স্বভূমি ও সমকাল

মারাঠা ইতিহাসের রক্তাক্ত ক্রান্তিকালে – ১

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মকর সংক্রান্তি একটি উল্লেখযোগ্য উৎসব। গঙ্গাসাগরে লক্ষ পুণ্যার্থীর ভীড়, শীতের পরশ, কোথাও বা ঘুড়ি ওড়ানোর ধুম সঙ্গে ভোজনরসিক বাঙালির পিঠে পুলি সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ। কিন্তু আজ থেকে ঠিক দু’শ ষাট বছর আগের এক সংক্রান্তি আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল। সেই পরিবর্তন এতটাই ভয়াবহ যে আগামী প্রায় দু’শ বছরের জন্য ভারত ছিল পরাধীন ।

সময়টা ১৭৫৭, বাংলায় তখন ব্রিটিশ রা বেশ মজবুত অবস্থায়, সিরাজদৌল্লার পরাজয় ঘটেছে, কিন্তু উত্তর ভারত বা মধ্য ভারতে ব্রিটিশদের প্রভাব তখন যৎ সামান্য। সমগ্র ভারতে তখনো মারাঠা শাসন মধ্যগগনে, দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরু সমেত বিশাল এক ভূখণ্ড মারাঠা দখলে। পুনা শহরে চিৎপাবন বংশীয় ব্রাহ্মণ শ্রীমন্ত বাজিরাও বল্লাল এর জ্যেষ্ঠ সন্তান – পেশোয়া বালাজি বাজিরাও ওরফে নানাসাহেবের শাসন। ভারতের মূল ভূখণ্ডে তখন মুসলিম শাসন বলতে নিজাম আর আউধ (অযোধ্যা) । এছাড়া রোহিলখণ্ডের রোহিল্লা আফগানদের নেতা নাজিব খান আর দিল্লিতে অসহায় মুঘল সম্রাট, যাদের সাম্রাজ্য দিল্লি শহরের সীমানাটুকুতেই আবদ্ধ, মারাঠাদের খোরপোষে মুঘল সম্রাটের দিন গুজরান হয়। দিল্লি সমেত উত্তর ভারতের অনেকাংশেই মারাঠাদের আধিপত্য, আর উত্তর পশ্চিম ভারতে অতি দ্রুত আরেকটি শক্তি উঠে এসেছে – শিখরা। তা এ হেন সময়…রোহিল্লা মুসলমান দের নেতা নাজিবখান, “কাফেরদের” এই প্রবল প্রতাপ খন্ডন করতে আমন্ত্রণ করে বসলেন আফগানিস্তানের তৎকালীন সুলতান আহমেদ শাহ আবদালিকে। ক্রুর নিষ্ঠুর আফগান সুলতান ভারত আক্রমনের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারলেননা, নাজিব খানের সহায়তায়, পাঞ্জাব , হরিয়ানার কিয়দংশ এবং দিল্লি দখল করে ফিরে গেলেন আফগানিস্তানে।

যাওয়ার আগে অবশ্য মুলতানের সিংহাসনে বসিয়ে গেলেন নিজের পুত্র তিমুর শাহ দুররানী কে।

পেশোয়া, এর প্রত্যুত্তরে উত্তর ভারত কে আফগান দখলমুক্ত করতে এবং মুঘল দের আরো দুর্বল করতে বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করলেন। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন রঘুনাথ রাও ( প্রথম বাজিরাও এর কনিষ্ঠ সন্তান)। অনায়াসে দিল্লি জয় হলো(১১ আগস্ট, ১৭৫৭) মুঘল সম্রাট হলো মারাঠাদের হাতের পুতুল মাত্র.. এক শতাব্দী বাদে আবার দিল্লির চালিকা শক্তি বকলমে কোনো হিন্দু শাসকের হাতে গেল। রোহিল্লা আফগানদের নেতা নাজিব উদ দৌল্লা ফেরার হলেন, তবে প্রতিশোধের আগুনে ফুঁসতে লাগলেন, “কাফেরদের” হাতে এই পরাজয় তার কাছে অসহনীয় ….। তবে মারাঠা রা এখানেই থামল না, দিল্লি থেকে হরিয়ানা, সেখান থেকে উত্তর পশ্চিমে মুলতান, পেশোয়ার। মারাঠা বাহিনী সেবার থেমেছিল অটক নামের একটি জায়গায় পৌঁছে, ১৭৫৮ সালের ঘটনা.। পাঠকরা ভারতের ইতিহাস নিয়ে একটু নড়াচড়া করলে বুঝবেন , এই সময়টিকে ভারতবর্ষের জন্য যুগ সন্ধিক্ষন বললেও অত্যুক্তি হবে না। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশ রা জয়লাভ করেছে ,কলকাতায় ব্রিটিশদের রমরমা দিনকে দিন বাড়ছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিকড় জাঁকিয়ে বসছে বাংলায়। কিন্তু অন্যদিকে ভারতের বিশাল একটি ভূখণ্ডে দোর্দন্ডপ্রতাপ মারাঠাদের ভগবা ধ্বজ তখনো উড্ডীন। দক্ষিণে বেঙ্গালুরু থেকে আফগানিস্তানের সীমানা অবধি তখন মারাঠাদের শাসন। খেয়াল করলে বোঝা যায় মুঘল শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার ফলে মারাঠাদের যে কোনো আর্থিক ও সামরিক ক্ষতি সেক্ষেত্রে সরাসরি ব্রিটিশ দের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে।

