অতীত যা লেখেনিসংস্কৃতি

লোচ্চা, লম্পট, লোফার উত্তম

উত্তমকে সোজাকথায় ‘লোফার’ ব’লে দাগানো হয়েছিল কোন ছবিতে?.. এ প্রশ্নের উত্তরে সার্ফিং,স্ক্রোলিং চ’লবে যে নামগুলোর মধ্যে সেগুলো অবশ্যই স্ত্রী,রাজাসাহেব, রাজবংশ,কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, নিশিপদ্ম,বাঘবন্দী খেলা,দুই পুরুষ ইত্যাদি। কিন্তু উত্তরটা যদি হয় ‘সবার ওপরে’, তবে কিঞ্চিৎ ভ্রুকুঞ্চন প্রাপ্তি ত হতেই পারে। ‘গুরু’ভক্তরা অনেকেই প্রশ্নটা ‘ভুল’, ‘বাজে’, ‘অবাস্তব’ ‘হতেই পারে না’ ইত্যাদি ব’লে উড়িয়ে দেবার প্রয়াসও করতে পারেনই; তার ওপরে উত্তরটা যদি সত্যিই হয় ‘সবার ওপরে’, তাহলে ত’ প্রতিক্রিয়া বর্ষণ আরোই তুমুল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।

ক্লিশে চর্বণে গিয়ে আবারও বাস্তব স্মরণ ক’রে বলতেই হয়, স্বাধীনতা উত্তর পর্বে, স্বদেশহারা,স্বজনহারা, রক্তাক্ত,আদর্শের অপমৃত্যুতে চুরমার বঙ্গজনের সামনে একটা অবয়ব নিতান্ত প্রয়োজন ছিল, যে ; পূর্বোক্ত যাবতীয় ক্ষতে প্রলেপলেপনের পাশাপাশি বঙ্গজনের সব অপূর্ণ আশা, অনুক্ত প্রতিবাদ,অপ্রকাশিত প্রেম এর পূর্ণতা এনে দেবে তার একক অস্তিত্বে। আর এই প্রয়োজন মেনেই পঞ্চাশ, ষাট দশকের ছবিতে উত্তম চিত্রায়িত হয়েছেন।তাই সত্যোদঘাটন থেকে নীরবে কাঁদা বিচারবার্তার উদ্ধারকারী হিসেবে যে ছবিতে উত্তম আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন, এবং তাঁর কেরিয়ারগ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী করতে যে ছবির ভূমিকা অনস্বীকার্য, সে ছবিতে উত্তমকে ‘লোফার’ বলা হয়েছে – এ তথ্য সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না কোনোমতেই। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে এইসব মানা না মানার ধার না ধেরেই এ ছবিতে কৃষ্ণনগরের ছোট হোটেলটিতে রীতা অর্থাৎ সুচিত্রা শঙ্কর অর্থাৎ উত্তমের খোঁজ করতে এলে মালিকটি পরিষ্কার ব’লে ওঠেন ‘অমন লোফার লোকের খোঁজ কে রাখে’।যদিও এ কথা বলামাত্রই ‘কাঁটাতারের বেড়া'(ধাতস্থ হবার অব্যবহিত পরে সুচিত্রা সম্পর্কে এই বিশেষণই ব্যাবহার ক’রেছেন হোটেলমালিকটি) য় ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যান প্রবলভবে; এবং এই ‘লোফার’ শব্দটিতে স্ট্রেস দিয়ে সুচিত্রা যখন কারণ জানতে চান, হোটেলমালিক ব’লেন ‘কারণ তিনি হোটেলভাড়ার বকেয়া ৪০ টাকা দিতে পারেন নি এবং সে জন্য তাঁর স্যুটকেসটি আটকে রাখতে হয়েছে। অতএব, তাই উত্তম অর্থাৎ শঙ্কর একটি লোফার।

এ ডায়লগের প্রেক্ষিতে একটা গভীর প্রশ্ন আসেই যে লোফারের সংজ্ঞাটা তাহলে প্রকৃত অর্থে কি??..

