— শ্রী পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়
অখণ্ড ভারতবর্ষকে টুকরো করে পাকিস্তান আদায়ের তিনমাস পর জিন্নার দম্ভী ঘোষণা — উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। দেশের ৫৬.৪০ শতাংশ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের পক্ষ নিয়ে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতির দাবি তুললেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর পূর্ব পাকিস্তানের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সেই স্ফুলিঙ্গ। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রামে গঞ্জে শহরে বন্দরে সর্বত্রই বহু মানুষ সংগঠিত হতে লাগল। যার চরম ফল প্রকাশ পেল ১৯৫২ সালে, ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। পূর্ববঙ্গের রাজশাহী খুলনা চট্টগ্রামসহ রংপুর ময়মনসিংহ কুমিল্লা জুড়ে উত্তাল জনস্রোত পদ্মা-মেঘনার দুর্দম তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়তে লাগল বাঙালির ভাষাচেতনার অভাবনীয় জাগরণে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সাফল্য এখানেই, তিনি একটি মাত্র প্রস্তাবে বারুদের স্তূপে যে আগুন লাগিয়ে দিলেন তা সমগ্র পূর্ববঙ্গকে কাঁপিয়ে দিল। তবু পাকিস্তানী শাসকদের ধারণা ছিল যেহেতু উর্দু আর আরবি হরফ একইরকম, সেইসঙ্গে আরবি মুসলমানদের পবিত্র ভাষা, অতএব ভারতের প্ররোচনায় হিন্দুরাই এই আন্দোলনের মূলে, তাই তারা বিশেষভাবে রুষ্ট হয়ে ওঠে হিন্দুদের উপর। ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল রাজশাহী খুলনা চট্টগ্রাম ময়মনসিংহ সিলেট আর বরিশাল-জানান দেয় প্রতিরোধের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের অগ্নিমশাল। এইসময় পাক পুলিশের গুলিতে মারা যায় চারজন হিন্দু ছাত্র। নিহতদের লাশও পুলিশ গুম করে দেয়। পরিকল্পিতভাবে পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকার এই চার হুতাত্মার নাম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। অলক্ষ্যে আরো কত হিন্দু যে প্রাণ দিয়েছে, কী তাদের গভীর আত্মত্যাগ তার কোনো হিসেব নেই। কেন নেই সেটা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে দ্রুত দানা বেঁধে ওঠা আন্দোলন দমন করতে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। সেইসঙ্গে ঢাকা শহরে সমাজ রকমের মিছিল ও সমাবেশ বেআইনি এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীবৃন্দ একটি প্রতিবাদ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে গুলিবর্ষণ করে। প্রচারিত হয় গুলিতে নিহত হন জব্বর, সালাম, রফিক, সফিউর, বরকত এবং একজন দরিদ্র রিকশাচালক আওয়াল। এছাড়া সতেরোজন পলিশের ছোঁড়া গুলিতে আহত হন। সেই তালিকায় ছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম, ফৈয়াজ সিরাজুদ্দিন খান, আব্দুস সালাম, এম.এ মোত্তালেব, এলাহী বক্স, মনসুর আলী, মোঃ বশিরুদ্দিন, এ রেজ্জাক, মোজাম্মেল হক, সুলতান আহমেদ সহ আরো অনেকে। অগণিত মানুষের রক্তে ঢাকার সুবিশাল রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। অত্যন্ত করুণ, মর্মন্তুদ এই ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরন্তর গবেষণায় একদিন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে প্রকৃত সত্য। পাঠক বিচার করুন —
১. শহীদ জব্বার: ১০ই অক্টোবর, ১৯১৯ সালে পাঁচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপজেলা ময়মন সিং: পিতা: হাছন আলি, মা: সাফাতুন নেছা। ১৯৪৯ সালে বন্ধুর বোন আমনা খাতুনকে তিনি সাদি করেন। নুরুল ইসলাম বাদল তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তান। ১৯৫২ সালে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত শাশুড়িকে ২০শে ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করেন, পরদিন সকাল দশটায় শাশুড়ির জন্য ফল ক্রয় করার উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হন। সামনে ভাষা আন্দোলনের মিছিল ছিল। পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। শহীদ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রীর বিবাহ তাঁর ভাই আব্দুল কাদেরের সঙ্গে হয়। তাঁকে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