আবার ,ভারতের ইতিহাসে পানিপথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ,পানিপথের প্রান্তরে সমস্ত যুদ্ধই ভারতের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অন্য এক অভিমুখে পরিচালন করেছে, ইংরেজিতে যাকে বলে টেক্টনিক শিফট, সেই টেক্টনিক শিফট এসেছে ভারতের ক্ষেত্রে। 

পানিপথের তৃতীয় ও সর্বশেষ যুদ্ধের পটভূমি রঘুনাথ রাওয়ের দিল্লি আক্রমণের মধ্যে দিয়েই রচিত হয়েছিল। ১৭৫৮ সালের পরাজয়ের পর ১৭৬১ তে নাজিব উদ দৌল্লা আবার ডাক দিল আহমেদ শাহ আবদালি কে। মারাঠাদের কাছে গত বারের পরাজয় আফগানরা তখনো ভুলতে পারেনি, বদলার আগুনে ফুঁসছে আফগানরা.. পাঞ্জাবের রাস্তায় আবার ধেয়ে এলো আফগান ফৌজ, এবারও “কাফের হিন্দুদের” ফৌজ কে শিক্ষা দিতে তাতে যোগ দিলেন অউধের(অযোধ্যা) নবাব । অন্যদিকে সদাশিব রাও ভাউয়ের ( বালাজি বাজিরাও এর খুড়তুতো ভাই, অর্থাৎ প্রথম বাজিরাওএর সহোদর চিমাজি আপ্পার সন্তান) নেতৃত্বে বিশাল মারাঠা বাহিনী উত্তরাভিমুখে ছুটলো “হিন্দুপদপদশাহির ” গেরুয়া পতাকা এবার চিরকালের জন্য যেন গেঁথে দেওয়া যায় উত্তর ভারতে.. এইই তাদের লক্ষ্য। মারাঠারা কুঞ্জপুরার যুদ্ধে নাজিব ও আফগানদের হারানোর পর দিল্লি দখল করলো, দিল্লি দখল হলো অচিরেই, মুঘল সম্রাট আবার পলায়ন করলেন.. আফগানদের হারানোর পর বিস্বাস রাও ( বালাজি বাজিরাওয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র) তাতে বসবেন ,প্রায় ৬০০ বছর পর ম্লেচ্ছ শাসন ঘুচবে ভারতের প্রাণকেন্দ্রে। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে বোধহয় ছিল অন্যরকম.। মারাঠারা যখন দিল্লিতে, আবদালি তখন যমুনার অপর প্রান্তে.. অর্থাৎ যুদ্ধ হবেই ..নচেৎ আবদালি আফগানিস্তান ফিরতে পারবেন না। মারাঠাদের সমস্ত শক্তিশালী সামন্তরা অর্থাৎ নাগপুরের ভোঁসলে (অন্য ভোঁসলে শাখা, শিবাজীর বংশের সাথে সম্পর্ক নেই) গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়ারা, ইন্দোরের হোলকার এবং অন্যান্যরা সকলেই মারাঠা বাহিনীতে বিদ্যমান কিন্তু মারাঠাদের পশ্চাতে মারাঠা মিত্র শক্তি তেমন নেই, হরিয়ানার জাঠরা মারাঠাদের দিল্লির দখল নেওয়া নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ..মারাঠাদের কোনো রসদ দিতে তারা কোনোমতেই প্রস্তুত নয়।

রাজপুতদের সাথেও মারাঠাদের সুসম্পর্ক বিশেষ নেই সেই সময়, সুতরাং রসদ জোগাড় করার রাস্তা একেবারে বন্ধ। মারাঠাদের মিত্র রাজ্যগুলো বহুদূরে দিল্লি থেকে। আফগান আর মারাঠাদের মধ্যে তখন ফারাক শুধু যমুনা । তবে শীতের সময় হলেও যমুনায় স্রোত তখন বেশ ভালো পরিমানে.. আফগান বাহিনী দিন গুনছে কবে নদীর স্রোত কমবে আর কবে তারা দিল্লির দখল নেবে।

মারাঠারা কুরুক্ষেত্রর দিকে এগিয়ে গেছে ততদিনে.. তাদের মিত্র গোবিন্দপন্থ বুন্দেলা যাওবা রসদের ব্যবস্থা করছিলেন, কিন্তু অকস্মাৎ একদিন আফগান বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেন… রসদ জোগাড় করার শেষ রাস্তা গেল বন্ধ হয়ে, দিন কতক পরেই আফগানরা নদী পার করলো.. যুদ্ধ তখন কয়েক দিনের অপেক্ষা মাত্র.। মারাঠা আর আফগান বাহিনী মুখোমুখি হলো পানিপথের প্রান্তরে…..

(ক্রমশ)

Leave a Reply