আমার ইতিহাসশাশ্বত সনাতনস্বভূমি ও সমকাল

বাঙ্গালীর নৌ-বাণিজ্যের একাল – সেকাল – ১

– শ্রী জ্যোতিষ্মান সরকার 

 

সমুদ্রে বঙ্গ ও বাঙ্গালীর কতটা প্রভাব ছিল তা বঙ্গোপসাগরের নাম দেখেই অনেকটা আন্দাজ করা যায়। বঙ্গোপসাগরের তীরে কলিঙ্গ, ব্রহ্মদেশ, কাঞ্চিপুরম এরকম বহু জায়গাই অবস্থিত। তা সত্বেও বাঙ্গালার নামেই হয়েছে বঙ্গোপসাগরের নাম। যা থেকে অনেকটাই পরিষ্কার হয় যে সমুদ্রে বাঙ্গালার প্রভাব ঐ সব জায়গাগুলির চেয়ে অনেক বেশি ছিল। যেমন আরবের প্রভাবের জন্য হয়েছে আরবসাগর বা চীনের প্রভাবের জন্য চীন সাগর একইভাবে বঙ্গ নামে বঙ্গোপসাগর।

কিন্তু বঙ্গের মাৎসন্যায়ের সময়ের পর থেকে, ‘আরব দস্যু দ্বারা আক্রমণের ফলেই বাঙ্গালার ব্যবসায়ী সমাজ পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ক্রমাগত বর্জন করে সিংহল, মালয় প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু এ পটভূমিকাও ষোড়শ শতাব্দী থেকে পরিবর্তিত হয় পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের আক্রমণের ফলে। বস্তুত ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে বাঙ্গালী বণিকরা আর বাণিজ্য করতে বিদেশ যেতেন না।’

প্রায় আঠারশ’ বছর আগে অধুনা পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলাতে অবস্থিত চম্পাইনগরী বা কসবা-চম্পাইনগরীর বণিক চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যতরী সপ্তগ্রাম ও গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত ত্রিবেণী হয়ে সমুদ্রের পথে যাত্রা করত। বিপ্রদাস পিপলাইএর মনসামঙ্গলে এর উল্লেখ আছে। “আইন-ই-আকবরী”তে সরকার মাদারণ-এর অন্তর্গত চম্পাইনগরী পরগণারও উল্লেখ পাওয়া যায় যা বর্তমানের পূর্ব বর্ধমান জেলাতে অবস্থিত৷ বর্ধমান শহরের ষোল ক্রোশ পশ্চিমে ও বুদবুদের দক্ষিণে দামোদর নদের উত্তর তীরে কসবা-চম্পাইনগরী অবস্থিত৷ আজও বাঙ্গালী লক্ষ্মীপুজোয় কলাগাছের খন্ড দিয়ে নৌকা তথা বাণিজ্যতরী বানায় সেই ধনলক্ষ্মীর আরাধনার অঙ্গ হিসাবে। বাঙ্গালী বণিকের প্রতীক চাঁদ সওদাগর স্বয়ং দৈবশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতেন তার একমাত্র ভিত্তি ছিলো নৌবাণিজ্যের অর্থনৈতিক শক্তি।

চাঁদ বণিকের পালারও প্রায় হাজার বছর আগে, আজ থেকে ২৫০০ থেকে ২৮০০ বছর আগের বাঙ্গালী সভ্যতা, ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকদের কলমে যার নাম- গঙ্গারিডি। টলেমি, পেরিপ্লাসের রচনায় বর্ণনা আছে এই গঙ্গারিডি বা গঙ্গাহৃদি সভ্যতার। ‘গাঙ্গে’ বন্দর এই সভ্যতার বাণিজ্যকেন্দ্র। এই প্রত্নস্থলটির সঙ্গে জলপথে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বিশেষত রোমের বাণিজ্যিক যোগসূত্রের সুনিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে। নদী বেয়ে সাগর পেরিয়ে ইউরোপেও পৌঁছে যেত বাঙ্গালীর নৌবহর। সংলগ্ন অঞ্চলে বহু ইউরোপীয় প্রত্নতত্ত্বিক সম্পদ পাওয়া গেছে যা দীর্ঘকাল ব্যাপী বাণিজ্যের প্রমাণ দেয়।

