রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

শ্রী হরিপদ ভারতী – এক প্রামাণ্য বীক্ষণ

“বিশিষ্ট বাগ্মী বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ও পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার প্রাক্তন সদস্য শ্রীহরিপদ ভারতী গত ২১শে মার্চ, ’৮২ কলিকাতার এস এস কে এম হাসপাতালে হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বৎসর।

অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলায় ১৯২২ সালে তাঁর জন্ম। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিক সহ প্রথম শ্রেণীতে ১ম হয়ে স্নাতক হন; ১৯৪২ সালের কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পরীক্ষাতেও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় যশোরের মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজে অধ্যাপকরূপে। এক বছর পর তিনি হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজে যোগ দেন এবং অধ্যক্ষ হিসাবে এখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮১ সালে।

ছাত্রজীবনেই তিনি ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন ও হিন্দু মহাসভাতে যোগ দেন। পরে শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে গঠিত ‘ভারতীয় জনসংঘ’ তে যোগদান করেন। দীর্ঘদিন যাবত তিনি এই দলের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি ও সর্বভারতীয়স্তরে সহ-সভাপতির পদ দক্ষতার সাথে নির্বাহ করেন। জনতা দলের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি ঐ দলের সদস্য হিসাবে যোগদান করেন। পরে তিনি ভারতীয় জানতা পার্টিতে আসেন এবং বি জে পি’র পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য হন। রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকায় তাঁকে একাধিকবার কারান্তরালে কাটাতে হয়। তাঁর সর্বশেষ কারাবাস ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থায় প্রয়াত লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণের নবনির্মাণ সমিতির সদস্য হিসাবে। ১৯৭৭ সালে কলিকাতার জোড়াবাগান কেন্দ্রের প্রতিনিধিরূপে বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি দল নির্বিশেষে সকলেরই প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। অতুলনীয় সৌজন্যবোধ, অসাধারণ বাগ্মিতা, সুললিত ভাষাশৈলী, সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে তাঁকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। শিক্ষাকতা ও রাজনৈতিক কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য-সাধনায় তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। নিখিল বঙ্গ সাহিত্য সন্মেলনের অনেক অধিবেশনে এবং কয়েক বছর আগে লণ্ডনে অনুষ্ঠিত বাংলা সাহিত্য সন্মেলনে তিনি সুবক্তা হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। একাধিক পুস্তকও তিনি প্রণয়ন করেন তাঁর ব্যস্ত জীবনের অবকাশে। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সুবক্তা ও সংসদীয় গণতন্ত্রে অভিজ্ঞ এই জননেতার মৃত্যুতে দেশের প্রভূত ক্ষতি হল।”

অষ্টম পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার ৭৭তম অধিবেশনে ১৯৮২ সালে ১৪ই জুন স্পিকার শ্রী সৈয়দ আবুল মনসুর হাবিবুল্লাহ (প্রোটেম স্পীকার) শ্রীহরিপদ ভারতী সম্পর্কে শোকপ্রস্তাবে ওপরের কথাগুলি বলেন।

বর্তমান সন্দর্ভে আমি শ্রীহরিপদ ভারতী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সিপিএম পরিচালিত প্রথম (১৯৭৭-১৯৮২) বামফ্রন্ট সরকারের বিরোধী দলনেতা হিসাবে তাঁর উত্থাপিত গুরুত্ব্বপূর্ণ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনায় অবশ্যই বাংলার (১৯৬৭-১৯৭৭) কংগ্রেসী-যুক্তফ্রন্ট অপশাসনের পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী/ সিপিআইএম) শাসনকালেও কিভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালী হিন্দুর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক অধিকারগুলি কিভাবে সংকুচিত ও পদহেলিত হয়েছে তার ওপরেও মনোনিবেশ করা হয়েছে। সর্বোপরি ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের ভূখন্ডগত বিভাজন ঘটিয়ে ভারত এবং পশ্চিম-পাকিস্তান ও পূর্ব-পাকিস্তান গঠনের সিদ্ধান্ত এবং পাকিস্তানের বিভাজন ঘটিয়ে পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যগঠনের প্রকৃত ইতিহাসের চর্চা আজও অসমাপ্ত। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস চর্চায় নেহেরু-ইন্দিরা কংগ্রেসী সরকারগুলির প্রত্যক্ষ মদতে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় তথাকথিত মার্কসীয় ইতিহাসচর্চা সাম্রাজ্যবাদী আরব-ঐসলামিক-আব্রাহানি রাজনৈতিক দর্শনকেই পরিপুষ্ট করেছে। বিগত সাত দশক ধরে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠসূচী এবং পাঠ্যপুস্তক রচনার ক্ষেত্রেও ঐসলামিক-আব্রাহানি ঐতিহ্যের স্তুতিগাঁথা রচিত হয়েছে, সমালোচিত ও ধীকৃত হয়েছে সনাতনী ভারতীয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী আত্মত্যাগী বিপ্লবীদের লড়াই-সংগ্রাম-বিপ্লবের প্রচেষ্টাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’, ‘বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদ’, ‘ভদ্রলোকচিত সন্তাসবাদ’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। অন্যদিকে আপোষমুখী, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তোষামোদকারী সমঝোতোমূলক নিয়মতান্ত্রিক সাংবিধানিক আন্দোলনকে গান্ধী পরিচালিত গণসংগ্রাম, গণবিদ্রোহের তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ-বঞ্চনার প্রতিবাদগুলি ব্যবহৃত হয়েছে তথাকথিত ব্যক্তিগত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এবং কংগ্রেস দলের ক্ষমতালিপ্সা জন্য। এমনকি বর্তমানের ইতিহাস চর্চায় ধারাবাহিকভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট ঐসলামিক আত্মনিয়ন্ত্রের দাবী নিয়ে ভারত বিভাজনের জন্য একের পর এক হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গায় পরিপুষ্ট মুসলীম লীগের কার্যকলাপকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে আখ্যায়িত করাও হয়েছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন ঐসলামিক জেহাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বৈধতা ও আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামক তথাকথিত হিন্দু-মুসলিম সমঝোতার নামে। বিশেষত, যে চুক্তিতে প্রকৃতপক্ষে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে হিন্দুদের স্বার্থের জলাঞ্জলি দিয়ে ঐসলামিক-সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতিকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে এবং বাঙ্গালী হিন্দুদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-ভূখন্ডগত স্বার্থকে আহুতি দিয়ে।

শহুরে উর্দুভাষী অভিজাত মুসলিম ও গ্রামীন বাংলাভাষী মুসলিমদের স্বার্থপূরণের লক্ষ্যে বাংলায় মুসলিম লীগ ও প্রজাকৃষকপার্টির তথাকথিত ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সহযোগী হয়েছে হিন্দু দলিত, কমিউনিস্ট ও উদারবাদী কংগ্রেসী দল। আর এই ক্ষমতা বিন্যাসের সর্বাধিক বঞ্চিত- লাঞ্ছিত রক্তস্নাত হয়েছে বাঙ্গালী হিন্দু। পূর্ব-বঙ্গের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক ঐসলামিক সাম্রাজ্যবাদীদের দাঙ্গায় হিন্দু নারী নির্যাতন ও গণহত্যার মদতদাতা প্রকৃতপক্ষে ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্র ও গান্ধির নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস; এবং সাম্রাজ্যবাদীদের দোসর কমিউনিস্ট দলগুলি।

স্বাধীনত্তোর পর্বে ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রের ঐতিহ্যরক্ষাকারী আইনগুলি অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সনাতনী সভ্যতার সাংস্কৃতিক অবদানগুলিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ৮০০ বছরের ঐসলামিক-আব্রাহানিক শাসনতন্ত্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে প্রগতিশীল উদারনৈতিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রাচীন-মধ্যযুগ-আধুনিক ভারতের ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, দর্শন ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে প্রক্ষিপ্তভাবেই ঐসলামিক-আব্রাহানিক-তথাকথিত পশ্চিমী সাম্রাজ্যাবাদী রাষ্ট্রদর্শনকে কখনও উদারনৈতিক-শ্রেণীসংগ্রাম; আবার কখনও হিংসাত্মক-জেহাদী-ব্যক্তি হত্যার রাজনীতিকে মার্কস-লেনিন-মাও নামধারী রাজনৈতিক বিপ্লব বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর এই রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রচারকার্য সম্পাদনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ইউরোপ, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ডলার-পাউন্ডে স্কলারশিপ্‌ প্রাপ্ত তথাকথিত ভারতীয় গবেষক-অধ্যাপকজীবীরাই।

