সংস্কৃতিসাদাকালো রঙমাখাস্বভূমি ও সমকাল

বৈরালি

– “দাদা, মৌরলা মাছ চাই না তো!”

– “আরে! আপনি তো তাই দিতে বললেন, দিদিভাই?”

– “মৌরলা না তো, বোরোলি বললাম। বোরোলি নাই?”

– “বোরোলি? সে আবার কোন মাছ?”

সেই সময় পাশের মাছওয়ালা দাদু দর্শকের ভূমিকা থেকে খানিক বিরতি নিয়ে বিজ্ঞের মত একটা হাসি দিয়ে বললেন, “ও মাছ আর এখানে কোথায় পাবেন, দিদি?”

অমনি আমি আঁশের স্তূপের পাশে বসে থাকা মোটাসোটা হুলোটাকে আচমকা চমকে দিয়ে খ্যাঁক করে উঠলাম, “কেন? এইখানে কেন পাবোনা? বাঙ্গালীর প্রাণ মাছে ভাতে আর সেই বাংলার রাজধানী হল গিয়ে কলকাতা। অতএব কলকাতা তো বাঙ্গালীর মাছ খাওয়ার স্বর্গ! তাহলে এইখানে পাবোনা মানে?” আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই শনিবারের সকালে আমার মতো সরেস একটা মুর্গি পেয়ে মৎস্য ব্যবসায়ীরা ভালমতোই জবাই করার তালে আছে। অতএব আমিও বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী স্মরণ করে ময়দানে অবতীর্ণ হলাম।

– “এমা ছিঃ ছিঃ! ওকথা কেন বলেন, দিদিভাই? যেখানকার জিনিস সেখানেই তো পাবেন, ঠিক কিনা? কলকাতায় খাবেন কলকাতার মাছ। আপনি যার কথা বলছেন, সে তো হল গিয়ে জলপাইগুড়ির জিনিস। উত্তরবঙ্গের তিস্তা নদীতে পাওয়া যায় সেই মাছ। এইখানে কোথায়?”

চাকরী সূত্রে কলকাতায় আসা ইস্তক সবাইকে “বাড়ি উত্তরবঙ্গে” বলে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করি। দক্ষিণবঙ্গের মানুষজন শুনলেই কত না আহা ইশ করেন আর সেটা শুনে প্রাণে বেশ একটা তৃপ্তি অনুভব হয়। অভাগার দেশের একটা জিনিস তো অন্তত আছে, যা নিয়ে একটু গর্ব করা যায়! এ জিনিস তো চাইলেও কেউ কেড়ে নিয়ে যেতে পারবেনা। তবে বলাই বাহুল্য, সেই মুহূর্তে আমার মোটেই আপন জন্মভূমির পরিচয়টা আস্ফালন করে বলতে ইচ্ছে করলো না। আসল কথাটা বলেই দিই, বলার মুখ ছিলো না। কারণ, এক্ষেত্রে “বাড়ি উত্তরবঙ্গে” বললেইযে কি প্রতিক্রিয়াটা আসবে তা আর না হয় ভাঙ্গিয়ে নাই বা বললাম…

অতএব বেজার মুখে যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে জ্ঞান দাদুকে দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পাল্টা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করলাম – “আরে সে জানিনা নাকি আমি? আমি তো সেখানকারই মানুষ। তাহলে এখন যদি আমার বোরোলি মাছ খাওয়ার ইচ্ছে হয়, তার জন্য টিকিট কেটে উত্তরবঙ্গ যেতে হবে নাকি? তোমরা আনাতে পারো না উত্তরবঙ্গ থেকে, হ্যাঁ? দিব্যি তো বিহারের রুই, অন্ধ্রের কাতলা এনে এনে খাওয়াচ্ছ! দাও দেখি একশো মৌরলাই দাও।”

