রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

বঙ্গে ইসলাম: কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনাপ্রবাহ কি ?

– শ্রী সুমন দেবরায়

“জগতের সমস্ত প্রাচীন সভ্যজাতির অধঃপতনের ইতিহাস তমসাচ্ছন্ন। অর্দ্ধাশনক্লিষ্ট বর্ব্বর, যখন বুভুক্ষাপীড়নের জন্য, সভ্যজগতের বিলাসব্যসনমগ্ন মানবের রুদ্ধদ্বারে করাঘাত করে তখন প্রথমবার সে প্রত্যাখ্যাত হয় – কিন্তু সে যখন ফিরিয়া আসে ,যখন সে বুঝিতে পারে যে, সভ্যমানবের কোমলকরকমলে ধৃত আয়ুধ দৃঢ়মুষ্ঠিতে ধৃত নহে, সভ্যমানবের পক্ষে তাহার গতিরোধ অসম্ভব। প্রাচীন প্রাচ্য ও প্রতীচ্য জগতে ইহাই সভ্যমানবের সহিত বর্ব্বরের ঘাতপ্রতিঘাতের একমাত্র ইতিহাস।………বিশাল সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশিষ্ট, বহুক্লেশরক্ষিত মহানগরী যখন বর্ব্বর সেনা কর্ত্তৃক আক্রান্ত হয়, সভ্যমানব যখন আত্মরক্ষা অসম্ভব জানিয়া স্তব্ধ হইয়া থাকে, যখন মহানগরীর উদ্যান ,প্রাসাদ ,মন্দির ,সঙ্ঘারাম নগরবাসীগণের সহিত একত্র বিনাশ প্রাপ্ত হয়, তখন আর ইতিহাস রচিত হয় না। এই জন্য জগতের সর্ব্বত্র ,প্রাচীন সভ্যজাতির অধঃপতনের ইতিহাস তমসাচ্ছন্ন।…….”

প্রয়াত শ্রী রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ এর দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম পরিচ্ছেদ, অর্থাৎ ‘মুসলমান বিজয়ের বিস্তৃতি ও কাল নির্ণয়’, এই অংশের সূচনা করেছেন উপরের অনুচ্ছেদ এ দৃশ্যমান শব্দগুলি লিপিবদ্ধ করে। কিন্ত কেন এমন লিখলেন এই প্রখ্যাত ঐতিহাসিক? আমরা তো জানি এই বঙ্গভূমিতে শুধুমাত্র সুফি-পীরদের উদার মানবতাবাদের প্রচারের মধ্য দিয়েই ইসলামের প্রসার ও বিস্তার ঘটেছে। কেন রাখালদাস বাবু বর্ব্বর আক্রমনের সাথে তুলনা করলেন এই বঙ্গের ইসলামিক বিজয়ের?

কারন একটাই – শ্রী রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় উপলব্ধি করেছিলেন যে এই বঙ্গদেশে ইসলামের প্রসার ও বিস্তার বিশেষ কোন আলাদা ঘটনা নয়। যে দর্শনের প্রয়োগে পৃথিবীর অন্য অংশে বা ভারতবর্ষের অন্যত্র ইসলাম তার রাজনৈতিক-ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, বঙ্গদেশে যে সে দর্শনের ব্যবহারিক দিকই প্রতিফলিত হয়েছে,অন্য বিশেষ কিছু নয়, রাখালদাস বাবুর ,”বর্ব্বর’ শব্দের প্রয়োগ সেটাই প্রতিষ্ঠিত করছে।

বখতিয়ার খিলজি নামক এক তুর্কী যে প্রথম বঙ্গদেশে ইসলামী আক্রমনের নেতৃত্বে ছিলেন সে ব্যাপারে কোনও বিতর্ক আছে বলে শোনা যায় না। তা এই বখতিয়ার খিলজি কি করেছিলেন এখানে পদার্পণ করবার আগের মূহুর্তে ?

“তবকাৎ-ই-নাসিরী ও তাজ-উল-মাসির মুসলমান বিজয়ের সমসাময়িক গ্রন্থ;তন্মধ্যে তাজ-উল-মাসিরে বখতিয়ারের গৌড়াভিযানের বিস্তৃত বিবরণ নাই। তবকাৎ-ই-নাসিরিতে তাহা আছে এবং এই বিবরণ অধিকাংশ স্থলেই সত্য।………….

