রাজনীতি

ইস্তেহার মেনে চলবো না বাস্তব মানবো?

টুকে পাশ করলে যে অনেক সমস্যা আছে, এটা ইঞ্জিনিয়ার বা উকিলদের থেকে ভাল কেউ জানেনা l কিন্তু রাজনৈতিক নেতারাও মাঝে মাঝে এই ফাঁদে পড়ে l টুকে ইস্তেহার বানিয়েছেন, ভোটে জিতেছেন এবং সেই ইস্তেহারের কাগজই গলার কাঁটা l এইজন্য বামপন্থীরা ইস্তেহারে কিছু করার কথা বলতেন না l মমতা ব্যানার্জী, অটল বিহারী বাজপেয়ী থেকে জর্জ বুশ—-সবারই বিরোধিতা করো এবং বিপ্লবের অপেক্ষা করো l কিন্তু, নিন্দুকেরা বলে, ২০০৯ এর তৃণমূলের ইস্তাহার নাকি কংগ্রেসের সঙ্গে মেলে, আর ২০১১ তে সিপিএম এর সঙ্গে l আর সেইজন্যই, ২০০৯ তে স্পেশাল ইকোনমিক জোন দেবার কথা বললেও, ২০১১ তে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ l আর গত দশ বছর ধরে এই সিদ্ধান্তের দাম দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত বেকাররা l রফতানিমূলক সব শিল্প এই রাজ্য ছেড়ে পালিয়েছে l. বিশেষ করে সফটওয়্যার শিল্প l প্রথমে মমতা ব্যানার্জী বলেন, তিনি সেজ এর শ্রমিক আইন না মানার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন l ২০১৫ সালে তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সেজকে সব শ্রমিক আইন আনার নির্দেশ দেন l প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, শ্রমিক দরদী সিপিএম ২০০৪ থেকে ২০০৮ কেন্দ্র সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিলেও, একবারের জন্যও কেন্দ্রকে সেজ নিয়ে কোন চাপ দেয়নি, যদিও সিপিএম এর সব ইস্তেহারে সেজ না মানার কথা ছিল l অবশ্য এটা না করে ভালই করেছেন l

কিন্তু মমতা ব্যানার্জী খাঁটি ব্রাহ্মণ কন্যা l বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, দুর্বাশাদের মত, তিনিও চান তাঁর মুখের কথা নিয়ে ইতিহাস প্রশ্ন করুক l এবার তিনি কেন্দ্রকে অনুরোধ করলেন, শ্রমিক আইন যখন মানতেই বললেন, সেজ নামটাই বদলে দিন না? কারণ উনি প্রতিজ্ঞা করেছেন ‘সেজ’ নামটা থাকলে উনি ছাড়পত্র দেবেন না l স্বাভাবিকভাবে, এবার বেঁকে বসল কেন্দ্র l

মুনি ঋষিদের একটা সমস্যা ছিল, তারা মুখের কথা থেকে নড়চড় করতেন না l পুরানের বেশিরভাগ গল্পের ক্লাইমেক্স তৈরি হত কিন্তু এই মুনিঋষিদের ‘বাক্য’ থেকেই l হিরণ্যকশিপু থেকে রাবন থেকে জরাসন্ধ, সব গল্পেরই শুরু এই বরদান বা অভিশাপ থেকে l আর তাঁর থেকেই শুরু হত অঘটন l এখানেও তাই ঘটল l IT কোম্পানিগুলি কলকাতার টিকিট কাটা বন্ধ করল l ভোটারদের খুশি করতে, ইনফোসিস, উইপ্রোকে ডাকা হত ভোটের আগে l ২০১৪, ২০১৬ ও ২০১৯-র ভোটের আগে আনন্দবাজার বড় করে এই খবর ছেপেছিল আগে l ২০১৪ ও ২০১৬তে এর ফলও পায় তৃণমূল l কিন্তু, ২০১৯ এ রাখালের বাঘ পড়ার মত গল্পটা বুমেরাং হয়ে যায় l

বাস্তব মেনে ইস্তেহারের বিরুদ্ধে গিয়ে যদি দেশের ভাল হয়, তবে সেটাই কাম্য l গত ৭১ বছরের ইতিহাসে, ইস্তেহারকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে দেশ চালানোর একটাই উদাহরণ আছে l ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এর কংগ্রেস সরকার l ১৯৯১ তে রাজীব গান্ধী রাওকে রাজনীতি থেকে বিদায় দিয়ে নিজের মা ও দাদুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে যে ইস্তাহার বানিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর, রাও সম্পূর্ণ বিপরীতে হেটে ইন্দিরা নেহেরুর পথকে সম্পূর্ণ বর্জন করে দেশকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন দেউলিয়া হবার মুখ থেকে l যদিও মানুষ বোঝেন নি এবং ১৯৯৬ এ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে l কিন্তু ভারতের ইতিহাসে ১১৯২, ১৫২৬, ১৭৫৭, ১৯৪৭ এর মত ১৯৯১ কেও একটা স্মরণীয় বছর হিসেবে স্থান দিয়ে গেছেন রাও l কিন্তু মমতা ব্যানার্জী পারলেন না l ১৯১১ র ন্যায় ২০১১ কেও স্মরণীয় করতে l ( ১৯১১ তিনটি করণের জন্য বিখ্যাত ; বঙ্গভঙ্গ রদ, মোহনবাগানের জয় ও কলকাতা থেকে ব্রিটিশদের দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর ) l কিন্তু পারলেন না l দশ বছরে রাস্তা নির্মাণ ছাড়া আর কোন সাফল্য নেই তাঁর ঝুলিতে l সঙ্গে রেখে যাচ্ছেন, আরও অন্ধকার ভবিষ্যৎ l নাগরিকদের জন্য রেখে গেলেন কিছু কম বেতনের চাকরি , বাণিজ্যে মাৎস্যন্যায়, শিক্ষায় নৈরাজ্য ও ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা l

Leave a Reply