শাশ্বত সনাতন

প্রশস্ত হোক ধর্মপথ –

#চিন্তন

নমো নারায়ণ।

গুরুকৃপায় বিবেচনাশক্তি লাভের পর থেকে বর্তমান সময়ে সনাতন ধর্মের যে শত মতের মতবিরোধ ও তার সাথে মনবিরোধ লক্ষ্য করলাম, তাতে আমার মতো নিতান্ত ক্ষুদ্র জীবের মন, বুদ্ধি, চেতনা কেবল আহতই নয়, যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট ও জর্জরিত। এমতাবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে হয়তো শেষরক্ষা হবে বলে মনে হয়না।

চিরায়ত কাল থেকে সনাতন ধর্মে ভিন্ন ভিন্ন দর্শন, বহু বহু মত, এমনকি নাস্তিক্য বা চার্বাক দর্শন পর্যন্ত এক ছাতার তলায় বেড়ে উঠেছে, যার নাম সহনশীলতা। স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসভায় তাঁর প্রথম বক্তৃতায় একেবারে শুরুতেই তুলে ধরেছিলেন সেই সহনশীলতার ও পরধর্মসহিষ্ণুতার কথা। কিন্তু আজ সজল নয়নে দেখি, পর ধর্ম তো দূরস্ত, পরমত, পরজাতি, পরবর্ণের প্রতি পর্যন্ত আজ সনাতন ধর্মের বিশ্বাসীগণ সহিষ্ণুতা হারিয়েছেন। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে, বর্তমান যুগে সনাতন ধর্ম যেভাবে বহিঃশত্রুর আঘাতে আহত হয়েছে, তাতে পরধর্মের প্রতি সহনশীলতা আর চলেনা। কিন্তু এটা কি ভুলে যাব আমরা যে শ্বেতাশ্বেতরোপনিষদ্ বলছে “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা”? আমাদের শ্রুতিপ্রস্থ বিশ্ববাসীকে অমৃতের সন্তান ঘোষণা করেছেন এবং তাঁর জ্ঞানালোকে সমগ্র বিশ্ব আলোকিত হবার অধিকার রাখে, তা বারংবার আমাদের ধর্মগ্রন্থে ঘোষিত।

কিন্তু আমরা ভুলে গেছি যে সংঘাতটা মতের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে নয়। আর কাদেরকেই বা বলছি, যাঁরা গৃহযুদ্ধে শতভাগে বিভক্ত, তারা পরধর্মাবলম্বীকে কি আর শ্রুত্যাগমাদির শিক্ষা পৌঁছে দেবে? যে গাণপত্যের গণপতি মাতৃলজ্জারক্ষায় পরমেশ্বর মহাদেবের সম্মুখেও বুক চিতিয়ে লড়ে নিজের শিরবিসর্জন করেছেন, যে সৌরের সূর্য সদা সমদর্শী, যে বৈষ্ণব সদা বৃক্ষসম সহিষ্ণুতার শিক্ষায় শিক্ষিত, যে শৈব অদ্বৈত দর্শনে পুষ্ট আর যে শাক্তের আরাধ্যা বাকি এই চারপন্থার ইষ্টগণের সর্বদা সহায়তায় নিরত, আজ তারাই একে অপরকে নর্দমার পাঁকে পুঁতে দিতে বদ্ধপরিকর। যে সমাজ বিপ্রের মার্গদর্শন, ক্ষত্রিয়ের রক্ষণ, বৈশ্যের পালন ও শুদ্রের পরিশ্রমের বলে একদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছিল, আজ পরমপুরুষের সেই চারপুত্রের বংশধররা চার অভিমুখে। ব্যতিক্রমী মানুষ কি নেই? আছে। কিন্তু তাঁদের কণ্ঠস্বর আজকের এই বিষম কোলাহলে অস্তিত্ব হারিয়েছে। আমাদের যেই দেশে শৈব শঙ্করপন্থী সন্ন্যাসী সম্ভাষণের শুরু করেন ‘নারায়ণ’ স্মরণ করে আর রামেশ্বর তীর্থের মুখ্য অর্চকের দায়িত্বভার বহন করেন মালাতিলকে ভূষিত বৈষ্ণব, কালীঘাটের মত গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠের সেবায় নিযুক্ত পরিবারের কুলদেবতা কৃষ্ণ আর শ্রীক্ষেত্রে মহাপ্রভুর পূজারীর কুলদেবী শক্তি, সেই ধর্মের আজ এই অবস্থা।

