— শ্রী মলয় দাশগুপ্ত
*বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়ক উত্তমকুমারের এবছর শতবর্ষে পদার্পণ। এই ২০২৬ শুধু একটি স্মরণবর্ষ নয়, বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন করে ফিরে দেখার এক মহামূল্যবান মুহূর্ত। জন্মশতবর্ষে বাংলার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও সশ্রদ্ধ প্রণাম। ভবানীপুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া অরুণ চট্টোপাধ্যায় কিভাবে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের আলোকস্তম্ভ হয়ে উঠলেন সেই বিষয় নিয়ে বাঙালির চিরকালের আগ্রহ পিপাসা মেটাতে বহু মানুষ কলম ধরেছেন। অসংখ্য সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বিভিন্ন মূল্যবান বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমি এই লেখাটির মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করব সেই দুঃখের উজ্জ্বল বিন্দুটিকে। অজস্র উত্তম অনুরাগীর মনে তাঁকে হারিয়ে ফেলার দিনটি আজও চিরস্মরণীয়। প্রখ্যাত পরিচালক তপন সিংহ বলেছিলেন, “সময় হার মেনেছে উত্তমের কাছে।”*
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ সমগ্র বাংলাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। জীবনের শেষ দু’দিনে কীভাবে তিনি কর্তব্য, অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা এবং মৃত্যুর সঙ্গে এক নীরব লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন, সেই মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলিই এই লেখায় স্মরণ করার চেষ্টা করলাম।
মৃত্যুর আগের দিন, ২৩ জুলাই। অন্য দিনের মতোই ভোরে উত্তমকুমারের ঘুম ভাঙল। স্নান সেরে তিনি ধূপ জ্বালিয়ে সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজো করলেন। তারপর বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়ের বড় তেলরঙের ছবিতে প্রণাম জানালেন।
এদিকে বংশী আর বাড়ির অন্য কর্মীরা শুটিংয়ের জন্য সব গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী ছবির স্ক্রিপ্ট, কয়েকটি ক্যাসেট, মেকআপ বক্স আর তাঁর বহুদিনের প্রিয় রেডিও-সহ টেপ রেকর্ডার গাড়িতে তুলে রাখা হলো। মন খারাপ হলে উত্তমকুমার প্রায়ই মেকআপ রুমে বসে ওই টেপ রেকর্ডারে গান শুনতেন। সেই গান শুনে তাঁর মন অনেকটা হালকা হয়ে যেত।
হঠাৎ নিচে নেমে গাড়িতে উঠতে গিয়েই তিনি অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর প্রিয় টেপ রেকর্ডারটা কোথায়? গত সতেরো বছরে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি থেকেই টেপ রেকর্ডারটা চুরি হয়ে গেছে! উত্তমকুমার স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা বেজে উঠল তাঁর মনে। কাকে বোঝাবেন? কে শুনবে সেই কথা? সহস্র আলোর বিচ্ছুরণের মধ্যে নিঃসঙ্গ নায়ক — বড় অসহায়!
