সংস্কৃতি

গুরু দত্ত

(পর্ব – ১)

৩৯ বসন্তের জীবন, নির্মাতা পরিচালক গুরুদত্তকে দিয়েছিল মাত্র এগারোটা বছর।যে এগারো বছরে তাঁর নির্মিত কাজ তাঁকে স্বীকৃতি এনে না দিলেও,মৃত্যুর সাড়ে পাঁচ দশক পরে পৃথিবীর সর্বকালের সেরা পরিচালকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান এবং আগামী কয়েকশতক চলচ্চিত্র দুনিয়াকে বিস্মিত স্থিরতায় স্তব্ধ হ’য়ে ভাবার মত রশদ এনে দিয়েছিল।

তাঁর ব্যক্তিজীবন , তাঁর অকালমৃত্যু ইত্যাদি নিয়ে এমন একটা রহস্যময়তা তৈরি হয়েছে যে মানুষ আজও তা নিয়ে কৌতুহলী ।
এ রহস্যের হয়তো একটা শেষ আছে। কিন্তু, শেষ নেই যে রহস্যের, তাঁর নির্মাণশৈলীর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যের আলোকেই আমরা একটু একটু ক’রে চিনতে চেষ্টা করব এই বিস্ময়প্রতিভাকে।
আজ প্রথম পর্বে তাঁর দুই মহৎ সৃষ্টির প্রথমটি ,অর্থাৎ ১৯৫৭ সালের ‘প্যায়াসা’ নিয়ে আমাদের আলোচনা। এর পরবর্তীতে আসবে ‘কাগজ কে ফুল’; এবং পরবর্তী পর্যায়ে, শিল্পী গুরুদত্তের নানান বৈশিষ্ট্য যা তাঁকে তাঁর সময় এবং পরিসরের মধ্যেও করে তুলেছিল চূড়ান্তরকম স্বকীয় ও অনন্য।

প্যায়াসা

———————————————–

প্যায়াসা , গুরু দত্তের ট্র্যাজিক ট্রিলজির প্রথম ছবি । ছবির নায়ক বিজয় একজন অসফল কবি, যাকে আমরা বোদলেয়ারিয় flaneur এর ভারতীয় প্রতিরূপ বলতে পারি । কিন্তু সে dandy নয় , বরং জীবন সম্বন্ধে তার মধ্যে একধরণের সিনিসিজম আছে । সে একজন অপরিসীম দুঃখবাদী মানুষ । এ প্রসঙ্গে ফ্রয়েড বলেছেন যে শোকার্ত ব্যক্তি (mourner) এর কাছে “ the object has not perhaps died , but has become his object of love” . তাই “ each single one of the memories and hopes which bound the libido to the object is brought up and hyper – catcheted and the libido from it is accomplished .” বিজয় আক্ষরিক অর্থেই তার মাকে তখনই হারিয়েছে , যখন তার ভাইয়েরা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে । সে হারিয়েছে তার প্রথম প্রেম মীনাকে যে তার muse । এরপর আমরা দেখি তার মায়ের মৃত্যুর খবরটাও তাকে দেওয়া হয়নি । সে কতকটা আকস্মিকভাবেই গঙ্গার ধারে তার ভাইদের মায়ের শ্রাদ্ধ করতে দেখে বিষয়টি সম্বন্ধে অবহিত হয় । আমরা দেখি বিজয়ের পিছনে অন্ধকার আর জল , যা স্পষ্টতই গর্ভের দ্যোতক । এরপর পতিতাপল্লীতে এক মায়ের যন্ত্রণার সঙ্গে সে একাত্ম বোধ করে । সেই পতিতা মাতৃসত্ত্বার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে যার অবস্থান । সে গুলাব , যে একজন পতিতা , তাকে একধরণের স্বীকৃতি দিতে চায় , তার জীবনে তার উত্তরণ ঘটে স্ত্রী এবং তার সম্ভাব্য জননী হিসাবে মীনার (তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমের) পরিবর্ত হিসাবে । বিজয়ের সমস্যাকে কাগজ কে ফুলের সুরেশ সিনহার মতোই আমরা বলতে পারি “ … as the third form of masochism , the moral type…( where) it is the suffering itself that matters ; whether the sentence is cast by a loved one or by an indifferent person is of no importance , it may even be caused by impersonal forces or circumstances but the true masochist always holds out his his check wherever he sees a chance of receiving a blow ( The Economic Problem in Masochism ( 1924) in General Psychological Theory) । ঠিক এই কারণেই বিজয় তার ভাইরা যখন তার সঙ্গে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করে তখন কোন প্রতিবাদ করে না । তাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেওয়া হয় , তার ভাই , তার পাবলিশার মিস্টার ঘোষ সবাই তাকে চিনতে অস্বীকার করে , কিন্তু সে ন্যুনতম প্রচেষ্টাও করে না নিজের সুস্থতা প্রতিপন্ন করার । তার মালিশওয়ালা বন্ধু আবদুস সাত্তার তাকে নিয়ে পালিয়ে আসে । তারপর অডিটোরিয়ামে , তার উপস্থিতি যখন তীব্র আলোড়ন তুলেছে , মিঃ ঘোষের পাঠানো গুণ্ডারা তাকে মারতে থাকে , সে নীরবে মার খেয়ে যেতে থাকে , আবারও তাকে বাঁচায় আবদুস সাত্তার । একবারে শেষে সে নিজেকে বিজয় বলে অস্বীকার করে । সে শহরের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে কুলীগিরি করবে তবুও কোন দশটা পাঁচটা চাকরির চেষ্টা করতে তাকে আমরা দেখি না । সে আবদুস সাত্তারের জন্য স্যাটায়ারিকাল সোশ্যালিস্ট গান লিখবে , তবু নিজে কোন কাজ করবে না । “ The one form of suffering” ফ্রয়েড বলেছেন “ Then gives way to another , and all that matters , as we see , is that a certain level of suffering is constantly maintained.” তাই বিজয়ের অস্তিত্বের একটা বৃহত্তর অংশকে আচ্ছন্ন করে থাকে এক ধরণের ম্যাসকিজম , তাই অসফল কবি সমাজের অন্তেবাসী এক পতিতাকে নিয়ে শহরের “ parental authority of fate” কে অস্বীকার করে এক অনিশ্চিতের দিকে যাত্রা ।