অথচ ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নানা দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপ ও সেন্সাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে তথ্যগত জালিয়াতি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁরা চিরকালই ভারতের ইতিহাস চর্চায় ব্রাত্য থেকে গেলেন। এরকমই একজন পরিসংখ্যাবিদ শ্রী যতীন্দ্র মোহন দত্ত ছিলেন আগরপাড়া-পানিহাটি নিবাসী, প্রেসিডেন্সী কলেজের স্নাতক (গণিত, সংখ্যাতত্ত্ব)। শ্রী যতীন্দ্র মোহন দত্ত দীর্ঘদিন মর্ডান রিভিউ, প্রবাসী, শনিবারের চিঠি, যুগান্তর, কথা সাহিত্যে লিখেছেন। বিশেষত তিনি মর্ডান রিভিউতে সেন্সাস্‌-এর ওপর ধারাবাহিকভাবেই পরিসংখ্যান দিয়ে তৎকালীন সেন্সাস্‌ প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও তার দ্বারা সৃষ্ট সীমাহীন গোঁজামিল নিয়ে লিখেছেন। যিনি দীর্ঘদিন বিখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের সহযোগী হিসাবে কাজ করেছেন ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট’-এ। ১৯৭৫ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত হন। ১৯৩৯ সালে ‘Zakat- The Economic Basis of Islamic Tithe’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধও তিনি প্রকাশ করেন( The Economic Journal, Volume 49, Issue 194, 1 June 1939, Pages 365–369, Oxford University Press on behalf of the Royal Economic Society)। একদিকে ভারতবর্ষে ও ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি, দেশভাগ উদ্বাস্তু নিয়ে বড় বড় প্রকাণ্ড মহাভারত লিখছেন অথচ মর্ডান রিভিউ (১৯৩০ এর দশক, ১৯৪০-এর দশকে) ও প্রবাসীতে বাংলার উপনিবেশিক প্রশাসনের সেন্সাস দুর্নীতি ওপর লেখা প্রবন্ধগুলির কোন উল্লেখ পর্যন্ত সুমিত সরকার, রামচন্দ্র গুহ, অ মলেশ ত্রিপাঠী, আয়েষা জালাল, মুশরিল হাসান, পার্থ চ্যাটার্জী, দীপেশ চক্রবর্তী, সুগত বসু, জয়া চ্যাটার্জী, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় ও হালের তাদেরই উত্তরসূরী দ্বৈপায়ন সেন, ধরিত্রী ভট্টাচার্য, দূর্বা ঘোষদের গবেষণাপত্রে স্থান পায়নি।

অত্যন্ত আশ্চর্য ও পরিতাপ বিষয়, বাংলার সেন্সাস দুর্নীতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটির ওপর লেখাগুলির কোন উল্লেখ ওই সময়ের ইতিহাস-রাজনীতির-অর্থনীতির ইতিহাস লিখতে থাকা বুদ্ধিজীবীদের গবেষণাপত্রে স্থান পায় নি। একবারের জন্যও শ্রী যতীন্দ্র মোহন দত্তের প্রবন্ধগুলি নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা বা তার কোন উল্লেখই করা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হল ভারতের সাত দশক ধরে যারা এই বিষয়গুলি নিয়ে ভারতবর্ষে কিংবা পশ্চিমবাংলায় বসে গবেষণা করেছেন তাঁরাও এই দুর্নীতির সাথে যুক্ত হলেন কিভাবে? আত্মঘাতী বাঙ্গালী হিন্দু জাতির ইতিহাসের ধারাবাহিকতা সত্যই বোঝা কঠিন! অন্তত যারা দেশভাগ, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, বাংলা প্রদেশের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন বই লিখেছেন তারাও এই বৌদ্ধিক এই দুর্নীতির সাথে যুক্ত? শ্রী যতীন্দ্র মোহন দত্তের উত্থাপিত সেন্সাস দুর্নীতির প্রবন্ধগুলি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে আরেকবার আমাদের সামনে নূতনভাবে গবেষণা সুযোগ এনে দিয়েছে। তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে ব্যবহার এবং ইতিহাসে রাজনীতির প্রেক্ষাপটগুলি নিয়ে নূতন ভাবে তর্ক-বিতর্ক ক্ষেত্র তৈরি হোক এই আশা রেখেই আমি বিষয়ান্তরে প্রবেশ করব।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের স্মরণে রাখা দরকার তা’ হল, ১৯৪৭ সালের ১৮ই জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমন্স সভায় কর্তৃক ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭’-এর অনুমোদন। এই আইনে পার্লামেন্ট অনুমোদিত ব্রিটিশরাজ শাসিত ভারতকে দুটি স্বতন্ত্র ডোমিনিয়ন-এ বিভক্ত করে সৃষ্টি করা হল – ভারত ও পাকিস্তান। এবং পাকিস্তান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বিভক্ত ছিল; অতীতের পূর্ব পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ নামক একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। দুটি পৃথক ডোমিনিয়নের সৃষ্টির কারণ ছিল মুসলিমদের পৃথক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং শিখ, হিন্দু পাঞ্জাবী ও বাঙ্গালী হিন্দুদের জন্য ভারত ডিমিনিয়নের মধ্যেই অবস্থান। শিখ ও পাঞ্জাবীদের স্বার্থরক্ষায় পাঞ্জাব প্রদেশ ও বাঙালী হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষার্থে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ গঠিত হয়েছিল। অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ গঠনে নাটকীয়তা বেশি হয়েছিল। এরর মূল কারণ, বিভাজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর নূতন করে ঐক্যবদ্ধ বাংলার একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের ধ্বনি তোলা হয়েছিল, কলকাতাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায়। বাস্তবে ১৯৪৭ সালের ১৮ই জুলাই ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’টি, ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষের ভূখন্ড ব্যবছেদের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ক্ষমতার হস্তান্তর প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়েছিল।

স্বাধীনত্তোরভারতে নেহেরু-ইন্দিরাবাদী কংগ্রেসী শাসনতন্ত্র এবং শাসনযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে স্বদেশী ও আত্মনির্ভরশীলতার ভারতীয় রাজনৈতিক অনুশীলনের ঐতিহ্যকেই ধ্বংস করেছে; ভারতীয়ত্ব-সার্বভৌমিকতা-স্বরাজের মনস্তাত্ত্বিক ভাবাদর্শ এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ঔপনিবেশিক পিতৃতান্ত্রিক আমলাতন্ত্র ভারতবর্ষের আধুনিক নির্মাণ পরিকল্পনাগুলি যেমন প্রভাবিত করেছে; তেমনি সর্বভারতীয় ও প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলগুলিও তোষণকামী স্থিতাবস্থামূলক নেহেরু-ইন্দিরাবাদী কংগ্রেসী শাসনতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক। এখানে কমিউনিস্ট ও অধিকাংশ আঞ্চলিকদলগুলিও নেহেরু-ইন্দিরাবাদী শাসনতন্ত্রের অনুসারী দোসরমাত্র। ব্যতিক্রম, কেবলমাত্র প্রাদেশিক ভাষা ও উন্নয়নমূলক স্বার্থজনিত প্রাদেশিক-স্বতন্ত্র শাসনকার্য পরিচালনাতেই তা সীমিত।

আমি এই পর্বের আলোচনায় বাঙালী হিন্দুর সম্প্রদায়ের মানুষ পূর্ব-পাকিস্তান ও অধুনা বাংলাদেশ থেকে দাঙ্গা, গণহত্যাজনিত কারণে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গে, আসাম ত্রিপুরা রাজ্যে রাজনৈতিক শরণার্থী ও উদ্বাস্তু হিসাবেই আশ্রয় নেবার দীর্ঘ ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকারের যে নির্লজ্জ ইতিহাস চর্চাকে সম্পূর্ণভাবেই একপেশে এবং অভিসন্ধিমূলক বলেই মনে করি। কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার ও সাময়িক সময়ের জন্য জনতা সরকারের বাঙালী হিন্দুদের জন্য গৃহীত উদ্বাস্তু নীতি এবং পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-যুক্তফ্রন্ট-কমিউনিস্টদের শাসনকালে গৃহীত উদ্বাস্তু নীতির অসাড়তা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার কতগুলি সংসদীয় দলিল আপনাদের কাছে তুলে ধরব। কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও আইনি পরামর্শদাতারা পরাম্পরাগতভাবেই বাঙালী হিন্দু উদ্বাস্তুদের সমস্যা নিয়ে উদাসীন এবং খানিকটা অনড় মনোভাব পোষণ করেছেন বর্তমান সন্দর্ভে তারও কিছু দলিল এখানে উপস্থাপিত করা হবে। অবশ্য দিল্লী-কলকাতার রাজনীতির আদর্শগত বুনন কিভাবে বাঙালী হিন্দুর স্বার্থ বিরোধী এক ঐতিহাসিক পরম্পরা সৃষ্টি করেছে সে সম্পর্কে তত্ত্বগত কিছু ভাবনাও আপনাদের সামনে রাখছি এবং এই নিয়ে খোলাখুলি বিতর্কও আহ্বান করছি।

