সংস্কৃতিসাদাকালো রঙমাখা

আধুনিক মুদ্রায় বিশ্বের প্রাচীনতম লিপি: উগারিট ও এক সভ্যতার অবসান

– শ্রী সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

 

একটি আয়তাকার, অন্যটি গোল। দুটিতেই কীলকের মতো হরফ লেখা। প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শনই ছাপা হয়েছে নোটের উপরে। কীলক বা কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা উগারিট বর্ণমালা পরিচয় করিয়ে দেয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এক সভ্যতার সঙ্গে। রাজধানীর নাম আসুর। তা থেকে আসিরিয়া। পরে সময়ের স্রোতে মেসোপোটেমিয়ার সেই অংশের ভৌগোলিক সীমা, রাজনৈতিক সীমা ভেঙেছে, গড়েছে। মুদ্রায় মাঝে-মধ্যেই উঠে আসে তাদের হারানো সভ্যতার নিদর্শন, সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে লেখার পরে এবার পশ্চিম এশিয়ার ভৌগোলিক অঞ্চলে দু’টি ভিন্ন সময়ের কথা মুদ্রায় হারানো ইতিহাস, সভ্যতা সিরিজে। প্রথমে এব্‌লা। আসিরিয়া এখন সিরিয়া। এব্‌লা এই দেশেই। অধুনা সিরিয়ার এই অঞ্চলে মাটির যেসব ট্যাবলেট পাওয়া গেছে, তাই তারা ছেপেছে ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫০ পাউন্ডের নোটে। আজ তাদের হারানো সভ্যতার প্রথম পর্ব।

খ্রিস্ট জন্মের আড়াই হাজার বছর আগে পশ্চিম এশিয়ার এব্‌লা ছিল মেসোপোটেমিয়ার একটা অংশ। এখানে থাকা নানা স্তূপ উৎখনন করে মিলেছে পুরাতাত্ত্বিক নানা নিদর্শন। তার মধ্যে এই প্রতিবেদনের সঙ্গে থাকা নোটে যে দুটি ট্যাবলেট ছাপা হয়েছে সেই দুটিও। মূলত দক্ষিণ মেসোপোটেমিয়ায় বসবাসকারীদের অ্যামোরাইট বলা হত, এঁদের ভাষার নামও অ্যামোরারাইট। সেই ভাষা লেখা হত কীলক বা কিউনিফর্ম হরফে। বর্ণমালার নাম উগারিট। এইউ হরফের নিদর্শন দেথা যায় ৫০ পাউন্ড নোটে ছাপা ট্যাবলেট দুটিতে। উগারিটই হল এখনও পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া বিশ্বের প্রাচীনতম লিপি।

নির্দিষ্টভাবে ঠিক এই অঞ্চলে যে সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল তাকে বলা হয় কিশ সভ্যতা, যা আদতে সুমের সভ্যতার অংশ। বাইবেলে সুমেরীয়দের উল্লেখ রয়েছে। সুমের সভ্যতা শেষ হয় ২২৩৪ খ্রিস্টপূর্বে আক্কাডিয়ান নামে মেসোপোটেমিয়ায় প্রথম সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে। কিশ সভ্যতার অবসান ঘটাল মেসোপোটেমিয়ার প্রথম সাম্রাজ্যের সূচনা। ১৯৬৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে উৎখনন করা হয়েছে এব্‌লাতে। তবে তার আগেও পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে, উৎখননও হয়েছে।

১৯৩১ সালে নিনেভে নামক জায়গায় সারগন নামে এক আক্কাডিয়ান শাসকের ব্রোঞ্জের মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। এই মূর্তির শিল্পকর্মের আদল দেখা যায় আক্কাডিয়ান সাম্রাজ্যের বহু পরে যিনি এই অঞ্চলের শাসক হয়েছিলেন, সেই সম্রাট দারায়ুসের সময়েও। আক্কাড শহর ঘিরে এই সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল বলেই এর নাম আক্কাডিয়ান। এই শহরের নামও বাইবেলে রয়েছে।

উৎখননের ফলে জানা গেছে, এব‌্লায় তিন হাজার বছর আগেও বহু মন্দির ছিল। তাঁরা উপাসনা করতেন ইস্তার, বাল, রসপ, কামিশ, সিপিশ ও শামাগানের। প্রধান দেবতা ছিলেন দাগান। এঁদের বলা হয় সেমেটিক দেবতা। পরের দিকে অস্তাপি, ইশহারা ও হেপাতের উপাসনা করতেন। এঁরা হুরাইট দেবতা। আবহাওয়ার দেবতা তেজাব ছিলেন হুরাইটদের প্রধান উপাস্য। এক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে তাদের একটা মিল রয়েছে। ইন্দ্রদেব, অর্থাৎ এক অর্থে আবহাওয়ার দেবতা একসময় প্রধান দেবতা হিসেবে পূজিত হতেন। যথেষ্ট পুজো পাননি বলে তিনি দুর্যোগ ঘটিয়েছিলেন যার জন্য বাসুদেব কৃষ্ণকে গোবর্ধন পর্বত তুলে সকলকে রক্ষা করতে হয়েছিল।

কীলক বা উগারিট লিপির পাঠোদ্ধার করে জানা গেছে, ব্যক্তিপুজোর চলও ছিল এই অঞ্চলে। প্রথম দিকে যাঁরা রাজা ছিলেন, সেইসব রাজারা মৃত্যুর পরে উপাস্য হয়ে উঠেছিলেন। সব মিলিয়ে তাঁদের দেবতার সংখ্যা সত্তরের বেশি ছিল।

খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবে এখানে সনাতন ধর্মের অবসান ঘটে। তারপরে ইসলাম ধর্মের দ্রুত প্রসার এই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির উপরেও পড়ে। আরবি ও হিব্রু ভাষার আধার আদতে একই হওয়ায় ভাষাগত পরিবর্তনে হয়ত তেমন সমস্যাও হয়নি। এখন সিরিয়ার মানুষজন মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও হারানো সময় ফুটে ওঠে তাদের মুদ্রায়।

তবে সিরিয়ার অবস্থা এখন মৃত্যুর পরে চিকিৎসকের কাছে বিলাপ করার মতোই। ২৩৩৪ থেকে ২১৫৪ খ্রিস্টপূর্ব সময়ে যে আক্কাডিয়ান সাম্রাজ্য ছিল তা আর যাই হোক ইসলামিক ছিল না একথা নিশ্চিত। তাই সিরিয়ার বড় অংশ জুড়ে ইসলাম পূর্ববর্তী সব নিদর্শন ধ্বংস করার করার যে পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছিল আইসিস (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড আল-শাম), তাতেই হাজার হাজার অন্য নিদর্শনের সঙ্গে চিরতরে শেষ হয়ে গেছে সারগনের মূর্তিটিও।

 

(লেখক পরিচিতি – প্রাক্তন সাংবাদিক, বর্তমানে ভাষাতত্ত্ববিদ; ইতিহাস চর্চা ও মুদ্রা সংগ্রহ তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান অঙ্গ)

Comment here