বিপন্নতার মানব মুখস্বভূমি ও সমকাল

পোলিও মুক্ত দেশ!(?)

সুমিতাভ বিশ্বাস, রূপসা মণ্ডল

গত বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি, আশেপাশের বহু মানুষ, করোনা প্রতিষেধকের অপেক্ষায়, চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করছেন। টীকাটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে গেলে, হয় রেগে যাচ্ছেন, বা পোলিও প্রতিষেধকের সফল্যতার উদাহরণ নিয়ে আসছেন। সত্যিতো, ছোটবেলা থেকে এই রোগের ভয়াবহতার গল্প পরিবারে আলোচিত হতে কত শুনেছি, TV তে সেই দেখা পঙ্গু শিশুগুলির কথা মনে পড়ে যায়, পোলিও টীকাকরণের সপ্তাহে অমিতাভ বচ্চনের “দো বুনদ জিন্দেগী কি”। সরকারের ফলাও করে প্রচারে দেখতে পাওয়া যায়, ভারত হলো, পোলিও মুক্ত দেশ। যার শেষ case টি, ২০১১ সালের হাওড়াতে ধরা পড়ে।

খুব ভালো লাগছিলো যে আমার দেশ, এই ভয়ঙ্কর রোগটিকে সম্পূর্ণ রূপে প্রতিহত করতে পেরেছে। সেখান থেকেই খোঁজ নিতে শুরু করলাম, যে এই অভূতপূর্ব বিষয়টি কিভাবে সম্ভব হলো? কতদিন লেগেছিলো এই প্রতিষেধক তৈরিতে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশিষ্ট গবেষকদের সাক্ষাৎকার এবং নিবন্ধ পড়তে পড়তে হঠাৎ যেন এক বীভৎস চেহারার শীতল চাহুনির স্পর্শ অনুভব করলাম। সেই চাহুনির এক ঝলক আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত করছি।

পোলিও ভাইরাস মূলত ৩ ধরনের, Type – 1, 2 এবং 3। Poliomyelitis রোগে, পোলিও ভাইরাসটি প্রধানত নাক ও গলার intersection কে affect করে, এবং সেখান থেকে অন্ত্রে পৌঁছে, নিজেদের বিস্তার ঘটায়। এরপর রক্তপ্রবাহে মিশে তা আমাদের Central Nervous System কে আক্রমন করে থাকে। কোমরের নীচের পেশীগুলো ক্রমশ তাদের ক্ষমতা হারাতে থাকে এবং শেষে স্থায়ী পক্ষাঘাত। এই ভাইরাস কে প্রতিহত করার জন্য দুই ধরনের vaccine আছে, Inactivated Polio Vaccine (IPV) ও Oral Polio Vaccine (OPV) [1]। ভারতে Pulse Polio টীকাকরণ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Universal Immunization Programme এর অন্তর্গত হয়ে যেখানে ১০০% টীকাদানের লক্ষ্য রাখা হয় এবং এখানে OPV ব্যাবহার শুরু করা হয় [2]।

OPV তে পোলিও ভাইরাসটিকে দুর্বল করে মুখে দেওয়া হয়। এতে অন্ত্রে ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা হয় যাতে ভাইরাসটি এখান থেকে কোন অবস্থাতেই বিস্তার না ঘটাতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি, OPV নিয়ে গবেষণায় অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে আসছে। যেহেতু ভাইরাসগুলিকে শুধুমাত্র দুর্বল করে vaccine রুপে দেওয়া হচ্ছে, তাই বেশ কিছু ক্ষেত্রে Vaccine Associated Paralytic Poliomyelitis (VAPP) এর প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। যেখানে ভাইরাসটির ৩টের মধ্যে যে কোন একটি strain সজীব হয়ে যাচ্ছে, ও তাতে vaccine থেকেই শিশুটি আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পোলিও vaccine নিয়ে যারা পোলিও paralysis এ আক্রান্ত হচ্ছে তাদের জন্য গালভরা এক category তৈরি করেছে, Non-Polio Acute Flaccid Paralysis (NPAFP) [3]. যার থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যত দফায় OPV চলছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে NPAFP বাড়ছে। ভারতে যখন আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হচ্ছে, যে দেশ ২০১১ সালে পোলিও মুক্ত হয়েছে, সেই বছরেই সব থেকে বেশি NPAFP case ধরা পড়ে [4]। ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের ভারত সরকারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যাচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ ও বিহার দেশের মধ্যে সবথেকে বেশি এই পক্ষাঘাতে আক্রান্ত, এবং ২০১২ সাল থেকে dose কমানোর পর, এই ধরনের পক্ষাঘাতের হার ও কমে যায় [4][5]। ২০১৫ সালেই শুধুমাত্র, ভারতে ৪২,৮০৪ টি NPAFP case ধরা পড়ে। ফিনল্যান্ডে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সালের একটি গবেষণায় OPV-ইর সাথে Guillain-Barre´ Syndrome এর সরাসরি কারণগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে [6]।