টেপ রেকর্ডার হারানোর ঘটনায় মনটা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল উত্তমকুমারের। তবু তিনি শুটিং বাতিল করেননি। ভারী মন নিয়েই সেদিন স্টুডিওতে পৌঁছেছিলেন। ফ্লোরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই অভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েকটি দৃশ্যের শুটিং করলেন। তখন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় অভিনয় করছিলেন না; তিনি পাশে দাঁড়িয়ে মহানায়কের অভিনয় দেখছিলেন। প্রতিটি দৃশ্যে কী অসাধারণ স্বাভাবিকতা, কী অনায়াস দক্ষতা—তা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
এরপর এল সেই দৃশ্য, যা পরে উত্তমকুমারের জীবনের শেষ শট হিসেবে ইতিহাসে থেকে যায়। দু’গালে সাবানের ফেনা, কাঁধে হলুদ তোয়ালে আর হাতে দাড়ি কামানোর ব্রাশ নিয়ে তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন।
দৃশ্য অনুযায়ী, গগন সেন ও তাঁর স্ত্রী চিত্রার মধ্যে তুমুল ঝগড়া হচ্ছে। মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘সাবিত্রী’ চরিত্রকে ঘিরেই এই অশান্তির সূত্রপাত। রাগে-অভিমানে চিত্রা ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি ছেড়ে দাদুর কাছে চলে যাচ্ছেন।
শটের আগে উত্তমকুমার সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, “যতটা পারো জোরে চিৎকার করবে। ঝগড়াটা না হলে ঠিক জমবে না।” সুমিত্রাও সেই অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বারবার শট নেওয়ার পরও উত্তমকুমারের মন ভরছিল না। তাঁর মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন একটু খামতি থেকে যাচ্ছে। তাই সকলের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি দৃশ্যটি বারবার করতে থাকলেন।
তৃতীয়বার সিঁড়ি বেয়ে নিজের জায়গায় উঠতে উঠতে হঠাৎ তিনি হেসে বলেছিলেন, “এই ওঠানামা করতে করতে আমার না হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়!” কথাটা তিনি মজা করেই বলেছিলেন, কিন্তু উপস্থিত অনেকেই তা শুনে অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সাত-আটবার এই দৃশ্যের শুটিং হয়। তাঁর নিখুঁত অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠাই তাঁকে বারবার একই দৃশ্য করতে বাধ্য করেছিল।
পরিচালক সলিল দত্ত জানতেন, উত্তমকুমারের হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে। তাই তিনি চুপিচুপি সবাইকে বললেন, এবার শট শেষ হতেই যেন সকলে হাততালি দিয়ে তাঁর প্রশংসা করেন। উদ্দেশ্য ছিল, তিনি যেন আর সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করে একই দৃশ্য আবার করতে না চান। শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটাই করা হয়। সেই দৃশ্যটি আজও মন দিয়ে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট চোখে পড়ে। সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় সিঁড়ি বেয়ে আগে নেমে যান, আর উত্তমকুমার কিছুটা ওপরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর তিনি সামান্য ঝুঁকে দ্রুত নেমে এসে কাঠের রেলিংয়ের পাশে সুমিত্রার কাছাকাছি দাঁড়ান। ঠিক সেই সময় সুমিত্রা রাগে তাঁকে “শাট আপ” বলে ওঠেন। মুহূর্তের জন্য উত্তমকুমার যেন থমকে যান। এরপর সুমিত্রা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলে তিনি বিস্মিত ও আহত এক মানুষের অনুভূতি নিয়ে সংলাপ বলতে শুরু করেন।