স্বাধীনতাত্তোর ভারতবর্ষের রাজনীতির বেসাতি কংগ্রেস-কম্যুনিস্ট ঔরসজাত শাসকগোষ্ঠীবর্গের বোঝাপড়া ও কায়েমী স্বার্থ পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালী হিন্দুর স্বাধীন স্বতন্ত্র অস্থিত্বকেই আজ বিপন্ন করে তুলেছে। সর্বোপরি ভারত বিভাজনে সর্বাধিক ‘রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক’ভাবে বিপন্ন বাঙ্গালী হিন্দুর প্রান্তীয়করণের প্রয়াস এবং বাঙ্গালী হিন্দু উদ্বাস্তুর মর্যাদাসম্পন্ন পুনর্বাসন প্রদানে নেহেরু-ইন্দিরা কংগ্রেস সরকারের বিদ্বেষমূলক বঞ্চনার ঐতিহ্য আজও অব্যাহত। এই প্রসঙ্গে অবশ্যই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারের শাসনকালে হিন্দু বাঙ্গালী উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে নৃশংস মরিচঝাঁপি গণহত্যার (১৯৭৮-৭৯) পরও তিনদশকব্যাপী শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতির সাফল্য প্রশ্নাতীত। নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় হিন্দু বাঙ্গালীর স্বার্থবিরোধী একের পর এক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস-বামফ্রন্ট-তৃণমূল সরকার ও কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের বদান্যতায় প্রতিবেশী পূর্ব-পাকিস্তান ও অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ঐসলামিক মৌলবাদীরা ধারাবাহিকভাবে হিন্দু বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে সংগঠিত গণহত্যা ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতরাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতাসীন সরকারগুলির গণহত্যাজনিত কারণে বাঙ্গালী হিন্দুর উদ্বাস্তু হয়ে আসার ঘটনাগুলিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা এবং নীরবে তাদের ওপার বাংলা থেকে চলে আসার কাহিনী সংবাদপত্রগুলির পাতা থেকে চেপে দেওয়া; অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারীদের বৈধ-নাগরিকের মর্যাদা দিয়ে যে নক্কারজনক দুর্নীতি বিগত ৪০-৪৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ-আসাম-ত্রিপুরাসহ রাজ্যগুলিতে চলছে তা ইতিহাসে বিরল।

এ প্রসঙ্গে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, ভারতবর্ষে হিন্দু-বাঙ্গালীদের আশ্রয়গ্রহণ ও তার মূল কারণ বাংলাদেশে দশকের পর দশক ধরে তাঁদের উপর সীমাহীন ইসলামিক অত্যাচারের অসংখ্য তথ্য পশ্চিমবঙ্গ তথা বাকি ভারতবর্ষের দুর্নীতি ও কায়েমী স্বার্থে জড়িত সংবাদপত্র ও মিডিয়াগুলি বর্জন করেছে প্রতিবেশী বাঙ্গালাদেশের সঙ্গে তথাকথিত মৈত্রীর ভেঁপু বাজাতে। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবেই বাঙ্গালী-হিন্দুদের বঞ্চনার ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক আইনের তাঁদের রিফিউজি স্বীকৃতি প্রদানে অস্বীকারের প্রতিযোগীতায় নেহেরু-ইন্দিরা কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট দলগুলির কার্যকলাপকে হিন্দু-বাঙ্গালী-বিদ্বেষী শাসনতন্ত্র বললে অত্যুক্তি করা হয় না। প্রতিমুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু বাঙ্গালীর জল-জমি-সম্পত্তি লুণ্ঠন-হস্তান্তরের মাধ্যমে তাদের এই প্রান্তীয়করণ সমান্তরালভাবে অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭৭-২০১১ – বাম পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ২০১১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন মা-মাটি-মানুষ-এর সরকারেরও অনুসৃত নীতিসমূহ পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালী হিন্দুর আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব বিলোপের কার্যকাল। শিক্ষার বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত কিরূপ? উদাহরণ – বামফ্রন্ট সরকার তার প্রথম কার্যকাল থেকেই এবং বর্তমান তৃণমূল সরকার পশ্চিমবঙ্গে স্কুল থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও দেবনাগরীর পরিবর্তে বাংলা ভাষায় মাধ্যমে সংস্কৃত শিক্ষাচর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করে সামগ্রিকভাবে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার চর্চাকেই ধ্বংস করেছে। অথচ মাদ্রাসা শিক্ষা ও উর্দু-আরবী ভাষা শিক্ষার প্রসারে যথেচ্ছ আর্থিক অনুদানের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি,নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো।

হিন্দু অধ্যুষ্যিত এলাকায় সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক আর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই বিগত প্রায় ৪০ বছরের অধিক সময়ব্যাপী হিন্দুদের জন্য আরব-আব্রাহামিক সেক্যুলার শিক্ষা আর মুসলিম জনতার জন্য উর্দু-আরবী-ঐসলামিক শিক্ষার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাসকে মুছে ফেলার চক্রান্ত চলছে প্রচন্ড গতিতে। পৃথিবীর কোথাও কোন কমিউনিস্ট দল পরিচালিত সরকার হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের জন্য একরকম শিক্ষা আর মুসলিমদের জন্য পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষার এরকম নজির ইতিহাসে বিরল। এবং তথাকথিত সংস্কৃতিবান বামপন্থী বুদ্ধিজীবিরা এই সম্প্রদায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা্র মদতাদাতা হয়েও নিজেদের সাম্যবাদী কমিউনিস্ট বলে ঢাক পেটান! বাঙ্গালী হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে আসার নিদারুণ ইতিহাসগুলিকে এই সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা সংবাদপত্রের পাতা থেকে, সাহিত্যের পাতা থেকে, ইতিহাসের পাতা থেকে উধাও করে ন্যায় ও নীতির প্রতিমূর্তি সাজতে সচেষ্ট।

এই প্রসঙ্গে স্মরণে আসে ডঃ হরিপদ ভারতীর অনন্যসাধারণ অথচ (বর্তমানে) বিস্মৃতপ্রায় ভূমিকা।

১৯৭৭-৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের বাজেটে পরও সাপ্লিমেন্টারি এস্টিমেট হিসাবে আনা আর্থিক অনুমোদনের জন্য বিলগুলি নিয়েও বিধানসভার আলোচনায় বিপক্ষে দাঁড়িয়ে শ্রী হরিপদ ভারতীর সমালোচনামূলক বক্তব্যগুলি সমকালীন সময়ে তো বটেই আজও সংসদীয় রাজনীতির মূল্যবান দলিল। বর্তমান সংসদীয় রাজনীতির গুণগত মানের যে অধঃপতন ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে–তার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রয়াত শ্রীহরিপদ ভারতী মহাশয়ের (ওয়েস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ আসেমব্লী ১৯৭৭ সালের ৬৬তম অধিবেশন থেকে ১৯৭৯ সালের ৭৪তম অধিবেশন) উত্থাপিত বক্তব্যগুলি বর্তমান ভারসাম্য-স্থিতাবস্থা-কায়েমী স্বার্থগোষ্ঠী রক্ষার সংসদীয় রাজনীতির কাছে কিছুটা বেমানান হলেও আমরা ব্যতিক্রমকেই তুলে ধরতে দায়বদ্ধ। শ্রী হরিপদ ভারতীর মহাশয়ের মূল্যবান রাজনৈতিক বক্তব্যগুলির মাধ্যমেই আমরা পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের ভিত্তিপ্রস্তর যুগের ইতিহাসকেও আমরা ফিরে দেখব। এক্ষেত্রে সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাঙ্গালী হিন্দু উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা-কর্মসংস্থান সহ বিভিন্ন বিষয়গুলি সম্পর্কে প্রয়াত মাননীয় শ্রীহরিপদ ভারতীর বক্তব্যগুলিই বর্তমান সন্দর্ভে স্থান পেয়েছে।