আমি অন্য পন্থের বিশ্বাসীদের কিছু বলবো না কারণ, আমি তাঁদের দর্শনের সমস্ত খুঁটিনাটি জানিনা। নিজের পন্থারও সব জেনে উঠতে না পারলেও কয়েকটি কথা আমার সহযাত্রীদের বিনীতভাবে স্মরণ করতে অনুরোধ রাখবো, যা আমি আমার শ্রীনাথার অহৈতুকী করুণায় বুঝেছি। সেগুলি হল-

আমরা যারা কৌলপন্থী, তারা মহানির্বাণোক্ত ব্যবস্থানুসার অবধূত অভিধাপ্রাপ্ত। যদিও মহানির্বাণের অনুসার বিচারে আমরা হয়তো কতিপয় ব্যতিরেকে সকলেই পরিব্রাট। কিন্তু তাও তো আমরা অবধূতেরই শ্রেণী। আমাদের সংজ্ঞাতেই বলা হয়েছে-

যো বিলঙ্ঘ্যাশ্রমান্ বর্ণানাত্মন্যেব স্থিতঃ পুমান্।

অতিবর্ণাশ্রমী যোগী অবধূত সঃ উচ্যতে॥— অর্থাৎ, যে ব্যক্তি চতুরাশ্রম ও বর্ণাশ্রম অতিক্রম করে পরমাত্মায় স্থিত, সেই অতিবর্ণাশ্রমীই অবধূত।

এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আমাদের কাজ সমদৃষ্টিশালী হয়ে সমাজের অভিভাবকত্ব করা। শাক্তের শাক্ত, শৈবের শৈব, বৈষ্ণবের বৈষ্ণব, সৌরের সৌর, গাণপত্যই গাণপত্যের গুরু, কিন্তু কৌল হলেন সকলের গুরু। আর এতে নিশ্চয়ই আমাদের সন্দেহ নেই যে শুধু মন্ত্রদাতারই কাজ গুরুকর্ম করা নয়। সৎসাধকমাত্রেই সমাজের অভিভাবক, মার্গদর্শক; অতএব গুরু। আর তার সাথে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজ ও পরসম্প্রদায়ের গুরুগণের প্রতি সম্মান দেওয়া আমাদের একান্ত দরকার এবং পরমতকে প্রমাণসম্বলিতভাবে খণ্ডন করলেও নিন্দা যেন করে ফেলা না হয়, কারণ অচ্যুতাবতার কুলাবধূতপ্রবর পরশুরাম তৎপ্রণীত কল্পসূত্রে কৌলগণকে সর্বদর্শনানিন্দার আদেশ করেছেন। তাই, সবাইকে মান দিয়ে আমাদের মানী হবার প্রমাণ দেওয়াই আমাদের সবসময়ের আদর্শ। এখন সময় এসেছে নিজেদের কর্তব্য অনুধাবন করে নিজের সম্মান রক্ষা করে সনাতন ধর্মকে শক্তিশালী করার। যদিও আমি কৌলদের এই কটা কথা বললাম, কিন্তু এটা আশা রাখি, সব দর্শনের সাধকদেরই স্মরণ করা একান্ত কর্তব্য, তা তাঁরাও একমত হবেন।

ওঁ সহনা ভবতু সহনৌভূনক্তু সহবীর্যং করবাবহৈ তেজস্বীনা বধীতমস্তু মা বিদ্বিষা বহৈঃ – ওঁম শান্তি শান্তি শান্তি

(ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন, আমরা সকলে সুখ ভোগ করব, একে অপরের লাভ হেতু প্রয়াস করব,

আমাদের সমগ্র জীবন তেজ দ্বারা পূর্ণ হউক, পরস্পরের প্রতি কোন দ্বেষ অথবা ঈর্ষা না থাকে।)

 

Leave a Reply