তর্পণে প্রণত মসী

অগ্নিযুগের ব্রহ্মা: যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

১৮৭৭ সনে ১৯ শে নভেম্বর (৫ই অগ্ৰহায়ণ, ১২৮৪ বঙ্গাব্দ) ব্রিটিশ ভারতে বর্ধমান জেলার চান্না গ্ৰামে (গলসি থানার অন্তর্গত, বর্তমান পূর্ব বর্ধমান জেলার একটি ছোট্ট গ্ৰাম) এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্ৰহণ করেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে তিনি স্বামী নিরালম্ব রূপে খ্যাতি লাভ করেন। পিতা কালিদাস বন্দোপাধ্যায় ছিলেন অবিভক্ত বাংলার খুলনা/যশোহরের জজকোর্টের পেশকার এবং মাতা হলেন অসম্ভাবিনী দেবী। গ্ৰামের পাঠশালাতেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বর্ধমান শহরে এসে তিনি বর্ধমান রাজ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন এবং পরবর্তীতে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে এফ. এ. (First Arts) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করার পরেই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ পড়ে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি দেশ-মাতৃকার মুক্তি সংগ্ৰামের উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করার সঙ্কল্প নেন। শক্তিশালী ইংরেজ শাসকদের বিতাড়নের জন্য সশস্ত্র সংগ্ৰামের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে তিনি ভারতীয় সৈন্যদলে যোগদানের মাধ্যমে সমর শিক্ষায় জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করেন। এরপর কিছুদিনের জন্য গ্ৰাসাচ্ছদনের জন্য এলাহাবাদ নিবাসী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র, কন্যাদের গৃহ শিক্ষকতার কাজটি বেছে নেন, যা রামানন্দের কন্যা সীতা দেবীর “যুগান্তর সাময়িকী”তে (অধুনালুপ্ত বাংলা দৈনিক) তাঁর পিতা-স্মৃতি প্রবন্ধে আমরা খুঁজে পাই।

পরবর্তীতে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সাহায্যে তিনি যতীন্দর (যতীন্দ্রনাথ) উপাধ্যায় ছদ্মনাম গ্ৰহণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। বরোদায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সেখানে বাল গঙ্গাধর তিলকের সংস্পর্শে এসে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। সেখানে বরোদার রাজাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ। রাজার কথামতো অরবিন্দ ঘোষের উপর দায়িত্ব পড়ে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথকে সুস্থ করে তোলার জন্য। আর সেই সময়েই যতীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় রাজনীতিতে যোগ দেন বিপ্লবী অরবিন্দ।

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে অরবিন্দ ঘোষ বাংলার বুকে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে যতীন্দ্রনাথকে বাংলাতে আসার আহ্বান জানান। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে অরবিন্দ ঘোষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার পবিত্র ভূমিতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে আরও সুদৃঢ় করতে ও সুপরিকল্পিতভাবে বাস্তব রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যতীন্দ্রনাথ প্রথমে নিজ গ্ৰাম চান্না এবং পরে চন্দননগরে যান। চন্দননগরে সুহৃদ সম্মিলনী কক্ষে এই গেরুয়া বসনধারী বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে যুবক রাসবিহারী বসু বিপ্লবের পথে পা রাখেন। ১৯০২ সালে অরবিন্দ ঘোষ যতীন্দ্রনাথ এবং তাঁর ভাই বারীন ঘোষকে কলকাতার বাগবাজারে সরলা দেবীর সহিত সাক্ষাৎ করার জন্য পাঠান। সেখানে প্রমথনাথ মিত্রের সাথে যতীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। এরপর এক পবিত্র দোল পূর্ণিমার দিন পি. মিত্রের নেতৃত্বে বরোদা থেকে আসা যুবকদল এবং বাঙালি বীর বিপ্লবীদের নিয়ে একটি বিপ্লবী নীড় গঠিত হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘ইষ্টক্লাব’। পরে এই সংগঠনের নাম ‘অনুশীলন সমিতি’ রাখা হয়, যার সভাপতি ছিলেন পি. মিত্র সাহেব, সহ সভাপতি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও অরবিন্দ ঘোষ, কোষাধ্যক্ষ রূপে সুরেন ঠাকুর সমিতির দায়িত্ব নেন এবং যুবক বিপ্লবীদের সামরিক শিক্ষা প্রদান, শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, আধ্যাত্মিক চেতনায় উজ্জীবিত করার দায়িত্ব পড়ে যতীন্দ্রনাথের উপর।

