– শ্রীমতী মিথিলা বসু
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ক্ষুদিরাম বসু, সূর্য সেন কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো বিপ্লবীদের নাম সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি এমন বহু বিপ্লবী ছিলেন, যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত শক্ত করেছিলেন। তাঁরা তৈরি করেছিলেন সংগঠন, প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তরুণদের, গড়ে তুলেছিলেন আত্মশক্তি ও আত্মত্যাগের মানসিকতা।
শ্রী পুলিনবিহারী দাস ছিলেন সেই ধরণেরই এক বিস্মৃত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী সংগঠক।
পূর্ববঙ্গের বিপ্লবী আন্দোলনকে বিস্তৃত ও সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। পুলিনবাবু ১৮৭৭ সালে পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার লৌহসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে শারীরিক কসরত, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় যুদ্ধকৌশলের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখা যায়। তিনি ১৮৯৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীকালে ঢাকার কলেজে পড়াশোনা করেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের এই যুবক ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে, কেবল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যথেষ্ট নয়, পরাধীন জাতিকে আত্মমর্যাদা ও আত্মরক্ষার যোগ্য করে তুলতে হলে শরীর, মন এবং চরিত্র তিনটিরই বিকাশ প্রয়োজন। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের প্রথম দশকে বাংলার সমাজে শরীরচর্চা ও আখড়া-সংস্কৃতির নতুন গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল। লাঠিখেলা, কুস্তি, তলোয়ার চালনা, দণ্ড-বৈঠক কিংবা অন্যান্য শারীরিক অনুশীলন তখন শুধু বিনোদন বা ব্যক্তিগত শক্তি প্রদর্শনের বিষয় ছিল না।
এগুলি ক্রমে জাতীয় আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যম হয়ে উঠছিল। পুলিনবিহারী এই ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯০৩ সালে ঢাকার টিকাটুলিতে তিনি একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। এই আখড়া পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সাহস, আত্মসংযম ও দেশপ্রেম গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীরভাবে বদলে দেয়। স্বদেশি আন্দোলন, বয়কট, জাতীয় শিক্ষা এবং ব্রিটিশবিরোধী চেতনা বাংলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় বিপিনচন্দ্র পাল এবং ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। শ্রী প্রমথনাথ মিত্র ছিলেন অনুশীলন সমিতির অন্যতম প্রধান সংগঠক। তাঁর চিন্তাধারা পুলিনবিহারীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শ্রী মিত্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুলিনবিহারী পূর্ববঙ্গে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরবর্তীকালে তিনি ঢাকায় অনুশীলন সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। অনুশীলন সমিতির উদ্দেশ্য ছিল বহুমাত্রিক। সংগঠনটির নামের মধ্যেই নিহিত ছিল ‘অনুশীলন’ অর্থাৎ নিয়মিত সাধনা, আত্মশাসন ও চরিত্রগঠন। শারীরিক শক্তি অর্জনের পাশাপাশি সদস্যদের ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, নৈতিকতা এবং দেশের অতীত সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হত। লাঠি ও তলোয়ার চালনার মতো শারীরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ, গোপনীয়তা, পারস্পরিক আস্থা এবং দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সামাজিক সাহায্য করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করাও ছিল সংগঠনের কার্যক্রমের অংশ। ফলে অনুশীলন সমিতি তরুণদের মধ্যে এক ধরনের সামগ্রিক জাতীয় চরিত্র গঠনের প্রচেষ্টাও ছিল।
শ্রী পুলিনবিহারী দাসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল তাঁর অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা। তিনি বুঝেছিলেন যে, কযেকজন সাহসী যুবকের বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড দিয়ে বৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম চালানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, নিয়মিত যোগাযোগ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং একটি সুস্পষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকার অনুশীলন সমিতি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ও ঐতিহাসিক সূত্রে এই সংগঠনের ৫০০রও বেশি শাখা এবং আনুমানিক পনেরো থেকে বিশ হাজার সদস্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্য একটি তথ্যে পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার-সহ প্রায় ছ’শো শাখা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। পুলিনবিহারীর নেতৃত্বে ঢাকার অনুশীলন সমিতি পূর্ববঙ্গে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক উপস্থিতি তৈরি করেছিল। ঢাকার অনুশীলন সমিতির বিস্তার এত দ্রুত হয়েছিল যে, অল্প সময়ের মধ্যেই এটি কলকাতার মূল সংগঠনের সমকক্ষ, এমনকি পূর্ববঙ্গের ক্ষেত্রে অধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে আখড়া ও শাখার মাধ্যমে তরুণদের সংগঠিত করা হয়।