খ্রীষ্টের জীবন এবং এক নিরন্তর দুঃখের গল্প

———————————————–

বিগত কয়েক কয়েক হাজার বছর ধরে ক্রুশবিদ্ধ খ্রীষ্টের ইমেজ আমাদের তাড়িত করেছে । ঈশ্বরের সন্তানের তীব্র যন্ত্রণা , তাঁর মৃত্যুর অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা আজও আমাদের স্পর্শ করে এবং তাঁর এই যন্ত্রণার সঙ্গে আমরা নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনযন্ত্রণার কোথাও একটা মিল পাই বলে তা আজও আমাদের উদ্বেল করে । খ্রীষ্টের এই ইমেজকে প্যায়াসাতে অত্যন্ত শিল্পসম্মতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ।

‘ জানে ওহ ক্যায়সে লোগ থে জিনকে প্যারকো প্যার মিলা’ গানটির দৃশ্যায়ণের কথাই ধরা যাক । প্রথম থেকেই পরিচালক আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সেদিন মীনার পাব্লিশার স্বামীর দেওয়া পার্টিতে যে সব কবিরা আমন্ত্রিত হয়েছে , বিজয় তাদের থেকে কতটা স্বতন্ত্র । প্রথমত তার শাদা পোষাক , যা তাকে উপস্থিত সমস্ত কবিদের থেকে আলাদা করেছে । তারা যে কবিতা বলে তা গতানুগতিক এবং পৌনঃপনিকতার চর্বিত চর্বন । ব্যর্থ প্রেমিক তার নায়িকাকে উদ্দেশ্য করে গান গাইছে —- এটি হিন্দি ছবির একটি বহু ব্যবহৃত দৃশ্য । Robert Bresson বলেছিলেন “ Originality is wanting to do as others do , but without ever succeeding .” এই দৃশ্যের ক্ষেত্রে এই বক্তব্যটি অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত । প্রথমত গানের সুরে একটা আশ্চর্যরকমের restraint আছে , একটা চাপা বিষণ্ণতা আছে । বস্তুত বিজয় মীনাকে উদ্দেশ্য করে গানটি গায় না , গানটি যেন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে

তার মধ্যে থেকে উতসারিত হয় । সে বুককেসের উপর খ্রীষ্টের মতো দুহাত ছড়িয়ে সে গাইতে থাকে , আশ্চর্য সাবলীলতায় । এটি যেন গান নয় , যেন তার হৃদয়ের অন্তর্লীন বেদনা গানের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে । ক্যামেরা মীনার দিকে এগোয় , তাদের মধ্যে একটা লাইন অফ টেনশন তৈরি হয় । দৃশ্যটির জটিলতা বাড়ায় মিঃ ঘোষের ঈর্ষা । আমরা দেখি গান চলাকালীন উপস্থিত সবাই তার শিল্পের অন্তর্লীন সততার দ্বারা মুগ্ধ হয়ে তার গান শোনে , কিন্তু গান যখন শেষ হয়ে যায় তার কোন স্থায়ী প্রভাব তাদের উপর পড়ে না । অর্থাৎ তারা তার যথাযথ শৈল্পিক মূল্যায়ন করতে অসমর্থ হয় । এই দৃশ্যটি শিল্পের artist – visionary তত্ত্বের একটি অসাধারণ উদাহরণ, যা শুরু হয় শিল্পীর অসম্মানে শেষ হয় তার অন্তিম আত্মবলিদানে ।

এই খ্রীষ্ট ইমেজটা আবার ফিরিয়ে আনেন পরিচালক, যখন ভিখারীটি রেললাইনে মারা যায়, এবং তার গায়ে থাকে বিজয়ের কোটটি । আমরা দেখি ভাগ্যাহত প্রাণীটি খ্রীষ্টের মতো দুহাত ছড়িয়ে পড়ে থাকে রেললাইনের উপর । পরের দৃশ্যে আমরা দেখি ঘোষ দম্পতি প্রাতরাশ সারছেন । টেবিলের দুই প্রান্তে দুজনের অবস্থান সম্পর্কের দূরত্বের দ্যোতক , আর চারপাশের কার্টিলারির ঝকঝকে উপস্থিতি যেন তাদের সম্পর্কের শৈত্যটাকে অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় । সংবেদী দর্শকের নিশ্চয়ই মনে পড়ে গেছে অরসন ওয়েলসের সিটিজেন কিং ছবির বিখ্যাত প্রাতরাশের দৃশ্যগুলির কথা । মিঃ ঘোষ মীনাকে বিজয়ের মৃত্যুর খবরটি জানান । মীনা মিঃ ঘোষের কাছে নিজের আবেগকে ব্যক্ত না করার অভিপ্রায়ে একটি লাইফ পত্রিকায় অন্তরাল খোঁজে । তার কভার পেজে খ্রীষ্টের ছবি ।