এই সময় বিপ্লবীদের সামরিক শিক্ষার সাথে সাথে চলতে থাকে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র পাঠ এবং আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করার কাজ। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে অর্থ সংগ্ৰহের জন্য কয়েকজন স্বদেশীর তারকেশ্বরে ডাকাতি করার কথা শুনে যতীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ হন। এই সময়ে তাঁর আদর্শ, নীতি, শৃঙ্খলা নিয়ে সমিতির প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিরোধ গড়ে উঠেছিল। যতীন্দ্রনাথ কিছুদিনের জন্য সমিতি ত্যাগ করে ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকার দায়িত্ব নেন। ভগিনী নিবেদিতা তাঁকে আইরিশ বিদ্রোহের ইতিহাস, সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস, আমেরিকার মুক্তি সংগ্ৰামের ইতিহাস ইত্যাদি নানা পুস্তকের সাহায্যে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর যতীন্দ্রনাথ আবারও ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকার দায়িত্ব নেন। সমিতির মধ্যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দূর করার জন্য পাঞ্জাব ও পশ্চিম ভারতে অনুশীলন সমিতির গুপ্ত শাখা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রচারকার্যের জন্য পি. মিত্র যতীন্দ্রনাথকে পাঞ্জাবে পাঠিয়ে দেন।

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবে গিয়ে তিনি ডাঃ হরিচরণ মুখোপাধ্যায়, ডাঃ চারুচন্দ্র ঘোষ, সর্দার অজিত সিং এবং তাঁর ভাই তথা বীর বিপ্লবী ভগৎ সিং এর পিতা কিষান সিং এর সাহায্যে গড়ে তোলেন ‘গদর সমিতি’। কলকাতায় ফেরার পর ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নরেন গোস্বামীর স্বীকারোক্তিতে আলিপুর বোমা মামলায় তিনি অভিযুক্ত হন, কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলেও অরিবন্দ ঘোষকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। এই মামলায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ওকালতি করেছিলেন। অরবিন্দের অনুপস্থিতিতে বারীন ঘোষের সাথে তাঁর মতানৈক্যের জেরে বিপ্লবী জীবনে সাময়িক ছেদ ঘটিয়ে তিনি হিমালয়ে চলে যান। পরে এলাহবাদে সোহং স্বামীর সান্নিধ্য লাভের পর শ্যামাকান্ত বন্দোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে তিনি বর্ধমানে গলসি থানার অন্তর্গত নিজ গ্ৰাম চান্নাতে খড়ি নদীর ধারে সুবৃহৎ অঞ্চল জুড়ে “আশ্রম চান্না” গড়ে তোলেন।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি “আশ্রম চান্না” গড়ে তোলেন। বিগ্ৰহবিহীন সোহং দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত এই আশ্রমটি তিনি আত্মানুসন্ধান করার উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংযম, ধৈর্য্য, সাহস, সহিষ্ণুতা, ক্ষমতা, ক্ষমা, ভক্তি বা নিষ্ঠা, সহমর্মিতা এই নীতিগুলিকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে এই আশ্রম, যেখানে যতীন্দ্রনাথ সোহ-হং ধর্মের বীজ বপন করে গিয়েছেন, যা আজও ফল, ফুলে বিরাজিত এবং সংসারী পথক্লান্ত মানুষের শান্তির নীড় ও মুক্তির আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এই আশ্রমেই স্বামী নিরালম্ব ১৯৩০ সনে ৫ই সেপ্টেম্বর পরলোক গমন করেন। বিপ্লবী জীবন ত্যাগের পরেও তিনি পরোক্ষভাবে বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং ভারতের মুক্তি সংগ্ৰামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করতেন। খড়ি নদীর পাড়ে চারটি থানার মাঝে জঙ্গলে ঘেরা ওই আশ্রমের একটি বট গাছের নীচেই চলত ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্ৰামের রূপরেখা তৈরির গোপন বৈঠক। বিপ্লবীদের গুপ্ত আলোচনায় উপস্থিত থাকতেন রাসবিহারী বসু, অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্ৰামীগণ।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, নিবন্ধ ও আশ্রমের স্মরণিকা থেকে আমরা জানতে পারি যে, এই আশ্রমে এসেছিলেন লালা লাজপত রায় থেকে শুরু করে পিতা কিষেন সিং এর সাথে ভগৎ সিং এর মত স্বাধীনতা সংগ্ৰামীগণ। এছাড়াও অরবিন্দ ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, বারীন ঘোষ, রাসবিহারী বসু, যদু গোপাল মুখোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ফকির রায়, বিনয় চৌধুরী সহ বহু মহামানবেরই এই আশ্রমে আসা যাওয়া লেগে থাকত। এমনকি বিপ্লবীদের গোপনে ধরার জন্য খানা জংশনে একটি পুলিশের ফাঁড়িও গঠন করতে বাধ্য হয় ইংরেজরা। স্বামী নিরালম্বের মৃত্যুর পর আশ্রমের অধ্যক্ষ হন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক যোগেশ্বর চট্টোপাধ্যায় তথা প্রজ্ঞান পাদজী, যাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তাঁর বিদেশী (বিশেষত ফরাসি) অনুগামীরা এই আশ্রমে প্রায়ই আসতেন। সুবৃহৎ এই আশ্রমটি তখন ছিল সুসজ্জিত এবং গাছ-পালা, ফুল, ফলে পরিপূর্ণ। ১৯৭৮ এবং ১৯৯৮ সালের দুটি বন্যা এবং দীর্ঘদিন ব্যাপী রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ বিপ্লবীদের এই গোপন আস্তানাটি অবহেলিত এবং ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়েছে। আগেকার বহু ঘর বাড়ি আগেই নষ্ট হয়ে গেলেও টিনের চাল দেওয়া দুটি বিপ্লবীদের আস্তানা এবং যতীন্দ্রনাথ, ফকির রায় প্রমুখ বিপ্লবীদের মূর্তি আজও এই আশ্রমের গৌরবময় ইতিহাসকে বহন করে চলছে।