১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের পোলিও মুক্ত বলে ঘোষণা করলেও, যখন তারা আবার এই vaccination কর্মসূচি নেয়, তখন OPV-ইর এই ভয়াবহ দিকগুলো দেখে, ২০০০ সাল থেকে তারা IPV শুরু করে [7]। IPV তে ভাইরাস কে এমন ভাবে culture করা হয় যাতে, তার রোগ উৎপাদন করার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যায়। সেই কারনেই এগুলিকে inactivated বা killed virus বলা হয়। IPV তে ৩ ধরেনের variant এর থেকেই সম্পূর্ণ নিরাপত্তা পাওয়া যায় [1]. তবে IPV কোন ভাবেই person-to-person transmission রুখতে পারে না [5]। ২০১৫ সালের নভেম্বার মাস থেকে কেন্দ্রিয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক তাদের পূর্বসূরি সরকারের নীতি সংশোধন করে, ছয়টি রাজ্যে IPV শুরু করার প্রকল্প নেয় এবং পরে তা দেশের সরবত্র চালু করা হয়[8]।

আরেকটা চমকপ্রদানকারী তথ্য, স্বয়ং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, যে poliomyelitis এ আক্রান্ত, ৫ বছর বয়সের কম, ২০০ শিশুর মধ্যে ১ জন স্থায়ী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। যাদের স্থায়ী পক্ষাঘাত হয়, এদের মধ্যে ৫% থেকে ১০% শিশুর শ্বাসযন্ত্রে পক্ষাঘাতের ফলে মৃত্যু হয় [9]। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সর্দি-কাশি জ্বরেই এর প্রকোপ সীমিত।

যেই প্রশ্ন গুলো উঠে আসছে, সেগুলো:
১. যেই রোগের মৃত্যুহার ০.০২৫% থেকে ০.০৫%, বা কোনো আক্রান্ত শিশুর স্থায়ী বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা ০.৫%, এই পরিসংখ্যানে, কিভাবে পোলিও এতো জনপ্রিয়তা পায়? কেন পোলিওকে এক ভয়াবহ রূপ দেওয়া হয়েছিল ?
২. OPV যে NPAFP-ইর কারন, তা জানার পর কেন আমরা পোলিও মুক্ত বলে এই vaccine এর জয়গানে সুর মেলালাম?
৩. পোলিওর নতুন নামকরন করে, statistics manipulation করে, কি vaccine industry-ইর ভবিষ্যতে ব্যাবসার পথ সুগম করার প্রচেষ্টা করা হল?
৪. বিখ্যাত গবেষক ডঃ পুষ্প মিত্র ভারগভ, পদ্ম ভূষণ ১৯৮৬, জানান যে হরিয়ানা তে ভারত সরকার যেই IPV production unit শুরু করতে চলছিল, WHO এর নির্দেশিকায় ১৯৯২ সালে সেই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত ভারত সরকার নিয়েছিল, তার উত্তর পাওয়া যায় নি! [8] WHO এর এই নির্দেশিকা কিসের বার্তা বয়ে আনে?

ইউনিভারসিটি তে পড়াকালীন কবিগুরুর একটি কথা, হৃদয় ছুঁয়ে গেছিল, “আমরা শিক্ষাকে বাহন করে নয়, বহন করে চলেছি”। শিক্ষিত সমাজ যদি সচেতন না হয়, তাহলে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলিকে দেখবে কে? এই সহজ-সরল মানুষগুলিকে ধনকুবেরদের শোষণের হাত থেকে কারা বাঁচাবে, তুমি যদি সেই শোষণকেই অস্বীকার করো? প্রতিষেধক এলেই তাকে সমুদ্র মন্থনের অমৃত ভাবা বন্ধ করো। ওহে, নগর সভ্যতার প্রতীক, চোখটা খোলো, জাগো। আর কতদিন ঝিনুকে চলবে? ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করলে সে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আর বিজ্ঞানের নাম করে কেউ যখন তোমার শরীরে ছুঁচ ফোটায়, শুধু সেই নাম শুনেই যখন সানন্দে তা গ্রহণ করো, সেটা কুসংস্কার নয় তো? ভেবে দেখো।

References:
1. https://www.who.int/teams/health-product-policy-and-standards/standards-and-specifications/vaccines-quality/poliomyelitis 
2. https://en.wikipedia.org/wiki/Pulse_Polio
3. https://www.who.int/data/gho/indicator-metadata-registry/imr-details/3399#:~:text=Definition%3A,of%20age%20X%20100%20000
4. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC6121585/
5. https://pediatrics.aappublications.org/content/135/Supplement_1/S16.2
6. https://sci-hub.se/https://doi.org/10.2165/00002018-200932040-00005
7. https://www.historyofvaccines.org/timeline/polio
8. https://scroll.in/pulse/803485/if-india-is-polio-free-why-are-children-still-getting-paralysed-by-the-polio-virus
9. https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/poliomyelitis#:~:text=Key%20facts,their%20breathing%20muscles%20become%20immobilized

Leave a Reply