একটা মজার ব্যাপার হল, বাংলার ‘লোচ্চা’, ‘লম্পট’ আর ইংরেজির ‘loafer’, ‘lumpen’ – এ সবকটা শব্দই ‘ল’ দিয়ে।আবার ‘lust’, ‘lechery’ – এগুলোও ‘ল’ ভুক্ত তাই।

যে শব্দ দিয়ে এ লেখা শুরু করেছিলাম সেই ‘loafer’ এ ফিরে যাই। অভিধানগত অর্থে loafer মানে, ‘a person who avoids work and spends time idly’। কিন্তু শুধু কি এটুকুই?.. আমাদের এই শব্দটির ব্যাবহারে এর অভিধানগত অর্থের সঙ্গে কোথাও একটা nonsensical attribute এর ব্যাপার এবং ততোধিক বেশী লাম্পট্য যেন অলিখিতভাবেই বঙ্গমননে ব’সে গেছে একেবারেই।এদিকে আভিধানিক সংজ্ঞানুযায়ী হোটেলমালিকের কথা দোষের কিছু ব’লে আদপেই ম’নে হয় না,কারণ শঙ্কর সারাদিন বেরিয়ে যায়,এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে বেড়ায় – এটা হোটেল মালিকের কাছে পরিচিত দৃশ্য। কি কারণে ঘোরে,কোথায় যায় – এত বিশদে যাবার তার দরকার নেই।

আপাতদৃষ্টিতে ‘কাজ নেই,কম্ম নেই ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে’ কনসেপ্ট থেকেই এই শব্দ তিনি প্রয়োগ করেন। কিন্তু সমস্যাটা আসে রিসেপটিভ এন্ড থেকে। যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, সাংবাদিক রীতা তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারত শব্দের অর্থানুযায়ী শঙ্করকে দেখে যা মনে হয়েছে লোকটি তাইই ব’লেছে।কিন্তু তার শার্প রিয়্যাকশনই ব’লে দেয় যে শব্দটির gross অর্থ আজ আমরা যা জানি, তখনও সেই অর্থই সুচিত্রা অর্থাৎ রীতাকে এতখানি রূঢ় করেছিল হোটেলমালিকের সঙ্গে পরবর্তী কথোপকথনে।

এ ছাড়া ঐ ছবিতে,এই প্রেক্ষিতের আর যেটুকু মেলে,তা হল জয়শ্রী সেনের সঙ্গে উত্তমের ফ্লার্ট করার অক্ষম চেষ্টা।তদন্তের কাজে লাগতে পারে ব’লে ক্রাফট দোকানের কর্মী বীণা (জয়শ্রী সেন)কে শঙ্কর (উত্তম) হাতে রাখতে চায় এবং তার প্রকৃতি বুঝে, ‘যে ফুলে যে দেবতা তুষ্ট’ রীতি মেনে জয়শ্রীর রূপের প্রসংশা, ‘বয়স কম’ ইত্যাদি ব’লে মন ভোলানোর খানিক চেষ্টা করে, কিন্তু তা একেবারেই শঙ্করের মত অতি ভাল ছেলের প্রকৃতি ও স্বভাববিরুদ্ধ হওয়ায় সে ফ্লার্টিং এর আড়ষ্টতা ও মেকিভাব প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাতে অবশ্য ক্ষতি খুব বেশি হয় না,কারণ বাস্তব হল যে, বীণা নামের বয়স্কা মহিলাটি এই শঙ্কর নামের যুবকটির প্রতি এতটাই বিগলিত,মুগ্ধ যে শঙ্করের প্রশংসাবাক্যের কৃত্রিমতা তার চোখেও পড়ে না।

এখন হোটেলমালিকের ‘লোফার’ সম্বোধন এর পরবর্তীকালে বীণার ফ্ল্যাটে এসে তার সঙ্গে রসালাপে জাস্টিফায়েড হতে হতেও হল না কারণ,এ ছবিতে উত্তমের অভিনয়ের সার্বিক আড়ষ্টতার পাশাপাশি নিতান্ত সচ্চরিত্র যুবক শঙ্কর বীণা গোত্রীয় নারীর হ্যান্ডলিং এ বড়ই বেমানান,অপারগ।