প্রথমেই ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট সরকারের উদ্বাস্তু ও পুনর্বাসন মন্ত্রী শ্রীরাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জী (সিপিআইএম) ২১শে সেপ্টেম্বর যে ডিমান্ড-৪৪ পেশ করেছেন এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন কেন্দ্রের জনতা সরকারের উদ্বাস্তুনীতির সমালোচনা করেই তিনি যে বক্তব্য পেশ করেছিলেন তার কিছু অংশ তুলে ধরা হল। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা দরকার যেখানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) কেন্দ্রের উদ্বাস্তু নীতির সমালোচনা করছেন, সেখানে তাঁরাই কিভাবে দণ্ডকারণ্যের ও বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের স্বতন্ত্র প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা নিজেদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করতে কিভাবে গণহত্যা ঘটিয়েছিল তার কিছু ইঙ্গিতও এখানে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে যে ইসলামিক শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারে মানসম্মান-আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচবার জন্য যাঁরা এদেশে এসেছিলেন, সেই ভারতবর্ষের বাংলা হিন্দুদের জন্য সৃষ্ট ভূখন্ড পশ্চিমবঙ্গেই এই মরিচ্‌ঝাপি উদ্বাস্তু জনপদের ওপর নারকীয় আক্রমণ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়ে বাঙালী হিন্দু উদ্বাস্তু জনতার ভোটে তিনদশক ধরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) দলকে ক্ষমতায় টিকে থাকার ইতিহাসও নিঃসন্দেহে এই রাজ্য রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের কারুশালাও বটে। উদ্বাস্তুদের ওপর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) মদতপুষ্ট পুলিশি-পার্টি ক্যাডারবাহিনীর অভিযান ও তাকে আদালতের কাছে ন্যায়সঙ্গত প্রশাসনিক কার্যকলাপ হিসাবে প্রমাণের ইতিহাসটি যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুবাঙালী উদ্বাস্তুরা মেনে নিয়েছিল, সেই শ্মশানের নীরবতা যে কোন জাতির ইতিহাসের এক নির্লজ্জ ঘটনা বলেই ধীকৃত হবে।

মন্ত্রী রাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জীর বক্তব্যে (ওয়েস্ট বেঙল লেজিসলেটিভ আসেমব্লি, ৬৬তম অধিবেশন, অগাস্ট-অক্টোবর; ১৯৭৭ ২১ সেপ্টেম্বর, পৃষ্ঠা ৪৭০।) ডিমান্ড নম্বর ৪৪—“Sir, on the recommendation to the Governor I beg to move that a sum of Rs. 14,71,90,000 be granted for expenditure under Demand No. 44, Major Heads: “288-social security and Welfare (Relief and Rehabilitation of Displaced Persons), 488-capital Outlay on Social Security and Welfare (Relief and Rehabilitation of Displaced Persons) and 688-Loans for Social Security and Welfare (Relief and Rehabilitation of Displaced Persons)”.

মাননীয় মন্ত্রীর দীর্ঘ বক্তব্য-এর আগে ওনার আনা ব্যয়মঞ্জুরির প্রস্তাবের বয়ানগুলির দিকে আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দেখুন কোথায় সেখানে উদ্বাস্তু বা refugee শব্দটিরই উল্লেখ নেই; রয়েছে displaced অথবা বাস্তুচ্যুত শব্দটি। অর্থাৎ তারা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ভারতের কোন একটি জায়গা থেকে বা পশ্চিমবঙ্গে কোন জায়গা থেকে উন্নয়নমূলক কর্মসূচীর জন্য ব্যস্তুচ্যুতের জন্য হলেই সেক্ষেত্রে ‘Displaced’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। বিদেশী কোন রাষ্ট্র থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আমরা কখনই ‘Displaced’ বা বাস্তুচ্যুত বলতে পারি না। অথচ মন্ত্রীমহোদয় দপ্তরের ব্যয় মঞ্জুরির প্রস্তাবে কোথায় ‘রিফিউজি’ শব্দটির উল্লেখ নেই অথচ বা রাজনৈতিকভাবে শরণার্থী উদ্বাস্তুদের জন্যই এই ব্যয় মঞ্জুরি করা হচ্ছে; অথচ মন্ত্রালয় বা দপ্তরের নামের ক্ষেত্রে রিফিউজি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এরকম বিচিত্র সাংবাধানিক-আমলাতান্ত্রিক-রাজনৈতিক বোঝাপড়ার নিদর্শন পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আছে কিনা পাঠকের জানা থাকলে অবশ্যই অবগত করবেন।

বাস্তবে ভারত সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার কারুর পক্ষেই আর্থিক ব্যয় মঞ্জুরির জন্য মানি বিলের প্রস্তাবে “রিফিউজি’ শব্দটির ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কেননা ভারতের সংবিধানে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিবিধানের কথা বলা হয়নি। ভারতরাষ্ট্রের কাছে শরণার্থী একজন ‘ব্যক্তি’ বটে, মূলত এই দিক থেকে সেই ‘ব্যক্তি’ ভারতের সংবিধানের অধীনে সুরক্ষিত। যেহেতু শরণার্থীদের বিষয়ে কোনও আইন এখনও পর্যন্ত ভারতের সংবিধানে স্থান পায়নি। এমনকি, ভারত সরকার ১৯৫১ সালের United Nations High Commissioner for Refugees (UNHCR) কনভেনশনে বা ১৯৬৭ সালে United Nations High Commissioner for Refugees (UNHCR) রিফিউজি প্রোটোকলের মধ্যে নিজেকে অন্তর্ভূক্ত করেনি; ১৯৪৮-এর মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর সত্ত্বেও। যদিও বর্তমানে এই রাজনৈতিক শরণার্থীদের নিয়ে অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন যে দেশের মধ্যে কোনও আইন পাস না হলেও আন্তর্জাতিক চুক্তির বিধানগুলি এক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা পেয়েছে এবং সম্ভবত পৌর আইনগুলির সাথে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, এবং পৌর আইনগুলির অসাড়তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে দেশীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য বিবেচিত হতে পারে এই ইঙ্গিতের কথা আজকাল মানবাধিকার কর্মী ও তাঁদের আইনি তাত্ত্বিকগণ বলছেন। এছাড়াও, ভারতের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণের কথা বলা হয়েছে।

তাই মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গির নিয়েই ভারতে শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে ভারতরাষ্ট্র ‘এলিয়েন’ শব্দটির প্রয়োগ বা ব্যবহার করে থাকে। এলিয়েন শব্দটি ভারতীয় সংবিধানে ভারতীয় সংবিধানের (অনুচ্ছেদ ২২, অনুচ্ছেদ ৩ এবং এন্ট্রি ১৭, তালিকা ১, তফসিল ৭) এবং ভারতীয় নাগরিকত্বের ধারা ৩ (২) (খ) এ প্রদর্শিত হয়েছে আইন, ১৯৫৫, পাশাপাশি কিছু অন্যান্য আইন। ভারতে বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণকারী আইনগুলি হ’ল বিদেশী আইন, ১৯৮৬ যার অধীনে কেন্দ্রীয় সরকার ভারতে এলিয়েনদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, তাদের উপস্থিতি এবং সেখানে থেকে প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত; এটি কোনও ‘বিদেশি’ অর্থ ‘এমন এক ব্যক্তি যিনি ভারতের নাগরিক নন’ বোঝায়। রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯৯৯-এ বিদেশী প্রবেশ,উপস্থিত থাকা এবং ভারত থেকে প্রস্থান করার নিবন্ধকরণ সম্পর্কিত কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও, পাসপোর্ট আইন, ১৯২০ এবং পাসপোর্ট আইন, ১৯৬৭ ভারতে প্রবেশের জন্য পাসপোর্টের শর্ত আরোপ করার এবং ভারতের নাগরিকদের ভারত থেকে প্রস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য পাসপোর্ট এবং ভ্রমণের দলিলপত্র জারি করার ক্ষমতা সরকারের সাথে রয়েছে।