শ্রী অক্ষয়কুমার দত্ত প্রণীত ও শ্রী রজনীনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য বিস্তার’ নামক গ্রন্থে ভারতীয় তথা এই অঞ্চলের মানুষের নৌ-বাণিজ্যের বেশ জোরালো সাক্ষ্য পাওয়া যায় : ‘ঋজ্ঞ্বেদ যে অতি প্রাচীন গ্রন্থ, তাহা ব্যক্তিমাত্রেরই বিশ্বাস আছে। এই সুপ্রাচীন গ্রন্থে অর্ণবপোত, বাণিজ্য ও বণিকদিগের সমুদ্রযাত্রা-সম্বন্ধীয় প্রসঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থের প্রথম-মণ্ডলস্থ পঞ্চবিংশতি সূক্তের রচয়িতা মহর্ষি শুনঃশেফ বরুণ দেবের কীর্তন করিতে করিতে বলিয়াছেন যে, ‘সমুদ্র-মধ্যে যে স্থানে পোত-সমূহের যাতায়াতের জন্য পথ আছে, তাহা বরুণ দেব অবগত আছেন। … উক্ত গ্রন্থের প্রথম-মণ্ডলের ছাপ্পান্ন সুক্তটি ঋষিবর শৈব্য দ্বারা রচিত। বণিকরা যে সমুদ্রযাত্রা করিত, তাহা মহর্ষি প্রকাশ করিয়াছেন।’

পঞ্চম শতকে লেখা কালিদাসের রঘুবংশম-এ বঙ্গের প্রসঙ্গ আছে। দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে ‘নৌসাধনোদ্যত’ বঙ্গজনকে পরাজিত করে রঘু ‘গঙ্গাস্রোতোহন্তরে’ জয়স্তম্ভ স্থাপন করেন।
বঙ্গানুৎখায় তরসা নেতা নৌসাধনোদ্যতান্ |
নিচখান জয়স্তম্ভান্গঙ্গাস্রোতোন্তরেষু সঃ|| ৪-৩৬||
আপাদপদ্মপ্রণতাঃ কলমা ইব তে রঘুম্ |
ফলৈঃ সংবর্ধয়ামাসুরুৎখাতপ্রতিরোপিতাঃ|| ৪-৩৭||
যে কারণে কবি বলেন, “আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে / দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।”

‘গঙ্গাস্রোতোন্তরে’ বলতে গঙ্গাস্রোতের মধ্যে বা গঙ্গাস্রোত পার হয়ে, যে ব্যাখ্যাই আমরা গ্রহণ করি না কেন, বঙ্গজনের বাসভূমির অবস্থান তাতে বিশেষ বদলায় না। 

শ্রী নীহাররঞ্জন রায় তাঁর “বাঙালির ইতিহাস” -এর আদিপর্বে উল্লেখ করেছেন, ‘মৌখরী-রাজ ঈশানবর্মের হড়হা লিপিতে (ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদ) গৌড় দেশবাসীদের (গৌড়ান্) ‘সমুদ্রশ্রয়ান্’ বলা হইয়াছে; ইহার অর্থ সমুদ্র-তীরবর্তী গৌড়দেশ হইতে পারে, অথবা সামুদ্রিক বাণিজ্যই যাহার আশ্রয়, সেই গৌড়দেশও বুঝাইতে পারে।

সম্রাট শশাঙ্কের সময় অবধি বাঙ্গালী জাহাজে পসরা সাজিয়ে ইন্দোনেশিয়া যেত, সিংহল যেত, পারস্য যেত, আরব সাগরের জল তোলপাড় করত। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর দু’টি ঘটনা ঘটল। প্রথম, গৌড়বঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিল। পরবর্তী বঙ্গেশ্বররা দৃঢ় হাতে শাসনভার হাতে নিতে অক্ষম। সাম্রাজ্য সঙ্কুচিত, হীনবল ও নৈরাজ্যবহুল হল। বহিঃশত্রুরা আক্রমণ করল।

