আঙিনাসংস্কৃতি

ভাষা সমুদ্দুরে আজ ঢেউ গোনার পালা –

আজ ভাষার স্রোতে নাইতে নেমেছি। প্রতিক্ষণে নাইতে নামি কিন্তু খেয়াল করি না। ভাষা-সমুদ্দুরে উথাল পাথাল ঢেউ। ফেনিল। নতুন নতুন রূপে মেলে ধরে নিজেকে পলে পলে। আবার নদী হয়ে বয়ে চলেছে ভাষা-স্রোত। নতুন নতুন উচ্চারণে লোকের মুখে মুখে – জিভে জিভে। যেমন যেমন ভূগোল বদলায় তেমন বদলায় জিভের টানটোন। মাটির গন্ধ লেগে থাকে তার গায়ে। মাটি যে মা!! আমাদের দেশের প্রাচীন ঋষিরা এসব লক্ষ্য করেছিলেন। লক্ষ্য পর্যন্ত করেছিলেন তাঁরা – কথা বলার ঢঙ, কথা  বলার সুর পর্যন্ত পালটে যায় মুখে মুখে।  তাই ভাষার কত না ভাগ – যোগ। জুড়ছে – ভাঙছে – মেলছে। অনবরত চলছে তার রূপ রঙ ঢঙ বদল।  ভাষার রূপমঞ্চে চলে পালা বদল। কিন্তু ধ্রুবপদটি বাঁধা থাকে তার ঐকতানে। ধ্রুবপদ বা ধ্রুপদ – যাই বলো না কেন। ভাষায় রূপ-বদল যতই হোক না কেন, ধ্রুপদী শিকড় থেকে সে আলগা হয় না কখনও। তাই সেই আদ্দিকালের সংস্কৃত ভাষা আজও বাংলা ভাষায় বজায় রেখেছে তার ধ্রুপদী বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃত  ►  বাংলা।  ধ্রুবপদে বাঁধা।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, একালে একপ্রকার ‘খিচুড়ি’ বাংলায় কথা বলা হয়ে থাকে। ইংরেজী-বাংলা-হিন্দী মেশানো ভাষা। এ ভাষা কি ধ্রুপদী?  পরিশুদ্ধ বাংলা ভাষা না হলে তাকে কি ধ্রুপদী বলা যায়? এক্ষেত্রে সংক্ষেপে বলি, আমরা ধ্রুপদী বলতে শুধু বইয়ের ভাষাকে ধরব? নাকি, কথ্যভাষাকেও ধরব? উত্তরটা আমি এইভাবে ভেবেছি, পৃথিবীর তাবৎ কথ্য ভাষাতে মিশেল হবেই হবে। এটা আটকানো যাবে না কখনোই। তাহলে তাকে কি ধ্রুপদী বলা যাবে না? যেমন ধরি – শেক্সপীয়রের ভাষায় কথা বলতে না পারলে ইংরেজী ভাষা ধ্রুপদী (classical) নয়। গোয়েটের ভাষায় কথা না বলতে পারলে আধুনিক জার্মান ধ্রুপদী নয়। বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ শেক্সপীয়র, গোয়েটে, কাফকা – সকলেই বাদ যান তাহলে! এমন আরও আছেন। খাতা ভরে যাবে।   

তাহলে সমীকরণটা কী দাঁড়াল? বুঝিয়ে বলো তো – ধ্রুবপদী, ধ্রুপদী বা classical যাই হোক না কেন – সে কোন হিসেবে স্থির হবে? কথায় বলে, একই নদীতে কেউ নাইতে পারে না। মানে, নদীর জল বয়ে চলে অবিরাম। আমি যে দলে নাইতে নামলাম, ঘন্টাখানেক পরে সে জলটা আর নেই। সে তো স্থির নয় যে সে থেমে থাকবে। কত দূরে বয়ে চলে গেছে – কবেই! যখন সাঁতরে উঠলাম নদী থেকে তখন কিন্তু অন্য জল। আবার যতবার নামব ততবারই একই ব্যাপার ঘটবে। ক্ষণে ক্ষণে জল বদলাবে – স্রোত বয়ে চলবে। তাই বলে কি আমি নদীটাকেই অস্বীকার করব? নাকি নদীর জলে নেমে যে নেয়েছি তাও অস্বীকার করি তাই তো? যদি স্নান অলীক হয় তো নদীটাও অলীক। কিন্তু এমনটা হবার জো নেই।তাতে ভাষার রাজ্যে অব্যবস্থা তৈরী হবে। স্নান যেমন ধ্রুপদী তেমনি নদীও আমার কাছে ধ্রুপদী। বাংলাভাষা যেমন ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষাও আমার কাছে ধ্রুপদী। সংস্কৃতভাষার এক বিরাট ভাঁড়ার রয়েছে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যে এবং বৈশিষ্ট্যে।তাই যতই মিশেল হোক না কেন বাংলা ভাষায় – বাংলাভাষা ধ্রুপদী। ধ্রুপদী শিকড়কে আঁকড়ে ধরে সে তার প্রাণকে ধরে রেখেছে। এ হল ধ্রুপদী কথার শুরু।

 

(ক্রমশ)

 

Leave a Reply