– শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত
হ্যাঁ, ‘বান্দ্রাবয়’ এখন ’ বান্দ্রাবাসী ’ |
অর্থাৎ? শ্রী জয় বিমল রায়ের ইংরাজিতে লেখা ‘Ramblings of a Bandra Boy’ এখন বাংলায় অনুদিত হয়ে ‘বান্দ্রাবাসির খেরোর খাতা’ নামে সদ্য প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু Rambling কথাটার তর্জমা করলে সেটা কি ‘খেরোর খাতা’ হয়? ইংরাজি কথাটার অর্থ খুঁজলে জানতে পারি – অপরিকল্পিত বা এলোমেলো কথা, লেখা বা চিন্তার প্রবাহ। আর ‘খেরোর খাতা? লাল শালুক মোড়া ‘নোটবুকে’ সত্যজিৎ রায় তাঁর ভুতের নাচের স্ক্রিপ্ট লিখেছেন; সুকুমার রায় তাঁর আবোল তাবোল এর সব কাল্পনিক চরিত্র এঁকেছিলেন; আর লীলা মজুমদার সে নামে তার স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মোদ্দা কথা, যেই নোটবুকে এক উর্বর মস্তিস্কের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ভাবনা চিন্তা এবং চিত্র পরিকল্পনার একটা খসড়া করে রাখা হয়। সম্ভবত এই অর্থেই Rachel Dwyer – SOAS এর অধ্যাপক – তাঁর ‘পূর্বকথায়’ বর্ণনা করেছেন জয় বিমল রায়ের ‘Ramblings’ কে।
আমি ইংরাজি ভাষায় আরেকটা অর্থ পাইঃ মেঠো পথে এলোমেলো ঘুরে আনন্দ পাওয়া। আমার ধারনা এই বর্ণনাটাই বান্দ্রাবাসীর ছোট ছোট গল্পকথা ওরফে narrative capsule এর form/গঠন আর content/বিষয়কে ম্যাচ করে। কারণ তার রচনার বিস্তার জীবনের এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে, ভূগোলের এক মানচিত্র থেকে আরেক মানচিত্রে, অগণিত পরিচিত মানুষের ভিড়ে এক ব্যক্তিত্বের থেকে আরেক ব্যক্তিত্বে অনায়াসে বয়ে চলে।
মনোবীনা এবং বিমল রায়ের সংসারে তিন কন্যার পর জয়ের জন্ম। সালটা ১৯৫৫। কিছুদিন আগেই তাঁরা সপরিবার বান্দ্রার গোদিওয়ালা বাংলোতে এ সংসার সাজিয়েছেন। সেই heritage architecture এখন আর নেই – তার স্থানে গজিয়েছে কাঁচে মোড়া এক ত্রিশতলা দৈত্য। কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া দেওয়ালের ভিতর যে মনমোহক জীবন যাত্রা চলেছিল, তা যারা একবার সেই বিশাল প্রাসাদে পদার্পণ করেছে, তারা কোনোদিন ভুলতে পারেনা। জয়ের বয়স যখন মাত্র দশ, তখন সে পিতৃহারা হয়। কিন্তু সেই 5, Mount Mary Road এর স্মৃতি আজো মলিন হয়নি । এই কথাটা আরেকবার প্রমাণ করে দিল ‘Bimal Roy Does Not Live here Anymore’ লঘুচিত্রটি।
নাসরিন মুন্নি কবির এই কাজটা করেছিলেন হঠাৎই একদিন। তখন জয়ের মা মনোবীনা, মেজদি যশোধরা, বুবুনদি অপরাজিতা সকলেই বর্তমান। ‘বান্দ্রাবাসি’র launchএ এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনা যোগ করেছিল এই ছবিটা। কারণ এই বাড়ির বাগানে বিমল রায় ‘সুজাতা’ ছবির কিছু দৃশ্য রচনা করেছিলেন। এই বাড়ির আসবাবপত্র, দেওয়ালে টাঙানো গোপাল ঘোষ আর কে এইচ আরার ছবি, চিন থেকে আনা জু বেহং এর ঘোড়া বা জাপানি ডল পুতুল, বিমল রায়ের জীবন প্রমান প্রতিকৃতি এবং তার পাওয়া ১১ টা ফিল্মফেয়ার ট্রফি – সবই এখনো রূপকথার মত আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে আছে।
বিমল রায় থাকতেই গোদিওয়ালা বাংলোর পাশের কটেজটা কিনে নেওয়া ছিল। তাই কোর্টের রায় বেরতেই জেঠিমা সেখানে চলে আসেন। তাই পিনকোড ৪০০০৫০, এখনো জয়ের জীবনের কেন্দ্র।
বান্দ্রা শব্দটি ‘বন্দর’ কথা থেকে এসেছে। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানির মধ্যমনি এই উপনগর। ইতিহাসের পদচিহ্ন মুখরিত এই চিত্রতারকা আর রাজনৈতিক সৈনিক খচিত প্রান্তর যেখানে বহুকাল ধরে চলেছে আরব সাগরের নিরন্তর ঢেউ। এর তীরে প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বান্দ্রা ফোর্ট, সেকাল থেকে যখন পর্তুগীজ রাজকন্যা Catherine এর সাথে ইংরেজ রাজা Charles ২ এর বিয়ে হয়। ১৬৬২ সালে সেই বিয়ের যৌতুক সরূপ Charles পেলেন সাতটি দ্বীপ। আরব সাগরের সেই বন্দরে St. Andrews পৌছলেন ১৫৭৫ সালে, সেই জেসুইট পাদ্রি কোলী মেছুনিদের বিশ্বাস অর্জন করে গির্জা স্থাপন করলেন। তাই আজো, গোয়ার মত্ বান্দ্রাও খ্রিষ্টানদের গড়।
