সাদাকালো রঙমাখা

‘ভারতবর্ষের সঙ্গীতঃ তত্ত্বে ও অনুভবে’ – একটি সরল নিরীক্ষণ – ১

– বিশাখদত্ত 

 

সঙ্গীতের গোমুখ খুঁজতে খুব দূরে যেতে হয় না আমাদের। দৃশ্যমান প্রকৃতির সমস্তে কি যেন অদৃশ্য, অনির্ণেয় সুর তরঙ্গ নিত্য-নিয়ত বাহিত হচ্ছে। তাতে কান পাততে হয়। অন্তরে চোখ মেলতে হয়। অনাহত শব্দ, সেই শাশ্বত নাদ-ব্রহ্ম কত না রূপে ব্যাহৃত হচ্ছে, ব্যাপৃত হচ্ছে লোকে লোকান্তরে, বিচ্ছুরিত হচ্ছে আলোর মতন প্রাণে প্রাণে।

এই তপ্ত বৈশাখের দুপুরে জানালার ধরে বসে নিমের পাতায় ঝিরিঝিরি হাওয়ার দোল দেখি আমি। অনতিদূরে আমের শাখায় এক নিঃসঙ্গ হাঁড়িচাচার উচ্ছসিত কি বা বেদনাহত, না জানা অনুভূতির লয়ে পুচ্ছ নাচিয়ে নিরন্তর ডেকে চলা শুনি। ঘরময় আমার পাঁচটি অ-বোলা মার্জার দাপাদাপি করে বেড়ায়। এই অ-বোলা প্রাণের মুখেও কখনো দেখি নিয়মবিরুদ্ধ স্বরের আনাগোনা। এরাও যেন এমন কিছু বলতে চায় যা তার নিত্যদিনে বলার বুলিতে আসে না। ওরা কি গাইতে জানে? মানবেতর হৃদয়ে কি গীত জাগে? আমার জানা নেই।

নদীর ঘটে জোয়ারের ঢেউ ভাঙে, ছলাৎছলাৎ ছন্দ লহর। হুহু বায়ুস্বনে অজানিত রাগ-মালা। ভাটার টান জাগে। কি যেন এক মহাবৈশ্বিক তালের অতি বিলম্বিত ঠেকার মতন ঘুরে ঘুরে সম’ এ ফেরার তাগিদে নদী সাগরে যায় নির্দিষ্ট ক্ষণে আবার ফেরে পূর্বপথে।

চরাচর ছন্দময়, সুরের লালিত্যে টইটম্বুর। বলতে পারেন ভাবুক হৃদয় ভাবের ঘোরে যা বোঝে তা আবার জড়-জাগতিক পরীক্ষাগারে সর্বথা গ্রহণযোগ্য হবে না। কাব্যিক ভাবরাজ্য নিয়েৎশের বাণীর মতন যেন – ‘There are no facts, only interpretations’! তবে যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি তা কেবল জড়-বিশ্লিষ্ট হবার তত্ত্ব দিয়ে মাপা যায় না। ভাব-বিমুক্ত সঙ্গীত হয় কি? যে কোন কলার ক্ষেত্রেই ভাবাশ্রয়ের প্রসঙ্গ প্রযোজ্য। এবং সেই ভাবতত্ত্বও বস্তুজাগতিক ব্যাখ্যার একেবারে বাইরের কিছু আবার নয়। যেটি ভাবুকের ভাব বা আবেগ, সেটিকে হয়ত আপনি মনোবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে টানতে চাইছেন। বিষয়টিকে ভাবপ্রবণতায় ব্যাখ্যা করুন বা মনোজৈবিক রসায়নে, এটি কোন অর্থেই আপামর জনসাধারণের জন্য সহজবোধ্য হয়ে ওঠে না তা গোড়ায় স্বীকার্য্য; interpretations যেমনই হোক। যেটিকে ভাবুক অতীন্দ্রিয়তায় সম্ভাব্য ভাবে, সেটিকে আপনি ইন্দ্রিয়গোচর বোধে ব্যবচ্ছেদ করতে হয়তো চান। যে সুর, যে নাদ, যে রাগরাগিণীর সঞ্চরণ, যে তত্ত্ব সাধক ইন্দ্রিয়দ্বার রুদ্ধ করে অন্তর্লোকে পেয়েছেন বলেন, সেটিকে নিছক ভাবালুতা বলে উড়িয়ে দিতে চাইলে ভারতীয় সঙ্গীতের প্রথম সোপানেই আপনি হোঁচট খেয়ে যাবেন! ভারতবর্ষে সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতায় উত্তীর্ণ হবার পথ মাত্র নয়, সঙ্গীত সাধকের কাছে এটি নিজেই অধি-আত্মিক। সেই প্রসঙ্গও এই প্রবন্ধ আলোচনায় পরবর্তীতে যথাস্থানে বিধৃত হবে। আপাতত প্রকৃতি ও তার স্রোত হতে সঙ্গীতের প্রাগভাব নিরূপণের দু’টো কথায় থাকি।