এই একই পরিচালক ‘অগ্রদূত’ এর পরিচালনায় , ঠিক পনেরো বছর পরের একটা ছবিতে চ’লে যাই। ‘মঞ্জরী অপেরা’; আর সে অপেরার ‘গোরাবাবু’ উত্তম। স্বামী অন্তপ্রাণ, তুখোড় অভিনেত্রী মঞ্জরী (সাবিত্রী)প্রাণপাত ক’রে দাঁড় করিয়েছে যে যাত্রার দল,সেই দলের নাট্যকার ‘গোরাবাবু’। দলে যখন ভ্রাতৃস্থানীয় বাবুলের (অনুপ কুমার) বান্ধবী হিসেবে নতুন নায়িকা অলকা (জ্যোৎস্না বিশ্বাস) আসে, গোরাবাবু তখন গুরুজন,শিক্ষক,মালিক,অন্নদাতা,রোল মডেল,দাদা – এই সবকটি ভূমিকায়। এরপর সেই চটুল মেয়েটির ছলাকলায় এ হেন গোরাবাবু- “ভেসে গেলেন” – এ কথা বললে একটু কম বলা হয়। বলা যায় নিজেকে তিনি স্বেচ্ছায়,সচেতনভাবে ভাসিয়ে দিলেন। কর্ম্মময়ী,সত্যনিষ্ঠ, একান্তভাবে, লক্ষ্যে অবিচল পতিব্রতা স্ত্রী পেয়েও গোরাবাবুর ভেতরে নিতান্ত নারীসুলভ ছলাকলা,লাস্য ইত্যাদির অভাব হয়তো ঘনিয়ে উঠেছিল তাঁর অজান্তেই।তাই,প্রথম দিন থেকেই অলকার প্রতি তাঁর প্রতিটি আচরণে, গুরুজন,শিক্ষক,মালিক,অন্নদাতা,রোল মডেল,দাদা- এই ভূমিকাগুলোর পাশাপাশি নারীসঙ্গপিয়াসী এক পুরুষ হিসেবে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ইঙ্গিত তিনি দিয়ে গেছেন প্রতিটি শব্দে,প্রতিটি চাহনিতে,প্রতিটি ছোঁয়ায়, মঞ্চে অলকার সঙ্গে একত্র অভিনয়ের প্রতিটি বাঁকে – সে উত্তমকে দেখলে জাস্ট উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

নিঝুম রাতে অসুস্থ অলকাকে আগলে নিয়ে শোয়া মঞ্জরীর পাশ থেকে উঠে আসা মেয়েটির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দিতে আবছায়ার মধ্য দিয়ে পা ফেলে ফেলে উত্তম এগোচ্ছেন যখন আশপাশ দেখতে দেখতে,সে চাউনিতে সাবধানতা আর লুকোচুরির গভীরে লুকিয়ে থাকা লাম্পট্যটুকু উপলব্ধি করতেই দর্শককে বারবার স্ক্রিণমুখী হতে হয়।বারবার উত্তমজালে আবিষ্ট হয়ে যেতেই হয়।

তাহলে এই পনেরো বছরব্যাপী ও তার পরবর্তী যাত্রায় , উত্তম সত্যিই কতটা সার্থক লোচ্চা-লোফার- লম্পট হয়ে উঠতে পারলেন, তাঁর অভিনীত কয়েকটি ছবির নিরিখে , সেটাই একটু দেখা যাক বরং।

তিনভাগে ভাগ ক’রি ছবিগুলোকে-

১- ‘৫৫র পর ‘৫৬ তেই ‘ত্রিযামা’ ১৯৫৮ তে সূর্য্যতোরণ,

২- ‘৫৯ এ ‘গলি থেকে রাজপথ ‘ ‘৫৯ এ ‘অবাক পৃথিবী’ , ১৯৬০ এ ‘কূহক’।

এবং

৩- ‘৭০ উত্তর ছবিগুলি ।
১৯৭০ এ নিশিপদ্ম, ‘আলো আমার আলো ‘৭১, ’স্ত্রী’ ‘৭২, ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ‘৭৩, ‘আমি সে ও সখা’ ‘৭৫, ‘জাল সন্ন্যাসী’ ‘৭৭, ‘রাজবংশ’ ‘৭৭, ‘রাজাসাহেব’ ১৯৮০,

একটু মনোযোগে খেয়াল করলে দেখা যাবে,অ্যাক্টিং কেরিয়ারে উত্তমের ‘লম্পট’, ‘লোচ্চা’, ‘লোফার’, ভ্যাগাবন্ড, অসামাজিক চরিত্রে অভিনয় আর অভিনেতা হিসেবে নায়কের ছাঁচ থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বের ক’রে দুমড়ে মুচড়ে ফেলা – এই দুটোই সমানুপাতে এগিয়েছে। আর সেটাই হল উপরোক্ত বিন্যাসের ভিত্তি।স্বাভাবিকভাবেই এই ছাঁচ ভেঙে বেরোনো সম্ভব হয়েছে পরের দিকে অনেক বেশি।কিন্তু এর শুরুটা হয়েছিল পাঁচ এর দশকেই,এবং এক্ষেত্রে উত্তমকে নিয়ে পরিচালকদের initial experiment এ চারিত্রিক স্খলনযুক্ত যে যে অভিনয়দৃশ্য বেরিয়েছে সেগুলো আবার এতটাই ইউনিক বা স্বতন্ত্র‍্য যে, সেগুলিকে ‘৭০ পরবর্তী ছবির ‘প্রস্তাবনা’, ‘ভূমিকা’ বা ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বলতে গিয়েও একটু থমকে দাঁড়াতে হয়।