প্রকাশ্যে এগুলির অনেকগুলি শরীরচর্চা, জাতীয় শিক্ষা বা সামাজিক সেবাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও অন্তরালে এগুলি বিপ্লবী চেতনা ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন ক্রমশ এই কার্যকলাপের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করে। ঔপনিবেশিক সরকার ক্রমশ বুঝতে পারে যে, এই আখড়াগুলির মাধ্যমে কেবল শারীরিক প্রশিক্ষণ না, বরং রাজনৈতিক অসন্তোষ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও ছড়িয়ে পড়ছে। ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবী সংগঠনগুলির ওপর দমননীতি জোরদার করে। ১৯০৮ সালে অনুশীলন সমিতি ও অনুরূপ কয়েকটি সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পুলিনবিহারী দাসকে গ্রেফতার করে পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু কারাবাস তাঁর বিপ্লবী মনোভাবকে ভেঙে দিতে পারেনি। মুক্তির পরও তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
১৯১২ সালে ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার সূত্রে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীকালে আন্দামানের সেলুলার জেলে সাত বছরের জন্য পাঠানো হয়। ১৯২০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ‘ভারত সেবক সংঘ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং পরবর্তীকালে ১৯২২ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। তবে রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলেও দেশ ও সমাজ গঠনের ভাবনা তিনি ত্যাগ করেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে আত্মশক্তি, শৃঙ্খলা ও চরিত্রের প্রয়োজন, স্বাধীনতার পরেও জাতি গঠনের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব থাকবে। সেই উদ্দেশ্যে তিনি তরুণদের শারীরিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের দিকে মনোনিবেশ করেন।
১৯২৫ সালে কলকাতায় তিনি ‘ বঙ্গীয় ব্যায়াম সমিতি ‘ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। এখানে তরুণদের শরীরচর্চা, আত্মরক্ষা, শৃঙ্খলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেওয়া হত। তাঁর কাছে ব্যায়াম ছিল আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং জাতীয় চরিত্র গঠনের একটি পদ্ধতি। তিনি মনে করতেন, দুর্বল ও আত্মবিশ্বাসহীন সমাজ স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করতে পারে না। তাই তরুণ সমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলাই ছিল তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। ক্রমশ শ্রী পুলিনবিহারী দাসের জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল-তাঁর কাজের মূল শক্তি ছিল সংগঠন নির্মাণ, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং মানবসম্পদ গড়ে তোলা। তিনি জানতেন, ইতিহাসে অনেক সময় সামনের সারির যোদ্ধাদের নাম স্মরণ করা হয়, কিন্তু তাঁদের প্রস্তুতকারী, সংগঠক ও প্রশিক্ষকদের অবদান আড়ালে থেকে যায়। পুলিনবিহারী সেই আড়ালে থাকা নির্মাতাদের একজন। ১৯৪৯ সালে একটি প্রশিক্ষণ ক্লাসের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তরুণদের শারীরিক ও নৈতিক বিকাশের কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবন এক আত্মশক্তি, সংগঠন, শৃঙ্খলা ও জাতীয় চরিত্র নির্মাণের ইতিহাস। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তৃত ক্যানভাসে শ্রী পুলিনবিহারী দাসের নাম হয়তো অনেক সময় উজ্জ্বলভাবে উচ্চারিত হয় না, কিন্তু পূর্ববঙ্গের বিপ্লবী সংগঠনকে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে ভাঁর অবদান উপেক্ষা করা যায় না।
শ্রী পুলিনবিহারী দাসের জীবন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত দিকের কথা মনে করায়। বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে আমরা সাধারণত বোমা, বন্দুক, গ্রেপ্তার ও আত্মত্যাগের ঘটনাগুলিই বেশি স্মরণ করি। কিন্তু তার পিছনে প্রয়োজন ছিল সংগঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং নতুন কর্মী তৈরি করার দীর্ঘ প্রচেষ্টা। পুলিনবিহারী দাস ছিলেন সেই সাংগঠনিক পরিকাঠামো নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারিগর। বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের বিস্তারের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল সংগঠিত তরুণ প্রজন্ম তৈরি করার ক্ষমতা।
লেখক পরিচিতি : গবেষক এবং লেখিকা; বিষয় – মানবাধিকার , বাংলাদেশের নিপীড়িত হিন্দু সম্প্রদায়, ভূ-রাজনীতি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিষয়ে | লেখালেখি ও বিশ্লেষণ করেন। ইসলামিক জিহাদ এবং বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের উপর দক্ষতার সাথে গবেষণা করছেন। তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: “Hindu Demographic Decline In Bengal: Historical And Contemporary Perspectives” আর “Religious Ideology and Islamist Terrorism: Mapping Conflict, Governance, and Jihadist Violence (1998–2026)”


