স্বভূমি ও সমকাল

মারাঠা ইতিহাসের রক্তাক্ত ক্রান্তিকালে – ৩

(দ্বিতীয় পর্বের পর) 

পানিপথ যুদ্ধের পর মারাঠা সর্দার দের অবস্থা সম্পর্কে আগের পর্বগুলোতে লিখেছি। কিন্তু পানিপথ পরবর্তী মারাঠা দের অবস্থা কিরকম ছিল? মারাঠা সাম্রাজ্যের বিসর্জন কি পানিপথের সাথেই হয়ে গেছিল? ঐতিহাসিকরা কিন্তু এমনটা মনে করেন না। পানিপথ মারাঠা দের দুর্বল করেছিল, ব্রিটিশ দের ভারতবর্ষ শাসনের পথ প্রশস্ত করেছিল , ঠিক কথাই। কিন্তু মারাঠা সাম্রাজ্য.. সিন্ধ এর আটক থেকে পূর্বে কটক অবধি যার বিস্তৃতি ছিল?সেই বিশাল সাম্রাজ্যের কি হলো? পানিপথ যুদ্ধের অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানেই বালাজি বাজিরাও এর মৃত্যু ঘটে… মারাঠাদের শোচনীয় পরাজয় এবং সেই গ্লানি বালাজি বাজিরাওয়ের পক্ষে অসহনীয় ছিল এ কথা সহজেই অনুমেয়।

মৃত পেশোয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান বিশ্বাস রাও ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন পানিপথের ময়দানে। পরবর্তী পেশোয়া হলেন মাধব রাও ।মাত্র ষোল বছর বয়স তখন তাঁর। মারাঠা অন্দরমহলে তখন নৈরাশ্য হতাশা আর অবিশ্বাসের বাতাবরন। পেশোয়ার সহোদর রঘুনাথ রাও পেশোয়া হওয়ার সমস্ত চেস্টাই করে চলেছেন। দক্ষিণে নিজাম মারাঠা দের চোখ রাঙাচ্ছে বেশ কিছু এলাকাও দখল করেছে… এই চরম বিপদের দিনে হিন্দু পদপদ শাহীর স্বপ্ন তখন নিমজ্জমান …। কথায় বলে… “hard times create strong man” এমন কঠিন সময়ে মাত্র ষোল বছরের পেশোয়া মাধবরাও মারাঠা সাম্রাজ্য কে যেন নতুন জীবন দান করলেন।

উত্তরে মারাতাহ সাম্রাজ্যের ভীত পুনরায় মজবুত করার শ্রেয় যদি কাউকে দিতে হয় তাহলে সেটা মাহাদজি সিন্ধিয়া।

পানিপথের ময়দানে পুরো পরিবারকে হারিয়েছিলেন এবং নিজে সাংঘাতিক আহত হয়েছিলেন। শোনা যায় আহত অবস্থাতেই আবদলির সহযোগীদের ওপর চরম প্রতিশোধ নেয়ার পণ নিয়েছিলেন তিনি। মাহাদজি সিন্ধিয়া যখন রোহিলখন্ড আক্রমণ করেন তখন রোহিলখণ্ডে , রোহিল্লা আফগান জাবিতা খানের রাজত্ব… এই জাবিতা খান হচ্ছে সেই নাজিব খানের পুত্র। সেই নাজিব খান যিনি মারাঠা হিন্দু “কাফের” দের হারাতে আবদালি কে সমস্ত রকম সাহায্য করেছিলেন। ১৭৭২ সালে ..পানিপথের ঠিক ১১ বছর পর মাহাদজি সিন্ধিয়া রোহিলখণ্ডে আক্রমন করেন… এই যুদ্ধের ফলাফল বলাই বাহুল্য , রোহিলখণ্ড যে শুধুমাত্র পর্যুদস্ত হয় তাই নয়, মৃত নাজিবের কবর খুঁড়ে তার দেহাবশেষ পর্যন্ত সিন্ধিয়া বাহিনী আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।

