বিপন্নতার মানব মুখরাজনীতি

শরণার্থীদের শঙ্কিত করে বিজেপির সঙ্কল্পপত্র –

২০২১ সালের ১৮ই মার্চ (অসমের) বরাক উপত্যকার সীমান্ত জেলা করিমগঞ্জের ভাটগ্রামের নির্বাচনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ‘কোনও দলের নির্বাচনী ইস্তাহার তৈরী অনেক বড় কাজ। ইস্তাহার তৈরী করার আগে মানুষের ও জানতে হয়, বুঝতে হয় তাদের আশা-আকাঙ্খা।’ একজন দক্ষ প্রধানমন্ত্রী ষোলোআনা খাঁটি কথা বলে গেছেন। প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রীর দল কি তবে নির্বাচনী ইস্তাহার তৈরী করার আগে মানুষের মন জানতে পেরেছে? না কি ভোটের বাজারদর সর্বস্বতা ইস্তাহার তৈরিতে দক্ষতা দেখিয়েছে?

মঙ্গলবার বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্রী জেপি নাড্ডার হাত ধরে অসমে তার দলের নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ পেয়েছে। দশ পয়েন্টের বাহারি নামের সেই ‘সঙ্কল্প পত্র’ – য়ের কোথাও শরণার্থীদের স্বার্থরক্ষাকারী নাগরিকত্ব আইনের বিধি বাস্তবায়নের বিষয়ে ছিঁটেফোঁটারও উল্লেখ নেই। অবশ্য শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টায় বিজেপি সভাপতি নাড্ডা দলীয় ইস্তাহার প্রকাশের অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বিজেপি সিএএ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

প্রশ্ন উঠেছে, বিজেপি যখন এ ব্যাপারে ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’, তবে বিষয়টি ইস্তাহারে লিখিতভাবে প্রকাশ করা থেকে তারা বিরত থাকলেন কেন?  শরণার্থীদের অমর্যাদা করেই অসমীয়া ভোটব্যাঙ্ক অক্ষুন্ন রাখতেই কি এমন নির্লজ্জ পদক্ষেপ? নাগরিকত্ব আইনের রুলস বাস্তবায়নে বিজেপি সরকারের চূড়ান্ত ব্যর্থতা ও অস্পষ্টতা গত প্রায় এক বছর ধরেই প্রকট। কী অভিসন্ধি রয়েছে এর পেছনে?

নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ২০১৯ (সিএএ) অখণ্ড ভূখন্ডের বাসিন্দা যারা দশভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার, তাদের সম্মান, মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি উদ্যোগ। এই আইনটি প্রণয়ন করে মোদী সরকার নিজেদের শরণার্থীদের ত্রাণকর্তা হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু, সেই ত্রাণকর্তারাই শরণার্থীদের নিজেদের ভোট রাজনীতির স্বার্থে যেমন খুশি ব্যবহার করছে। ভোটের বাজারে এই শরণার্থীরা সকল পক্ষের কাছেই কাউন্টেবল ফ্যাক্টর।

তবে তাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে প্রত্যেকেই রাজনীতিতে লিপ্ত। কংগ্রেসের পক্ষে শরণার্থীবান্ধব এই আইনকে শুরু থেকেই অমর্যাদা করা হয়েছে। সমস্ত স্পর্ধার সীমা ছাড়িয়ে কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারেও ক্ষমতায় এলে আইনিটি বাতিল হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা কখনোই তাদের অর্থাৎ রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়ই নয়। কিন্তু শরণার্থীদের ত্রাণকর্তারা? অসম রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহারে উদ্বাস্তুর কবচ কুণ্ডলী অথচ সিএএ’র চিহ্নমাত্র রাখা হয়নি। অথচ অসমে বিজেপির প্রধান ভোটব্যাঙ্ক এই সিএএ প্রত্যাশীরা।

রাজ্য বিজেপির ‘সঙ্কল্প পত্র’ – য়ে রাজ্যের ‘শরণার্থী’ দের রক্ষাকবচ সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়নের কোনও বিধিনিয়ম বা রুলস প্রণয়নের কোনও উল্লেখ না থাকলেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ইতিমধ্যে নবিকৃত জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা আপডেটেড এনআরসি-কে কাঠামোগতভাবে পোক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ইস্তাহারে। অস্তিত্বের সঙ্কটে বিপন্ন মানুষকে আরও বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিতে সিএএ রুলস বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটিয়ে এবং জাতীয়তাবাদী শিবিরকে তুষ্ট করতেই কি ফের এনআরসি করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিল রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব?