ছবির অন্তিম দৃশ্যে বিজয় যখন তার তথাকথিত মৃত্যুর পর ফিরে আসে , ঠিক খ্রীষ্টের রেজারেকশনের পর , সেই দৃশ্যেও পরিচালক ফিরিয়ে আনেন খ্রীষ্টের ইমেজ । আমরা দেখি বিজয় , যে ‘মৃত্যু’র পর এখন একজন বিখ্যাত কবি , তার মূর্তির আবরণ উন্মোচন হবে এক অডিটোরিয়ামে । এই অডিটোরিয়াম তার বিশাল স্তম্ভ নিয়ে আমাদের মনে পড়ায় প্রতিষ্ঠিত চার্চের কথা , তার প্রবল বৈভব এবং ক্ষমতা নিয়ে । এখানে যাজকদের জায়গায় রয়েছে প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন , আরও ব্যপকতর অর্থে সেইসব শিল্পপতিরা যারা শিল্পের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে । এই দৃশ্যটিতে পরিচালক চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্বকে । এবং এই দ্বন্দ্ব শুধু কাহিনীর বয়নে নয় , আলো , মন্তাজ এবং mise- en- scene এর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে চিত্রিত হয়েছে । যেমন চার্চে সারমন উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে আত্মধিক্কার তৈরি করে , ঠিক তেমনই করে মিঃ ঘোষের বক্তব্যটি । তিনি বিজয়ের এই পরিণতির জন্য সবাইকে দায়ী করে চলেন কেবলমাত্র নিজেকে ছাড়া । এরপর বিজয়কে আমরা ব্যলকনিতে এসে দাঁড়াতে দেখি , হাতদুটো ছড়ানো , পিছনে আলো যা অনিবার্যভাবে খ্রীষ্টকে মনে পড়াবে । এইভাবে মাথার পিছনে একটা halo তৈরি করার কোন বাস্তবসম্মত কারণ নেই , কিন্তু এই আলোর ব্যবহার একটা অতিপ্রাকৃত , ethereal effect তৈরি করে যা গভীরতর অর্থে ধার্মিক । বিজয়ের গান ‘ জ্বালা দো , জ্বালা দো , জ্বালা দো , ইয়ে দুনিয়া’ এর আর্তি , তা কিন্তু কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয় , তার আসল উদ্দেশ্য সেই সমাজের বিরুদ্ধে , যা মানুষের যন্ত্রণাকে নিজের মুনাফার জন্য ব্যবহার করে । এ যেন ঈশ্বরের আরাধনার জায়গায় , তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানের সাবলাইম ক্ষোভ , যা এই নীতিভ্রষ্ট মানুষদের প্রতি বর্ষিত হয়েছে । “ There is something of Charlie Chaplin in Vijay’s personality and something of Dostoyvosky too . Vijay is a man doing penance . This is not all . One notices a strong influence of Christianity on the whole of Pyaasa . This is astonishing’. Henry Micciolo.

তাঁর পরিচালক প্রতিভার চূড়ান্ত স্ফুরন হয়েছে এই দৃশ্যটির শেষে , যখন সমবেত জনতা উন্মাদের মতো অডিটোরিয়াম থেকে বেরোতে যায় । তাঁর ক্যামেরা নির্মম ডিটেলে ধরে প্রত্যেকটি শরীরকে , পায়ের চাপে পিষে যাওয়া শরীর , মানুষের আতঙ্কিত মুখ , নিষ্ঠুর মুখ, ক্লান্ত মুখ , একটা বিচ্ছিন্ন হাত , এক সার্বিক chaos । ছবির প্রথম দৃশ্যটি মনে আছে । প্রায় ওয়ার্ডসওয়ার্থিয় ভঙ্গীতে যে বিজয় প্রকৃতিকে নিয়ে গাইছিলো – ‘ ইয়ে হাসতে হুয়ে ফুল , ইয়ে ম্যাহেকা হুয়া গুলশন’ , তারপরই পথচারীর নির্মম পদপ্রান্তে পিষ্ট হয়ে মারা যায় ভ্রমরটি , সেই অনুষঙ্গই আবার ফিরিয়ে আনেন তিনি , যখন দেখি গুলাবকে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে সবাই । ‘ As flies to wanton boys are we to th’ Gods/ They kill us for their sport’ । যে নিষ্ঠুর নিয়তিবাদের কথা আগের পর্বে আলোচনা করেছিলাম , তার বৃত্তটি এবার সম্পূর্ণ হয় ।

