রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

হিন্দুত্ব, পরিসংখ্যানচর্চা ও বাঙালির অবদান

-Woke Hunter 

“হাম দো হামারে সত্তর
সব কে হাত মে ইঁট আউর পত্থর”

সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিমদের জনসংখ্যা বিষ্ফোরণ নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের মুখে মুখে এইরকম মজাদার ছড়ার ছড়াছড়ি। দীর্ঘদিন ধরেই। শিল্পীদের কৌতুকধার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে কেবল।

আবার অন্যদিকে বাংলা, কেরল,দিল্লি, জম্মু- কাশ্মীর ইত্যাদি অঞ্চলে অনুপ্রবেশের জ্বালা।পাকিস্তান আর বাংলাদেশের হৃদয় বিদারক অসংখ্য কাহিনী।লাভ জিহাদের বিভীষিকাময় কঠিন বাস্তব নিয়ে হিন্দু জাতির হাহুতাশ। কি ভারত,কি বাংলাদেশ। হিন্দুত্বে ধর্মন্তরণের প্রাণপণ চেষ্টা।সাধারণ দেওয়ানী বিধি আর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বৃথা দিবাস্বপ্ন….

সবের মূলে কেবল একটিই দুশ্চিন্তা যেন আজ সমগ্র হিন্দু সমাজকে তিলেতিলে গ্রাস করছে……”হিন্দু খতরে মে হ্যায়”। হিন্দুজাতির ক্রমাগত সংকোচনশীল জনসংখ্যা,বিলুপ্ত হবার দুশ্চিন্তা। সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠচালিত গণতন্ত্র আর ভিড়তন্ত্রের দ্বারা চালিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিজের দেশেই কোণঠাসা আর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার নিরাপত্তাহীনতাবোধ।

অথচ,আমরা কতজন জানি যে হিন্দুদের এই অস্তিত্ব সংকটের ভবিষ্যদ্বাণী আজ থেকে ১১৩বছর আগে প্রথম করে গিয়েছিলেন একজন দূরদর্শী বঙ্গসন্তান? শুনিয়ে যান পরবর্তী ৪২০ বছরের মধ্যে হিন্দু জাতির নিশ্চিহ্ন হওয়ার সাবধানবাণী? আদমশুমারির তথ্য, সাথে সমাজবিজ্ঞান,ইতিহাসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভারতে জনসংখ্যা বিভীষিকার প্রথম দলিল মুদ্রিত হয়েছিল এই বাংলায়,কলকাতায় বাবু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “The Bengalee” নামক ইংরেজি পত্রিকায়,ধারাবাহিকভাবে।

লেখক হলেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয়। সাধারণভাবে, নাম জানা বা তাঁর কাজের ব্যাপারে অবগত হওয়া দুরস্থ,মহাশয়ের পুরো নামটাও ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অথচ,এই লেফটেন্যান্ট কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় হিন্দু মহাসভার পূর্বসুরি পাঞ্জাব হিন্দু সভারও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নেতা ছিলেন।

১৯০৯ সালে ১লা জুন থেকে ২২শে জুন অবধি,ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সেই প্রবন্ধসমূহের নাম দেওয়া হয় “Hindus- A Dying Race”। যা পরবর্তীকালে pamphlet এবংবইয়ের আকারে মুদ্রিত হয়। বঙ্গভঙ্গ, শিমলা ডেপুটেশন এবং সাম্প্রদায়িক Morley – Minto সংস্কারের পরবর্তীকালে লেখা এই প্রবন্ধগুলোতে (১৮৭২-১৯০১) এর মধ্যে প্রকাশিত হওয়া census রিপোর্টের ভিত্তিতে তুলে ধরেন যে আপাতদৃষ্টিতে এই অল্পসময়ের মধ্যে বাঙালি হিন্দুজাতি হ্রাস পেয়েছে প্রায় এক পঞ্চাংশ। উল্টোদিকে,বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

নিউজিল্যান্ড,আমেরিকা ও হিস্পানিওলা প্রভৃতি দেশের মূলনিবাসী জাতিগুলোর করুন পরিণতির কথা উপেন্দ্রনাথ স্মরণ করান বিপন্ন বাঙালি পাঠককে। বলেন: “We are also a decaying race. Every census reveals the same fact. We are getting proportionately fewer and fewer…Year after year they[the Hindus] are being pushed back, the land once occupied by them is taken up by Mohammedans, and their relative proportion to the population of the country is getting smaller and smaller.”…অবিকল যেন, একবিংশ শতাব্দীর সদ্যজাগরিত হিন্দুর অহরহ হা হুতাশের প্রতিধ্বনি।

আরো লেখেন হিন্দুবিলুপ্তির মুলে এক মর্মভেদি সারকথা:

“How do the two communities stand to-day? The Mohammedans have a future and they believe in it, we Hindus have no conception of it. Time is with them, time is against us. At the end of the year, THEY COUNT THEIR GAINS, WE CALCULATE OUR LOSSES. They are growing in number, growing in strength, growing in health, growing in solidarity, we are crumbling to pieces. They look forward to a united Mohammedan world-we are waiting for our extinction…..” “In our treatment of our co-religionists lies the germ of our destruction. This is the history of the Hindus. The same process is going on around us.”

