সংস্কৃতি

‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী’ – সুমিত্রা সেন

আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগেকার কথা।হাওড়া অঞ্চলের এক কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরের বার্ষিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।উদ্যোক্তারা গিয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী সুমিত্রা সেনের কাছে। প্রাথমিক কথাবার্তা হলো।শিল্পী রাজী। এবার যখন উদ্যোক্তারা পারিশ্রমিকের অগ্রিম অর্থ দেওয়ার কথা বললেন তখন শিল্পী বললেন, – আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাই।অগ্রিম নেওয়ার কথা ভাবি না।আগে আমার গান শুনুন।তারপর দেবেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন বললেন, – যদি কোনো কারণে অনুষ্ঠান না হয় তাহলে কোনও সমস্যা হবে না তো? – আমরা যারা রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করি তারা মানুষের ওপর আস্থা রাখি।তাই কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই।ঐদিন যাবো আমি।বললেন সুমিত্রা সেন। নির্ধারিত দিনে কোনও অগ্রিম অর্থ না নিয়েই সুমিত্রা সেন এসেছিলেন এবং গান শুনিয়েছিলেন।শ্রোতারা আরও একবার সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলেন।

মনে আছে ১৯৯২ সালের কথা।কবিপক্ষের এক অনুষ্ঠান।বরানগর রবীন্দ্রভবনে সুমিত্রা সেনের গানের অনুষ্ঠান।তখন আমি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র।জানা গেলো যে ভদ্রলোক সুমিত্রা সেনের গানের আগে তাঁর সম্বন্ধে কিছু কথা বলবেন তিনি আসতে পারবেন না তাই তাঁকে নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে আমাকে এমনই নির্দেশ এলো।সেসময় শিল্পীদের নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে এত তথ্যের সমাবেশ ছিলো না।আমাদের পাড়াতে একজন থাকতেন যাঁর কাছে বাংলা গানের বিভিন্ন শিল্পীদের সম্বন্ধে নানা তথ্য ছিলো। তাঁর কাছে গিয়ে সুমিত্রা সেন সম্বন্ধে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করি।যেসব ছায়াছবিতে সুমিত্রা সেন গান গেয়েছেন সেই ছবিগুলিরও উল্লেখ করেছিলাম সেদিন।বেতারের মহিষাসুরমর্দিনীতে তিনি গান গেয়েছিলেন তাও বলেছিলাম। উইংসের পাশে বসে শুনেছিলেন সুমিত্রা সেন।আমার প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর যখন গান শুরু করলেন তার আগে আমাকে অনেক আশীর্বাদ করলেন।তারপর অনুষ্ঠান শুরু করলেন ‘ মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দর বেশে এসেছো’ দিয়ে।সকলে মন্ত্রমুগ্ধ।এরপর একে একে ‘ দিনের বেলায় বাঁশী তোমার’,’ চোখের আলোয় দেখেছিলেম’,’ ফুল বলে ধন্য আমি’,’ তুমি কোন কাননের ফুল’,’ সখী ভাবনা কাহারে বলে’,ইত্যাদি চলতে লাগলো।কোনো ম্যানারিজম ছাড়াই একের পর এক গান শুনিয়ে গেলেন সুমিত্রা সেন।মন জয় করে নিলেন উপস্থিত শ্রোতাদের।

সুচিত্রা মিত্র,কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়,নীলিমা সেন,রাজেশ্বরী দত্তদের পরবর্তী যুগটি আলোকিত হয়েছিলো সুমিত্রা সেন ঋতু গুহ,বনানী ঘোষ,বাণী ঠাকুর,পূর্বা দাম প্রমুখের কন্ঠলাবণ্যে।এঁদের মধ্যে বনানী ঘোষ বহুদিন প্রবাসিনী,বাকিরা সকলেই প্রয়াত। তাই সুমিত্রা সেন ছিলেন কলকাতার রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পীদের কাছে অন্যতম পথপ্রদর্শক।দীর্ঘসময় ধরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং অন্যদিকে ত্রিবেণী নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বহু ছাত্রছাত্রীকে সঠিক ভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষায় শিক্ষিত করা- এই দুই ভূমিকায় তিনি ছিল্বন সফল।শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন।এইভাবেই সুমিত্রা সেন ছিলেন কলকাতার রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের সামগ্রিক ক্ষেত্রের অন্যতম কান্ডারী।

১৯৩৩ সালের ৭ মার্চ।কলকাতায় জন্ম সুমিত্রার।১৯৪২ সালে যখন কলকাতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাতঙ্কে আতঙ্কিত তখন সুমিত্রার পিতা সবাইকে নিয়ে চলে যান বহরমপুরে।সেখানে শুরু করলেন শ্রী রাজা রায়ের কাছে সেতার শিক্ষা।কলকাতায় এরপর এসে তিনি ভর্তি হলেন বেঙ্গল মিউজিক কলেজে।তখন তিনি প্রধানত সেতার শিখে চলেছেন।তার পাশাপাশি আঁকা,মাটির কাজ,বাটিকের কাজ,পুতুল তৈরির কাজ – এসবও চলছিলো।

এইসময় ঘটলো এক বিশেষ ঘটনা।বেঙ্গল মিউজিক কলেজে এসেছেন ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ।কলেজের অধ্যক্ষ ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় ঐ অনুষ্ঠানে সুমিত্রাকে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে বললেন।তখন সুমিত্রা সেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন না তবুও রেকর্ড থেকে দুতিনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছেন। সেভাবেই ফৈয়াজ খাঁর সামনে গাইলেন, ” মোর পথিকেরে বুঝি এনেছো এবার”। সালটা ছিলো ১৯৫০। সেই গান শুনে১৭ বছরের মেয়ে সুমিত্রাকে অনেক আশীর্বাদ করেছিলেন ফৈয়াজ খাঁ।