আমরা যখন নেহাতই কিশোর-কিশোরী তখন দেখনা দেখ এই বান্দ্রা ফোর্টে এ বেড়াতে যেতাম। যেমন যেতাম Mount Mary Basilica তে, মেলা থাক বা না থাক। কিন্তু আজ আবধি বান্দ্রা বললেই আমরা বুঝি মেহেবুব studio – যে studio তে মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭) কাগজ কে ফুল (১৯৫৯) এবং গাইড (১৯৬৫) এর মতন ক্লাসিক ফিল্ম তৈরি হয়েছে। আজো যে এই cinematic heritage নিজস্ব স্বকীয়তায় দাঁড়িয়ে আছে আশেপাশের অনেক দাম্ভিক multistory buildingকে ছাপিয়ে – তা মেহেবুব খানের লিখিত নির্দেশে, যে সিনেমা রহিত অন্য কোন কারণে এটিকে ব্যবহার করা হবেনা।
বান্দ্রা’র অপর প্রান্তে আছে ধারাভী, যেখানে অগনিত Slumdog Millionaire আজও স্বপ্ন বুনে চলেছে। এদের আঁধার ছায়ায় মুড়ে দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে Bandra Kurla Complex। সেখানে Nita Ambani Cultural Centre আর Jio World Drive এর সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে বড় বড় ব্যাঙ্ক, নামি দামি কর্পোরেট হাউস, আর সুস্বাদু রেস্তোরাঁ। অদুরে বান্দ্রা-ওরলি সিলিঙ্ক দক্ষিণ মুম্বাইকে যোগসূত্রে গাঁথছে তার চির প্রসারমান suburb এর সাথে।
বান্দ্রার হৃদয়স্থলে আছে পালি হিল – যেখানে নার্গিস দত্ত ঘর বেঁধেছিলেন সুনীল-সাঞ্জয়-প্রিয়া-নম্রতার সঙ্গে; দিলীপ কুমার সায়রা বানুর সাথে; গুলজার রাখীর সাথে। এক সময় এই বান্দ্রাতেই, আরব সাগরের জলে সূর্যাস্ত যেতে দেখতেন মীনা কুমারী; তারপর তাঁরই মত রেখা। সেই একই সাগরের দিকে মুখ করে হাজারো ফ্যান কে হাত নাড়ে শাহ্রুখ-সলমন খান, আর সেই বান্দ্রা promenadeএই জয় install করেছে Requiem, শান্তিনিকেতনের এক শিল্পীর সৃষ্টি, দুটো ঊর্ধ্বমুখী যুক্ত কর, প্রণাম মুদ্রায়। মাতৃ প্রণাম হিসাবে।
মায়ের তোলা অনেক অনেক ছবি সাজিয়ে তুলেছে জয়ের ‘খেরোর খাতা’। এইখানেই ইংরাজি মুল বইয়ের সঙ্গে তফাৎ। মা মনোবীনা আর বাবা বিমলের তোলা ছবি এই আত্মকথার অমুল্য সম্পদ। হয়ত এই কারণেই, ‘খেরোর খাতা’ য়ে আমরা মূলত পাই জয়ের পরিবার কেন্দ্রিক anecdotes, পরিবারের বাঙ্গালীয়ানা ও বাঙ্গালী খাবারের উপর ফোকাস; এবং জয়ের Man friday জগন্নাথ – যাকে ‘J’ নামে চিহ্নিত করেছে জয়।
বইয়ের সব চরিত্র জয়ের বাস্তব জীবনের পাত্র পাত্রী। আর হবে নাই বা কেন? কি মীনা কুমারী কি দিলীপ কুমার; কি রেখা; কি শশী কাপুর; কি শ্যাম বেনেগাল, গিরীশ কারনাদ, কি আলিশা চিনই- সকলকে জয় দেখেছে, চিনেছে, কাজ করেছে সকলের সাথে। স্বভাবতই সকলের ঝলক পাবে ‘খেরোর খাতার’ পাঠকরা। তাই Rachel Dwyer মুখবন্ধে লিখেছেনঃ “এটি জয়ের খেরোর খাতা – একটি ঐতিহ্যবাহী কাপড়ে বাঁধানো নোটবই যেখানে ভারতের উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজের এক বিশেষ অংশের টুকরো টুকরো কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। আরামদায়ক চেয়ারে বসে এক কাপ চা আর বাঙ্গালী জলখাবার ও মিষ্টি নিয়ে এই লেখাগুলোয় ডুব দেওয়ার জন্য এই বই।‘’
(লেখক পরিচিতি – শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত – ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রাক্তন আর্টস এডিটর, মাস কম্যুনিকেশন এবং ফিল্ম এপ্রিসিয়েশনের শিক্ষিকা, গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনার সাথে যুক্ত। তিনি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)-এর সদস্য ছিলেন; জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন: তিনি জাতীয় পুরস্কার প্রাপক।)