রাষ্ট্রহীনের তকমা পাওয়া মানুষগুলো ‘ডি’ আতঙ্কে ত্রস্ত। অহরহ ডি নোটিশ জুটছে তাদের ভাগ্যে। বন্দি জীবন কাটছে অনেকের। করোনা পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশে অসমের ডিটেনশন ক্যাম্পে তিন বছর কাটানো বন্দিদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। বিদেশী তকমা পাওয়া এই বন্দিদের মুক্তিতে অসংখ্য সাধারণ মানুষে পাশাপাশি এগিয়ে এসেছিলেন শিলচরের বিধায়ক শ্রী দিলীপ কুমার পালও। জামিনদার হয়েছিলেন ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি ঘোষিত সীমা বর্ধনের। কিন্তু করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে এই রাজনৈতিক চক্রান্তের প্রতিরোধে বার বার কারা হবেন নিপীড়িত মানুষের সহায়? কারা দেবেন সম্মান ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি? যে অসহায় মানুষরা ভেবেছিলেন শরণার্থী ও আক্রান্ত অসমবাসীদের জন্য আর দেরি না করে এবারের নির্বাচনী ইস্তাহারেই সিএএ রুলস বা নির্দিষ্ট কবচ কুণ্ডলীর লিখিত ইঙ্গিত দেওয়া হবে তারা তো আজ সম্পূর্ণ হতাশ, বিক্ষুব্ধ ও অপমানের জ্বালায় ক্ষুব্ধ। অথচ এই মানুষগুলোকেই প্রায় স্থায়ী ভোটব্যাঙ্ক করে এতদিন ফায়দা তোলা হয়েছে।

পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের জন্য বিজেপি রাজ্য কেন্দ্রিক পৃথক পৃথক নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেছে। রবিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের দলীয় ইস্তাহার প্রকাশ করেছেন। ইস্তাহারের তিন নম্বর প্রতিশ্রুতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠন হলে প্রথম ক্যাবিনেটের বৈঠকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) লাগা করা হবে।’ সংসদে পাশ হওয়া কোন আইন লাগু করা বা না করা কোনও রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। অথচ বিজেপি নির্বাচনী ইস্তাহারে ফলাও করে সেই মিথ্যাই প্রকাশ করেছে।  আর তা ঘোষণা করেছেন দেশের এক শীর্ষ আইনপ্রণেতা স্বরাষ্ট্ৰমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহ। অথচ নাগরিকত্ব আইনের বিধি বাস্তবায়ন নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি দিলেন না তারা পশ্চিমবঙ্গেও।

ভারতীয় সংবিধানের সপ্তম অনুসূচির ২৪৬ নং অনুচ্ছেদে কেন্দ্র, রাজ্যে এবং কেন্দ্র-রাজ্যের মিলিত অধিকারগুলোর ক্রমতালিকা সন্নিবিষ্ট রয়েছে। ১ নম্বরের কেন্দ্র তালিকায় (ইউনিয়ন লিস্ট) কেন্দ্র সরকার এককভাবে ভোগ করতে পারে ৯৭টি বিষয়। সেই ৯৭টি বিষয়ের তালিকার ১৭ নম্বর বিষয়টিতে উল্লেখ রয়েছে, Citizenship (নাগরিকত্ব), Naturalisation (রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারদান), and aliens (বিদেশী ব্যক্তি)’ । এই অধিকারের তালিকাঅনুযায়ী সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কিংবা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী নবায়নের বিষয়, সবগুলোর ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় সরকারের একচ্ছত্র অধিকার। রাজ্য সরকারগুলোর কোন অধিকারই নেই। দেশের শীর্ষ আইনপ্রণেতা ও সর্বভারতীয় দল এ ব্যাপারী যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তবে কি শুধু ভোটের বাজার ধরতেই বিজেপি, কংগ্রেস প্রত্যেকেই এমন আলপটকা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে?

 

(প্রবন্ধটি ইতিমধ্যেই অসমের প্রখ্যাত সংবাদপত্র – ‘দৈনিক প্রান্তজ্যোতি’ – তে প্রকাশিত হয়েছে)

Leave a Reply