যেমনি মানুষ দূরে চলে যাওয়ার পরই যেন তাকে বেশি ভালোভাবে জানা যায়, তেমনি বোধহয় জন্মভূমির থেকে দূরে থাকার পরই জন্মভূমিকে আসল ভাবে চেনা যায়। মধুসূদনের প্রত্যাবর্তন তো সেই কারণেই হয়েছিল? বোরোলির যে এতো দেমাক, তা জানলাম এই কলকাতা মহানগরীতে এসেই। আমাদের তিস্তা তোর্ষার বোরোলির কলকাতায় পদার্পণে ভীষণ আপত্তি। ইলিশের না হয় বড় দায় আছে। কিন্তু বোরোলি রানীর তো আর সেরকম ব্যাপার নেই। কিন্তু,তাঁর বাড়ি গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসতে গেলেও কিন্তু তিনি রাজি নন। তিস্তার রানী বলে কথা, দেমাক তো তাঁর একটু আধটু হতেই পারে।উত্তরের মাছ বলে কি তারএকটু দেমাকও হতে নেই? কিন্তু তার সত্বেও যে কলকাতার মানুষের হৃদয় জুড়ে বড় একটা জায়গা করে ফেলেছে আমাদের বোরোলি রানী? অতঃপর ভূগোলকে গোল দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে শুরু হয়েছে বোরোলির চাষ।

ইদানীং উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পের দিকেও অনেকটা মন দেওয়া হয়েছে। আমাদের শীতকালের বাঁধাধরা পিকনিক স্পট ছিল গজলডোবা ব্যারেজ। নদীর ধারে কাঠের জ্বালে তিস্তার জলে হত রান্না। তিস্তা নদীর বুক ছুঁয়ে হুহু করে বয়ে আসা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস শরীরের হাড় অব্দি স্পর্শ করে দিয়ে যেত। তখন কাঠের আগুনের আঁচে খোঁজা হত মায়ের বুকের ওমের আশ্রয়। এখন নাকি আর চেনাই যায়না সেই গজলডোবাকে। এই কয়েক বছরে সাদাসিধে মানুষগুলোকে আরেকটা জিনিস “করে দেওয়া” হয়েছে গর্ব করে লোকের কাছে বলার জন্য। গর্ববোধে উত্তরের মানুষজন সেরকম আশানুরূপ ফল কোনোকালেই করতে পারেনি। তবে কৃতজ্ঞতাবোধে আমরা যে অনায়াসেই প্রথম স্থানের দাবীদার, তা হয়তো আপামর বঙ্গবাসী একবাক্যেই স্বীকার করবে।

আট-নয় বছর আগের সেদিনের সেই মৎস্যদাদুকে একটা কথা জিগ্যেস করেছিলাম বটে। “দাদু, তুমি এতো কথা জানলে কি করে, হ্যাঁ? বেড়াতে গেছিলে নাকি, উত্তরবঙ্গে?” দাদু আবার সেই মিটিমিটি হাসি হেসে উত্তর দিয়েছিল, “আগে তো যাইতামই গো, দিদি। এখন বাড়িটাও নাই, বাড়ির লোকগুলাও আর সেইখানে নাই। আর যায়ে কি হবে?” উত্তর দিয়েছিলাম, “এইবার তা’লে আমার বাড়ি যাবা। যায়ে বোরোলি মাছ খাবা।”

কালোজিরে ফোড়নে পাতলা পাতলা লম্বা লম্বা করে আলু বেগুন পেঁয়াজকলি কাঁচালঙ্কা দিয়ে বোরোলির চচ্চড়ি খাবো বলে থলে হাতে বেরিয়েছিলাম। সেই থলেতে করে ফিরে এলো মৌরলা। পেঁয়াজকলিটা আলু দিয়ে ভাজাই খাবো, না হয়। পাশ দিয়ে সাইকেল করে আরেক মৎস্যদাদা হাঁকতে হাঁকতে হুশ করে বেরিয়ে গেল। “বাটা মাছ, ট্যাংরা মাছ…”। পরের কথাগুলো কতদিন হল শুনিনা। তবুও কি করে ঠিক তারা কানের কাছেসুর করে বেজে উঠলো – “নদীয়ারি মাছ, নদীর ট্যাংরা মাছ, বোরোলি মাছ। মাছ লাগবে, কাকিমা? মাছ– নদীয়ারি মাছ!”

Leave a Reply