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল গৌড় থেকে তিন হাজার মাইল দূরে। ‘গৌড়মল্লার’ উপন্যাসে শ্রী শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন-
“শশাঙ্কদেবের দীর্ঘ রাজত্বকালে গৌড়দেশে যে সম্পদ-শ্রীর জোয়ার আসিয়াছিল, তাঁহার মৃত্যুর পর তাহাতে ভাঁটা পড়িয়াছিল। গৌড়রাজ্য লইয়া বিভিন্ন রাজশক্তির মধ্যে টানাটানি ছেড়াছেড়ি চলিতেছিল। তাহাতেও হয়তো সামগ্রিকভাবে দেশের জনগণের অধিক ক্ষতি হইত না, কিন্তু এই অন্তর্বিপ্লবের সঙ্গে বাহির হইতেও এক প্রচণ্ড আঘাত পড়িয়াছিল। সে সময়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য ছিল গৌড়বঙ্গের প্রাণ; এই সাগর-সমুদ্ভবা বাণিজ্য-লক্ষ্মী সাগরে ড়ুবিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। চাতক ঠাকুর দেবাবিষ্ট হইয়া যাহা দেখিয়াছিলেন তাহা মিথ্যা নয়, আরব দেশের মরুভূমিতে সত্যই ঝড় উঠিয়াছিল এবং সেই বাত্যাবিক্ষিপ্ত বালুকণা সমুদ্রের উপর দিয়া উড়িয়া আসিয়া গৌড়দেশের আকাশ সমাচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছিল।

সমগ্র দেশের সহিত ক্ষুদ্র বেতসগ্রামও এই ঘনায়মান দুরদৃষ্টের অংশভাগী হইয়াছিল। গ্রামবাসীরা আর গ্রামের বাহিরে যায় না। কি জন্য যাইবে? গ্রামের গুড় বাহিরে বিক্রয় হয় না। স্বর্ণ রৌপ্যের প্রচলন দেশ হইতে ধীরে ধীরে লুপ্ত হইতেছে; দ্রহ্ম কার্ষাপণ দিয়া কেহ আর সহজে পণ্য কেনে না; কড়ি এখন প্রধান মুদ্রার স্থান অধিকার করিয়াছে। যে লক্ষ্মী নারিকেলফলাধুবৎ আসিয়াছিলেন তিনি আবার গজভুক্তকপিঙ্খবৎ অলক্ষিতে অন্তর্হিত হইতেছেন।”

৫০৭-৮ খ্রিষ্টাব্দে লিখিত বৈণগুপ্তের গুনাইঘর তাম্রশাসনে গোপচন্দ্রের উল্লেখ পাওয়া যায় সমতট অঞ্চলের শাসক হিসেবে। তিনি রাঢ় জয় করেন এমন প্রমাণও রয়েছে। টলেমির মত অনুযায়ী তখন তমলুক থেকে চট্টগ্রাম গঙ্গার ৫ টি শাখানদী ছিলো। তার মধ্যবর্তী কোনো স্থানেই গাঙ্গে বন্দর ছিলো বলে মনে করা হয়। সেটি চন্দ্রকেতুগড়ের অবস্থান কেন্দ্রের কাছেই।

বাঙ্গালীর বাণিজ্যতরী সমুদ্রে যেতে সাহস পায় না। আরবের বুকে যে সামাজিক পরিবর্তন এসেছিল তার ফলে জলদস্যু সম্প্রদায়ের বাড়বাড়ন্ত হল। আরব সাগর, পারস্য উপসাগর, এমনকি বঙ্গোপসাগর জলদস্যুসঙ্কুল হয়ে উঠল। বাঙ্গালীর নৌশক্তি হীনবল হয়ে যাওয়ায় জলদস্যুদের হাত থেকে বণিকদের রক্ষা করার কোনো উপায় ছিল না। নৌবাণিজ্য ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হল। লক্ষ্মীদেবী ম্রিয়মান হলেন। বঙ্গীয় শব্দকোষে একটি অত্যন্ত ঋণাত্মক শব্দের জন্ম হল। যার নাম ‘কালাপানি’।
কালাপানি, অর্থাৎ সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ। আরব জলদস্যুদের হাত থেকে পরিত্রাণের সংগ্রামী পন্থার উদ্ভব না হওয়ায় সমাজপতিরা বঙ্গবাসীকে রক্ষা করতে কালাপানির কথা বললেন। যে শব্দটি পরবর্তী কালের প্রেক্ষাপটে হিন্দুধর্মের গোঁড়া কুপমন্ডুকতাকে সূচিত করত। অথচ বাস্তব তা নয়। জল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিভীষিকা। আরবের হাত থেকে বঙ্গকে বাঁচাতেই ঐ কালাপানির ধারণা। না হলে বাঙ্গালী কখনো সমুদ্রকে ভয় পায়নি। অধুনা হুগলী জেলার সিঙ্গুরের সিংহবাহুর পুত্র বিজয় সিংহ হেলায় লঙ্কা জয় করেছিলেন।