‘সবার ওপরে’র ঠিক পরের বছর, ১৯৫৬র ছবি ‘ত্রিযামা’র কথায় আসি।কুশল (উত্তম) তার প্রতি মুগ্ধা মেয়েটির কাছে নৈতিকতায়, দায়িত্বশীলতায় ‘চারিত্রিক শুদ্ধি বা দৃঢ়তা’র প্রশ্নে সর্বতোভাবে পরাজিত হ’য়ে বিবেকের দংশনে, জ্বালায় জ্বলতে থাকে প্রবলভাবে।নিজের অবস্থানকে জাস্টিফাই করতে নীচ সংসর্গে আরও বেশি ক’রে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়।শুঁড়িখানায় যায়; মদ খেয়ে গভীর রাতে ‘স্বরূপা’র কাছে এসে তার অগ্নিসম শুদ্ধ প্রেমকে স্বার্থলোভে পুরুষের লালসা জাগানোর কৌশল ব’লে হীন দোষারোপে তাকে বিদ্ধ ক’রে চলে।এরপর,কোনো এক মিথ্যে রটনার বশবর্তী হয়ে অর্থের বিনিময়ে সেই নারীর দেহ দাবী করে।সে অরাজী হওয়ায় খুন অব্দি করতে এগোয়।

কিন্তু এ সবটাই ঘটে একটা মাত্র দৃশ্যের মধ্যেই।স্বরূপার মুখে ‘নিশাচর পাপী’, ‘ভীরু’,’চোর’ ইত্যাদি বিশেষণ শোনামাত্রই কুশলের অনুশোচনা, আত্মগ্লানি শুরু হ’য়ে যায়। মুখ লুকিয়ে পালায় সে।অর্থাৎ, গ্রীক নাটকের পরিভাষায় বলতে গেলে Hamartia-র সময়কাল যেন বড় অল্পেই শেষ হয়। এখানেই আসে বিপণন ও সেকারণে পরিচালকের সাবধানতার প্রসঙ্গ। আদর্শের প্রতিমূর্তি, রোম্যান্টিক হিরোকে এ ভূমিকায় কতটা নেবে মানুষ ভেবেই যেন দ্রবণে ডুবিয়েই তুলে নেবার মত একটা প্রয়োগ ব’লে ম’নে হয়। আরও বেশি সময় জারিত হতে দিলে দর্শকের প্রত্যাখ্যান সম্ভাবনা পরিচালককে এ সব ক্ষেত্রে (অগ্রদূত)সংযত থাকতে বাধ্য করেছিল -এ সত্য অনস্বীকার্য হ’য়ে ওঠে।

কারখানার কুলি যখন মাঝরাতে জানলা ভেঙে মালিকের মেয়ের ঘরে ঢোকে চোখেমুখে খুনে আগুন নিয়ে,এবং বলে, ‘কেমন হবে এবার যদি তোমাকে না ছাড়ি’, তখন সেই ভয়ংকর দুষ্কৃতির নারীলোলুপতা টপকে তার দুঃসাহসটাই প্রবল হয় সর্বাংশে;কারণ, আসলে সোমনাথ (উত্তম)এর এই ইনট্রুজন শ্রেণী সচেতনতার মূলে কুঠারাঘাত।মালিকের মেয়েকে দেখে পূর্বপরিচিত কর্মী সৌজন্যস্বরূপ হাসলে, ফলস্বরূপ তার কপালে জোটে প্রথমে জনসমক্ষের তীব্র অপমান,পরে ব্যক্তিগত নিগ্রহ, যার ফলশ্রুতিতেই প্রতিশোধস্বরূপ এই অনধিকার প্রবেশ।ঐ তিন চার মিনিটের একটি দৃশ্য বাদে আগাগোড়া গোটা ছবি জুড়েই উত্তম যথাযথ নায়কোচিত।