ওপরের আলোচনা থেকে পাঠকদের বুঝতে অসুবিধা হয়’না যে ‘ভারত রাষ্ট্র’ বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় কোনভাবেই ‘রিফিউজিদের আইনি স্বীকৃতি অধিকার পাবার কোনভাবেই সম্ভব নয়। উলটো নাগরিকত্ব ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনটি এমন ভাবে করা হয়েছে যার দ্বারা ভারত সরকার চাইলেই যে কোন উদ্বাস্তু’কে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবেও ঘোষণা করতে পারে এবং করেও। তাই জন্য নাগরিকত্ব আইনে সংশধোনী এনে ভোট রাজনীতিতে কলকে পেতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ‘মাইগ্রেন্ট ‘অবৈধ বসবাসকারীদের’, জন্য বিল আনতে হয়; যাকে নিয়ে চলে আরেক রাজনৈতিক তরজা ও setting রাজনীতি। এই জন্যই কয়েক দশক অন্তর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ থেকে আসা বাঙালী হিন্দু রাজনৈতিক শরণার্থীদের আইনি স্বীকৃতি নিয়ে চলে দীর্ঘ রাজনৈতিক কায়েমী স্বার্থের সাপ-লুডুর খেলা, যাতে বলি হয় উদ্বাস্তু জনতা। মূলত অসম-পশ্চিমবঙ্গসহ-ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন পূর্ব ও উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে এই ইস্যুতে রয়েছে নানা বঞ্চনা-মিথ্যাচারের নজির; রয়েছে আইনপ্রেণেতা-বিচারালয়-আমলাতন্ত্রের বোঝাপড়ায় চলা উদ্বাস্তুদের নিয়ে রাজনৈতিক-দুর্নীতির সাতকাহন।

পুনরায় ফিরে আসি বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী রাধিকারঞ্জন ব্যানার্জীর বক্তব্যে (ওয়েস্ট বেঙল লেজিসলেটিভ আসেমব্লি, ৬৬তম অধিবেশন, অগাস্ট-অক্টোবর; ১৯৭৭ ২১ সেপ্টেম্বর, পৃষ্ঠা ৪৭০-৪৭৯।) — “মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, বড় ক্ষোভ ও দুঃখের সঙ্গে এই বিধানসভায় মাননীয় সদস্যদের কাছে এবং ৪৪ নম্বর ব্যয়মঞ্জুরির অন্তর্গত পুনর্বাসন দপ্তরের ১৯৭৭-৭৮ সালের ব্যয়-বরাদ্দের দাবি উপস্থিত করতে হচ্ছে। কিঞ্চিত ছ’মাস আগে বামপন্থী সরকারের উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের সংকল্প বিধৃত প্রথম বাজেট অনেক আশা নিয়ে পেশ করেছিলাম, কিন্তু এই ক’মাসের কার্যকালে কেন্দ্রীয় জনতা সরকারের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত নীতিগত মনোভাব আমাদের আশাহত করেছে। গত ৩০ বছরের কংগ্রেস সরকারের উদ্বাস্তু-স্বার্থ বিরোধী নীতি পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুগণের পুনর্বাসন তো দিতেই পারেনি, বরং পুনর্বাসনের নামে কেন্দ্রের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের কাছ থেকে পাওয়া টাকার অপচয় ও অপব্যয় হয়েছে। ……… গত বাজেট বক্তৃতায় এই আশা ব্যক্ত করেছিলাম যে, কেন্দ্রে নতুন জনতা সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ায়, পরিবেশ ও পরিস্থিতির যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কেন্দ্রীয় সরকার আগেকার কংগ্রেস সরকার অনুসৃত উদ্বাস্তু স্বার্থবিরোধী নীতি পরিত্যাগ করে এমন এক সার্বিক নীতি অনুসরণ করবেন যা পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু ভাই-বোনদের পুনর্বাসনকে সুষ্ঠ ও ত্বরান্বিত করবে। …… অত্যন্ত ব্যথিতচিত্তে পশ্চিমবাংলার শরনার্থীগণ লক্ষ্য করছেন যে, কেন্দ্রের জনতা সরকার কংগ্রেসি সরকারের ত্রিশ বছরের সেই পুরোনো পুনর্বাসন নীতিকেই আঁকড়ে ধরে আছেন। যে প্রগতিশীল ও সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাবের সাথে সেই পুরোনো পুনর্বাসন সমস্যা সমাধানের সর্বাত্মক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, জনতা সরকারের পুনর্বাসন নীতি—সে হিসেবে এখনও পর্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। ………”

কেন্দ্রে জনতা সরকার ও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমরা ভেবেছিলাম যে উভয় সরকারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে কোনও অসুবিধে হবে না। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেন্দ্রের জনতা সরকার আমাদের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন নীতিগুলির যৌক্তিকতাটুকুও উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে তেমন কোনও লক্ষ্যণ দেখা যায়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ,– উদ্বাস্তুদের দেয় জমির নিঃশর্ত মালিকানা দেওয়ার দাবি নিয়ে আমরা কেন্দ্রের জনতা সরকারের কাছে দরবার করতে গিয়েছিলাম কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁদের কাছ থেকে কোনও ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে আশার কথা, আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লীস্থ ‘লীজ’ দেওয়া জমির নিঃশর্ত মালিকানা দেওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে আমরা জানিয়েছিলাম যে পূর্ববঙ্গে ফেলে আসা-সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের দাবি দাখিলের সময়সীমা ৩১শে ডিসেম্বর, ১৯৭৭ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হোক, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, কেন্দ্রীয় সরকার সে অনুরোধ রাখেননি। তবে একথা পরিষ্কার ভাবে বলতে চাই যে, জমির নিঃশর্ত মালিকানার নীতি ভারত সরকার যদি অনুমোদন না করেন তবে, প্রয়োজন হলে আন্দোলনের পথ গ্রহণ করে পুনর্বাসন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমরা করব। …………।” কথাগুলি শুনলে মনে হয় তাঁরা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে কতখানি আন্তরিক এবং দৃঢ়তাপূর্ণ রাজনৈতিক সচেতন দল। বাস্তবে ঘটে তার উল্টোটাই।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০-এর দশক পর্যন্ত সিপিএম দল যাদবপুরসহ দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ জবর-দখল কলোনি অঞ্চলে লীজ দলিল দেবার জন্য প্রচারে মাধ্যমে বলা শুরু করলে উদ্বাস্তু কলোনী কমিটিগুলি সমবেত যৌথ আন্দোলনের মাধ্যমে তার বিরোধীতা করে। কলোনি কমিটিগুলি সিপিএম দ্বারাই ৭০-এর দশক থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছিল। কলোনি কমিটিগুলি লিজ দলিল প্রদানের বিরুদ্ধে সমবেত আন্দোলন শুরু করলে, সিপিএম দল চাপে পড়ে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নিঃশর্ত দলিলের কথা বলতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে সমগ্র যাদবপুর অঞ্চলের প্রবীণ আর.এস.পি নেতা তথা শহীদস্মৃতি কলোনির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সমগ্র যাদবপুর অঞ্চলে উদ্বাস্তু আন্দোলনের প্রাণপুরুষ প্রয়াত শ্রীসুধীর মুখটী মহাশয়ের নাম অবশ্যই স্মরণীয়। মূলতঃ যাদবপুর অঞ্চলে উদ্বাস্তু কলোনীগুলির নিঃশর্ত দলিল প্রাপ্তির আইনি স্বীকৃতি লাভে পেতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে তৎকালীন যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সদর্থক ভূমিকাও ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জবর-দখল উদ্বাস্তু কলোনীগুলি রাজ্য সরকারের খাস জমিতে কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে ৩৫-৪০ বছর ধরে বসবাস করলেও তাদের নিঃশর্ত দলিল প্রদানের কোন উদ্যোগই সিপিএম গ্রহণ করেনি। অবশ্য তাঁদের দীর্ঘদিন বসবাসের কিছু আইনি বৈধতা ও কলোনির নাম ও প্লটনম্বরসহ নথিভূক্তকরণে কাজ তারা করেছে। এবং এর ভিত্তিতেই শাসনক্ষমতায় থাকার সুবিধাকে ব্যবহার করে তাদের দীর্ঘ অনুগত ভোটারদের তালিকা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ধারবাহিকভাবে এই জবর-দখল উদ্বাস্তু এলাকাগুলি থেকেই সিপিএম দল একের পর এক নির্বাচনে ভোটদাতাদের সমর্থন পেয়েছে।

