সংস্কৃতি

কলমচিদের আড্ডাখানায় – ২

(প্রথম পর্বের পর

১০০ নং গড়পার রোড। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বাড়ি। একতলায় প্রেস, দোতলার সামনের দিকে কিছুটা অংশ জুড়ে অফিস এবং বাকি অংশে তাঁরা বসবাস করেন। উপেন্দ্রকিশোরের বড় ছেলে সুকুমার ইংল্যান্ড থেকে এফ আর পি এস ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে এলেন। ১৯১৫ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোরের জীবনাবসান হবার পর তিনি ও তাঁর মেজো ভাই সুবিনয় ইউ রায় এন্ড সন্স এর দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন।সুকুমার ছিলেন উদার মনের মানুষ।কোনরকম গোঁড়ামি তাঁর মধ্যে ছিলনা। ক্রমশঃ ক্রমশঃ সুকুমার কে কেন্দ্র করে গড়পার রোডের বাড়িতে অনেক গুণী লোকের সমাবেশ হলো। এঁরা ছিলেন সংগীতজ্ঞ, শিল্পী, সাহিত্যিক এমন কত কি। প্রতিষ্ঠা হল মানডে ক্লাবের।রসিকতা করে যাকে বলা হতো মন্ডা ক্লাব।সভ্যরা এর ওর বাড়িতে জমায়েত হতেন।

গান-বাজনা, প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা পাঠ আবার কখনো বা দেশি বা বিদেশি সাহিত্য নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি সবই হতো সেখানে।চলতো রসালাপ বা নাট্যাভিনয়। এদেশে এই ধরনের ক্লাব সম্ভবতঃপ্রথম চালু করেন সুকুমার রায়। ১৯১৭-১৯১৮ সালের এই মন্ডা ক্লাবের তৃতীয় বার্ষিক বিবরণী দেখে পুলকিত হতে হয়। ক্লাবের মোট সদস্য সংখ্যা ২৫। এই সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন কালিদাস নাগ, অজিত কুমার চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অমল হোম,অতুলপ্রসাদ সেন, ডা.দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র,অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র,প্রভাতচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, জীবনময় রায়, নির্মলকুমার সিদ্ধান্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কিরণশঙ্কর রায়, সুরেন্দ্রনাথ দত্ত, সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

সেপ্টেম্বর ১৯১৭ থেকে ১৯১৮ র আগস্ট পর্যন্ত মন্ডাক্লাবের সাড়ে ৪০ টি অধিবেশন হয়েছিল।জুট ইন্ডাস্ট্রি, স্বামী বিবেকানন্দ, স্ট্রিন্ডবার্গ তুর্গেনেভ,প্লেটো কেউই বাদ পড়েননি এই ক্লাবের সভার আলোচনা থেকে।

মণ্ডাক্লাবে নিয়মিত আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখা হতো। এই হিসাব থেকে দেখা যায় যে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৭ টাকা দান করেছিলেন এবং তাঁর প্রেমচাঁদ ভোজে সাড়ে ষোলো টাকা খরচ হয়েছিল। এই ক্লাবের নিত্য চাহিদা মেটাবার জন্য সুকুমার রায় প্রবন্ধ কবিতা নাটক ইত্যাদি লিখতেন।মধ্যে মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এখানে আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন। জানা যায় যে তাঁর বিখ্যাত পয়লা নম্বর গল্পটি কবি ওখানেই পড়ে শুনিয়েছিলেন। ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সুকুমার রায়ের দেওয়া নাম নিয়ে মজা করে লিখেছেন আমাদের এই মন্ডা সম্মিলন। 

মন্ডাক্লাবে সুকুমারের কবিত্বশক্তির অনেক নজির রয়েছে। একটি উদাহরণ এই প্রসঙ্গে সবিশেষজরুরী। একবার মন্ডাক্লাবের সেক্রেটারি কিছুদিনের জন্য কলকাতার বাইরে চলে গেলে সদস্যরা যা ইচ্ছা তাই করতে লাগলেন। সেক্রেটারি আবার ফিরে এলেন এবং মিটিং ডাকলেন।সুকুমার রায় স্বয়ং সেই সেক্রেটারীর বক্তব্য লিখে দিলেন।লেখাটি ভারী মজার – 

‘ আমি অর্থাৎ সেক্রেটারি মাসতিনেক কলকাতা ছাড়ি
যেই গিয়েছি অন্য দেশে, অমনি কি সব গেছে ফেঁসে!
বদলে গেছে ক্লাবের হাওয়া, কাজের মধ্যে কেবল খাওয়া! চিন্তা নেইকো গভীর বিষয়, আমার প্রাণে এসব কি সয়?

এখন থেকে সমঝে রাখো,
এ সমস্ত চলবে না কো
আমি এবার এইছি ঘুরে,
তান ধরেছি সাবেক সুরে
মঙ্গলবার আমার বাসায়, আর থেকো না ভোজের আশায়,
শুনবে এসো সুপ্রবন্ধ
গিরিজার বিবেকানন্দ।’

 

(ক্রমশ)

Leave a Reply