শশাঙ্কের পরে সেই যে সমুদ্রবাণিজ্য বন্ধ হল, সেই যে বাঙ্গালীর অর্থনৈতিক অধঃপতন শুরু হল, তা চলেছিল শত শত বছর ধরে। শ্রী শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৌড়মল্লার’ -এ আছে – “বরুণ দত্ত পুরুষানুক্রমে ব্যবসায়ী, পূর্বকালে তাহাদের অনেকগুলি বহি ছিল, গৌড়বঙ্গের পণ্য লইয়া বহুদূর পর্যন্ত যাত্রা করিত। দক্ষিণে সিংহল অতিক্রম করিয়া ভরুকচ্ছ যাইত, কখনও পারসীকদের দেশে যাইত। পূর্বদিকে মলয় যবদ্বীপ সুবর্ণভূমিতে যাইত। শতাব্দীর পর শতাব্দী এইভাবে চলিয়াছে, গৌড়বঙ্গ পুণ্ড্রমগধের পণ্যসম্ভার দেশ দেশান্তরে সঞ্চারিত হইয়া স্বর্ণ রৌপ্যের আকারে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে। 

প্রায় বিশ বছর পূর্বে হঠাৎ এক নিদারুণ বাধা উপস্থিত হইল, সমুদ্রে হিংস্লিকা দেখা দিল। এতকাল সমুদ্রে জলদস্যুর উৎপাত ছিল না, সকল দেশের বাণিজ্য-তরী স্বচ্ছন্দে সাগরবক্ষে বিচরণ করিত; এখন বনায়ু দেশের দস্যুরা সমুদ্রের পথ বিপদসঙ্কুল করিয়া তুলিল। নিরীহ নিরস্ত্র পণ্যবাহী জাহাজ লুঠ করিয়া ড়ুবাইয়া ছারখার করিয়া দিতে লাগিল। তাহাদের দৌরাত্মে গৌড়বঙ্গের সাগরসম্ভবা লক্ষ্মী আবার সাগরে ড়ুবিতে বসিলেন। গত বিশ বছরে গৌড়ের নৌ-বাণিজ্য ক্রমশ সঙ্কুচিত হইয়া দক্ষিণে সিংহল ও পূর্বে সুবর্ণভূমি পর্যন্ত দাঁড়াইয়াছিল, কিন্তু তাহাও বুঝি আর থাকে না। আরব জলদস্যুদের দুর্নিবার অভিযান বঙ্গোপসাগরের জল তোলপাড় করিয়া তুলিয়াছে।

বরুণ দত্তের সপ্তদশ ডিঙা ছিল, এখন মাত্র দুইটি অবশিষ্ট আছে, বাকিগুলি ভরাড়ুবি হইয়াছে। নাবিকেরা সমুদ্রে যাইতে চায় না; নৃশংস জলদস্যুর হাতে প্রাণ দিবার জন্য কে সমুদ্রে যাইবে? বণিকেরা বেতন দিয়া সৈন্য সংগ্রহ করিতে চায়, কিন্তু বাঙ্গালী সৈন্য সমুদ্রে যুদ্ধ করিতে অভ্যস্ত নয়, বেতনের লোভেও তাহারা নৌ-যুদ্ধে যাইতে অসম্মত। রাজশক্তি নিশ্চেষ্ট উদাসীন, রাজা থাকিয়াও নাই। বাংলার বন্দরে বন্দরে বাঙ্গালীর নৌবাহিনী পঙ্কবদ্ধ হস্তিযুথের ন্যায় নিশ্চল; নদীর মোহানা পার হইয়া সাগরের নীল জলে ভাসিবার সাহস কাহারও নাই।”

পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যে ক্ষতি হয়েছিল তা পূরণে পরবর্তী কালে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বীপময় দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।

বঙ্গের বণিকদের চেয়েও বেশি প্রভাব ছিল এমন দাবী কেবলমাত্র চোল রাজাদের পক্ষেই হয়তো করা সম্ভব কারণ ওনারা ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন এবং বঙ্গোপসাগরকে চোল হ্রদে পরিণত করেছিলেন তাদের নৌবাহিনীর ক্ষমতার জোরে। কিন্তু আরব, ইউরোপ, চীনে চোলদের বাণিজ্য ছিলনা যার ফলে বাঙ্গালী ব্যবসায়ীদের প্রভাব যে তাদের চেয়ে বেশি ছিল তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গোপসাগরকে হয়তো তখনই বহির্বিশ্বে বঙ্গোপসাগর হিসেবে জেনেই গিয়েছিল নইলে হয়তো চোল উপসাগর নামেই পরিচিত হতো। এমনকি উত্তম চোল ও রাজেন্দ্র চোলের মতো শাসকরাও বঙ্গলিপিতে মুদ্রা জারি করেছেন গৌড়ের বণিকদের প্রভাবে।নীচে শ্রীলঙ্কায় প্রাপ্ত দুটি চোল মুদ্রার চিত্র দেওয়া হলো।

