বামপন্থারাজনীতি

পৃথিবী বদলে যাবে – ৩

(পূর্ব অংশের পর)

 

সংগঠনে মৃত্যুর ছায়া

দলীয় সংগঠনেও সি এম-এর দর্শন মৃত্যুর ছায়া ফেলেছিল। সরাসরি নয়, পরোক্ষে। দলকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেলেন। দলের অনুগামী শ্রমিক, কৃষক, ছাত্রদের গণসংগঠনগুলো তুলে দিলেন। প্রকাশ্য গণআন্দোলন, গণকর্মসূচি বাতিল হয়ে গেল। তার বদলে এল নতুন কিছু শব্দ, গেরিলা স্কোয়াড, অ্যাকশন, খতম, জনে জনে চক্রান্ত, কানে কানে ফিসফিস প্রচার, শত্রু খুন, ঘৃণা, শ্রেণীঘৃণা, লালসন্ত্রাস, শত্রু নির্মূল এবং এরকম আরও অনেক শব্দ। সামাজিক রূপান্তরের কর্মকৌশল রচনার জন্যে ব্যবহৃত এই শব্দগুলিতে মিশে আছে অস্বস্তিকর অনুভূতি। জনসভা এ কথাগুলো বলা যায় না। ছোট গ্রুপ মিটিঙে কানে কানে ফিসফিস করে বলতে হয়। যারা বলে, তাদের ঠোঁট হিমশীতল হয়ে যায়। যারা শোনে, তাদের কানের পাতা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসে। বক্তা আর শ্রোতা, দু’পক্ষই বিপ্লবের চেয়ে তাড়াতাড়ি বিনষ্টির দিকে এগিয়ে যায়। বিনষ্টি আর আত্মত্যাগ তখন সমার্থক হয়ে ওঠে। সি এম-এর ব্যাখ্যাটা তাই হয়েছিল। ব্যাখ্যা যারা শুনত, তারা প্রশ্ন তুলত না। নিজের ভাবাবিষ্টাকে সি এম অনায়াসে শ্রোতাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারতেন। সি এম কলকাতায় সম্ভবত একটার বেশি জনসভা করেননি। ময়দানের সেই সভায় তাঁর ভাষণ শ্রোতাদের মধ্যে দাগ কাটেনি। কিন্তু ঘরোয়া বৈঠক করেছেন অসংখ্য। জনসভায় যাঁকে অনুজ্জ্বল দেখাত, ঘরোয়া আলোচনায় তিনি হয়ে উঠতেন দিগন্তপ্লাবী। শ্রোতাদের মগজের কোষে কোষে ঢুকে পড়তেন। বিরুদ্ধ মতামতকে আবেগের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতেন। স্বপ্ন ও মৃত্যুর মিশেলে সে আবেগ ছিল অকৃত্রিম।

অতি ওর যুক্তিবাদীও তাঁর আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করত। মৃত্যুর স্পর্শ না থাকলে কোনও স্বপ্ন, আবেগ জীবন্ত হয়ে ওঠে না। মৃত্যু আছে বলেই জীবন এত আদরের। রাজনৈতিক চিন্তায়, সংগঠন নির্মাণে আগাগোড়া মৃত্যুকে তিনি লালন করেছেন। সফল শিক্ষকের মত জয় করেছেন শ্রোতাদের। তিনি বাগ্মী ছিলেন না, ছিলেন মন্ত্রদাতা। বিশাল জনজমায়েতে শোনা ভাষণ সভা শেষ হওয়ার আগে শ্রোতারা ভুলে যায়। কিন্তু ঘরোয়া সভায় কানে যে মন্ত্র মন্ত্রদাতা ঢুকিয়ে দেয়, শ্রোতা সারা জীবন মনে রাখে। পরিস্থিতির চাপে সি এম অনুগামীরা করো ক্রমশ একা, বিচ্ছিন্ন, নিশ্চুপ, চক্রান্তকারী হয়ে উঠল। পৃথিবীর মানুষ, আলো, বাতাস থেকে দূরে সরে যেতে থাকল। নেতার মত স্বপ্নে ভাবাবিষ্ট হয়ে থাকার ,মানসিকতা তাদের ছিল না। সি এম দর্শনের দ্বিতীয় অংশ ‘মৃত্যু’ শব্দটাকে তাকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করল। সবচেয়ে পছন্দের শব্দ হয়ে উঠল ‘খতম’। কলকাতা, ২৪ পরগনা, হুগলির রাস্তায় পাওয়া যেতে থাকলো সি এম-এর তরুণ অনুগামীদের লাশ। এক-আধটা নয়, ডজন ডজন। ‘খতম’ শব্দটা যাদের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, প্রতিপক্ষের হাতে তারাই বুমেরাং হতে থাকল। আত্মত্যাগ, আত্মবলিদান, শহিদত্ব ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের পরও বলতে হয়, তাদের অনেকে খুন হয়ে গেল। ‘খতম’ করে দেওয়া হল অনেককে।