চ’লে আসি দ্বিতীয় পর্বের অর্থাৎ ‘৫৯, ‘৬০ এর ছবিগুলিতে। মজার ব্যাপার হল, এ সময়ের ছবিগুলোয় উত্তম চোর হয়েছেন খুব বেশি। ‘গলি থেকে রাজপথ’, ‘কূহক’,’অবাক পৃথিবী’,’সখের চোর’। অসামাজিকতায় লিপ্ত লোকের চরিত্রদোষ থাকবেই- এ যেন এক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার।তাই হিন্দি ছবিতে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন মানেই তার চারপাশে স্বল্পবসনারা কৃষ্ণের সঙ্গে বাঁশি বা শিবের গলায় সাপের মতই অবশ্যম্ভাবী। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও কাছাকাছি সময়ে নির্মিত ‘ বাদশা’ ছবির (১৯৬৩)কথাই যদি ধ’রি, ত দেখা যাবে, কুখ্যাত ‘বাদশা’গুণ্ডা অর্থাৎ কালী ব্যানার্জির যে ডেরা, সেইখানে দেওয়ালে হিন্দি ছবির নায়িকাদের ছবি সাঁটানো। অর্থাৎ ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বোতল, গেলাসের মত তার রোজনামচায় নারীসঙ্গও অতি সাধারণ ব্যাপার।

এই প্রেক্ষিত থেকে ‘চোর’ উত্তমের দিকে তাকাই যদি…উত্তম সবখানেই দাগী চোর,কিন্তু অদ্ভুতভাবে চরিত্রদোষহীন। ‘কূহক’ এ সুনন্দ(উত্তম)র সাগরেদ গোকুল (প্রেমাংশু বসু) তাকে তাই ব’লে, – মেয়েমানুষের দিকে তাকানোর স্বভাব ত’ তোর কোনোকালে নেই সুনন্দ – শুধু তাইই নয়, ভরন্তযৌবনা,অভিভাবকহীন নারীর সঙ্গে দিনের পর দিন একই বাড়ীতে বসবাস ক’রেও কেবল পয়সাটুকু হাতানোর বাইরে এক মুহূর্তের জন্যও স্বর্ণর প্রতি (আকৃষ্ট হলেও) লুব্ধ হয় না সে,লাম্পট্য ত দুরের কথা।

একই জুটিতে (উত্তম – সাবিত্রী)’গলি থেকে রাজপথ’ এ আসি। সেখানেও জেলফেরত ছিঁচকে চোর বস্তিতে পাশাপাশি ঘরে বসবাস করলেও এবং মেয়েটির মনোযোগলোভী হবার পরেও রাজা (উত্তম) কে কখনও ঘরের ফাঁক দিয়ে মেয়েটির পোষাক বদলানো বা স্নানদৃশ্য দেখে ফেলতে দেখানো হয় না, যা হিন্দী ছবি বা পরবর্তী অনেক বাংলা ছবিতেও আকছার দেখেছি,(এবং অদ্ভুতভাবে সেই দেখে ফেলাটা ভিলেনের ক্ষেত্রে হলে দোষের, কিন্তু হিরো বা যার সঙ্গে তার ভবিষ্যতে প্রেম করাবেন ব’লে পরিচালক স্থির ক’রে রেখেছেন,তার ক্ষেত্রে জাস্টিফায়েড হ’য়ে যায়)। রবি ঘোষ,চিন্ময় রায়,উৎপল দত্তরা বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে বা পুকুরঘাটে লুকিয়ে মেয়েদের চান দেখাকালীন উত্তম মধ্যম বহুবার খেয়ে গেছেন সৌমিত্র,শমিত ভঞ্জ ইত্যাদিদের হাতে।বরং এই লাইনে অনেকটা হাঁটতে এগিয়েছিলেন ‘৭৩ এর ‘জাল সন্ন্যাসী’র পরিচালক। জল থেকে তুলে ভেজা পোষাকের আরতী ভট্টাচার্যকে সন্ন্যাসী উত্তমের বাঁচানোর দৃশ্য এনে,এবং সে নিয়ে বিস্তর কেচ্ছা কানাকানি হবার পরও দৃশ্যটিকে নির্মল রেখেছিলেন সর্বতোভাবেই।

তাহলে প্রশ্ন আসেই যে দাগী চোর,জেলফেরত আসামী,ছিঁচকে পকেটমার এমন সব চরিত্রও ক’রেছেন যখন উত্তম,সেখানে লাম্পট্য, লোচ্চামি আনা হয় নি কেন??… এখানেও কি সেই উত্তমের ক্লিন ইমেজ বেচার প্রশ্ন একইরকম থেকে গেছে যা ছিল পঞ্চাশের দশকের শুরুর ছবিগুলোয়??