২. শহীদ সালাম: ২৭শে নভেম্বর, ১৯২৫ সালে লক্ষ্মীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপজেলা: দাগনভূঞা, জেলা: দেনী। পিতা ফাজিল মিয়া, মাতা: দৌলতের নেছা। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টর অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগের পিয়ন পদে চাকুরি করতেন সালাম। একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০.৩০ নাগাদ অফিসে যাবার পথে পুলিশের গুলিতে আহত হন, তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। ২৫শে ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় (৭ই এপ্রিল, সরকারি গেজেটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী) তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁর পিতার উপস্থিতিতে পরের দিন তাঁকে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৩. শহীদ রফিকউদ্দিন: ১৯২৬ সালের ৩০শে অক্টোবর পারইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপজেলা: সিংগাইর, জেলা: মানিকগঞ্জ। পিতা আব্দুল লতিফ মিয়া, মাতা : হাফিজা খাতুন। তাঁর নিজ গ্রামে রাহেলা খাতুন পানু নামে একজন মহিলার সঙ্গে বিবাহের দিন স্থির হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি বিবাহের বাজার করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে যাবার পথে তাঁর মাথায় গুলি লাগে। ঘটনাস্থলে তিনি শহীদ হন। তাঁকে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৪. শহীদ আব্দুল বরকত ১৬ই (মতান্তরে ১৩ই জুন) ১৯২৭ সালে বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। থানা ভরতপুর, জেলা: মুর্শিদাবাদ, ভারত। পিতা সামসুদ্দিন, মাতা: হাসিনা বেগম। তার আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন। একুশে ফেব্রুয়ারি, রাত আটটায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকেও আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৫. শহীদ সফিউর রহমান: ২৪শে জানুয়ারি, ১৯১৮ সালে কোন্নগরে জন্মগ্রহণ করেন। জেলা হুগলি, ভারত। পিতা মৌলভী মাহবুবুর রহমান। ১৯৫০ সালের ১৬ই মে কলকাতার তমিউদ্দিন মোহাম্মদের মেয়ে আকিল খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ঢাকা হাইকোর্টের হিসাবরক্ষণ শাখায় চাকুরি করতেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি, সাইকেলে অফিস যাওয়ার পথে খুশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাকে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৬. শহীদ আউয়াল/অহিউল্লাহ একজন দরিদ্র রিকশাচালক। পুলিশের গুলিতে তাঁরও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাঁকেও আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা:
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন শ্যামল বঙ্গের আকাশে এক জ্বলন্ত সূর্য, অভিশাপের কালো মেঘ সরিয়ে তিনি উদিত হয়েছিলেন। চিরসত্য সেই সূর্যের তাপ সহ্য করতে পারেনি বর্বর পাকিস্তানি নেকড়েরা। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন ভাষা আন্দোলনের মুক্তিসূর্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সেই অপরাধে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাক যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। যার মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। রাতের অন্ধকারে তাঁকে এবং তাঁর পুত্র দিলীপ দত্তকে কুমিল্লার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো ময়নামতি সেনা ক্যান্টনমেন্টে। অকথ্য নির্যাতনের মধ্যে অশীতিপর বন্দি বৃদ্ধকে দীর্ঘদিন ফেলে রেখে একটু একটু করে চরম নিষ্ঠুরতায় হত্যা করা হয়। পুত্র দিলীপ দত্তের অবস্থাও হয় তদ্রুপ করুণ।