পাটুলি-পঞ্চশায়র অঞ্চলে ‘সত্যজিত রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ তৈরির সময় যে সমস্ত বুদেরহাটের চাষীদের জমি তারা অধিগ্রহণ করেছিল তাদেরকে ক্ষতিপূরণ বাবদ সিপিএম এর কৃষকসভার ( দীপক দত্ত, কচি দাস, গৌরাঙ্গ, জয় নস্কর, স্থানীয়ভাবে এদের দ্বারাই জমি বন্টনের প্রক্রিয়াগুলি পরিচালিত হতো) নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে পার্শ্ববর্তী চকবনিয়াগাছি মৌজার কাঁটা-হোগলাবন দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় জমি প্রদান করা হয়; অথচ আশ্চর্যভাবে সেই জমির প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে কোন বৈধ দলিল এবং মিউটেশনগত আইনসঙ্গত প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়িত করা হয় না। পরবর্তীকালে সেই বুদেরহাটের চাষীরা চাষবাস ছেড়ে বিভিন্ন পেশার যুক্ত হয়, এবং কেউ কেউ আবার ক্ষমতাসীন দলের সাথে গাঁটছাড়া বাধার সুবিধে নিয়ে তাদের নামের জমিগুলি বাড়তি শহরের সম্প্রসারণের সুযোগ বিক্রি করে অন্যত্র চলে যায়, আবার কেউ কেউ সেই জমিগুলি আগলে রেখে পরবর্তীকালে চড়া দামে হস্তান্তর করে দেয় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে। এই অবৈধভাবেজমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া মুকন্দপুর, অজয়নগর, পঞ্চশায়র অঞ্চলে আজও অব্যাহত ২০টাকার স্ট্যাম্প পেপারে (স্থানীয় ভাষায় কলাপাতার দলিল)। বর্তমান ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত এই অঞ্চলে জমির মালিকানা হস্তান্তর এবং সময়ের সাথে সাথে আবাসন, ফ্ল্যাট তৈরির প্রক্রিয়াতে তাই স্থানীয় থানার পুলিশ এবং তা স্থানীয় কাউন্সিলর যোগসাজস এবং অবৈধ নির্মাণকার্যকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার রাজনীতি-দুর্নীতি-তোলাবাজি সবকিছুই বিশ শতকের শেষ পর্যায় থেকে বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। এই অঞ্চলে বহু জলাভূমি বুজিয়ে আবাসনও তোলা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল জমিগুলির আইন সম্মত স্বীকৃতি না থাকায় শাসকদলের স্থানীয় কেষ্ট-বিষ্টুর সাথে থানার পুলিশ যৌথভাবে ভয় দেখিয়ে উদ্বাস্তু কলোনিগুলির জমিতে নির্মাণকার্যে বাঁধাসৃষ্টি করে এবং জমি মাফিয়া-প্রমোটার-সিন্ডিকেট-চক্র একত্রে এই জবর-দখল কলোনির জমিগুলিকে কেন্দ্র করে চলে অবৈধ-নির্মাণকেন্দ্রিক রাজনৈতিক-অর্থনীতি; যা একত্রে রাজনৈতিক দল-স্থানীয় আইনের রক্ষক-অদক্ষ বেকার পার্টি সমর্থকদের আর্থিক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুইয়েরই চাহিদা পূরণ করে। এই জন্য কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে কলকাতা পুরসভার ও বিধাননগর পুরসভার মধ্যে গড়ে ওঠা জবর-দখল কলোনিগুলিতে পাড়ায় পাড়ায় বাড়ি-ঘর নির্মাণের ওপর চলে নজরদারি এবং কোন নির্মাণকার্য শুরু হলেই সিভিক ভলেন্টিয়ার বা অন্য কোর মাধ্যমে থানায় ডেকে পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনা এই অঞ্চলে রীতিমতো সর্বজন স্বীকৃতি নিয়ময়াফিক ব্যবস্থাপনা। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি-কাউন্সিলর-শাসক দলের কেষ্ট-বিষ্টুদের সাথে পুলিশের আঁতাতে সিণ্ডিকেট-প্রোমোটারি ব্যবসার নামে চলে সাধারণ মানুষের কার্যকলাপে ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ ও ব্যক্তি জীবনকে নিয়ন্ত্রণের ঘটনাও।

পুনরায় ফিরে আসি রাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জীর ডিমান্ড ৪৪-এর প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থনে ১৯৭৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় দাঁড়িয়ে শ্রীহরিপদ ভারতী মহাশয় বাংলাদেশ থেকে বাঙ্গালী হিন্দু উদ্বাস্তুদের বঞ্চনার কথা প্রকাশ্য বিধানসভায় যেমর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছিলেন তার নজির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ইতিহাসে খুব অল্পই আছে। সেদিন বিধানসভার কক্ষে শ্রী হরিপদ ভারতী তাঁর বক্তব্যকে যে ভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন তা আপনাদের কাছে হুবহু রাখা হল (ওয়েস্ট বেঙল লেজিসলেটিভ আসেমব্লি, ৬৬তম অধিবেশন, অগাস্ট-অক্টোবর, ১৯৭৭ পৃষ্ঠা ৪৮০-৪৮৪।) — “মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আজকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী তাঁর বিভাগের ব্যয়বরাদ্দের যে প্রস্তাব এখানে রেখেছেন জনতা পার্টির পক্ষ থেকে আমি সেই প্রস্তাব সমর্থন করতে দাঁড়িয়েছি। মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের দেশের নিত্যসঙ্গী। প্রতি বৎসর হয় অনাবৃষ্টি নয়-খরা, মাটি দীর্ন বিদীর্ন হয়, শস্য ভস্মীভূত হয়, পীপাসায় কণ্ঠনালী শুষ্ক হয়ে যায়, আর না হয় অতিবৃষ্টি হয়, বন্যায় শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়ে যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ বিপন্ন বোধ করে। এই প্রাকৃতিক দূর্যোগে আর্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো প্রতিটি সুস্থ সচেতন সরকারের কর্তব্য। আপনার সরকারও সে কর্তব্য পালন করেছেন। সে জন্য নিশ্চয় আমি তাকে সাধুবাদ প্রদান করব। তবে এই প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে এই যে, তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে কিনা তাতে আমাদের যে সংবাদ এসেছে তাতে করে মাননীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী যে পরিমাণ ত্রাণের সংবাদ আমাদের কাছে দিয়েছেন ততখানি ত্রাণ আর্ত মানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে কিনা তাতে আমাদের সন্দেহের অবকাশ আছে। অনেক স্থানের সংবাদ আমরা পেয়েছি যেখানে আর্ত মানুষেরা এই সরকারের কাছ থেকে বিশেষ কোনও ত্রাণ পায়নি, প্রয়োজনীয় সাহায্য পায়নি। প্রয়োজনীয় সাহায্য পায়নি বলে মানুষ আজও বিপন্ন বোধ করছে। কাজেই তারা প্রচুর অর্থ ব্যবয় করেছেন বলে যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন সেই চিত্রের সঙ্গে আমাদের চিত্রের সংবাদের সঙ্গে মিলন হয়না—তাই আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, এই বন্যাকে কেন্দ্র করে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এই বিধানসভা কক্ষে আমাদের সকলকে জ্ঞাত করেছিলেন যে, এই ত্রাণ কার্য পরিচালনার সময় সর্বদলীয় সংস্থাকে গ্রহণ করে এবং বিধানসভার সমস্ত মাননীয় সদস্যের সহযোগিতা নিয়ে তাঁরা ত্রাণকার্য সম্পন্ন করবেন। কিন্তু অনেক স্থানের সংবাদ আমাদের কাছে আসে যেখানে সম্পূর্ণ দলীয়ভাবে আপনাদের সরকার এই ত্রাণ কার্য সম্পন্ন করবার চেষ্টা করেছেন। অন্য দলের কর্মীদের, অন্য দলের নেতাদের, অন্য দলের মাননীয় বিধান সভার সদস্যদের সহযোগিতা তাঁরা প্রার্থনা করেননি। সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করলেও তাঁরা সেই হস্ত গ্রহণ করেন নি। এটা দুঃখের কথা আমি আজকে আপনার কাছে নিবেদন করতে চাচ্ছি এবং আপনার মাধযমে মাননীয় ত্রাণ মন্ত্রীর কাছে বলতে চাচ্ছি যে ভবিষ্যতে কোনও ত্রাণ কার্যের জন্য দুর্ভাগ্যকে যদি বহন করতে হয় সেদিন যেন সমস্ত দলমত নির্বিশেষে সকল বিধানসভার সদস্যদের সহযোগিতা আন্তরিক ভাবে তিনি প্রার্থনা করেন এবং সেই সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত হলেও তাকে যেন বিমুখ করে না দেন এই অনুরোধ আমি তাঁর কাছে রাখছি।”