এমন নানা প্রশ্ন ওঠার পরেও বাস্তব যা দাঁড়ায়,তা হল,এ আলোচনার মাঝপথ বহুক্ষণ পেরিয়েও সেভাবে লম্পট, লোফার,লোচ্চা উত্তম মিলল কই??…

পরের দিকের অমন ছবি ‘নিশিপদ্ম’, যেখানে ‘খারাপ’ মহিলার কাছে প’ড়ে থাকা নিয়েই গোটা ছবিটা, সেখানেও অনঙ্গ কখনও ‘দুগগা’র মত মেয়েদের পরিত্রাতা, কখনও স্বার্থপর সংসার কলে পিষ্ট এক উচ্চবিত্ত, রূক্ষ পারিবারিক জীবনের হাতে ভিক্টিম এক অসহায় মানুষ।বাজারী মেয়েমানুষের কাছে এসেও যে ‘পিরিতীর আগুন তোরা নিভিয়ে দে না এসে’ জাতীয় কিছু না গেয়ে ‘যা খুশি ওরা বলে বলুক’ গাইতে বসে ।

‘জাল সন্ন্যাসী’তে মুখ দিয়ে একটা ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বেরোয় কেবল। তার আগে রাস্তা থেকে গাড়ী থামিয়ে মেয়ে লুঠ ক’রেও তাকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসা।

অর্থাৎ উত্তম যখনই এমন চরিত্রে,তখনই এই ‘খারাপ’টুকু অর্থাৎ তার লোচ্চামি, লাম্পট্যকে ব্যালান্স করা হয়েছে ‘ভাল’ এলিমেন্ট এনে।

ফলে, এততেও উত্তমের পরিপূর্ণ লোফার,লম্পট হওয়া হল না।

তাহলে এবার এক্কেবারে লম্পটশ্রেষ্ঠ ব’লে চিহ্নিত তিনি এমন ছবি ‘আলো আমার আলো’ ‘স্ত্রী’ বা ‘রাজাসাহেব’এ যাই বরং।

‘আলো আমার আলো’র মত ‘কামুক’ পুরুষের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় বোধহয় ঐ একটিই।শুভ্র ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত যে শিল্পপতি উদ্বাস্তু এলাকা পরিদর্শনে এসে তাদের জন্য সাহায্যের ভাণ্ড উপুড় ক’রে দেন, পরের দৃশ্যে নাইট ক্লাবে নর্তকীর গোপনাঙ্গের আন্দোলনে তারই জিভ দিয়ে জল টপতে থাকে – এ দেখানোর সাহস পরিচালক পিনাকী মুখোপাধ্যায় করতে পেরেছিলেন; কিন্তু সেখানেও ত’ সুচিত্রাকে তুলে আনার পরেই তাঁর জীবনে প্রতিরাতে নতুন নতুন নারী সম্ভোগের ইতি হ’য়ে যায়,এবং একজন কেয়ারিং,স্নেহময় প্রেমিকের ভূমিকা শুরু হ’য়ে যায়,আবার শেষে গিয়ে এই ভূমিকাটিকে মাথায় রেখেই সুচিত্রা,তার জীবন প্রায় শেষ করে দেওয়া লোকটির বিরুদ্ধে কোর্টে দাঁড়িয়ে সমস্ত অভিযোগ তুলে নেয়।
তাহলে???
জিজ্ঞাসা আসেই, ‘তবে কি ভাল উত্তমের আড়ালে ঢেকে যাওয়া থেকে লম্পট, লোচ্চা, উত্তমের বেরোনোর কোথাও কোন উপায়, সাহস রাখে নি বাংলা ইন্ডাস্ট্রি!!!!

