রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

বারুইপুরের হিন্দু কৃষকদের মরণপণ সংগ্রামই পরিত্রাণের একমাত্র পথ –

দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার অন্তর্গত বারুইপুর মহকুমার কল্যাণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত চণ্ডীপুর,মলয়াপুর, হাটা, ধোপাগাছি, জগদীশপুর, চকালালপুর গ্রামের ১৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় ২০০৭ সালে বারুইপুরে নূতন জেলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য। অর্থাৎ সংশোধানাগার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সুপার, পাওয়ার হাউজ, ডিআরডিও, ফিল্ম সিটি সহ নানা সরকারি বেসরকারি প্রকল্প রূপায়নের জন্য জমি নেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত সরকারিভাবে যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল তাতে বিজ্ঞাপনে সরকারি প্রশাসনিক ভবনের কথাই উল্লেখ করা হয়েছিল। যদিও সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী দক্ষিণ-২৪ পরগণার একধিক সভায় এমনকি বারুইপুরে এসে সভাতেও একাধিকবার বলেছিলেন যে শিল্পের জন্য জমি দরকার, নূতন প্রজন্ম কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। যতটুকু জানা যায় ২০০৭ সালে এই অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণে বিশেষ সমস্যা হয়নি, কেননা জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা ও ম্যাপিং এমনভাবে করা হয়েছিল তাতে ৮০%-৯০% জমি হিন্দু সম্প্রদায়ের। বাকী জমি বিক্ষিপ্তভাবে খৃস্টান ও মুসলমান চাষীদের থেকে নেওয়া হয়। ২০০৭ সাল থেকেই জমিদাতাদের বিঘে প্রতি ১ লক্ষ ৬৫-৬৭ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছিল।

আশ্চর্যজনকভাবে, বর্তমান ২০২০ সালে সেখানে ইলেকট্রিক সাব স্টেশন, সংশোধানাগারের বিল্ডিং আর গুটি কয়েক প্রশাসনিক ভবন ছাড়া কিছুই নেই। সাধারণভাবে এই অঞ্চলের জমি দুই ফসলি। বর্ষার জল চণ্ডীপুর ক্যানেল মারফৎ নেমে যাবার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের খাল সংস্কারের অভাবে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এই অঞ্চলের চাষিরা অন্তত বর্ষার সময় মাছ, ধরে, শাক-সবজি চাষ করে থাকে। এই অঞ্চলের চাষের জমিতে ভাগ চাষী যেমন রয়েছে, তেমনি ক্ষেত মুজুরদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। একই বাড়ির সদস্যরা চাষের সাথে সাথে বিভিন্ন মরসূমী পেশায় যুক্ত থাকেন, এছাড়া অনেকে কলকাতা শহর এলাকায় জনমজুর, জোগালি, রঙের কাজে লিপ্ত হয়েই নিজেদের সংসার প্রতিপালন করেন। যে জমি থেকে সারা বছর কিছু না কিছু পরিবারের আয় হত; এখন এককালীন ১লক্ষ ৬৫-৭০ হাজার টাকায় তাঁদের বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত একটুকরো জমিকে ঘিরে যে জীবন-যাপনের ভরসা তা’ শিল্পায়নের ঢক্কানিনাদে যেমন হাতছাড়া তেমনি প্রায় ১৩ বছর ধরে তারা কর্মহীন। জমি বিনিময়ে যে টাকা তাঁরা পেয়েছিল তা অনেকেই খরচ করে ফেলেছে হয় বাড়ির মেরামতি কাজে, নতুবা ছোট দোকান দিয়ে বসেছিল তাতে। অনেকে আবার পরিবারের আত্মীয়ের রোগের চিকিৎসাতেও সেই টাকা খরচ করেছে। কেউ কেউ সেই টাকা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভাগও করে দিয়েছে।