তবে এই দৃশ্যের আর-একটি সূক্ষ্ম দিক অনেকেরই নজর এড়িয়ে যায়। সংলাপ বলার সময় অজান্তেই তিনি একবার বুকে হাত দিয়ে ফেলেছিলেন। অনেকের ধারণা, সেই মুহূর্তেই হয়তো হৃদ্যন্ত্রে হালকা চাপ অনুভব করেছিলেন। কিন্তু নিজের শারীরিক কষ্টকে সম্পূর্ণ আড়াল করে তিনি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় পুরো সংলাপ শেষ করেন। শেষে ব্যঙ্গমিশ্রিত ভঙ্গিতে শেষ কথা বলে শরীর সামান্য দুলিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যান। শট শেষ হতেই ক্যামেরা বন্ধ হয়। তখনই কাঠের সিঁড়িতে বসে তিনি কিছুক্ষণ হাঁফাতে থাকেন। কে জানত, সেই দৃশ্যে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সংলাপই একদিন বাঙালির কাছে মহানায়কের শেষ অভিনয়-নিবেদন হয়ে থাকবে।
পরে পরিচালক সলিল দত্ত জানিয়েছিলেন, ওগো বধূ সুন্দরী ছবির জন্য উত্তমকুমারের সঙ্গে মোট ৪০ থেকে ৪২ দিনের কাজের চুক্তি হয়েছিল। তার মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ দিনের শুটিং শেষ করেছিলেন। তখনও ১০-১২ দিনের কাজ বাকি ছিল।
উত্তমকুমারের শরীর যে পুরোপুরি ভালো ছিল না, তা পরিচালক জানতেন। তাই তাঁকে বিশ্রাম দিয়ে, ধীরে ধীরে শুটিং করানো হচ্ছিল। যে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার দৃশ্যটি তোলা হয়েছিল, সেটি আসল সিঁড়ি নয়; সেটের জন্য তৈরি কাঠের সিঁড়ি। এমন সিঁড়িতে সব ধাপ সমান থাকে না। কোথাও একটু উঁচু, কোথাও একটু নিচু হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ফলে হৃদ্রোগে আক্রান্ত একজন মানুষের জন্য বারবার ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা যথেষ্ট কষ্টকর ছিল।
উত্তমকুমারের স্বভাব ছিল—কোনো দৃশ্য নিখুঁত না হলে তিনি সহজে সন্তুষ্ট হতেন না। তাই নিজের শরীরের কথা না ভেবেই তিনি বারবার একই শট দিচ্ছিলেন, আবার নিজেই তা বাতিল করছিলেন। নায়ক ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ—‘এই খুঁতখুঁতেমিই তোকে একদিন অনেক বড় করবে’—তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্যের সঙ্গে যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই নিখুঁত অভিনয়ের প্রতি অদম্য নিষ্ঠাই তাঁর শরীরের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করেছিল।
শুটিং শেষ হওয়ার পরই উত্তমকুমারের শারীরিক ক্লান্তি পরিচালক সলিল দত্তের চোখ এড়ায়নি। তাঁর মুখে অসুস্থতার স্পষ্ট ছাপ দেখে সলিল দত্ত আর দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথাও বলেন। কিন্তু মহানায়ক সেই পরামর্শকে গুরুত্ব দেননি।
অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি ৩ নম্বর ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।
বহুদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রযোজক দেবেশ ঘোষ নতুন ফ্ল্যাট কেনার আনন্দে একটি আড্ডার আয়োজন করেছিলেন। বন্ধুর আন্তরিক অনুরোধ এড়াতে পারেননি উত্তমকুমার। তাই শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে উপস্থিত কেউই তাঁর মুখ দেখে বুঝতে পারেননি, শরীরের ভেতরে তখন কতটা অস্বস্তি জমে উঠেছে।
সেই দিনই ছিল দুই পৃথিবী ছবির প্রেস শো। পার্ক হোটেলের দুই নম্বর ব্যাংকোয়েট হলে রাত পর্যন্ত চলেছিল অতিথি আপ্যায়ন ও খানাপিনা। কেউ তাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার কথা জোর দিয়ে বলেননি। জানা যায়, সেদিন তিনি কিছু গলদা চিংড়ি এবং সামান্য স্কচও পান করেছিলেন।
গভীর রাতে বাড়ি ফিরলেও আর স্বাভাবিকভাবে ঘুমোতে পারেননি। বুকের তীব্র যন্ত্রণা ক্রমশ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে দ্রুত বেলভিউ নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়।
মহানায়কের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই বোর্ডে ছিলেন ডাঃ সুনীল সেন, ডাঃ এ. বি. মুখোপাধ্যায়, ডাঃ মণি ছেত্রী, ডাঃ চোপড়া, ডাঃ বিশ্বাস এবং তাঁর শৈশবের বন্ধু ডাঃ ললিতমোহন মুখোপাধ্যায়।