আমরা ‘স্ত্রী’র উত্তমকে দেখার চেষ্টা করি বরং,যেখানে উত্তম আগাগোড়াই এক উদার ম’নের নারীসম্ভোগী,লোলুপ জমিদার;শেষ দৃশ্যে স্ত্রীর প্রেমিকের মৃতদেহের ওপর এসে গুলি ক’রে আক্রোশ মেটায়।

পুরো ছবি জুড়ে বিষয় একটাই,মাধব দত্ত (উত্তম) – 
তিন বছরের বিবাহিত জীবনে কোনও রাতেই ঘরে স্ত্রীর কাছে আসে না।কোনো না কোনো বিপন্ন,বিধবা, অসহায়াকে ছদ্ম উদ্ধারের আড়ালে চলে কোঠিতে এনে তোলা আর তারপর বাবুর সেবায় লাগানো।

মহানায়কের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনের সব থেকে বৈচিত্র‍্যপূর্ণ অভিনয়ের নিদর্শন এই ছবি। নিত্যনতুন মেয়েদের এনে, তাদের গলা জড়িয়ে মদ খাওয়ানো, যৌবন পেরোনো এক পুরুষের সদ্যযৌবনা কোমলাঙ্গীদের দেহস্পর্শজনিত সুখ নেবার যে অননুকরণীয় আশ্লেষময় অভিব্যক্তি – তার সমান্তরাল বাংলাতে ত নয়ই, হিন্দি ছবিতেও যার সমান্তরাল দু একজন চরিত্রাভিনেতার ক্ষেত্রে ক্কচিৎ হলেও কোনো নায়কের ক্ষেত্রে অন্তত ম’নে পড়ে না।

এ ছবির সবটা শুধু উত্তম একাই কেড়ে রাখেন, আর সঙ্গে নচিকেতা ঘোষের সঙ্গীত; কিন্তু তার বাইরে পরিচালকের একটা ট্রিটমেন্ট বলা একান্ত আবশ্যক।

অন্য মেয়েদের সঙ্গে জমিদারের নৈকট্য যখন দেখানো হচ্ছে,তখন একেবারেই সরাসরি দুটো শরীরকে পরিচালক ক্যামেরায় নিচ্ছেন।রক্তমাংস,লালসা,ক্ষুধা,রিরংসায় ভরপুর দুটো দেহ।কিন্তু নিজের স্ত্রীর সঙ্গে যখন জীবনে প্রথমবার অন্তরঙ্গ হচ্ছেন মাধব, তখন পরিচালক ব্যবহার করলেন ছায়া।তিন বছর পেরিয়ে জীবনের প্রথম মধুযামিনীতে এক দম্পতির পরস্পর কাছাকাছি আসা, সিল্যুটে আমাদের কাছে তুলে ধ’রে পরিচালক প্রতিরাতের নিত্যনতুন শরীর আস্বাদের চেয়ে এই মিলনকে পৃথক রাখার এক বার্তাই কি দিতে চাইলেন না??
আর ঠিক এর থেকেই এক অন্য মাত্রা যোগ হয়ে গেল মাধব দত্তের চরিত্রে। অর্থাৎ প্রতিরাত বাইরে কাটালেও স্ত্রীর সঙ্গে এই মিলন তার রোজের সম্ভোগের বাইরের কিছু। নিষ্কলুষ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় তার সরল মন, মানুষের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস আর ছেলেমানুষী..

সর্বোতোভাবে লম্পট হয়েও,লাম্পট্যকে কোথাও এগুলোও কি ব্যালান্স করতে থাকে না??
লোচ্চামিটাই যার শেষ কথা, অর্থাৎ এর বাইরে আর কিচ্ছু নেই বলার মত,সেরকম কেউ যে অর্থে লোচ্চা, মাধব দত্ত কিন্তু লম্পট চূড়ামণি হয়েও ঠিক সেই ক্যাটেগরিতে পড়ল না।

ঠিক সেই ক্যাটেগরিতে পড়েছিল একটিই চরিত্র,তা হল ‘রাজবংশ’ ছবির রাজা অর্থাৎ বাবা উত্তম (এ ছবিতে বাবা ও ছেলে দুই ভূমিকাতেই ছিলেন মহানায়ক)।কিন্তু মূলতঃ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কাহিনীটাই এখানে মূখ্য ছিল ব’লে শুরুর দিকের দুরাচার,নারীলোলুপতা – এগুলোর পরে ছবি মাঝপথ পেরোনোর আগেই মেরে ফেলা হয় বাবা অর্থাৎ রাজা উত্তমকে।তাকে কোনও সুযোগ দেওয়া হয় নি ভাল হবার,অনুশোচনা করার বা নিজেকে শোধরানোর । মেক আপ এবং অভিনয়ে নিজেকে ‘declasse’ করা – তার অনেকটা পীষূষ বসুর এ ছবিতে পাওয়া যায়, যা আরও বেশী করে দাগ কেটেছিল পলাশ ব্যানার্জি পরিচালিত ‘রাজাসাহেব’ এ।
তাহলে কি উত্তমের নায়ক ইমেজের বহু কাঙখিত ভাঙন শুরু হয়েছিল অপেক্ষাকৃত পরের পরিচালকদের হাতেই??… এ প্রশ্নের উত্তর একটাই – ‘না’।
উত্তমকে ভাঙার এই সাহস, তার মেক আপে চোয়াড়ে লাফাঙ্গার লুক আনা, তার সংলাপে খিস্তি বসানো, তার উচ্চারণে বস্তির অ্যাক্সেন্ট ধরানো – এসব করেছিলেন আর কেউ নয়, উত্তম স্বয়ং; ‘বনপলাশীর পদাবলী’তে, ১৯৭৩ এ,নিজে পরিচালক ছিলেন যেখানে।

