তর্পণে প্রণত মসীস্বভূমি ও সমকাল

ঊনিশ শতকীয় বঙ্গীয় সমাজ ও শ্রীঅরবিন্দের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট

সমগ্র ঊনিশ শতক-ই বাংলার ইতিহাসে ‘রত্নগর্ভার শতক’ রূপে একটি প্রাতঃস্মরণীয় ও অত‍্যুজ্জ্বল অধ‍্যায়ের সূচনাকাল হিসাবে দিকচিহ্নস্বরূপ দন্ডায়মান। সাহিত্য, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ধর্ম, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, বানিজ‍্য ইত‍্যাদি আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে আলোক বিচ্ছুরণকারী প্রভূত মার্গ দার্শনিকের মহান আবির্ভাব আধুনিক বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস-কে গৌরবান্বিত ঘটনার অংশীদার করেছে। বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এর রেশ প্রবলভাবে বিরাজমান ছিল। এখন খুব সঙ্গত কারণেই একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, ঊনিশ শতকীয় এই সামাজিক পরিমণ্ডল কিভাবে অসংখ্য মনিষীর উদ্ভবের দ‍্যোতনা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল? মহর্ষি অরবিন্দের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট হিসাবে ‘ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া’-র কিছু ঘটনার উল্লেখ আমাদের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা ও কার্যকারণ সম্পর্ক অনুধাবনে সহায়তা করবে। স‍্যার আইজ‍্যাক নিউটন(জানুয়ারি ৪, ১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দ–মার্চ ৩১, ১৭২৭, যদিও জন্মমৃত‍্যুর তারিখ বিষয়ে মতদ্বৈধতা আছে)-এর পদার্থবিদ‍্যার তৃতীয় সূত্র কিভাবে সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, তার প্রকৃষ্ট নিদর্শন হোল, ঊনিশ শতকীয় বঙ্গীয় সমাজের মধ‍্যেকার নানান দ্বান্দ্বিক অবস্থান, অগ্রগতি ও তার প্রতিকার সাধন প্রচেষ্টা।

শ্রীঅরবিন্দ ছিলেন রাজনারায়ণ বসু(জন্ম-সেপ্টেম্বর ৭, ১৮২৬, তিরোধান-সেপ্টেম্বর ১৮, ১৮৯৯)-র দৌহিত্র। তাঁর মাতা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন রাজনারায়ণের কন্যা। তাঁর স্বনামধন‍্য চিকিৎসক পিতা কৃষ্ণধন ঘোষের কথা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। শ্রীঅরবিন্দের আধ‍্যাত্মিক অনুষঙ্গের পশ্চাতে রাজনারায়ণ বসুর একটা বিরাট অবদান লক্ষ্য করা যায়। রাজনারায়ণ হিন্দু কলেজে অধ‍্যয়নের সূত্রে প্রথম জীবনে ‘Derozio Syndrome’-এর শিকার হন। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর, ইউরোপীয় ভাবাদর্শের আচার্য স‍্যার হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (জন্ম-এপ্রিল ১৮, ১৮০৯, তিরোধান- ডিসেম্বর ২৬, ১৮৩১, মাত্র বাইশ বছর বয়সে)-র ছিল ছাত্র আকর্ষণের অসীম সম্মোহনী বিদ‍্যা। শিক্ষক নবীন, প্রায় সমবয়সী গুণমুগ্ধ ছাত্রের দলও নবীনতার জয়গানে মুখর। সুতরাং, সমাজ-সংস্কৃতির খরস্রোতা নদী তো বেগবান হবেই। ‘আপন বেগে পাগল পারা’ হয়ে ডিরোজিয়ানগণ সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির উৎকর্ষের দিকগুলিকে অবহেলা করে শুধুমাত্র প্রচলিত জড় বিষয়গুলিকে সামনে এনে আলেয়া সদৃশ বিচ্ছুরণে বঙ্গীয় সমাজ জীবনে প্রভাব ফেলতে অতি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। সব কালে, সব সমাজে ‘evil practices’ থাকেই। শত সহস্র বছর ধরে প্রবহমান বিশ্বের আদি সভ‍্যতাকে আক্রমণের জন‍্য এঁরা বেছে নিলেন জাতিভেদ, অস্পৃশ‍্যতা ও অন‍্যান‍্য কিছু সামাজিক গোঁড়ামির মতো অশাস্ত্রীয় আচরণ বিধি, প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রসমূহ-ও যেগুলির নিন্দায় পঞ্চমুখ ছিল।