রোহিলখণ্ডের আফগানদের সিংহভাগ এই যুদ্ধের পরেই রোহিলখন্ড ত্যাগ করে। এ ছাড়াও ১৭৭১ এ পুনরায় মারাঠারা দিল্লি দখল করে এবং শাহ আলম দ্বিতীয়কে সিংহাসনে বসায়। অতএব, এ কথা সহজেই অনুমেয় যে পানিপথের মাত্র ১১ বছরের মধ্যেই মারাঠা রা সমগ্র ভারতে নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল। কিন্তু ক্ষতি হয়েছিল অন্য ক্ষেত্রে…পানিপথে মারাঠাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ফলে পেশোয়া বংশের বহু প্রাণ অকালে ঝরে যায়.. মাধবরাও এর পরে মারাঠা সাম্রাজ্য সামলানোর মতন বিচক্ষণ নেতৃত্ব আর ছিল না। নারায়ণ রায়ের বয়স তখন সবে মাত্র ১৭ বছর । মাধবরাও এর মৃত্য ঘটে ১৭৭২ সালে টিবি তে। সেই সকল টিবির চিকিৎসা বিশেষ ছিল না… কিন্তু মাত্র ১১ বছরের শাসনকালে মাধবরাও মারাঠা সাম্রাজ্য কে তাদের হারানো গরিমা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন.. অনেক ঐতিহাসিক রা বলে থাকেন মারাঠা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পরাজয় মোটেই পানিপথ নয় …বরঞ্চ মাধবরাও এর মৃত্যু..। মাধবরাও এর মৃত্যুর সাথে সাথেই মারাঠাদের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছিল… সাম্রাজ্যে তখন চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব.. ১৭৭২ থেকে ১৭৭৩ অবধি কিশোর নারায়ণ রাও রাজ্যপাট সামলালেও ,সাম্রাজ্যের মূল মস্তিষ্ক ছিলেন নানা ফড়নবিস। 

মাধবরাওয়ের অত্যন্ত কাছের মানুষ এবং সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। পানিপথের পরে মারাঠাদের উত্থানের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয় এবং উল্লেখযোগ্য।

মারাঠা সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক টা পরে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে…শনিবারওয়ারার অন্দরমহলে নারায়ণ রাওয়ের মৃত্যুতে। রঘুনাথ রাও ও বেশ কিছু মারাঠা সর্দারের ষড়যন্ত্রে খুন হন বালাজি বাজিরাওয়ের কনিষ্ঠ সন্তান… ইংরেজী তে যাকে বলে” folklore” সেই “folklore” অনুযায়ী যেই রাতে নারায়ন রাও খুন হন সেই রাতে তার কাতর আর্তি ছিল “কাকা মালা বাঁচওয়া ” অর্থাৎ “কাকা আমাকে বাঁচাও ” ..হতভাগ্য নারায়ণ রাও বোধহয় জানতেন না তার কাকাই এই জঘন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন…।
এর পর মারাঠা দের ইতিহাস পরাজয়ের ও গ্লানির। তিনটি “Anglo Maratha” যুদ্ধ মারাঠাদের কোমর ভেঙে দেয় সেও আরেক ইতিহাস ….।

কালের নিয়মে হিন্দু স্বরাজের স্বপ্ন মিশে থাকা একটি সাম্রাজ্য যা প্রায় ১০০ বছর ভারতের ভাগ্যনিয়ন্তা ছিল ,যা কিনা ভারতের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হিন্দু শাসন কে ফিরিয়ে এনেছিল সেই সাম্রাজ্য আবার কালের গহ্বরেই নিমজ্জিত হয় শুধু, সাহায়দ্রির কোনো অনামী পাহাড় চুড়োর কোনো এক শিবমন্দিরে.. শিবলিঙ্গের সামনে এক তরুণ মারাঠা জায়গীরদারের হিন্দু স্বরাজের জন্য , ধর্ম রক্ষার জন্য করা শপথ টা রয়ে যায়… এখনো সেখানে কলরব ওঠে … জয় ভবানী….জয় শিবাজী… । এখনো… তিনকোনা গেরুয়া ঝান্ডার সামনে সাদা ঘোড়ায় চড়ে একজন তেজোদ্দীপ্ত শক্তিশালী রাজা এক হাতে খাপ খোলা তলোয়ার হাতে জয়ধ্বনি দেন …..হর হর ….মহাদেব।

(সমাপ্ত) 

(Picture courtesy: Utkarsh Rai) 

Leave a Reply