ছবির শেষের দিকে প্রায় বেহুঁশ উদাসকে শেষ বাসে কোনো সওয়ারী জানতে চায় ‘কোত্থেকে ফিরছিস’?.. ছাপ ছাপ চকরা বকরা জামা পরা,কনুই এর বেশ খানিকটা ওপর অব্দি জামা গোটানো, চাপ দাড়ির উদাস, নেশাড়ু চোখ সরু ক’রে বলে ‘মাগীর বাড়ি থেকে’।এর পর পদ্ম (সুপ্রিয়া) ‘দিনের কালে রূগীদের সেবিকা’ আর ‘রেতে ডাক্তারের সেবাদাসী হঁইঞ্চে’ শুনে যে বাছাই শব্দ প্রয়োগ করতে থাকে গ্রামের সজ্জন ডাক্তারের (অনিল চ্যাটার্জি) উদ্দেশে, যে ভঙ্গিমায় বাস থেকে নেমেই ঐ অবস্থায় চ’লে আসে ডাক্তারের বাড়ীতে,এবং তৎপরবর্তী উত্তমের অভিনয়, মহানায়ক ইমেজ ভেঙে এক মহা নটের উত্থানের যাবতীয় সম্ভাবনার দ্বার হাট করে খুলে দেয়,যার বেশ খানিকটা সার্থক রূপায়ণ ঘটেছিল পরিচালক পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ১৯৮০র ছবি ‘রাজাসাহেব’ এ।মোটা মোটা জংলী গোছের ভুরু,গোল গোল চোখ,মুখে পাহাড়ী ডায়ালেক্ট নিয়ে উবু হ’য়ে বসা উপজাতি প্রধান। যে কিনা সাপের বিষদাঁত আর তার রাজত্বের সুন্দরী মেয়েদের লজ্জার আড়াল নিজে হাতে ভাঙতে বড্ড ভালবাসে।এ হেন চরিত্রে মহানায়ককে কণ্ঠ বাদ দিয়ে উত্তম ব’লে চেনা সহজ হয় না।

এভাবেই উত্তম অভিনীত চরিত্ররা দেখিয়ে যান, আমাদের আজন্ম চলা সুশীলতা আর লাম্পট্যের মধ্যবর্তী সরু আলপথ ধ’রেই ; যে পথ আপাতদৃষ্টিতে সরল সোজা দেখালেও, চেনা বড় বিভ্রান্তির।যে পথে রাজা,সুনন্দদের মত দাগীরাও যেমন পরিচ্ছন্ন, শুদ্ধতার প্রতিমূর্তি হ’য়ে থেকে যায়,
তেমনি গোরাবাবুর মত ছাপোষা মধ্যবিত্তও কখন, কোন উচ্চাবচে পিছলায়।
সুধীরের (আমি সে ও সখা)মত দেবতুল্য দুর্দান্ত নায়কও ক্ষেত্রবিশেষে লাম্পট্যকে হাতিয়ার ক’রেই সমাজের জমাট কোন অন্ধকার বাসা ভেঙে তছনছ ক’রে দেয়,
আবার কারখানা কুলী সোমনাথ (সূর্য্যতোরণ) ক্ষণিকের জন্য হলেও লাম্পট্যের অস্ত্র হাতে নিয়েই ঘুচিয়ে ফেলে lumpenproletariat এর চিরকালীন সংজ্ঞা….
আর, এই বিপুল বিস্তৃত সামাজিক,নৈতিক, মনিস্তাত্বিক,সামূহিক,ব্যক্তিক ক্ষেত্রে এই চরম সত্যটাই এক এবং এককভাবে মূর্ত ক’রে তোলেন যিনি, তাঁর নামই হল উত্তমকুমার।

Leave a Reply