মিঃ ঘোষ , বিজয়ের ভাইয়েরা , তার বন্ধুরা একটা সভা আহ্বান করে বিজয়ের সত্য পরিচয় নিরূপণ করার জন্য । এই দৃশ্যটিতে আমরা মুখোমুখি হই সেই প্রশ্নের যা যুগে যুগে রোমান্টিকদের ভাবিয়েছে । ‘আমি কে’ এই প্রশ্নটা এই ক্ষেত্রে একটা বৃহত্তর তাতপর্য পায় । রোমান্টিকরা তাঁর শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেন । তাই তাঁর শিল্পসৃষ্টিই ‘ আমি কে’ এই প্রশ্নের উত্তর হয়ে যায় । এই দ্বিতীয় সভাটিতে বিজয় যখন যায় তার মনে প্রশ্ন জাগে ‘ এই বিজয় কে?’ সে কী সেই অসফল কবি যে বেঁচে থাকতে কোন স্বীকৃতি পায়নি ! নাকী যে বিজয় মারা গিয়ে শহীদের মর্যাদা পেয়েছে , এ বিজয় সে ! যদি তাই হয় সেই মৃত বিজয়ের যে কল্পিত রূপ এই সমবেত জনতা মনে মনে তৈরি করে নিয়েছে , তার সঙ্গে তার মিল কতটুকু! সবচাইতে বড়ো কথা এই উন্মাদনার পিছনে তার সাহিত্যের সাহিত্যমূল্যর যথাযথ মূল্য দেওয়ার প্রবনতা আছে , না তা বাজারের তৈরি করা তার শহীদ ইমেজের প্রতি আবেগতাড়িত জনতার পাগলামী ! যদি তাই হয় তাহলে এই সাফল্যে তার ভূমিকা কতটুকু! যদিও সভার আলোচ্য বিষয় ছিলো সমস্যাটির আইনগত এবং অর্থকরী দিকটি , অর্থাৎ বিজয় যখন ফিরে এসেছে তার লেখার লভ্যাংশ কে পাবে ? তাই এই বিজয় কী সেই বিজয় যে এই কবিতাগুলি লিখেছে সেটা নিরূপণ করা জরুরী ছিলো । কিন্তু বিজয়কে পীড়িত করেছে গোটা বিষয়ের নৈতিক এবং আরও বৃহত্তর দার্শনিক দিকটি ।

সঙ্গীতের ব্যবহার

———————

আমরা আগেই বলেছিলাম সঙ্গীতের ব্যবহার মেলোড্রামার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য , আর গুরু দত্ত তাঁর ছবিতে মেলোড্রামাকে ব্যবহার করেছেন ।

“ One must add that these films give the audience , more so the western audience , more so the western audience , an impression of dream rather than reality . Certain tonalities characteristic of the camera work with many dark spaces , no exteriors , and an all pervading geyness , the slowness of action and the movement of people all add up to a leisurly building up of melodrama . And the songs also move in the same direction . ( Guru Dutt — 1924 – 1965 L’Avant – Scene du Cinema , Numero 158 Paris 1978)

তাঁর ছবিতে সময় বরাবরই একটা ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে । কাগজ কি ফুল এবং সাহাব বিবি আউর গুলাম ছবিতে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে । প্যায়াসায় কাহিনী যদিও ফ্ল্যাশব্যাকে বর্ণিত হয়নি , কিন্তু এখানেও মীনার সঙ্গে বিজয়ের অসফল সম্পর্কের ছায়া বিজয়কে তাড়া করে বেড়িয়েছে । মীনাকে বিজয় যখন দেখে তখন সে সোজাসুজি তার দিকে তাকায় না । এলিভেটরের দেওয়ালে তার অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় । আমরা দৃশ্যটিকে পরপর এভাবে সাজাতে পারি —-

১) আমরা মীনা আর বিজয়কে এলিভেটরের ক্লস্ট্রোফোবিক পরিবেশে দেখতে পাই ।

২) ক্যামেরা মীনার ডিফিউজড প্রতিচ্ছবির উপর প্যান করে , ফলে তার মুখের অবয়বটা অস্পষ্ট হয়ে আসে , অতীতে ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা প্রশস্ত হয় ।

৩)তারপর আমরা দেখি বিজয় আর মীনা একটা বেঞ্চে বসে আছে । চারদিকে একটা কার্ণিভ্যালের মতো পরিবেশ । তারপরই একটা স্বপ্নের মতো দৃশ্য । বেলুন , ধোঁয়া , একটা লম্বা সিঁড়ি , একটা অবাস্তব পরিবেশ ( গুরু দত্ত বোধহয় নিজস্ব ভাবে ট্রিবিউট দিচ্ছেন আর এক কাল্ট ছবি আওয়ারা আর তার স্রষ্টা রাজ কাপুরকে)। বিজয় আর মীনা নিজেদের প্রেমে বিভোর ( হাম আপকে আঁখোমে ইস দিলকো বসা দেঁতো ) । তারপর গানের মধ্যেই মীনা বিজয়কে ছেড়ে অদৃশ্য হয়ে যায় ।