বধ্যভূমিতে দেশপ্রেম

সি এম দর্শনের মূল ধুয়ো ছিল দেশপ্রেম। তাঁর স্বপ্ন আর মৃত্যুকে সেতুর মত জুড়ে রেখেছিল দেশপ্রেম। প্রেক্ষাপটে ছিল ভারতীয় দর্শন। তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্বকে বৈদান্তিকের দৃষ্টি, স্থিতি, বিলয়ের ধারণা প্রভাবিত করেছে।  কাজের পদ্ধতিতেও ছাপ ফেলেছে গীতার কর্মবাদ। ফলের কথা ভেবে রাজনৈতিক কর্মী কাজ করবে না, ফল পৌঁছবে সমষ্টির হাতে। আদর্শ প্রতিষ্ঠা ছাড়া ব্যক্তির কোনও ভূমিকা নেই। সি এম-এর জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তাঁর তত্ত্বকে প্রভাবিত করেছে ভারতীয় দর্শনের ঐতিহ্য। তাঁর দেশপ্রেমের উৎসমুখেও আছে ভারতীয়ত্ব। স্বাধীনতা-উত্তর দেশের শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি,   মানবিক সম্পর্ক নতুন ছাঁচে তিনি গড়তে চেয়েছেন। তিনি জানতেন, ‘আমাদের দেশের ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশ এবং আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়।’ (‘ছাত্র যুব আন্দোলন সম্পর্কে’ – পৃ – ১২৪) চলতি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে নির্ভুল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সি এম। গ্রাম-শহরের বৈরিতা, জাতপাতের দ্বন্দ, প্রাদেশিক বৈষম্য, ধর্মীয় সঙ্ঘাত – সব কিছুর মূলে আছে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা। শ্বেত বিশ্ব মনস্তাত্ত্বিকভাবে অশ্বেত বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অশ্বেত পৃথিবীর মানুষের আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, জাতিগৌরবকে লুঠ করে নিয়েছে ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি। প্রতিবেশী রাজ্যের চেয়ে একজন ভারতীয় ইউরোপ, আমেরিকার খবর বেশি রাখে। এইসব ভারতীয় দেশ শাসন করে, দেশের শিক্ষানীতি রচনা করে।  মাও জে দংকে উদ্ধৃত করে সি এম তাই লেখেন, ‘যত বেশি পড়াশুনা করবে, তত বেশি মূর্খ হবে।’ (বিপ্লবী ছাত্রদের প্রতি কয়েকটি কথা, রচনা সংগ্রহ, পৃ – ৯৯)

জোতদারের গলা কাটা, স্কুল-কলেজ পোড়ানোর তাত্ত্বিক পটভূমি তৈরি হয়ে গেল। পটভূমি এবং প্রত্যাশায় অমিল ছিল। দেশপ্রেমের গভীরতা আর ব্যাপ্তির সঙ্গে গলা কাটা, অগ্নিসংযোগের কর্মসূচি খাপ খেল না। ব্যাপক আত্মবলিদানের পরেও সি এম-এর স্বপ্ন অধরা থেকে গেল। ১৯৭২ সালের ২৮ জুলাই অপূর্ণ স্বপ্ন আর অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুকে বুকে আঁকড়ে সি এম শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন।

 

কেউ কেউ বেঁচে থাকেন

মৃত্যুর পঁচিশ বছর পরেও সি এম যে বেঁচে আছেন, এ কথা নতুন করে বলার দরকার হয় না। দেশজুড়ে শুয়োরের খোঁয়াড়গুলো যখন শূকর কেনাবেচার হাটে রূপান্তরিত হয়েছে, শূকরদের দাপাদাপিতে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে দেশ আর দেশের মানুষ, তখন অনুভব করা যায় শীর্ণ চেহারার সেই মানুষটি কাছাকাছি কোথাও আছেন। আড়াল থেকে নজর করছেন ঘটনাস্রোত। গয়া, রাঁচি, জেহানাবাদে শয়ে শয়ে নিহত নিরীহ, গরীব চাষার ছবি  সকালের সংবাদপত্রে দেখার মুহূর্তে বোঝা যায়, তিনিও লক্ষ্য করছেন। তিনি আত্মত্যাগের কথা বলতেন, খতম আর বদলার কথা বলতেন, তাঁর জন্যে আসন্ন নতুন শতাব্দী দরজা খুলে রেখেছে। নতুন শতকে, নতুন কলেবরে যে চারু মজুমদার আসবেন, তার দর্শনে স্বপ্নের সঙ্গে মিশে থাকবে মৃত্যু নয়, প্রাণোচ্ছল জীবন। বেঁচে থাকা, আত্মত্যাগ সমান গুরুত্ব পাবে। খুন, খতম, গলা কাটা ইত্যাদি শব্দ শুধু কসাইখানায় ব্যবহৃত হবে।  হয়ত তা-ও হবে না। অভিধান থেকে শব্দগুলো মুছে যাবে। সব মালিন্য মুছে নতুন অধ্যায় শুরু হবে সংসদীয় গণতন্ত্রে। শুয়োরের খোঁয়াড় হয়ে উঠবে মানবিক মতপ্রকাশের সুস্থ মঞ্চ। কী হবে আর কী হবে না, সি এম বলতে পারেন।  তাঁর পরিকল্পনামত পৃথিবীটা দু’হাজার সালে বদলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। নতুন শতকের পৃথিবীর রূপান্তরে ছাঁদ বদল ঘটলে সি এম মেনে নেবেন।

(সমাপ্ত)  

Leave a Reply