চীনের পরিব্রাজক হিউ এন সাং ৬২৯ খ্রীস্টাব্দে ভারতে আসেন। ওনার বিবরণে তাম্ব্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওনার বিবরণ অনুযায়ী- ‘সমতট থেকে পশ্চিম দিকে ৯০০ লি পথ পাড়ি দেয়ার পর এসে পৌঁছলাম তান মো লি তি বা তাম্রলিপ্তি রাজ্যে। রাজ্যটি আকারে ১৫০০ লির মতো। রাজধানীর আয়তন ১০ লি। নিয়মিত চাষবাস চলে। প্রচুর ফল ও ফুলের ছড়াছড়ি এখানে। এখানে দশটির মতো সংঘারাম আছে, হাজার খানেক ভিক্ষুর বাস। দেবমন্দির আছে পঞ্চাশটির মতো। নানা সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে মিলেমিশে বাস করছে। দেশটির উপকূল ভাগ একটি সমুদ্র খাঁড়ি দিয়ে বেষ্টিত। জল ও ভূমি যেন একে অপরকে আলিঙ্গন করছে এখানে। প্রচুর দামী দামী জিনিস এবং রত্নসামগ্রী এখান থেকে সংগৃহীত হয়। এজন্য এলাকার অধিবাসীরা বেশ ধনী।’

বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তৃতির ইতিহাস দেখলে দেখা যায় ধর্মপালের সময়কাল বাঙলা থেকে বজ্রযাণী বৌদ্ধরা একাদশ শতকে মালয় (ইন্দোনেশিয়া) সুবর্ণদ্বীপ (সুমাত্রা দ্বীপ) গমন করেন এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তৃত করেন।

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে পাল সাম্রাজ্যের সাথে আরব, তিব্বতের সাথে বঙ্গের সুসম্পর্ক ছিল। পাল যুগে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে গৌড়দেশের ব্যবসা বৃদ্ধি পায় ফলে পাল প্রত্নস্থলগুলিতে আব্বাসীয় মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া আরব ইতিহাসবিদদের রচিত নথিপত্রেও পাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাদের দেশের বাণিজ্যিক ও বৌদ্ধিক যোগাযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক বজায় ছিল।ইরাকের বাগদাদের বিখ্যাত গ্রন্থাগার “বাইতুল হিকমাহ” এই যুগেই ভারতীয় সভ্যতার গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত কীর্তিগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।

মঙ্গলকাব্যের মধ্যে সবচেয়ে পুরানো কাব্য হল মনসামঙ্গল যা পঞ্চদশ শতকের দিকে লেখা হয়েছিল। এই কাব্যে গাঁঙুড়ের জলে বেহুলা ও লখীন্দরের কাহিনী পাওয়া যায়, বিখ্যাত বণিক চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা ডুবে যাওয়ার কাহিনী পাওয়া যায়। সুতরাং মনসামঙ্গল যখন রচিত হচ্ছে সেই পঞ্চদশ শতকের আগের থেকেই যে বাঙ্গালি বণিকদের প্রভাব ছিল তার একটা অনুমান পাওয়া যায়। চন্ডীমঙ্গল কাব্যে কবি মুকুন্দরাম লিখেছেন- ‘সপ্তগ্রাম থেকে বণিকেরা কোথায় না যায়?’