গ্ৰামের মানুষের সরকারের কিছু সুযোগ সুবিধা পৌঁছালেও এই আশ্রমটিকে নিয়ে বিশেষ কেউই চিন্তিত নন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানা এবং ১০ বছরের তৃণমূল সরকার কেউই এই বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেয় নি, বরং প্রতিবছরই যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যে ছোট অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, সেখানে স্থানীয় এবং রাজ্যস্তরের নেতৃবৃন্দ এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান। তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্ৰামের স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ “আশ্রম চান্না” আজ বিপন্ন এবং ধ্বংসের মুখে।

ভারতবর্ষের বিশেষ করে বাংলার বহু স্বাধীনতা সংগ্ৰামীর জীবনের অধিকাংশ অধ্যায় নানা কারণে অনাদরে অবহেলায় ক্ষিতির অতল তলে তলিয়ে গেছে। সেরকমই এক মহান পুরুষ হলেন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্ৰামের দীক্ষা গুরু বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। এই মহামানবকে বিপ্লবী যদু গোপাল মুখোপাধ্যায় “অগ্নিযুগের ব্রহ্মা” নামে আখ্যায়িত করেন। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ভাই) বর্ধমানে এক ছাত্র সম্মেলনে ভাষন দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা নেতা খুঁজে বেড়াচ্ছো কোথায়? বিপ্লবের বড়দা বসে আছেন চান্নায়। যাও তাঁর কাছে।“

তথ্যসূত্র:
ভারতের সাধক সাধিকা- সুবোধ চক্রবর্তী
বর্ধমানের বড়ো মানুষ- সুধীর দাঁ
আশ্রম চান্নার একটি স্মরণিকা
‘স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নে ভরা’, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ ই আগস্ট, ২০২০
উইকিপিডিয়া
https://www.facebook.com/theddnbangla/videos/768302800583298/ (স্থানীয় খবরের চ্যানেল)
বিভিন্ন খবরের কাগজ , পত্র-পত্রিকা

Leave a Reply