ষী দের নিয়ে যুবরাজ মাধব সেন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং লক্ষ্মণ সেন চলে আসেন নিজ রাজধানী বিক্রমপুর এ।

বিক্রমপুর থেকে নিজপুত্র তথা সেনাধ্যক্ষ বিশ্বরূপ সেন কে নিয়ে এক বিশাল হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ করেন এবং মহাবলী দিগ্বিজয়ী গৌড়ীয় বাহিনী কে নিয়ে বখতিয়ারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান।

গৌড়ীয় সেনা বখতিয়ারের সেনাবাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং ম্লেচ্ছ সংহারে মেতে ওঠে। বঙ্গের ঘনাঘন হাতীর আঘাতে পদপিষ্ট হতে থাকে তুর্কিরা।

শান্ত, ধীমতি লক্ষ্মণ সেন আবার হয়ে ওঠেন দিগ্বিজয়ী গজারূঢ় মারাঙ্কমল্লদেব। নিজে হাতির পিঠে চেপে তির দিয়ে আহত করেন বখতিয়ার কে এবং বখতিয়ার “অস্ত্র, অস্ত্র” বলে চিৎকার করতে থাকে।

উমাপতি ধর লিখেছেন:-

সাধু ম্লেচ্ছ নরেন্দ্র সাধু ভবতো মাতৈব বীরপ্রসূর্-

নীচেনাপি ভবদ্বিধেন বসুধা সুক্ষত্রিয়া বর্ততে

দেবো কূট্যতি বস্য বৈরিপরিযম্মারাঙ্কমল্লে পুরঃ

শস্ত্র শস্ত্রমিতি স্ফুরতি রসনাপত্রান্তরালে গিরঃ।।

এরপর কোনক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে বখতিয়ার বিহার পালিয়ে যায়।

সম্রাট লক্ষ্মণ সেন কর্তৃক বখতিয়ারের পরাজয়ের কথা প্রথম লেখেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নিহাররঞ্জন রায় মহাশয়।

এর স্বপক্ষে আরও বলা যায়:-

১. সম্রাট লক্ষ্মণ সেন এর মৃত্যুর পর তাঁর তিন পুত্র মাধব, বিশ্বরূপ ও কেশব সেন এবং পৌত্র সূর্য সেন, প্রপৌত্র মধুসেন স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করেন এবং বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করেন।

২. গৌড়েশ্বর মধুসুদনসেন বুদ্ধগয়া পুনরুদ্ধারের সময় তাঁর সামন্ত অশোকচাল্লা দেব এর শিলালিপি তে “লক্ষ্মণসেনদেবপাদানংবতীতরাজ্যে” শব্দটি র উল্লেখ পাওয়া যায়।

উপরোক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে আমরা বলতেই পারি যে সম্রাট লক্ষ্মণ সেন বখতিয়ার কে পরাজিত করেন।

এই ঘটনার তিনবছর পর বৃদ্ধ বয়সে তিনি প্রাণত্যাগ করেন এবং তাঁর তিন পুত্র রাজ্যশাসন করতে থাকেন।

 

🟠 সম্রাট বিশ্বরূপ সেন:-

লক্ষ্মণসেনের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য তিনভাগে তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়:-

জেষ্ঠ্যপুত্র মাধব সেন বারেন্দ্রভূমের শাসক

মধ্যম পুত্র বিশ্বরূপ সেন বঙ্গ অঞ্চলের শাসক হন

কনিষ্ঠ পুত্র কেশব সেন রাঢ় অঞ্চলের শাসক হন

 

তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র বিশ্বরূপ সেন ছিলেন সর্বাপেক্ষা পরাক্রমশালী এবং নিজ পিতার ন্যায় ক্ষমতাবান।