প্রাচীন ব্রতকথাগুলোতে দেখা যাবে, বাবা-ভাই-স্বামীর বাণিজ্য যাত্রা নিয়ে বাড়িতে থাকা মেয়েরা স্বজনের মঙ্গল কামনা করছে, ব্রত পালন করছে, সুরে সুরে গাইছে মঙ্গলগীতি :
‘ভেলা! ভেলা! সমুদ্রে থেকো / আমার বাপ-ভাইকে মনে রেখো !’
অথবা,
‘সাগর! সাগর! বন্দি। / তোমার সঙ্গে সন্ধি। / ভাই গেছেন বাণিজ্যে, / বাপ গেছেন বাণিজ্যে, / সোয়ামি গেছেন বাণিজ্যে। / ফিরে আসবেন আজ’…
কিংবা,
‘কাগা রে! বগা রে! কার কপাল খাও? / আমার বাপ-ভাই গেছেন বাণিজ্যে, কোথায় দেখলে নাও।’

চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গৌড়দেশে আগত মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা তাঁর কিতাবুর রেহালায়’ সোনারগাঁওয়ে তৈরি সুতি বস্ত্রের বিশেষ প্রশংসা করেন। আকবরের সভাসদ আবুল ফজল তাছাড়া পঞ্চদশ শতকে আগত চীনের পর্যটকরাও মসলিনের প্রশংসা করেছেন।

কিন্তু তাও বন্ধ হয়ে যায় পর্তুগীজ মগ জলদস্যুদের উৎপাতে। বঙ্গের বাণিজ্যলক্ষ্মী দ্বিতীয়বার নিমজ্জিতা হন।(শ্রী অতুল সুর : “বাঙলা ও বাঙালির বিবর্তন” – পৃষ্ঠা ২৫৩)

শ্রী রজনীকান্ত চক্রবর্তী “গৌড়ের ইতিহাস” – র ২৫২ পৃষ্ঠাতে বলেন, ডি ব্যারো নামক পর্তুগীজ ঐতিহাসিকের পুস্তকে আছে গোয়ার পর্তুগীজ গবর্ণর নূন্যে দা কান্হা (Nuno da Cunha) পাঁচখানি জাহাজ ও দুই শত মনুষ্যসহ আলকন্সো ডিমেলোকে চট্টগ্রামে একটি উপনিবেশ স্থাপনের জন্য প্রেরণ করেন।……সপ্তগ্রাম ও চট্টগ্রাম তাহাদের প্রধান বাণিজ্য স্থান ছিল। তাহারা চট্টগ্রামকে পোর্ট্রোগ্রাণ্ডি ও সপ্তগ্রামকে পোট পেকিনো বলিত।…. …১৫৩৬ খৃষ্টাব্দে ত্রিপুরেশ্বর দেবমাণিক্যের জেষ্ঠ পুত্র বিজয় মাণিক্য রাজা হইয়া চট্টগ্রাম অধিকার করেন। ..…… ….