গৌড় বিজয়ের চত্বারিংশত বর্ষ পরে,তবকাৎ-ই-নাসিরী প্রণেতা মৌলানা- মিনহাজ-উস-সিরাজ আবু -ওমর-ওসমান জুর্জ্জাণী, গৌড়দেশে লক্ষ্মণাবতী নগরে আসিয়া,সমসাম্-উদ্দীন নামক বখতিয়ার খিলজির জনৈক প্রাচীন সৈনিকের সাক্ষাৎ পাইয়াছিলেন। মগধ এবং সম্ভবত গৌড় বিজয়ের বিবরণ সমসাম-উদ্দীনের উপরে নির্ভর করিয়া লিখিত। সেই বিবরণ দেখিলে স্পষ্ট উপলব্ধি হয় যে মগধ তখন অরক্ষিত, অরাজক ……… । সেইজন্যই প্রাচীন চরনাদ্রি দুর্গের অধিকারী,তুরুষ্ক জাতীয় বখতিয়ার ,সামান্য সেনা লইয়া মগধের নানা স্থানে লুন্ঠন করিতে ভরসা পাইয়াছিলেন।পাল ও সেন-বংশীয় রাজগণ মগধের অধিকারের জন্য দীর্ঘকাল যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন , সেই সময় সীমান্ত অরক্ষিত দেখিয়া বখতিয়ার মগধের নানা স্থান লুন্ঠন করিতেন। মগধ-লুন্ঠন-অর্থে সেনা সংগ্রহ করিয়া , তিনি অবশেষে উদন্ডপুরের প্রাচীন সঙ্ঘারাম অধিকার করিয়াছিলেন।………সেন ও পাল রাজবংশের তখন এমন ব্যক্তি ছিল না যে ,লুন্ঠনলোলুপ দস্যুর অত্যাচারে বাধা প্রদান করেন।। তবকাৎ-ই-নাসিরীতে দেখিতে পাওয়া যায় যে ,কেহ কখনও লুন্ঠন-তৎপর তুরষ্কসেনাকে বাধা প্রদান করেন নাই ।……..” ( বাঙ্গালার ইতিহাস,দ্বিতীয় ভাগ,পৃষ্ঠা তিন— রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)

উপরের বর্ণনা থেকে এটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার যে বখতিয়ার বঙ্গদেশে আগমনের পূর্বে, সুযোগ বুঝে, এক ধারাবাহিক লুটপাট চালু রেখেছিলেন পার্শবর্তী অঞ্চলে। শান্তিপূর্ণ দেশের মানুষ,সভ্যজগতের মানুষ বা প্রশাসন এই লুটেরাদের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয় নি। অবশেষে এই লুটেরা তথা ‘বর্ব্বর’ দের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশের অঞ্চলে লুটপাট করে সেই লুটেরা দল বঙ্গের সুজলা-সুফলা-শষ্যশ্যামলা মাটিতে পা ফেলেই সমন্বয়বাদী,উদার মানবিকতার ধারক-বাহক হয়ে গেল, এটা কি বেশি মাত্রায় হাস্যকর বলে মনে হচ্ছে না ? অনেকটা যেন সেই মধ্য এশিয়ার থেকে ঘোড়ায় চড়ে আসা হিংস্র,যুদ্ধবাজ আর্যদের পঞ্চনদের দেশে পৌছেই আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী হয়ে যাওয়ার মতো ?

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাতে আরো একটি জিনিস প্রতিফলিত হচ্ছে। তৎকালীন মগধের শাসকেরা সেই বর্ব্বর আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হন নি। বঙ্গদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদী বিচারে কোন প্রতিরোধ দানা বাঁধতে পারে নি। কারনটা কি সে সময়ের Poor Governance এবং সামগ্রিক Moral Degeneration এর সাথে সম্পর্কিত কোনোভাবে ?