কবিগুরু লিখেছিলেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” জীবনের শেষ মুহূর্তে যেন সেই আকুল বাঁচার ইচ্ছাই গভীরভাবে ধরা দিয়েছিল উত্তমকুমারের মধ্যে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি হার মানতে চাননি।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে তিনি চিকিৎসক ডাঃ সুনীল সেনের হাত ধরে আবেগভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, “সুনীলদা, আমাকে এবারের মতো বাঁচিয়ে দিন। আমি কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন আপনার কথা অমান্য করব না।” কথাগুলোর মধ্যে ছিল এক অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ডাঃ সুনীল সেন উত্তমকুমারের ছেলে গৌতমকে একটি বিশেষ ইনজেকশন দ্রুত জোগাড় করতে বলেন। কিন্তু সেই সময় ওই ইনজেকশন ছিল অত্যন্ত দুর্লভ। হাসপাতাল থেকেও সেটি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। উত্তমকুমার আগে গৌতমকে ‘আইভি মেডিকেল’ নামে একটি ওষুধের দোকান করে দিয়েছিলেন। তাই সেখান থেকে হয়তো ইনজেকশনটি পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেও সেটি জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।
সেই সময় উত্তমকুমারের ছোট ভাই, অভিনেতা তরুণকুমার, বম্বে থেকে সবে কলকাতায় ফিরেছিলেন। বাড়িতে পৌঁছেই মেয়ে ঝিমলির মুখে দাদার অসুস্থতার খবর শুনে তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি। গভীর রাতেই ছুটে যান বেলভিউ নার্সিংহোমে।
সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন, পরিবেশ অত্যন্ত গম্ভীর। মা চপলাদেবীর মুখে গভীর উদ্বেগের ছাপ। ছোট ছেলের হাতে সব দায়িত্ব তুলে দিয়ে তিনি চোখের জল সামলাতে সামলাতে হাসপাতালের প্রার্থনাকক্ষের দিকে চলে গেলেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতে।
লিফটে করে ওপরে উঠে তরুণকুমার দেখলেন, উত্তমকুমারের শয্যার চারপাশে চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। ডাঃ সুনীল সেনও স্পষ্টতই চিন্তিত। তিনি তরুণকুমারকে কাছে ডেকে ইশারায় উত্তমকুমারের সামনে দাঁড়াতে বললেন। তারপর মহানায়কের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “উত্তমবাবু, ভালো করে দেখুন তো, একে চিনতে পারছেন?” কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর উত্তমকুমার মৃদু ও ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, “বুড়ো, কখন এলি?” এই একটি বাক্য শুনেই তরুণকুমার ও ডাঃ সুনীল সেন দুজনেই কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন। পরে বাইরে এসে ডাঃ সেন জানালেন, এর আগে পর্যন্ত উত্তমকুমার কাউকেই ঠিকমতো চিনতে পারছিলেন না।
রাত কেটে সকাল, সকাল গড়িয়ে দুপুর। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি ফিরে যেতে হয় তরুণকুমারকে। কিন্তু মন থেকে দাদার অসুস্থ মুখটি কিছুতেই সরছিল না। বিকেলে তিনি আবার বেলভিউ নার্সিংহোমে পৌঁছন। তখন চিকিৎসক ডাঃ এ. বি. মুখোপাধ্যায় তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “ল্যাসিক্স দেওয়া হচ্ছে। প্রস্রাব হলে উত্তমবাবুর অবস্থার উন্নতি হওয়ার আশা আছে।”
বিকেলে আবার হাসপাতালে ঢুকেই তরুণকুমার যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। আগের তুলনায় উত্তমকুমার তখন অনেকটাই সচেতন। তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলা যাচ্ছিল। কথার মাঝেই তিনি হঠাৎ মনে করিয়ে দিলেন, সেদিন তপন থিয়েটারে তরুণকুমারের নহবত নাটকের অভিনয় রয়েছে।
তরুণকুমার কিছুতেই যেতে চাইছিলেন না। কিন্তু উত্তমকুমার দৃঢ় গলায় বললেন, “কেন যাবি না? আমি তো এখন অনেকটাই ভালো আছি। ভাব তো, কত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে শুধু তোদের অভিনয় দেখতে আসে। তুই না গেলে নাটক হয়তো চলবে, অন্য কেউ তোর চরিত্রে অভিনয়ও করবে। কিন্তু যারা শুধু তোর অভিনয় দেখার জন্য এসেছে, তাদের কথা একবার ভাব।”