পরবর্তীকালে,লেফটেন্যান্ট কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থীদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন,তাদের দ্বারা সাম্প্রদায়িক ও অন্ধবিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত হয়েছেন। বামপন্থীদের যুক্তি অনুযায়ী সেন্সাসে তখনকার দিনে, হিন্দু জনসংখ্যায় বাংলার একটি বড় অংশকে হিন্দু হিসেবে গণনা করা হলেও,তারা হিন্দুদের সাধারণ সামাজিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত ছিল ।সুতরাং, তাদের হিন্দু বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।উপেন্দ্রনাথের সেন্সাস ব্যাখ্যা ত্রুটিপূর্ণ!! 

হিন্দু মহাসভা তো বটেই,”A Dying Race” অচিরেই বৃহত্তর হিন্দু সমাজে এক তুমুল সাড়া জাগিয়েছিল। দেশে এই প্রথম কেউ বুক ঠুকে জনসংখ্যা বিভীষিকাকে এত জলের মত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলো।হিন্দু মহাসভার প্রবাদপ্রতিম আর্য সমাজি সন্ন্যাসী নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে ১৯১২ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ই বোঝান হিন্দু জাতির এই শিয়রে সংক্রান্তির বিষয়ে। যার ঋণ স্বামী শ্রদ্ধানন্দজী স্বীকারও করেন ১৯২৫এর পাটনা বক্তৃতায়। মজার বিষয়, ১৯৭৯ সালে “THEY COUNT THEIR GAINS – WE CALCULATE OUR LOSSES” নামে হিন্দু মহাসভা বইও প্রকাশ করেছিল। অথচ, বইয়ের প্রস্তাবনায় উক্তিটি হিন্দু মহাসভার আরেক দিকপাল নেতা ভাই পরমানন্দের বলে উল্লেখ করা ছিল,যদিও উপেন্দ্রনাথ মহাশয়ের উপরের উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট যে এই কথাটি আসলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বাবু প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।

উপেন্দ্রনাথ মহাশয় এখানেই থেমে না থেকে 1911 সালে প্রকাশিত “Hinduism and the Coming Census: Christianity and Hinduism”এ বৃহত্তর হিন্দু স্বার্থে হিন্দু সমাজে বঞ্চিত পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং হিন্দু আদিবাসীদের সামাজিক ন্যায় এবং উত্তরণের একান্ত প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেন। যা আজও ইসলাম আর খ্রিষ্টান আগ্রাসনের মুখে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের একান্ত করণীয় এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি (JNU) র Centre For Comparative Politics And Political Theoryর অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দত্ত তার এক পেপারে মুখোপাধ্যায় বাবুর থিওরি সম্বন্ধে লিখেছেন: “This was not simply a case of the discourse outliving the author. What I was confronted with was a text that had become ‘common sense’…”

তাজ্জবের বিষয়,এমন ভবিষ্যত দ্রষ্টা হিন্দুত্ববাদী চিন্তাবিদের বিষয়ে জাতীয় স্তরের নিউজ পোর্টাল গুলোতে প্রভূত আলোচনা হয়ে থাকলেও,বাঙালি হিন্দুত্ববাদী সমাজে উপেন্দ্রবাবুর বিষয়ে বিশেষ আলোচনা বা তার কাজের স্বীকৃতি বিশেষ চোখে পড়েনি।আশা করি আমার এই ছোট্ট উপস্থাপনা ওনার প্রতি কিছুটা হলেও ন্যায় বিধান করবে।

তথ্যঋণ স্বীকার:

1)History of Hindu Mahasabhasavarkar.org
2) Carving Blocs: Communal Identity In Twentieth-Century Bengal, Pradip Kumar Dutta, Oxford UniveristyPress,1999
3) ‘Dying Hindus’: Production of Hindu Communal Common Sense In Early 20th Century Bengal, Pradip Kumar Dutta, JSTOR
4) “Is Hindu A Dying Race”: Dr. Rakesh Sinha
5) Mission Bengal: A Saffron Experiment, Snigdhendu Bhattacharya, HarperCollins India
6) https://www.newsclick.in/History-Hindutva-Bengal
7)https://caravanmagazine.in/politics/historical-roots-of-hindu-majoritarianism-in-west-bengal
8) Constructing Nation and History: Hindu Mahasabha in Colonial North India(1915-1930),Prabhu Narain Bapu
9)https://www.newsclick.in/not-hindus-history-sanity-danger-india

 

(লেখক পরিচিতি: বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে MSc(Physics) পাঠরত)

Leave a Reply