পশ্চিমী ভাবাদর্শের প্রতি এঁরা এতই রোমান্টিক ছিলেন, সনাতন ভারতীয় ভাবাদর্শের বিষয়ে তথ‍্য-সন্ধানের কোন প্রয়োজন বোধ করেননি। তবে একথা স্বীকার না করলে সত‍্যের অপলাপ হবে যে, এঁদের দেশভক্তি ও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান ছিল প্রশ্নাতীত। কিশোরী।চাঁদ মিত্র(১৮২২-১৮৭৩), রামতনু লাহিড়ী(১৮১৩-১৮৯৮), রাধানাথ শিকদার(১৮১৩-১৮৭০), শিবচন্দ্র দেব(১৮১১-১৮৯০), হরচন্দ্র ঘোষ(১৮০৮-১৮৬৮), কাশীপ্রসাদ ঘোষ(১৮০৪-১৮৭৩), রসিককৃষ্ণ মল্লিক(১৮১০-১৮৫৮), দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ‍্যায়(১৮১৪-১৮৭৮), প‍্যারীচাঁদ মিত্র(১৮১৪-১৮৮৩) রামগোপাল ঘোষ(১৮১৫-১৮৬৮)প্রমুখ ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে গতির সঞ্চার করার জন‍্য যে নৈতিক পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টায় সামিল হয়েছিলেন, তার রশদ তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন পশ্চিমী ভোগবাদী সংস্কৃতির গর্ভগৃহ থেকে।’শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস‍্য পুত্রাঃ’ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আত্ম পরিচয় সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে পশ্চিমী সংস্কৃতির প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত‍্যে আত্মসমর্পণ করলেন। সামাজিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে যে মদমত্ত উল্লাসে তাঁরা উত্তুঙ্গু প্রলয়নৃত‍্য করেছিলেন, তাতে তাঁদের মূল লক্ষ‍্যই বিচ‍্যুত হয়ে গিয়েছিল। সমাজ শোধরানোর যে দায় আপন দায়িত্বে তাঁরা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তাঁদের আক্রমণাত্মক উৎশৃংখলতার কারণে বৃহত্তর জনমানসে নিজেরাই এক-একজন ‘দায়’ হয়ে উঠেছিলেন। সেই জন‍্য কোলকাতার বাইরে এঁদের আবেদন বৃহত্তর ভারতীয় সমাজের মান‍্যতা ও সমীহ আদায় করতে ব‍্যর্থ হয়। সেজন্য পরবর্তীকালে অনেকেই সনাতন ধর্মের আপন আলয়ে প্রত‍্যাবর্তন করে জীবনের অবশিষ্টাংশ অতিবাহিত করেন। শ্রীঅরবিন্দের মাতামহ রাজনারায়ণ বসুও প্রথম জীবনে ডিরোজিও-র প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লেও প্রৌঢ় বয়সে সুমহান ভারতীয় সংস্কৃতির বিজয় কেতন তুলে ধরার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রণিপাত করেন।

রাজনারায়ণ বসু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’-তে লেখেন,”ছেলেবেলায় রাজনারায়ণবাবুর সঙ্গে যখন আমাদের পরিচয় ছিল তখন সকল দিক হইতে তাঁহাকে বুঝিবার শক্তি আমাদের ছিল না। তাঁহার মধ‍্যে নানা বৈপরীত্যের সমাবেশ ঘটিয়াছিল। তখনই তাঁহার চুল দাড়ি প্রায় সম্পূর্ণ পাকিয়াছে কিন্তু আমাদের দলের মধ্যে বয়সে সকলের চেয়ে যে-ব‍্যক্তি ছোটো তাহার সঙ্গেও তাঁহার বয়সের কোনো অনৈক্য ছিল না।তাঁহার বাহিরের প্রবীণতা শুভ্র মোড়কটির মতো হইয়া তাঁহার অন্তরের নবীনতাকে চিরদিন তাজা করিয়া রাখিয়া দিয়াছিল। এমন-কি, প্রচুর পাণ্ডিত্যেও তাঁহার কোনো ক্ষতি করিতে পারে নাই, তিনি একেবারেই সহজ মানুষটির মতোই ছিলেন।… একদিকে তিনি আপনার জীবন এবং সংসারটিকে ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ নিবেদন করিয়া দিয়াছিলেন, আর- একদিকে দেশের উন্নতি সাধন করিবার জন্য তিনি সর্বদাই কত রকম সাধ‍্য ও অসাধ‍্য প্ল‍্যান করিতেন তাহার আর অন্ত নাই।…দেশের সমস্ত খর্বতা দীনতা অপমানকে তিনি দগ্ধ করিয়া ফেলিতে চাহিতেন।… এই ভগবদ্ ভক্ত চির বালকটির তেজঃপ্রদীপ্ত হাস‍্যমধুর জীবন, রোগে শোকে অপরিম্লান তাঁহার পবিত্র নবীনতা, আমাদের দেশের স্মৃতিভাণ্ডারে সমাদরের সহিত রক্ষা করিবার সামগ্রী তাহাতে সন্দেহ নাই”। সুতরাং, বিশ্বকবি বর্ণিত ‘বৈপরিত‍্যের সমাবেশ’ শ্রীঅরবিন্দের চরিত্রের মধ‍্যেও প্রকট হয়েছিল।