সেনানিবাসের ক্ষৌরকারের বয়ান থেকে জানা যায়, এক অভিশপ্ত ভোরবেলায় তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হামাগুড়ি দিয়ে চরম কষ্টে শৌচাগারের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছিলেন। সারা শরীরে বীভৎস অত্যাচারের চিহ্ন। পায়ে সামান্যতম শক্তি অবশিষ্ট নেই। সারা গায়ে তুলোর ব্যান্ডেজ, মাথা চোখ সব ঢাকা। কত দিন সয়েছিলেন এই অসহনীয় জীবনযন্ত্রণা, জানা যায় না। শুধু জানা যায়, ৮৪ বছরের বৃদ্ধ ধীরেনবাবুর হাত-পা ভেঙে দেয় নরপশুরা, তারপর জীবন্ত অবস্থায় তাঁর দুটি চোখ উপড়ে ফেলে, এবং প্রায় ১৫ দিন পর ১৪ এপ্রিল ভোরবেলায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলার শ্যামল মাটিকে ভালোবেসে, মাতৃভূমির সোঁদা গন্ধে থেকে গিয়েছিলেন তাঁর আজন্মলালিত পূর্ববঙ্গে, সেখানেই যেন ভেসে এলো সেই অমর গান ‘আমার এই দেশেতেই জন্ম/যেন এই দেশেতেই মরি।’
শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত চেয়েছিলেন অখণ্ড স্বদেশ, বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রে তিনি গাঁথতে চেয়েছিলেন প্রাণের গভীরে থাকা নিবিড় হৃদয়। আকাশবাণী থেকে বেতার তরঙ্গে তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রথম প্রচারিত হয়। বাংলা ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী নায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ভারতের লোকসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম, ৩০ লাখ অসহায় মানুষের রক্ত, এককোটি শরনার্থীর বুকফাটা আর্তনাদ, ২০ হাজার ভারতীয় সেনার আত্মবলিদান তবে কি ব্যর্থ হয়ে গেল? ভারতবাসীর রাজকোষাগার থেকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ব্যয় করে অবশেষে এলো আসন্ন দিন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, অপরাহ্ন ৪.১০ মিনিটে ভারতীয় সেনাদের নিকট অবনত মস্তকে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জয় হলো স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। আজ বাংলাদেশের নব্য প্রজন্ম তাঁর নাম জানে না। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কারণে তাঁর সেই উজ্জ্বল স্মৃতিকে মলিন কার্পেটের তলায় চাপা দিয়ে রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গেও আজ একই অবস্থা। এর জন্য দায়ী কে? ‘পবিত্র একুশের পুণ্য লগ্ন’ বাঙালির ভাষা চেতনায় যেন এক নতুন ক্রান্তিকাল ।
উনিশে মে শিলচর ভাষা আন্দোলনে সেই উচ্ছ্বাস এবং আলোড়ন আমরা দেখতে পাই না। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ সাড়ম্বরে পালিত হলেও একটিবারের জন্যেও স্মরণ করা হয় না হুতাত্মা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অক্ষয় পৌরুষে অবিনাশী মন্ত্রের কথা। তবু আমরা আশাবাদী, আমরা বিশ্বাসী গভীর রাত্রির কালিমা ক্রমশ ম্লান করে একদিন জেগে উঠবে হিরণ্ময় সত্যের সেই আলোকস্পন্দন। ‘ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পদক’-এর মাধ্যমে হয়তো কোনো একদিন দ্যুতিময় হয়ে উঠবে বাঙালি জাতিসত্ত্বার ধুলোপড়া সেই অভিজ্ঞান। আমরা চিনতে, জানতে এবং বুঝতে পারব ভাষা আন্দোলনের মুক্তিযজ্ঞে তিনি ছিলেন প্রকৃত ঋত্বিক, দীপ্ত স্বাধীনতার অগ্রণী পুরুষ।
(লেখক পরিচিতি – মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক। জাতীয়তাবাদী কবি ও প্রাবন্ধিক। প্রকাশিত গ্রন্থ : রাত বারোটার সূর্য (কাব্যগ্রন্থ), প্রকাশ্য আড়াল ( কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থ ), লিমেরিক ৫০ (ননসেন্স ভার্স), এবং ‘বাঙালি হিন্দুর ধূসর ভবিষ্যৎ’ (নিবন্ধগ্রন্থ)।)