১৯৪ পৃষ্ঠায় রজনীকান্তবাবু বলেন, “মুসলমানদের রাজত্বের পূর্ব্ব হইতেই সোণার গাঁও, ডুমরোর, তীতবাদী, জঙ্গলবাড়ী, কাপাসিয়া প্রভৃতি কার্পাসশিল্পের প্রধান আড়ৎ ছিল। মুসলমান আমলে এই শিল্পের অবনতি হয় নাই, তবে হিন্দুদের এই শিল্পের সম্বন্ধে অবনতি হইয়াছিল। তাহারা পূর্ব্বে অর্ণবযান চালাইয়া বিদেশে বাণিজ্য করিতে যাইত; এখন মুসলমানদের হাতে বহির্বাণিজ্যের ভার অর্পণ করিয়া বিধিনিষেধের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ হইতে লাগিল।সোণার গাঁও সূক্ষ্ম মলিন ও ফুলদার কাপড়ের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। ডুমরোর, সাভারের নিকটবর্ত্তী, বংশী নদীর তটস্থ; এই প্রদেশই প্রাচীন শিল্প প্রধান স্থান। এখানে সূক্ষ্ম বস্ত্রের উপযোগী সুক্ষ্ম সূত্র উৎপন্ন হইত। তীতবাদী লক্ষীয়া নদীর তীরবর্ত্তী। উত্তম কার্পাস উৎপন্ন হইত বলিয়া এই প্রদেশের কাপাসিয়া নাম হইয়াছিল। জঙ্গলবাড়ী, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব্ব-তীরবর্ত্তী। বস্ত্র শিল্পের জন্য এস্থান প্রসিদ্ধ ছিল। পূৰ্ব্বে ঢাকা অঞ্চলে যে তুলা উৎপন্ন হইত, তাহার আঁশ দীর্ঘ, সূক্ষ্ম ও কোমল হইত ৷ ব্ৰহ্মপুত্র, মেঘনা ও তাহার শাখানদীগুলির ধারে ধারে তুলা উৎপন্ন হইত। ঢাকার বর্ত্তমান ফিরিঙ্গীবাজার হইতে ইদিলপুর পর্যন্ত ৪০ মাইল ভূভাগে যেরূপ তুলা উৎপন্ন হইত, জগতে সেরূপ তুলার চাষ কোথায়ও হইত না। বৎসরে চৈত্র বৈশাখ ও আশ্বিন কার্ত্তিক মাসে দুইবার তুলার চাষ হইত। ধান কাটিয়া বিচালীতে আগুন লাগাইয়া, সেই ছাই সার প্রাপ্ত জমি চষিয়া তাহাতেই তুলার বীজ বপন করা হইত। গ্রীষ্মের তুলা অপেক্ষা শারদী তুলা নিকৃষ্ট হইত।’ গারো পাহাড়, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে ভোগা নামক মোটা তুলা উৎপন্ন হইত।হিন্দু মেয়েরা সূক্ষ্ম সূত্র প্রস্তুত করিত। ইহারা আধসের তুলা হইতে ১২৫ ক্রোশ লম্বা সূতা প্রস্তুত করিতে পারিত। হিন্দু তাঁতিরা অসাধারণ দক্ষতাসহ মাকু চালাইতে পারিত।ঢাকা অঞ্চলের ঝুনানামক কাপড় দেশীয় নর্ত্তকী, গায়িকা ও অসূর্য্যম্পশ্যা অন্তঃপুরিকাগণ ব্যবহার করিত। তিব্বতীয় “দুলবা” নামক গ্রন্থে বর্ণিত আছে কলিঙ্গরাজ, কোশলরাজকে এই বস্তু উপঢৌকন দিয়াছিলেন। এই বস্ত্র একজন ভিক্ষুণীর হস্তগত হয়, তিনি ইহা পরিয়া প্রকাশ্য সভায় উপস্থিত হন, তাহাতে তাঁহার নগ্নতা নিবারিত হয় নাই; তদবধি ভিক্ষুণীদের এই বস্ত্র পরিধান নিষিদ্ধ হইয়াছে।”

রিয়াস-উস-সালাতিন অনুসারে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলিম শাসনের সময় বঙ্গের অভ্যন্তর অবাধ বা মুক্ত ছিল না। পলাশির যুদ্ধের আগে নবাবরা বণিকের জাতধর্ম দেখে শুল্ক আদায় করত, মুসলমান বণিকদের ২.৫ শতাংশ, হিন্দুদের ৫ শতাংশ, আর্মেনীয়দের ৩.৫ শতাংশ, ফরাসি ও ওলন্দাজদের ২.৫ শতাংশ সরকারি শুল্ক (সায়ের Duties) হার ধার্য ছিল। বাঙ্গালী হিন্দুরা কেন ব্যবসা বিমুখ হয় এটা তার কারণ। এবং মজা এখানেই যে ইংরেজরা বার্ষিক তিন হাজার টাকা দিয়ে বঙ্গদেশে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করত!

এরপরেও শ্রী সুশীল চৌধুরীর ‘From Prosperity to Decline’ বইতে মিরজাফরের রাজত্বকালে অর্থাৎ ১৭৬০ এর দিকে মেদিনীপুরে ৩০০০ খানা লবণের কারখানার উল্লেখ পাওয়া যায় যা সারা বিশ্বে রপ্তানী করা হত। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে এসব কারখানা একদিনে গড়ে ওঠেনি: তাই বাঙ্গালার প্রভাব এতেও অনেকটা পরিষ্কার হয়।

বিদেশি পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বঙ্গদেশের ধনরত্নের গল্প যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তখনই বিভিন্ন দস্যুবৃত্তিতে অভ্যস্ত জাতিগোষ্ঠী এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিবেক-বিবেচনাহীন অর্থলোভী লুটেরাদের দল এ অঞ্চলে আসতে থাকে, তাদের নানা মুখোশ- কেউ ধর্মপ্রচারক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ পরিব্রাজক, কেউ-বা নিতান্তই ভবঘুরে। বঙ্গ ও বাঙ্গালীর সাম্প্রতিক দুর্দশার পেছনেও অনুঘটক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্প-সমৃদ্ধির কথা।

 

(লেখক পরিচিতি: শ্রী জ্যোতিষ্মান সরকার B.Tech Ceramic Technology তে পাঠরত।)

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

Leave a Reply