৪) এরপর আমরা আবার বাস্তবের রুক্ষতায় সেই বেঞ্চটায় ফিরে আসি । এখন বিজয় একা , মীনা তাকে ছেড়ে চলে গেছে ।

৫) আবার আমরা এলিভেটরে ফিরে আসি । এবার এলিভেটর থামে । মীনা বলে যে সে ভুল করেছে , তার উপরে যাওয়ার কথা । বিজয়কে নিয়ে এলিভেটর নীচে নেমে যায় । এভাবে মীনার চলে যাওয়াটা স্বপ্নদৃশ্যের একটা সমান্তরাল ভাষ্য তৈরি করে এবং মীনা যে উপরে যেতে চায় , তা যেন তার সামাজিক উচ্চাকাঙ্খারই অভিব্যক্তি বলে প্রতিভাত হয় ।

এই গানের দৃশ্যটি নাকি পরে, ছবির সার্বিক ডিপ্রেসিং টোনের কথা মাথায় রেখে দর্শকদের রিলিফ দেওয়ার জন্য যোগ করা হয় । দর্শকরুচিকে সন্তুষ্ট করতেও যে মাঝে মাঝে শিল্পসম্মত দৃশ্য তৈরি হওয়া সম্ভব , এই গানটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ।

এবার ‘জানে কেয়া তুনে কহি’ গানটি নিয়ে আলোচনা করা যাক । গুলাব বিজয়কে তার খরিদ্দার মনে করে , এবং তাকে অনুসরণ করার জন্য গান গেয়ে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে । বিজয় আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে তার কবিতা কী করে গুলাবের কাছে গেলো । তদুপরি গুলাবের গানের সুর , তার লাস্য তাকে অদৃশ্য শক্তির মতো টেনে নিয়ে যেতে থাকে । গুলাব কখনও কখনও কালো ছায়ায় হারিয়ে যায় , আবার কখনও ম্লান আলোতে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় — এভাবে এক আকর্ষক রহস্যময়তা তৈরি হয় । উল্লম্ব থামগুলি যা ক্যামেরার সমান্তরাল চলনের বিপ্রতীপে স্থাপিত হয়ে এক আশ্চর্য রিদম তৈরি হয় । ( If direction is a look , montage is a heartbeat— Jean Luc Godard) । এখানে সিনেমাটোগ্রাফি এক দিবাস্বপ্নের আবেশ তৈরি করে । ছবির শেষ দিকে ট্র্যাজেডির অভিঘাত আনতে কালোছায়ার ব্যবহার বাড়ানো । বিজয়ের তথাকথিত মৃত্যবার্ষিকীর দিন ছায়ার ব্যবহার একটি শক্তিশালী , অ্যাপোক্যালিপ্টিক ইমেজ তৈরি করে । তারপর একবারে শেষে মীনার সঙ্গে যখন বিজয়ের দেখা হয় , আমরা বিজয়ের লম্বা ছায়া দেখতে পাই । অস্ফুটস্বরে প্রায় স্বগতোক্তির মতো ( যদিও মীনা সামনে দাঁড়িয়ে আছে) সে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় ।

এই গানের চিত্রকল্পের ঠিক বিপ্রতীপে আমরা দেখি আজা সাজন মোহে অঙ্গ লাগালে জনম সফল হো যায়ে গানটির চিত্রায়ণ । এখন গুলাব জানতে পেরেছে যে তার হাতে পড়া কবিতাগুলি বিজয়ের লেখা । সে বিজয়কে খুঁজে বেড়ায় । যেমন জানে কেয়া তুনে কহি গানে গুলাব বিজয়কে আকর্ষণ করে নিয়ে চলে , এখন ঘটনাটা পুরো উলটে গেছে । এখন বিজয়ের অনুসরণ করতে করতে তার মেসে এসে পৌঁছয় সে । মূলত কীর্তনাঙ্গের এই গানটিতে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কথা আছে । রাধাকৃষ্ণের এরোটিক মোটিফের ব্যবহার হিন্দি ছবিতে বহুল ব্যবহৃত হলেও এখানে তা অন্য মাত্রা পায় । গুলাব ছাতে এসে বিজয়ের ঠিক পিছনে এসে দাঁড়ায় , বিজয় কিন্তু তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে অচেতন থাকে , তারপর গানটি শেষ হয়ে যায় , গুলাব তার নিজের এবং বিজয়ের অবস্থান সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে , সে পিছন ফিরে চলে যায় , এভাবে গানের অনুপস্থিতিও গানের মতোই তাতপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে । এই গানটির বক্তব্য যথেষ্ট এরোটিক , কিন্তু আমরা আশ্চর্য হই যখন ওয়াহিদা রহমানের কথায় আমরা জানতে পারি —-