যখন বহিরাগত এক দস্যু সর্দার অবাধে নাগরিকদের ধনসম্পদ কেড়ে নিতে পারে এবং সেই লুন্ঠিত সম্পদের উপর ভিত্তি করেই ভাড়াটে সেনা সংগ্রহ করে পরবর্তী বৃহত্তর অভিযান চালায়,তখন Poor Governance বোঝাতে আর কোনো উদাহরণের প্রয়োজন আছে কি ?

তবে একটা প্রশ্ন আছে , শুধুই কি লুটপাট করাই উদ্দেশ্য ছিল এই বিজাতীয় আক্রমনকারীদের ? একটু দেখাই যাক : “Muhammad Bakhtiyar Khilji, traditionally held as conqueror of Bengal but described by contemporary sources as conqueror of the kingdom of Lakhnaoti,belonged to a Turkman tribe called Khilji which migrated from the Oxus region to Afghanistan in the twelfth century.He, like many other adventurers,moved eastward to the fabled Hindustan in quest of fortune.All of them aspired towards carving out kingdoms in Hindustan,taking advantage of the political disunity and vulnerability of the numerous Hindu princes in the face of better horsemanship,better training in swords and guns and better speed and military techniques of the Central Asian Tribes .The invaders were strongly motivated by the Islamic fervour to spread the new religion “. ( Page 57 of the ‘Land of Two Rivers’ by Nitish Sengupta )

ইসলাম বিস্তারের উদ্দেশ্য এবং লুটের মাধ্যমে সম্পদ সংগ্রহ, একটি ছিল আর একটির পরিপূরক। ইসলামের প্রসার ঘটাতে পারলেই আসবে নতুন নতুন সম্পদের উপর অধিকার ,আবার সেই সম্পদকে ব্যবহার করেও ঘটবে ইসলামের প্রসার। কোনো সংশয় ছাড়াই তাই বলা যেতে পারে যে বাঙ্গলাতেও ইসলামের বিস্তার কোনো ব্যতিক্রমী উপায়ে ঘটে নি, প্রাথমিকভাবে যুদ্ধ , রক্তপাত আর সম্পদ লুঠের মাধ্যমেই হয়েছিল। আর সুফি পীরদের মানবতাবাদী ভুমিকা ? কি পদ্ধতিতে তাঁরা প্রসার ও প্রচার করেছিলেন । একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে।

ফুরফুরা শরীফের Official Websites এ ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে :

“796 হিজরীতে সুলতান গিয়াস-উদ্দিন ভাগীরথী নদীর তীর নিয়ন্ত্রনে আনার পরিকল্পনা নেন। সৈন্য পাঠান বাঙলার ছোট ছোট সামন্তবাদী এলাকায়,জমিদারীতে। সেনা বাহিনীর সাথে সাথে বিদগ্ধ আলেমরাও আগমন করেছিলেন।

এমনি এক অভিযানে হজরত শাহ সুফী সুলতান (রহ-) সেনাবাহিনী সহ আগমন করেন বঙ্গ দেশের দিকে,হজরত সুফী সুলতান(রহ-) সৈন্যদের দুভাগ করলেন।নিজে একদল নিয়ে এগিয়ে গেলেন পান্ডু অভিমুখে,অন্য দলটা হজরত শাহ হোসেন বোখারি(রহ-)র নেতৃত্বে বলিয়া-বাসন্তির দিকে এগিয়ে আসে । এখানেই ফুরফুরা শরীফের গোড়াপত্তন। “

মানবতা আর সমন্বয়বাদী চেতনার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে সৈন্যবাহিনী নিয়ে আগমন হল সুফী সাধকের । অর্থাৎ এই বঙ্গদেশের বিশেষ একটি অংশে, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,সুফী সাধকের সামরিক নেতৃত্বে ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হল। বঙ্গদেশ কিন্ত তা হলেও নাকি ব্যতিক্রমী।

রাজা গণেশের কথা আমরা অনেকেই জানি। আমরা শুনেছি যে গণেশ ইসলামিক শাসনের মধ্যে একজন হিন্দু রাজা হিসেবে বাঙলার শাসন ক্ষমতা অধিকার করেছিলেন। কি হল তারপর এই উদার সমন্বয়বাদী ভূমিতে : “ Subsequently,at the request of the outraged Bengali ulama and sufis,who repudiated a non-Muslim ruler,Ibrahim Shah Sharki of neighboring Muslim state of Jaunpur invaded Bengal.”( Page 57 of The Wonder That Was India ,Part II by S.A.A Rizvi) 

উদার সমন্বয়বাদী সুফীদের পক্ষে একজন অ-মুসলমানের শাসন মেনে নেওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই তাহলে ?