এরপর মূলতঃ ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই গান গাওয়া শুরু হলো।১৯৫০ সালেই আকাশবাণীতে নয়টি বিষয়ে অডিশান দিয়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন সুমিত্রা।সেই বছরই প্রথম নজরুলগীতির রেকর্ড করলেন সুমিত্রা। তখন তিনি সুমিত্রা দাসগুপ্ত।গানদুটি হলো ‘গোঠের রাখাল বলে দে রে’ এবং ‘ বেদনার বেদীতলে’। এর দশ বছর পরে ১৯৬১ সালে সর্বপ্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করলেন সুমিত্রা।কিন্তু তার আগে ঘটে গিয়েছে আর একটি ঘটনা সেই ঘটনাটি বেশ উল্লেখ করবার মতো।১৯৬০ সালের ৯ ডিসেম্বর মুক্তি পায় অজয় কর পরিচালিত সুবোধ ঘোষের কাহিনী নির্ভর ছবি শুন বরনারী। এই ছবির নায়ক উত্তমকুমার রেডিওতে সুমিত্রা সেনের গান শুনে তাঁকে টেলিফোন করে ঐ ছবিতে একটি গান গাইবার অনুরোধ করেন।ছবির নায়িকা সুপ্রিয়া দেবীর লিপে থাকবে গানটি।সেইসময় সুমিত্রা সেন নতুন।উত্তমকুমারের মতো মানুষ তাঁকে ফোন করে গাইতে বলছেন এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।যাই হোক সুমিত্রা গাইলেন ‘ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে’। সেই শুরু তারপর বহু ছায়াছবিতে তিনি একের পর এক রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন।সেই গানগুলির উল্লেখ করাই যায়।

যেমন
‘এদিন আজি কোন ঘরে গো'( গৃহদাহ),
‘বিপদে মোরে রক্ষা করো'( আলো আমার আলো),
‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়'( দিবারাত্রির কাব্য),
‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার’,’চরণরেখা তব’
(পরিচয়),
‘আগুনের পরশমণি'( কাঁচের স্বর্গ),
‘মনে কি দ্বিধা রেখে'( ছায়াসূর্য চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈত),
‘আমার মন মানে না'( অয়নান্ত)
,’তুই ফেলে এসেছিস কারে'( নবরাগ),
‘ওগো পুরবাসী'( বিসর্জন),
‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ (কোমল গান্ধার),
‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম'( অনুষ্টুপ ছন্দ),
‘ভালোবাসি ভালোবাসি'( বিজয়িনী), ইত্যাদি।

রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে যখন গ্রামাফোন কোম্পানী থেকে সন্তোষ সেনগুপ্তর পরিচালনায় শাপমোচন গীতিনাট্য প্রকাশিত হয় তখন সেই গীতিনাট্যের প্রথম গান ‘ ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ গেয়েছিলেন সুমিত্রা সেন।শুধু ছায়াছবিতেই নয় তার পাশাপাশি প্রতিবছর একের পর এক রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করতেন সুমিত্রা সেন।শ্রোতারা উন্মুখ হয়ে থাকতেন তাঁর রেকর্ডের জন্য।’কান্না হাসির দোল দোলানো,’ ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’, ‘এবার সখী সোনার মৃগ’,’এবার আমায় ডাকলে দূরে’,’আমি এলেম তারি দ্বারে’,’ সখী ভাবনা কাহারে বলে’,’ দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে’,’ ওগো সাঁওতালি ছেলে’,ইত্যাদি গানগুলি যেন সুমিত্রা সেনের গান হয়েই রয়ে গিয়েছে।

সুমিত্রা সেনের স্বামী শ্রী অনিল সেন ছিলেন একজন আদ্যন্ত সংস্কৃতিবান মানুষ।সুমিত্রা সেনের সুমিত্রা সেন হয়ে ওঠার জন্য তাঁর অবদান অনেকটাই।যখন ত্রিবেণী সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠানের আয়োজন সুমিত্রা সেন করতেন তখন অনিল সেনের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা আজও অনেকে স্মরণ করেন।দেবব্রত বিশ্বাস,হেমন্ত মুখোপাধ্যায়,সাগর সেন,চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়,দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়,ধীরেন বসু,অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধন গুহ,পলি গুহ,শান্তি বসু,পার্থ ঘোষ,গৌরী ঘোষ,প্রমুখ শিল্পীরা অংশ নিতেন এইসব অনুষ্ঠানে।জনপ্লাবনে রবীন্দ্রসদন উপচে উঠতো।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর নিয়ে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষাদানের মধ্যে।

সহজ করে রবীন্দ্রনাথের গানকে আত্মস্থ করে সেই গান পরিবেশন করেছেন সুমিত্রা সেন।শুধু গান গেয়েছেন বা শিখিয়েছেন এমন নয় যাঁরা তাঁর অনুজ বা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী তাঁদের প্রতিই ছিলো তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ ও উৎসাহ। দুই কন্যা ইন্দ্রাণী ও শ্রাবণী আজ রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাংলা গানের জগতে দুই উজ্জ্বল নাম।নানা পুরস্কারব ভূষিতা সুমিত্রা সেনের জীবনবসান ঘটে ২০২৩ এর ৩ জানুয়ারি।সেদিন তাঁর ছাত্রছাত্রী ও কাছের মানুষরা রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁদের প্রিয় সুমিত্রাদিকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলো। শীতজর্জর কলকাতা সেদিন যেন আর একবার রিক্ত হলো সুমিত্রা সেন কে হারিয়ে।।তাঁকে প্রণাম জানাই।

Comment here