আঙিনাশাশ্বত সনাতনসংস্কৃতি

একটি ধানের শীষের উপরে – ৪

(আগের পর্বের লিঙ্ক)

বাংলার আর সমস্ত সংক্রান্তির মধ্যে পৌষসংক্রান্তি আমাদের সবার জীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে সে বিষয়ে আসার আগে কার্ত্তিক সংক্রান্তির রেশ খানিক শুনিয়ে রাখি। নিয়ম অনিয়মের হরেক রকমফের নিয়েই তো জীবন যাপন আমাদের সবার। সে নিয়ম কারুর কাছে আপন গৃহস্থালির মঙ্গলকামনা তো অন্যের কাছে খামোখাই সময় অপচয়- বেশ টানাপোড়েন এ বিষয় নিয়ে!!  !! কিন্তু থেমে কিছুই থাকেনা, আর এই আচারবিচারে কার্ত্তিক সংক্রান্তিতে আরও একটা সংস্কার গ্রামের প্রায় সব ঘরেই পালিত হয় “ইতুপূজো” বা “ইতুর ব্রত”! সকাল সকাল স্নান সেরে ছোট মাটির সরায় (মাটির গোলাকার পাত্র) মাটি ভরে তাতে ধান-দূর্বাসমেত আরও নানান কলাইয়ের বীজ ছড়িয়ে সিঁদুরে রাঙানো স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে, গৃহবধূরা পাঠ করেন ইতুর ব্রতকথা-
” অষ্টচাল অষ্টদূর্বা কলসপাত্রে থুয়ে-
শোনরে ইতুর কথা এক মনপ্রাণ হয়ে!
ইতু দেন বর
ধনধান্য পূত্রে বাড়ুক তোদের ঘর!”

এ ব্রতের কথায় আদ্যিকালে উমনি-ঝুমনি নামের দুই গরীব ব্রাক্ষ্মণের মেয়েরা অন্নসংস্থানের জন্য সূর্যদেবকে স্বাক্ষী রেখে ব্রতের প্রচলন করেন। সেইথেকে লোকবিশ্বাসে এখনও কূলবধূগণ এ আচারে আবদ্ধ। সারামাস তাতে ফুল-জলবাতাসা আর ধূপ দেখিয়ে একাগ্রমনে পূজা করেন অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে। সেই ইতুকে চালগুঁড়ির সুস্বাদু পিঠে বানিয়ে, মন্ডা-মিঠাই , ফলমিষ্টি দিয়ে থুয়ে তারপরে সংসারের মঙ্গলকামী হয়ে বিসর্জন দেন নিকটের প্রবাহিত জলাশয়ে। মূলত “ইতু” কথাটি এসেছে সূর্য়ের অপরনাম ‘আদিত্য’ থেকে। অন্য অর্থে “ইতু” শব্দ “মিত্র” থেকে, মিত্র অর্থে সূর্যদেবকে বোঝায়,। অর্থাৎ ইতুপুজোর মাধ্যমে আসলেই সূর্যের উপাসনা। যার কিরণ ব্যতীত আমাদের জীবনযাত্রা ব্যর্থ, প্রকৃতিগতভাবে তাকে মান্যতা দিতে উপাসনা করাই এক অর্থে সমীচীন।

তবে পূজাই শুধু সবটা জুড়ে বললে খুব ভুল হবে, আরে মশাই বাঙালীর এই চালের গুঁড়ির পিঠে নিয়ে কি কম উন্মাদনা! 😁 সেও এক লম্বা চওড়া পদ্ধতি। চাল সারারাত ভিজিয়ে, ঢেঁকি মায় কম পরিমাণে শিলনোড়াতে গুঁড়িয়ে সেই গুঁড়ি চোখ ধাঁধানো রোদে পাঁচদশদিন শুকিয়ে এবার শুরু হয় তা দিয়ে রকমারী স্বাদের সরুচাকলি-গোলাকার আসকেপিঠে-রসবড়া-গুড়মিশিয়ে ডুবোতেলে ভাজা পিঠে। আর কতই না তার পদ্ধতি। সরুচাকলির জন্য ভেজানো চাল বেটে সাথে বিউলির ডালবাটার মিশ্রণ এবং স্বাদ মতো নুন দিয়ে পরিমাণে বেশী জল দিয়ে ভালোকরে ফেটিয়ে কম আঁচে লোহার সমতল কড়াইতে বেগুনের ডাঁটির সাহায্যে অল্প সরষের তেল দিয়ে, রুটির মতো বড়ো গোলাকৃতি সমান আকারে জলেগোলা চাল আর বিউলির ডালবাটা ঢেলে দিয়ে এপিঠ ভাজো, ওপিঠ ভাজো- হতে থাকল সাদাসাদা, পাতলা ফিনফিনে অপূর্ব স্বাদের সরুচাকলি।

আবার সেখানে আসকেপিঠের উপকরণ ঢেঁকিছাঁটা চালগুঁড়িতে পরিমাণমতো নুন, ইষদূষ্ণজল কমকরে দিয়ে বেশি ঘনত্বে মাটির গোলাকার সরায় তারাজ্বালে (মাটির উনুনে বেশীআঁচে) ভাপিয়ে নিয়ে তৈরী হয় আসকেপিঠে। আবার চালগুঁড়িতে গুড় আর অল্প জল মিশিয়ে ডুবোতেলে ভাজা হয় “গুড়পিঠে” ।

এমন অনন্য স্বাদ খুব কম খাবারেই মেলে বোধকরি। এমনিভাবেই গ্রাম বাংলা সপ্তায় সপ্তায় নানান লোকাচারে মেতে ওঠে, সংসারকে ভালোবেসে, গৃহস্থীর কল্যাণে, বাড়ির প্রতিটা জনের ভালোথাকার নিমিত্তে। ভালো থাকুক ভরাসংসার নিয়ে প্রতিটা মানুষ। এবার যে শীতের হিমেল চাদর গায়ে পৌষ রয় দোরগোড়ায়। এমন সময় কৃষিনির্ভর গ্রামে নতুন চাল বা নবান্নের নানা ভাবে উৎসব ঘরোয়াভাবে বিশেষত চাষীবাসীরা করেই থাকেন। কেননা চাল বা অন্নই হলো সবার প্রথম খাদ্য। তাকে কদর না করলে সেকি এমনি রয়! অন্ন তো দেবীলক্ষ্মীও, তাই সারা অগ্রহায়ণ আর পৌষমাস জুড়ে ঘরে ঘরে সাধ্যমতো পালিত হয় নবান্ন আর ধান্যলক্ষ্মীর পূজা, নতুন ধানের শীষ সাথে ফুল-মিষ্টি জলবাতাসাসমেত , তিলের খাজা সাথে শীতের অন্যতম আকর্ষণ খেঁজুরের গুড়ের মুড়কি দিয়ে চলে গৃহের সমৃদ্ধির একাগ্রচিত্তে আরাধনা।

তবে একবার ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের পিঠেপুলির আস্বাদে ফিরে গিয়ে চুপিচুপি বলে রাখি জিভকে এখানেই ক্ষান্ত দেওয়া হয় না যে, সেই চালগুঁড়ি কি এতই কম কিছু কথা নাকি! সেযে একটা আখ্যান সমান, কারণ সামনেই যে মকরক্রান্তি দরজা ধাক্কাচ্ছে! পরের পর্বে আসবো সেই পিঠেপুলি নিয়েই।

Leave a Reply