তাহলে বাঙলার ইসলামের প্রসার ও প্রচার আলাদা কোন দর্শনের প্রয়োগে হয় নি, এটা নিয়ে নিশ্চয় আর দ্বন্দ্বের অবকাশ নেই।
এখন তৎকালীন বঙ্গের কিছু প্রাসঙ্গিক চিত্রের দিকে একটু চোখ ফেরানো যেতে পারে।

শ্রী নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস- আদি পর্ব ‘ তে উল্লেখ করেছেন লক্ষ্মণসেনের সভাকবি উমাপতিধরের কথা , যিনি ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের আনুগত্য ও পরিবর্তন করেছেন এবং তা করেছেন অভূতপূর্ব দ্রুততার সাথে। লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি ম্লেচ্ছ রাজার অর্থাৎ কিনা মুসলমান রাজার উদ্দেশ্যেই স্তুতিবাক্য রচনা করে ফেলেছেন ।

কি বলছেন শ্রী নীহাররঞ্জন রায় : “ পর পর তিনটি রাজার রাজসভাকবি বৃদ্ধ না হউন অন্তত প্রৌঢ় উমাপতিধর কি বখত-ইয়ার কর্তৃক নবদ্বীপজয়ের পর সেন-রাজসভা পরিত্যাগ করিয়া নিজের ভক্তি ও স্তুতি অর্পণ করিবার পাত্র পরিবর্তন করিয়াছিলেন,এবং ম্লেচ্ছরাজকেই সেই পাত্র বলিয়া নির্বাচন করিয়াছিলেন। সভাকবি সভাকবিই থাকিয়া গিয়াছিলেন সন্দেহ নাই,কিন্ত সেন-রাষ্ট্র, সেন-রাজসভা ,সেই সভার অলংকার কবি ও পন্ডিত ,এবং সমসাময়িক কাল ও সমাজের উপর ইহা যে কত বড় কটাক্ষ, উমাপতিধর কি তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন ?”

শ্রী রায় আরও লিখেছেন : তারানাথের বিবরণী হইতে মনে হয়,একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু মুহম্মদ বখত-ইয়ারের কাজ করিয়াছিলেন,এবং বাঙলার সঙ্গে তাহার যোগাযোগের ব্যবস্থাও করিয়া দিয়াছিলেন।মিনহাজ ও তারানাথের বিবরণী একত্র মিলাইয়া দেখিলে মনে হয় ,বিহার-বাঙলারই একদল লোক বিভীষন বাহিনীর কাজ করিয়াছিলেন ।…….., রাজসভা চরিত্র ও আত্মশক্তিহীন ,ধর্ম ও সমাজ বিলাসলালসায় ও যৌনাতিশয্যে পীড়িত,…….রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধোগতির চিত্র সম্পূর্ণ;উভয়ই চরিত্রে ও আত্মশক্তিতে দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত। এই দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত রাষ্ট্র ও সমাজ ভাঙিয়া পড়িবে ,এবং সমাজ-প্রকৃতির নিয়মে পরবর্তীকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপিয়া দেশ তাহার মুল্য দিয়া যাইবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়।…..”

ইতিহাস কথা বলে। ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। সত্য যে বড়ই কঠোর,বড়ই নিষ্ঠুর। বঙ্গদেশের ইসলামের প্রচার ও প্রসার যে কোন ব্যতিক্রমী ঘটনাপ্রবাহ প্রতিফলিত করে না, বাস্তবের নির্মোহ বিশ্লেষন তা নিশ্চিত করে। বর্তমানের বাঙ্গালী সমাজ কি ইতিহাসের মোহমুক্ত বিশ্লেষনের জন্য প্রস্তুত, ভবিষ্যতের স্বার্থে ?

 

লেখক পরিচিত : লেখক একজন সরকারী আধিকারিক ; ইতিহাস,অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে বিশেষ আগ্রহী।

Leave a Reply