জমিদাতাদের সমস্যা আর দুর্দিন ওইখানেই থেমে নেই। ২০১৪-১৫ সাল থেকে অধিগৃহীত ১৫০০ একর জমি উঁচু করার কাজ শুরু হয়। হঠাৎ-ই জমি উঁচু করার কন্ট্রাক্ট পাওয়া বিশেষ সম্প্রদায়ের কন্ট্রাক্টর যারা স্থানীয় এলাকার নয়, তারা চণ্ডীপুর, মলয়পুর, হাটা গ্রামের জমির মাটি কেটে প্রকল্প এলাকার জমি উঁচু করতে শুরু করে। এইপ্রকারে বেআইনিভাবে চাষীদের জমির মাটি কেটে রাতারাতি তারা প্রকল্প এলাকার জমি ভরাট করতে শুরু করে। এই নিয়ে জমির মালিকরা বাধা দিতে গেলে শাসকদলের আশ্রিত দুষ্কৃতীদের দ্বারা হুমকি, এমনকি কয়েকজনকে শারিরীকভাবে নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় হইচই ও গণ্ডগোল শুরু হলে তারা যাতে মাটি কাটাতে বাধা দিতে না পারে তার জন্য প্রচার করা হয় সরকারি কাজে বাধা দিলে অসুবিধে আছে। এই ভাবে ভয় দেখিয়ে প্রকল্প এলাকার বাইরের চাষীদের চাষের জমির মাটি কেটে, শাসকদলের দুষ্কৃতীদের আশ্রয়প্রাপ্ত কন্ট্র্রাক্টর মাটি কেটে প্রায় বড় বড় দীঘি বানিয়ে ফেলে। পুলিশ এবং শাসকদলের যোগসাজসে এইভাবে ভয় দেখিয়ে হুমকি দিয়ে এই অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী অনেক শালি জমিকে নষ্ট করে দেওয়া হয়। এক কথায় ভয়াবহ।জমিদাতাদের তরফে আন্দোলনও শুরু হয়। কিন্তু নরম-গরমে চোরাগোপ্তা ভয় দেখিয়ে চাষের জমির মাটি কেটে প্রায় একাধিক দীঘি সমান জলা বানিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় নূতন উৎপাত। প্রকল্প এলাকায় তৈরী ইলেকট্রিক সাব স্টেশন বানানোর পর তার সঙ্গে হাইটেনশন ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন তারের খুঁটি পোতা ও তার টানাকে কেন্দ্র করে। কোনরকম সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই লাইন টানার বরাত পাওয়া ঠিকেদার খুঁটি পুঁততে শুরু করে। এইজন্য আগে থেকে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে কোন সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও দেওয়া হয়না। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই খুঁটি পোঁতার কাজ চলে। যাঁদের জমি ওপর দিয়ে এই খুঁটি পোতার কাজ চলছে তারা বাধা দিতে গেলে তাদের প্রথমে হুমকি, পরে প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয় এই বলে যে সরকারি কাজে বাধা দিলে বিপদ আছে। পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে অভিযোগ জানালেও কিছু সুরাহা মেলে না। পঞ্চায়েত সদস্য শ্রীমতী শিখা মণ্ডলও কিছু সহযোগিতা করেন না। অথচ প্রকল্প এলাকার বাইরের জমির ওপর দিয়ে ব্যক্তিগত জমিতে এইভাবে বিনা বিজ্ঞপ্তিতে হাইটেনশন ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন তারের খুঁটি পোঁতা ও পরিবাহী তার নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ ওই হাইটেনশন ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন তার যেখান যেখান দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেখানে জমির কর্মরত চাষী-ক্ষেতমজুর কিংবা বর্ষাকালে মাছ ধরতে যাওয়া অত্যেন্ত বিপদজ্জনক। সর্বোপরি ঠিকাদারের লোকরা এই বর্ষায় মরসূমে হাইটেনশন ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন তার যেসমস্ত জমির ওপর দিয়ে গেছে সেইসব জমির আশে পাশের এলাকায় যেতে বাধা দিচ্ছে। দীর্ঘদিন লকডাউনে কর্মহীন এইসব অঞ্চলে কর্মহীন চাষী জনমজুর পরিবারগুলি অত্যন্ত আর্থিক সংকটের সম্মুখীন। এই বর্ষার মরসূমী চাষ এবং মাছ ধরায় তাদের বাধা দেওয়ার অর্থ তাদের নূন্যতম অন্নসংস্থানেও বাধা দেওয়া।

এই চূড়ান্ত অমানবিক, বেআইনী সরকারি সাব-কন্ট্রাক্ট পাওয়া ঠিকাদারের এজেন্ট এলাকার বিভিন্ন মানুষকে ভুল বুঝিয়ে নতুবা ভয় দেখিয়ে একএকজনের সাথে একরকরকম ভাবে ডিল করে কাউকে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। অনেকের অনুমতি ছাড়াই তার জমির ওপর দিয়ে তার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ ভাঙড় এলাকায় ঠিক এই একই কাজের জন্য সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থার কথা বলে ছিল এবং সেইখানে চাষীদের প্রতিবাদে সেই প্রকল্প বন্ধও হয়ে যায়। এই অসামান্য করুণা বর্ষণের কারণ কি? ওখানকার কৃষকেরা মুসলমান বলে?

অথচ বারুইপুরের চণ্ডীপুর, মলয়পুর, হাটা গ্রামের অধিকাংশ হিন্দুদের জমি নেবার ক্ষেত্রে কোন নিয়ম নীতি মানা তো দূরের কথা, হিন্দুদের নিজেদের মধ্যে বিভেদ অনৈক্যের সুযোগে হিন্দু জমি কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাঙালী হিন্দুর পূর্বপুরুষের জমি চলে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি নিয়ে বাঁচবে?

আর একটি প্রশ্নও থেকে যায়। চূড়ান্ত প্রশাসনিক অসযোগিতার মাধ্যমে হিন্দুদের উৎখাত করে demography changes বা ধর্মীয় জনসংখ্যা পরিবর্তনের কোন নয়া চক্রান্ত নয় তো?

Leave a Reply