“সঙ্গে সঙ্গে আজকে আপনার কাছে এই বক্তব্য রাখতে চাই, মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আজকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও, যে মনুষ্যকৃত দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক দুর্যোগ এবং যার ফলশ্রুতি হচ্ছে এই উদ্বাস্তু সমস্যা। মাননীয় ত্রাণ মন্ত্রী এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং বিভিন্ন সমস্যাকে আপনাদের কাছে বলতে চাই। মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় বলেছেন পশ্চিমবাংলার জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ হচ্ছে উদ্বাস্তু। নিঃসন্দেহে পশ্চিমবাংলার জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ কেন, হয়ত আরো কিছু বেশি হতে পারে, যাঁরা পূর্ব বাংলা থেকে এসেছেন। একদা পূর্ব বাংলা বলে কোন স্বতন্ত্র রাজ্য ছিলনা। পশ্চিমবাংলায় মানুষ কাতারে কাতারে সেই দেশ থেকে নানা কারণে এমনিতেই এদেশে এসেছে। তাদের সকলের পুনর্বাসনের দায়িত্ব কোনও সরকারকে নিয়ে হয়েছে এটাও সত্যি কথা নয়। অনেকে নিজেরাই নিজেদের আত্মীয়স্বজনের সাহায্যে পুনর্বাসিত হয়েছে, এখানে সম্পূর্ণ নাগরিকের জীবন যাপন করছেন। উদ্বাস্তু সমস্যাটাকে যদি বিপূল একটা কলেবর সমস্যা বলে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করি তাহলে হয়ত আমরা সত্য চিত্র পাবো না। একথা আমি প্রথমে আপনার কাছে নিবেদন করতে চাই এবং যে উদ্বাস্তুরা আমাদের দেশে এসেছে তাদের পুনর্বাসনের প্রতি সম্পূর্ণ দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করেছেন এবং মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সরকার, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম বাংলার উদ্বাস্তু সমস্যার দিকে যথোচিত দৃষ্টি দেননি—দিতে পারেননি কেন জানিনা, তবে দেননি। আমি তুলনামূলক বিচার করে আজকে এখানে কোনও প্রাদেশিকতার পরিবেশ তৈরি করতে চাইব না। তথাপি একথা সত্য যে অন্যান্য অঞ্চলের উদ্বাস্তুরা সরকারের কাছে যে সহানুভূতি পেয়েছেন, পূর্ববাংলা থেকে আগত ছিন্নমূল দুর্ভাগ্যপীড়িত উদ্বাস্তুরা ঠিক ততখানি কেন্দ্রীয় সরকারের বদন্যাতা অতীতে পাননি, এটা সত্য কথা। তথাপি আজকে তুলনা করব না। তথাপি একথা বলব যে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন এই পুনর্বাসনের জন্য তত পরিমাণ অর্থ তাঁরা ব্যয় করতে পারেননি। অতএব পুনর্বাসনের দায়-দায়িত্ব তদানীন্তন হোক আর বর্তমান হোক কেন্দ্রীয় সরকারের স্কন্ধে ন্যস্ত করে রাজ্য সরকার যদি নিরঙ্কুশ থাকতে চান তাহলে নিশ্চয়ই এটা সত্যের অপলাপ হবে। অতএব দায় দায়িত্ব আমরাও বহন করেছি।

আমরা আমাদের সত্যিকারের দায়িত্ব বহন করিনি। আমরা পুনর্বাসনের প্রতি যথোচিত মনোযোগ দিইনি, তাকে গুরুত্ব দিইনি, একথা সত্য। সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাছে একথা বলব যে, আমরা আগেও দেখেছি, অনেক উদ্বাস্তু আছে যারা ১৫-২০ বৎসরকার বসবাস করছেন। তাঁরা সম্পূর্ণ নাগরিকের জীবন যাপন করছেন। কেন্দ্রীয় সরকার হোক বা রাজ্য সরকার হোক, কারোর উপর কোনও দায়িত্ব তাঁরা দেননি। তথাপি তাঁরা আজও নাগরিকত্ব পাননি, নাগরিকের মর্যাদা পাননি, তাঁদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি। নিশ্চয়ই এই দায়িত্ব আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের স্কন্ধে ন্যস্ত করে আমাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারিনা। আমরা তাদের নাগরিকত্ব দেব, তাদের ভোটাধিকার দেব, পশ্চিমবাংলার নাগরিকদের সঙ্গে একাত্মা করে দেব, পশ্চিম বাংলার জীবন সংস্থার সঙ্গে তাদের শরিক করে নেব। আমি তাই আজকে মাননীয় পুনর্বাসন মন্ত্রী মহাশয়ের কাছে আমার অন্যনতম আবেদন উপস্থাপন করতে চাইছি, তিনি স্বয়ং বলেছেন যে অনেক জবরদখল কলোনির নাম আছে, যারা আজও জীবিত আছে। জবরদখল প্রারম্ভে ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু বর্তমানে নিশয়ই জবর দখল কলোনিগুলোকে চিহ্নিত করা যায়না। তাঁরা জমি কিনেছেন, বসবাস করছেন, সর্বপ্রকার সুস্থ নাগরিকের জীবন-যাপন করছেন, কিন্তু জমির মালিকানার আইনগত দলিল তাঁদের কাউকে প্রদান করেননি। নিঃসন্দেহে মন্ত্রী মহোশয়ের কাছে আমার এই আবেদন এবং আমার বিশ্বাস, তিনি সেই ভাবে তাদের দলিল-পত্র দিয়ে, তাঁদের জমির মালিকানা দিয়ে সম্পূর্ণ ভাবে তাঁদের দখলটাকে বৈধ করবার ব্যবস্থা করবেন, সেকথাই তাঁকে বলব এবং মন্ত্রী মহাশয় স্বয়ং উপলব্ধি করেছেন যে শুধু জমি দিলে, একটা ঘর দিলে, ঘর বাঁধবার জন্য কিছু পয়সা দিলে বা সরকারি সাহায্য তেমন ভাবে পৌঁছে দিলেই পুনর্বাসন হয়না।

যদি তার ব্যবস্থা না থাকে—চাকরি হোক, ব্যাবসা-বাণিজ্য হোক বা অন্য কোনও ব্যবস্থার মধ্য থেকে তারা যদি সত্যি সত্যি আজকে জীবিকা স্বাধীন ভাবে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করতে না পারে তাহলে তাদের পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই আপনি সেদিকে লক্ষ্য রেখেছেন, এই ভাষণের মধ্যে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দেবেন, সেই জন্য জনতা পার্টির পক্ষ থেকে আমি আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদান করছি। সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাছে অকপটে এই এবেদনটুকু পৌঁছে দিতে চাইছি, শুধু ঘোষণা করে, শুভ সংকল্প উচ্চারণ করে যেন আপনি আপনার কর্তব্য শেষ করবেন না, আগামীকাল যেন আমরা এই জিনিস দেখতে পাই, যে আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন, তাদের জীবিকা দেবার জন্য ন্যায় সঙ্গত ভাবে নিষ্ঠা সহকারে আন্তরিক ভাবে প্রয়াস পেয়েছেন—প্রয়াস বড় কথা, সাফল্যের দ্বারা আমরা বিচারের মান দণ্ডকে পরিচালিত করব না, আপনারা আন্তরিক প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে আপনাকে আমরা সাধুবাদ জানাব।

কিন্তু এই সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাছে আজকে আমি এই কথা বলতে চাই, প্রতিদিন সংবাদ পত্রে দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে নানা কলঙ্কজনক কাহিনীর খবর। নানা নির্যাতনের কাহিনী এসে পৌঁছচ্ছে নানা ভাবে, ব্যাভিচার সেখানে চলছে। নানা ভাবে উৎপীড়ন চলছে। আপনি নিশ্চয়ই সরকারের তরফে থেকে ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী রূপে দায়িত্ব বহন করবেন, এবং এই অত্যাচারের যেন অচিরে বন্ধ হয় বা তাদের উপর এই ভাবে উৎপীড়ন যেন না চলে, সেদিকে আপনি আপনি দৃষ্টি প্রসারিত করবেন। আজকে সংবাদ পত্রে আছে দিল্লি ক্যাম্পে কিভাবে নির্যাতন ঘটেছে, সেখানকার উধ্বর্তন কর্মচারিরা বলছেন যে এই শরণার্থীরা কি সাহস লাভ করেছে, যে সাহসের মধ্যে দিয়ে তারা এই ভাবে নালিশ করতে পেরেছে, তারা এইভাবে সমস্ত সংবাদ পত্রে, সমস্ত মানুষের কাছে বলবার দুঃসাহস অর্জন করে—এই যদি মনোভাব হয়, এই কর্মচারিদের উপর যদি দায়িত্ব ন্যস্ত করে কেন্দ্রীয় সরকার হোক, রাজ্য সরকার হোক, নিশ্চিন্তে থাকেন তাহলে পুনর্বাসনের পরিবর্তে আপনারা তাদের পুনরায় নির্বাসনে প্রেরণ করুন, আমি সাধুবাদ জানাব। কারণ এই সরকারি অত্যাচার, নিপীড়নের মাধ্যমে যেন উদ্বাস্তুরা না বসবাস করে, এই আপনার কাছে আমার আবেদন এবং এই প্রসঙ্গে আমি আপনার কাছে মানা ক্যাম্পের কথা বলতে চাই। মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আপনি এবং আজকে ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী নিজে অবগত আছেন, এই মানা ক্যাম্পে ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭০ সালসাল এই ১৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এবং সেখানে ১৭ লক্ষ উদ্বাস্তুর আশ্রয় শিবির তৈরি হয়েছিল।