“ I couldn’t get the right expression for the scene … He said ‘ Who do you love the most in your life?’ I said ‘ My father , because he spoilt me most’ . Then he said ‘ He’s dead . Isn’t he ? I said ‘ Yes’ . ‘ Imagine your father was alive . Imagine your father is standing on the terrace . You don’t know why you’re afraid to go to him , but you are . There is a force pulling you to him . You are dying to go up to him and hug him . At that point I really started missing my father . Guru Dutt noticed my expression had changed . He said ‘ Murthy lights on . Roll the camera.” ( Guru Dutt – A Life in cinema , Nasreen Munni Kabir)

মা , পতিতা এবং স্ত্রী

———————————

আমরা যদি বিজয় , গুলাব এবং মীনার চরিত্রের পারস্পরিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে মা , স্ত্রী , পতিতা এই নারীর এই তিনটি রূপকে বারবার মিলিয়ে দিয়েছেন । আমরা দেখি মিঃ ঘোষ বিজয় এবং মীনার কথা শুনে মীনাকে পতিতা বলে ভর্তসনা করেন । আবার গুলাবকে রাস্তায় পুলিশ তাড়া করলে বিজয় গুলাবকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে বাঁচায় । বিবাহিত নারী তার স্বামীর কাছে পতিতা হয়ে যায় , আবার এক অখ্যাত কবি পতিতাকেই স্ত্রীর মর্যাদা দেয় । আবার অন্যভাবে দেখলে যে গুলাব বিজয়কে একদিন খেতে দিয়ে বাঁচিয়েছিলো , সেই বিজয়ই তার চরমতম দুর্দিনে তাকে শুধু বাঁচায় তাই না , তার প্রসুপ্ত নারীত্বকে সম্মান দেয় , যা সে আগে কোনদিন পায়নি । এইভাবে এই সমপাতনগুলির মধ্যে এমন একটি অন্তর্লীন সংযোগ রয়েছে যা ছবির ট্র্যাজেডিকে শিল্পসম্মত করেছে । মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিজয় চরম হতাশায় জীবনে প্রথমবার মদ খায় এবং বন্ধুদের সঙ্গে পতিতালয়ে যায় । পতিতালয়ের দৃশ্য বাণিজ্যিক হিন্দি ছবিতে বহুবার দেখেছি আমরা , কিন্তু এমন তীব্র তিক্ততার সাথে তার উপস্থাপনা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না । পতিতাটি নাচতে বাধ্য হয় , কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যায় পাশের ঘরে তার অসুস্থ বাচ্ছাটির দিকে । সদ্য মাতৃহারা বিজয় তার যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্মবোধ করে , তার যাবতীয় ক্ষোভ এবং যন্ত্রণা ঢেলে দেয় জিনহে নওয়াজ হ্যায় হিন্দ পর গানে এবং পর্দায় ভেসে আসে পতিতাপল্লীর বিভিন্ন টুকরো , টুকরো , দৃশ্য ।

ছবির শেষে আমরা দেখি নিঃস্ব , রিক্ত বিজয় এসে দাঁড়িয়েছে গুলাবের দরজায় । এই পরিণতিকে কোনভাবেই হ্যাপি এন্ডিং বলা যাবে না , তবুও যে সামান্য আশার আলো আমরা অনুপস্থিত পরের ছবি কাগজ কে ফুলে । সেখানে নৈরাশ্যের তিক্ততা আরও বেড়েছে ।

 

Comments (2)

  1. Anek bachhar holo film niye lekha para banai kore diyechi. Ei lekhati parar par maner atripta basana takiye railo parabati nibandher janna. Atota tagid bodhai onekdin eirakam onubhab korini ……

  2. অসাধারণ!

Leave a Reply