দাদার এই কথার পরে আর আপত্তি করার সাহস হলো না তরুণকুমারের। তিনি থিয়েটারের উদ্দেশে রওনা দিলেন। অভিনেতা বিকাশ রায়ও প্রথমে কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, কর্তব্যের প্রশ্নে উত্তমকুমার কখনও আপস করতেন না। তাই অসুস্থ অবস্থাতেও ভাইকে অভিনয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষেই সম্ভব।
সেদিন মঞ্চে উঠলেও তরুণকুমারের মন পড়ে ছিল হাসপাতালেই। অভিনয়ে মন বসছিল না। সারাক্ষণ দাদার চিন্তাই তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। কোনো রকমে নাটক শেষ করে তিনি বিকাশ রায়কে বললেন, “দাদা আমাকে ঠিক সাড়ে নটার মধ্যে নার্সিংহোমে যেতে বলেছে।” বিকাশ রায় উত্তর দিলেন, “উত্তম যখন সময় বেঁধে দিয়েছে, তখন ঠিক সেই সময়েই যা। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।”
রাত সাড়ে নটার কিছু পরেই তরুণকুমার বেলভিউ নার্সিংহোমে পৌঁছলেন। রিসেপশনে ঢুকতেই তাঁকে তাড়াতাড়ি ওপরে যেতে বলা হলো। জানানো হলো, উত্তমকুমারের শারীরিক অবস্থার আবার অবনতি হয়েছে, চিকিৎসকেরা তাঁকে খুঁজছেন।
লিফটে করে ওপরে উঠে তিনি দেখলেন, উত্তমকুমারের শয্যার চারপাশে চিকিৎসকদের ব্যস্ততা। ডাঃ সুনীল সেন গভীর মনোযোগ দিয়ে আর্টিফিশিয়াল রেসপিরেটরি মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঘরের পরিবেশ তখন নিস্তব্ধ, ভারী। হঠাৎ একটি তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যেই যেন সবকিছু থেমে গেল। একজন চিকিৎসকের হাত থেকে সিরিঞ্জ মেঝেতে পড়ে গেল। তারপর শোনা গেল সেই নির্মম ঘোষণা—“এক্সপায়ার্ড।”
১৯৮০ সালের ২৪ শে জুলাই, রাত ৯টা ৩২ মিনিট। সেই মুহূর্তে চিরবিদায় নিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অমর নায়ক, বাঙালির একমাত্র ‘ম্যাটিনি আইডল’ মহানায়ক উত্তমকুমার। তাঁর প্রয়াণে শুধু চলচ্চিত্র জগতই নয়, শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল সমগ্র বাংলা। ২৪ জুলাই, ১৯৮০—দিনটি আজও বাঙালির স্মৃতিতে গভীর বেদনার এক অবিস্মরণীয় দিন হয়ে আছে।
নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ লিখেছিলেন, “দেহপট সনে নট সকলি হারায়।” অর্থাৎ শিল্পী একদিন চলে যান, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর স্মৃতিও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। অথচ উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে যেন এই কথার ব্যতিক্রম ঘটেছে। মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাঙালির হৃদয়ে তাঁর স্থান আজও একই রকম উজ্জ্বল।
আশ্চর্যের বিষয়, ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই, যেদিন উত্তমকুমার প্রয়াত হন, সেদিনই পৃথিবী হারায় হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা পিটার সেলার্সকেও। আজ তাঁর দেশে তাঁকে কতটা স্মরণ করা হয়, তাঁর মৃত্যুদিনে বিশেষ অনুষ্ঠান হয় কি না, টেলিভিশন বা রেডিওতে তাঁকে নিয়ে সারাদিন আলোচনা বা সম্প্রচার চলে কি না—তা আমার জানা নেই। কিন্তু বাংলায় প্রতি বছর ২৪ জুলাই এলেই উত্তমকুমারকে ঘিরে এক বিশেষ আবেগের পরিবেশ তৈরি হয়। টেলিভিশনে তাঁর ছবি দেখানো হয়, রেডিওতে বাজে তাঁর গাওয়া বা তাঁর অভিনীত ছবির গান, সংবাদপত্র ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিশেষ প্রতিবেদন। পরিচালক, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী থেকে শুরু করে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া জগতের বিশিষ্ট মানুষজনও নানা স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। এত বছর পরেও তিনি বাঙালির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছেন।
উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটি শুধু বাংলা সিনেমার ইতিহাস নয়, বাঙালির আবেগেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের পর্দার প্রেম আজও দর্শকের মনে একইভাবে বেঁচে আছে। অনেকের বিশ্বাস, উত্তমকুমারের প্রতি গভীর টান থেকেই সুচিত্রা সেন ধীরে ধীরে নিজেকে চলচ্চিত্রজগতের আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং জীবনের দীর্ঘ সময় নিভৃতবাসে কাটিয়েছিলেন। এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে নানা মত থাকলেও, তাঁদের সম্পর্ককে ঘিরে মানুষের আবেগ আজও অটুট।
উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর তাঁর বহু সহ-অভিনেত্রী গভীর শূন্যতার কথা বলেছেন। শুধু চলচ্চিত্রজগত নয়, বাংলার অসংখ্য দর্শকও যেন তাঁকে নিজের পরিবারের একজন বলে মনে করতেন। বিশেষ করে বহু গৃহবধূর কাছে তিনি ছিলেন স্বপ্নের নায়ক। তাঁর চলে যাওয়াকে তাঁরা ব্যক্তিগত ক্ষতির মতোই অনুভব করেছিলেন।
মানুষের প্রতি তাঁর টানও ছিল অসাধারণ। বন্যাত্রাণের জন্য তিনি যখন পথে নেমেছেন, তখন বহু নারী তাঁকে এক ঝলক দেখার আনন্দে নিজের গয়নাও দান করতে দ্বিধা করেননি। মানুষের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসাই প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের কথা লিখতে গিয়ে বারবার কলম থেমে যায়। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্ক্তি—
“এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গ-মর্ত্য ছেয়ে
সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
গভীর ক্রন্দন—‘যেতে নাহি দিব।’ হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়!” হয়তো এ কারণেই মহানায়ক উত্তমকুমার আজও শুধু স্মৃতিতে নন, বাঙালির হৃদয়ের গভীরতম আবেগে বেঁচে আছেন।
প্রায় সাড়ে চার দশক কেটে গেছে। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের শূন্যস্থান আজও পূরণ হয়নি। মহানায়কের স্মরণসভায় বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়ও এই আক্ষেপ করেছিলেন। সত্যিই তাই। সময়ের সঙ্গে বহু দক্ষ অভিনেতা এসেছেন, নিজেদের অভিনয়গুণে দর্শকের ভালোবাসাও পেয়েছেন। তবু ‘মহানায়ক’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আজও প্রথম যে নামটি মনে আসে, তিনি উত্তমকুমার। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, “আমাকে রিপ্লেস করার মতো এখনও কেউ এলো না।” সময় যেন তাঁর সেই কথাকেই সত্য প্রমাণ করেছে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৮০—এই দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন। যত সময় এগিয়েছে, তাঁর অভিনয়ের ঔজ্জ্বল্য ততই নতুন প্রজন্মের কাছে উন্মোচিত হয়েছে। দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর ছবিগুলি আজও সমান জনপ্রিয়। নতুন দর্শকও বারবার ফিরে আসে সেই চলচ্চিত্রগুলোর কাছে। তাই উত্তমকুমার কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি বাংলা সিনেমার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
মহানায়কের শারীরিক প্রস্থান ঘটেছে, কিন্তু তাঁর শিল্পের মৃত্যু নেই। তাঁর অভিনয়, তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর হাসি, তাঁর সংলাপ—সবই আজও বাঙালির স্মৃতিতে সমান উজ্জ্বল। তাই আজও গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায়, তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ যেন চিরকাল সত্য হয়ে থাকবে—“আই উইল গো টু দ্য টপ, দ্য টপ, দ্য টপ!”
(লেখক পরিচিতি – শ্রী মলয় দাশগুপ্ত, জন্ম – ২১ জুন, ১৯৫৩, ৮০র দশকের বিশিষ্ট কবি
তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে ‘হেঁটে যাও ধ্রুপদী খেয়ালে’, ‘পাতারা করে স্নান’, ‘নিঃসঙ্গ ডুবুরি’ বিশেষ জনপ্রিয়)