কালক্রমে সেখান থেকে ৬ লক্ষ উদ্বাস্তুকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে, মহারাষ্ট্রে, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, প্রভৃতি স্থানে তাদের পুনর্বাসনের নামে যে’ভাবে সরকার প্রহসন করেছেন, সামান্য একটু জমি দিয়েছেন, যে জমিতে কাঁকর, যে জমিতে বালি, শস্য উৎপাদন করা যায় না, যেখানে পাহাড়, জঙ্গল, দুর্গম অরণ্য যেখানে শ্বাপদ সংকুল, মানুষ জন নেই, কোনও কিছু নেই, সেখানে মানুষগুলোকে উপস্থিত করে বলা হল, তোমাদের আমরা পুনর্বাসন দিলাম। এই কথাগুলো আজ আপনার কাছে বিশেষ করে বলতে চাইছি, এই মানার অধিবাসীরা তারা আজকে ওখানে বিপন্ন বোধ করে, ওখানে তারা জীবিকার কোন সংস্থান করতে না পেরে, অত্যাচারিত হয়ে, উৎপীড়িত হয়ে, সেখান থেকে আসতে চাইছে। স্বভাবতই তাদের দৃষ্টি পশ্চিমবাংলার দিকে প্রসারিত, বাংলার মানুষ বাংলার জল আবহওয়ার সঙ্গে পরিচিত, বাংলায় আত্মীয় স্বজন, তাই এদিকে তারা দৃষ্টি প্রসারিত করেছে, তারা প্রশ্ন তুলেছে সুন্দরবন এলাকায় তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরকার করতে পারে কি না, পারেন কি না, আপনি জানেন, কিন্তু যদি পারেন এই মানা ক্যাম্পের উদ্বাস্তুদের, যারা আবার ওখান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ফিরে আসতে চাইছে অনিশ্চিতের পরিমণ্ডলের মধ্যে, অনিশ্চিত আকাশের নিচে দাঁড়াতে চাইছে, তাদের আপনি সুযোগ দেবে, চেষ্টা করবেন তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে, এই অনুরোধ আপনার কাছে করতে চাইছি। সেই সঙ্গে আমি আপনার কাছে শিবির কর্মচারিদের সমস্যানামক একটা সমস্যাকে উপস্থিত করতে চাইছি।

প্রথম কত সংখ্যা ছিল তা হয়তো আমার পক্ষে বলা সম্ভব হবে কিনা কিন্তু ৮ হাজার শিবির কর্মচারী আজকে আছে যাঁরা বেকার যাঁরা চাকরি চেয়েছে সরকারের কাছে তাঁদের একদা চাকুরি ছিল। সরকার তাঁদের নিয়োগ করেছিলেন। সরকার তাঁদের বেতন দিয়েছিলেন। কয়েক বছর চাকুরি করবার পর তাঁরা বরখাস্ত হয়েছে, বেকার হয়েছে। তাঁরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কোথাও সহানুভূতি পাচ্ছেন না। এই উদ্বাস্তু শিবিরের মানুষগুলি, এই ৮ হাজার যুবক-যুবতী তৎকালীণ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সিধার্থ রায় মহাশয় একটা নিয়োগপত্র দিয়েছিলেন। ইস্তাহার বিলি করেছিলেন যে তাঁদের পত্র দিলেন কিন্তু তথাপি মাননীয় সিদ্ধার্থ রায় আজ অতীত হয়ে গেছেন, জ্যোতি বসু, বর্তমান আছেন। বর্তমান ম্যখ্যমন্ত্রীর কাছে আমি গিয়েছিলাম। আমি ওনাকে বলেছিলাম এঁদের কথা। মাননীয় জ্যোতিবাবু বললেন তিনি অগ্রাধিকার দেবেন যখন ওদের নিয়গের প্রশ্ন উঠবে। আককে আমি পুনর্বাসন মন্ত্রীর কাছে আবেদন করব এই ৮ হাজার শিবির কর্মচারী—কোন্‌ সরকার এদের চাকরি দিয়েছে, তখন কি সরকার ছিল, আজ এই প্রশ্ন বড় কথা নয়, বড় কথা হোল এঁরা পশ্চিমবাংলার ছেলেমেয়ে, তাঁরা বেকার তাঁরা কর্মে নিযুক্ত ছিল। আজ তাঁরা চাকুরি হারিয়ে তাঁরা আর্ত।

এই আর্ত মানুষের দিকে তাকিয়ে আমি আপনার কাছে আবেদন করব এই ৮ হাজার শিবির কর্মচারীকে পুনরায় নিযুক্ত করুন। জীবনের প্রশ্ন আজ তাঁদের সামনে, সমাধানের পথে যদি আজ নিয়ে যেতে পারেন, জীবনের যে হতাশা সেই হতাশাকে যদি আপনি রক্ষা করতে পারেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধা ভাজন হবেন, কৃতজ্ঞতা ভাজন হবেন। পরিশেষে আমি আর একটি বিষয়ের প্রতি মাননীয় পুনর্বাসন মন্ত্রীকে, বোধ করি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীকেও একটি গুরুতর পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করব যে আজকের বাংলাদেশ অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি আমাদের সামনে উপস্থিত করেছে, আজকের সামরিক শাসক পরিচালিত বাংলাদেশ আজ যেভাবে সেখানে ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে পরিচালিত হয়েছে তাঁর মধ্যে দিয়ে ও পাশের মানুষ অনবরত পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিমবাংলায় আসবার জন্য চেষ্টা করেছে এবং তাঁদের সেই আসবার পথে আমরা বাধা স্রিষ্টি করতে চাচ্ছি। আমি সেদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মাননীয় অটলবিহারী বাজপেয়্র বক্তৃতা শুনেছি। তিনি কাগজেও বিবৃতি দিয়েছেন যে কোনও শরণার্থীকে আসতে বাধা দেব না। আমি নিঃসন্দেহে আহ্বান করব না, আহ্বান আমরা করছি না কিন্তু আমরা বিসর্জন দেব না। আমি নিঃসন্দেহে আহ্বান করবার জন্য আপনাদের বলব না, আমি নিসন্দেহে একথাও বলবো না পূর্ব বাংলার মানুষকে আপনারা উত্তেজিত করুন, অনুপ্রাণিত করুন, দলে দলে কাতারে কাতারে পশ্চিমবাংলায় আসুক, পশ্চিমবাংলার ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করুন আমি একথা বলব না কিন্তু আমি এ কথা বলব যে পূর্ব বাংলার ওপারের কান্না, বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ, বেদনা ও কান্নাকে আপনাদের শুনতে হবে। এ কথা আপনাদের মনে রাখতে হবে পূর্ববাংলার এই মানুষগুলি এরা একদিন বাংলাদেশের মানুষ ছিল, রাজনৈতিক পাশাখেলায় সেই দ্রৌপদির মতো আপনারা ওদের বিলিয়েছেন।………”

বাংলাদেশ থেকে শরনার্থীদের সম্পর্কে এইভাবেই শ্রী হরিপদ ভারতীর তাঁর তীক্ষ্ণ সংবেদনশীল মতামত ও কতগুলি নীতিগত মৌলিক সিন্ধান্ত গ্রহণের প্রতিও তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। যেগুলির ব্যবহার ও অপব্যবহার করে ভারতের কমিউনিস্ট পাড়ড়টি (মার্কসবাদী) দল পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় তিনদশকের বেশি সময় টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল।

ক্রমশ –

 

Leave a Reply