সংস্কৃতি

কলমচিদের আড্ডাখানায়- ৩

(দ্বিতীয় পর্বের পর)

১৪ নম্বর পার্শিবাগানে রাজ শেখর বসুর দাদা ডা. গিরীন্দ্রশেখর বসুর বাড়িতে বসতো উৎকেন্দ্র সমিতির বৈঠক। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রায় বাহাদুর জলধর সেন, রাজ শেখর বসু, গিরীন্দ্রশেখর বসু, যতীন্দ্র কুমারসেন,কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। বিরিঞ্চিবাবা নামক গল্পে পরশুরাম এই আড্ডার চমৎকার পরিমণ্ডল ব্যাখ্যা করেছেন। শুধু ১৪নং পার্শিবাগান বদলে হয়েছে ১৪ নং হালসিবাগান। এই আড্ডার নানা মজার মজার গল্পের কথা বহুজনের স্মৃতিচারণে ধরা পড়েছে। এই আড্ডার আসরে বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্যিক পরশুরামকে অনেকেই নানারকম আজগুবি প্রশ্ন করতেন। একদিন একজন জিজ্ঞাসা করলেন, – আচ্ছা রাজশেখরবাবু, আমরা এই যে রোজ ব্লেড পুরোনো হলে ফেলে দিই এগুলো দিয়ে কোন কাজ হতে পারেনা?  পরশুরাম ছিলেন বেশ রাশভারী। তিনি গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন, – মাটিতে পুঁতে দিয়ে দেখতে পারেন যদি গোলাপ গাছ হয়।

২০২, রাসবিহারী এভিনিউর কবিতা ভবন। বাড়ির বাসিন্দা কবি বুদ্ধদেব বসু,কবিপত্নী প্রতিভা বসু, কবিকন্যা মীনাক্ষী আর দময়ন্তী। মীনাক্ষী দত্ত এবং সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন স্মৃতিচারণে এই আড্ডার কথা ঘুরে ফিরে এসেছে। কবিতা ভবনে আসতেন বালিগঞ্জপ্লেসের ডিহি শ্রীরামপুর লেনের বাসিন্দা বাসিন্দা চিত্রশিল্পী যামিনী রায়। তাঁর মাথার চুল কপালে এসে পড়তো। গায়ের রঙ ছিল সোনার মতো। যামিনী রায় চোখে গোল চশমা পরতেন। সাধারণতঃ ঢোলাহাতা পাঞ্জাবি এবং সাদা ধুতি পরতে পছন্দ করতেন।কখনো ফতুয়াও পরতেন।পায়ে সর্বদাই তালতলার চটি। যখন বুদ্ধদেব থাকতেন তখন তাঁর নানা রূপ।কখনো তিনি কবি, কখনো সাহিত্য সমালোচক,কখনো বা নাট্যকার আবার কখনো অধ্যাপক। কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন এই আড্ডায় তবে তিনি স্বভাবলাজুক। কবি অজিত দত্ত,কবি নরেশ গুহ কবি কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের দৈনন্দিন উপস্থিতি উন্মোচন করতো বাংলা কবিতার নব-দিগন্ত।

যখন বুদ্ধদেব বসু নাকতলার বাড়িতে চলে গেলেন তখন সেখানকার আড্ডা জমাতেন সন্তোষ কুমার ঘোষ, সমরেশ বসু।প্রতিভা বসু আর সাগরময় ঘোষ সেই আড্ডায় কখনো কখনো গান গাইতেন। সেই সময়ে সমরেশ বসুকে বলা হত বাংলা সাহিত্যের উত্তমকুমার। অতএব তাঁর উপস্থিতি সেই আড্ডায় আলাদা মাত্রা যোগ করতো।বুদ্ধদেব বসু থাকবেন আর সেখানে তর্ক হবে না এমন তো নয়। তর্ক করতে করতে বুদ্ধদেব মাঝে মাঝেই উত্তেজিত হয়ে উঠতেন। তাঁর গলার স্বর উঠেছে উচ্চগ্রামে মাঝে মাঝে আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন। তর্কের বিষয় থাকতো কখনো ছন্দ ব্যবহার আবার কোন সময় তরুণ কবিদের রচনা কিন্তু কোনো সময়ই তিনি কাউকে নিন্দা করতেন না। হয়তো উপস্থিত কোন সাহিত্যিক অপর কোনো সাহিত্যিককে হেয় করার চেষ্টা করলে তীব্রভাবে প্রতিবাদ করতেন বুদ্ধদেব।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়াও নবনীতা দেবসেন, প্রণবেন্দু দাসগুপ্ত প্রমুখ তরুণ কবিদের সঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর ছিল নিবিড় সম্পর্ক।

এই প্রসঙ্গে একটি গল্পের কথা স্মরণ করতেই হবে। একদিন রাসবিহারী এভিনিউ বাড়ি থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেশ অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরছেন। বুদ্ধদেব সিঁড়ির দরজার কাছে সুনীলকে বিদায় জানাবেন বলে দাঁড়িয়েছেন। যে কোনো কারণে সে সময় সিঁড়িতে আলো জ্বলছিলো না।বুদ্ধদেব বললেন অন্ধকারে।বলেই একটু থেমে গেলেন।সচকিত সুনীল দাঁড়িয়ে পড়লেন। বুদ্ধদেবকে থেমে যেতে দেখে সুনীল বললেন, – আচ্ছা যাই। তখন বুদ্ধদেব সুনীলকে বললেন, -অন্ধকারে দেখে দেখে যেও! খুবই ছোটো ছোটো কিছু শব্দ কিন্তু অন্ধকারে বলে থেমে যাওয়ার বিষয়টি সুনীলের স্মৃতিতে চিরকালই ছিল।

 

(ক্রমশ)

 

 

Leave a Reply