বিশ্বরূপ সেন এর সবথেকে বড় কৃতিত্ব হল বারাণসী পুনরূদ্ধার। ১২১২ সালে মাধব সেন এর সেনাধ্যক্ষ হিসেবে বিশ্বরূপ সেন বারাণসী ধাম কে যবনদের কবলমুক্ত করতে যুদ্ধযাত্রা করেন। এক প্রবল যুদ্ধে বাংলার সেনা যবনদের পরাস্ত করে বিশ্বরূপ সেন কাশীতে বিজয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেন এবং কাশীকে শিব-বিশ্বেশ্বর এর পূণ্যভূমি বলে ঘোষণা করেন।

পরবর্তীতে স্বাধীন ভাবে শাসনকালে ১২৩০ নাগাদ দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ এর অধীনে লখনৌতির শাসক সাইফুদ্দিন আইবক পূর্ববঙ্গ আক্রমণ করে। কিন্তু প্রবলপ্রতাপী বিশ্বরূপ সেন এর নেতৃত্বে এক বিশাল নৌবাহিনী তুর্কি দের বাজেভাবে পরাস্ত করে।

এরপর বিশ্বরূপ সেন “সগর্গযবনান্বয়প্রলয়কালরুদ্র” উপাধি ধারণ করেন।

অন্যদিকে ১২১৫ নাগাদ কেশব সেন এর রাজধানী রাজনগর কে ছল করে দখল করে নেয় যবনরা।

১২৪৪ সালে রাঢ়ের সমস্ত রাজন্যবর্গের সাথে বিশ্বরূপ সেন ও তাঁর পুত্র সূর্যসেন সামন্তরাজা উত্তর হামীর রায় এর নেতৃত্বে রাজনগরের লখনৌর দুর্গ পুনর্দখলের অভিযান চালান এবং খিলজি দের পরাজিত করে রাজনগর পুনর্দখলে সক্ষম হন।

এই সময়ে ইজউদ্দিন খিলজি পূর্ববঙ্গ আক্রমণ করে। বিশ্বরূপ সেন এর সামন্ত রামনাথ দেব তখন এক বৃহৎ কৈবর্ত নৌবাহিনী নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

চারদিক থেকে খিলজি দের ঘিরে বাণ ও অগ্নিবর্ষণ চলতে থাকে। পরাজিত খিলজি পালিয়ে দিল্লি চলে যায়।

এই যুদ্ধের কয়েক বছর পর বিশ্বরূপ সেন দেহত্যাগ করেন এবং তাঁর পুত্র সূর্যসেন রাজা হন।

সূর্যসেন তাঁর পিতার বঙ্গ অঞ্চলের রাজত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হন।

এরপর সিংহাসনে বসেন পরমসৌগত মধুসূদন সেন, তিনি তথাগত বুদ্ধের ভক্ত ছিলেন এবং গৌড় পুনরূদ্ধার করেন এবং তারপর বুদ্ধগয়া, নালন্দা জয় করেন। মধুসেন এর সামন্ত অশোকচল্ল দেব এর উৎকীর্ণ এই সময়ের বুদ্ধগয়ার শিলালিপি তেই “লক্ষ্মণসেনদেবপাদানংবতীতরাজ্যে” শব্দটি র উল্লেখ পাই আমরা, যা লক্ষ্মণসেনের বখতিয়ারের বিরুদ্ধে জয়ের কথা সত্য বলে প্রমাণ করে।

মধুসেন এর পর সেন রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বরূপ সেন এর সামন্ত রামনাথ দেব “দনুজমর্দনদেব” উপাধি নিয়ে দেব বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

 

বাঙালির শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের ইতিহাসের প্রাথমিক অংশের চর্চা থেকে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে বাঙালি নৃপতি তথা বাঙালিরা বারবার বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং সাম্রাজ্য বিস্তার তথা ধর্মস্থাপনায় বারবার অস্ত্র তুলে নিয়েছেন এবং স্বীয় ক্ষমতায় জয়লাভ করেছেন।

 

(লেখক পরিচিতি: পদার্থবিদ্যা স্নাতক, সঠিক ইতিহাস সন্ধানী ও প্রচারক, চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী, শক্তিচর্চায় নিবেদিত এক বাঙালি যুবক)

(সমাপ্ত)

Leave a Reply