রাজনারায়ণ বসুও প্রথম জীবনে পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চা তথা দর্শন চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু সেই চর্চায় তিনি ‘প্রাণের আরাম’ পান নি বলেই পরবর্তী জীবনে ভারততত্ত্ববিদ‍্যা (Indology)-তে কায়মনোবাক‍্য হন। এখানে দৌহিত্র শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত সাদৃশ্য। পিতামহ নবীন বয়সে তৎকালে প্রচলিত নানান অসাঞ্জস‍্যপূর্ণ আচার ও প্রথার বিরুদ্ধে ভীম বিক্রমে অগ্রসর হয়েছিলেন ডিরোজিও-র প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে; দৌহিত্র একই শতকের একেবারে শেষ দিকে মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনের জন‍্য ক্ষাত্রতেজে প্রজ্জ্বলিত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ডিরোজিয়ানদের “সাধারণ ধর্ম ছিল মানবাতাবাদী দৃষ্টিকোন থেকে গোঁড়া হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে ধিক্কার। এঁদের বৈশেষিক লক্ষণ হোল–(ক) বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এঁরা নিউটন ও ডেভি-র অনুগামী, (খ) ধর্মের ক্ষেত্রে এঁরা হিউম ও টমাস পেইনের ভক্ত, (গ) রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে এঁরা অ‍্যাডাম স্মিথ, জেরেমি বেন্থাম, টমাস পেইন প্রমুখ দ্বারা প্রভাবিত, (ঘ) অধিবিদ‍্যা বা সাধারণ ধর্মশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এঁরা লক, রীড, স্টুয়ার্ট, ব্রাউন প্রমুখের দ্বারা প্রভাবিত।” (উৎস: ডিরোজিও ও ডিরোজিয়ানস্, অমর দত্ত, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০২, পৃষ্ঠা-৪১, প্রথম প্রকাশ,১৯৭৩,ভূমিকা-ভাষাচার্য সুকুমার সেন)

উল্লিখিত বিদ‍্যাচর্চায় ভারততত্ত্বের কোন স্থানই ছিল না। শত-সহস্র কালের ভারতীয় জ্ঞানের আকর গ্রন্থগুলি অবহেলার শিকার হয়ে একপাশে পড়ে রইল। অথচ ইউরোপের দেশগুলির তখন সৃষ্টিই হয়নি! ইতিহাস জানায়, ৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ভার্দুনের চুক্তিতে ফ্রান্স ও জার্মানি নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। এই সময় জীবন ধারণের জন্য আধুনিক ইউরোপের বহু দেশ দস‍্যুতাবৃত্তির দ্বারা জীবন ধারণ করতো। আমরা পৃথিবীর বিস্তির্ণ অঞ্চলে ম‍্যাগিয়ার, স‍্যারাসেন, ভাইকিং প্রভৃতি জাতির দস‍্যুতা বৃত্তির ইতিহাস জানি। আর সেই সময়েই ভারতের প্রাচীন রাজবংশগুলির নেতৃত্বে এই দেশ একটি সুষ্ঠু সামাজিক ব‍্যবস্থা ও শান্তির ললিতবাণীর পথে অগ্রসর হয়েছিল। আর বৃহত্তর ইউরোপ ‘খাবারের সন্ধানে’ জান্তব জীবনধারার হিংসাত্মক পথে সামিল হয়েছিল। অথচ ঊনিশ শতকের ডিরোজিও-র ছাত্রদল বেমালুম তা বিস্মৃত হয়ে দেশের মুক্তিসাধনার পথে অগ্রসর হলেন! এই মস্ত ফাঁকি পরবর্তীকালে যাঁরা উপলব্ধি করেন, তাদের মধ‍্যে অগ্রগণ‍্য হলেন–রাজনারায়ণ বসু ও তাঁর সুযোগ‍্য দৌহিত্র শ্রী অরবিন্দ ঘোষ।

(ক্রমশ)

Leave a Reply