পাখির কলতান, পাখায়-পুচ্ছে স্পন্দন বা ধরুন সন্ধ্যা নামলে গ্রাম্য নিবিড়তা ছেদ করে জেগে ওঠা শৃগালমন্ডলীর কলরব; প্রাণীকুলের কত কথা, কত ভাষা। হয়তো প্রাণীদের এইসব রবে সঙ্গীত নেই। প্রাণীদের মুখের ভাষা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভাষা (gesture) পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমসূত্র। যে হাঁড়িচাচাটি লেজ নাড়ছে, কবিচিত্তে যেটি খুবই সাঙ্গীতিক মনে হচ্ছে, হতে পারে এটি নিছকই তার প্রজাতিগত ভাষা-বৈচিত্র্য, যা দিয়ে সে হয়ত কোন সঙ্গী/সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করার প্রয়াসে মগ্ন। প্রাণিকূলে এমনটিই দেখি আমরা। ঘটনার বাস্তবতা যাই হোক – মানুষের কাছে এই সকল দৃশ্য কাব্যিক প্রেরণা হিসেবে ধরা দিয়েছে যুগেযুগে -‘পাখির কণ্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ’। মানুষ তার কল্পনায় রাঙিয়েছে তার জগতকে। তার অভিব্যক্তি, তার ভাষা সেই কল্পনাকে রূপায়িত করেছে কবিতায়, গীতে, নৃত্যে। অন্য প্রাণীতে ভাষা যেখানে তাদের inbuilt instinct (সহজাত বৃত্তি) এর বৃত্তবন্দী, ভাষা কেবল একে অপরকে সংকেত দেবার জন্য যেখানে রয়েছে: সেখানে মানুষ-প্রজাতি প্রবলতম ব্যতিক্রম। পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা মানুষ কোন একটা ভাষাপ্রণালীতে প্রাকৃতিকভাবে বদ্ধ নয়। যেমন ধরুন কাকেরা কলকাতায় যেভাবে ডাকে, চেন্নাইতেও তেমনি ডাকে। অথচ মানুষ কলকাতায় যে ভাষায় কথা বলে, চেন্নাইতে তা তো বলে না। মানুষের কোন প্রজাতিগত সুনির্দিষ্ট ভাষা নেই। মানুষ প্রকৃতিকে ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তো বটেই। মানুষেরা সেই ক্ষমতাবলে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক বাতাবরণে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা গড়েছে।  ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক প্রকৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি হয়েছে। মানুষের প্রাকৃতিক অভিযোজনের পাশাপাশি সাংষ্কৃতিক অভিযোজনের শক্তিও আছে। তারা ভিন্ন পরিবেশে কেবল শরীরবৃত্তীয় অভিযোজনে মানিয়ে নেয় না, তারা রপ্ত করতে পারে অপর মানুষের অজ্ঞাত ভাষাটি, চর্চা করতে পারে অপরের সংস্কৃতিটিও। প্রাকৃতিক বিবর্তনের এই সর্বগ্রাসী মহাতরঙ্গে মানুষ প্রকৃতিকে নিজের কব্জায় আনার সাধনায় ব্যস্ত থেকেছে শুরু থেকেই। মানুষ হয়েছে অপ্রিতরোধ্য, মানুষ বুদ্ধিরিন্দ্রিয় বলে অজেয়।

ভাষার কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে আদ্যন্ত সংস্কৃতি ব্যাপারটি গোড়া থেকেই ভাষা কেন্দ্রিক, সঙ্গীত তো তার বাইরের কিছু নয়। সংস্কৃতি হয়েছে ভাষাকে ভিত্তি করে। মানুষের ভাষা তার প্রয়োজনের চাইতেও বেশী বড়। ঠিক এখানে সংস্কৃতির স্রোতমুখ। পাখি হয়তো আরেকটি পাখিকে সুনির্দিষ্ট একটি সংকেত দেওয়ার জন্য ডাকতে জানে।  পাখিরা কি পারে ভদ্দুপুরে চাট্টে ভাত খেয়ে কয়েকজন মিলে খোশগল্প করতে? মানুষ পারে। মানুষ সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়াও তার ভাষাকে অফুরান সময় ধরে বলে যেতে পারে। মানুষ তার কল্পনাকে ভাসাতে পারে তার ভাষায়। কল্পনা যেখানে ভাষা পায় সেখানেই তো শিল্পের জন্ম। যারা কল্পনাকে ভাষা দিতে জানেন, অবয়ব দিতে পারেন আমরা তাদেরই শিল্পী বলি। সকলেই শিল্পী নয়। আমি জানিনা অন্যান্য প্রাণীরা উদাস মনে কিছু কল্পনা করতে পারে কি না, তারা স্বপ্ন দেখে কি না, তাদের কল্পনা প্রকাশের ভাষা আছে কি না। তবে রাগে দুঃখে ক্ষোভে বিষাদে আনন্দে আর্তিতে তাদেরও আলাদা আলাদা বুলির ধরণ হয়, চোখের চাওয়া বদলে যায় – এতো নিত্যদিনের দেখা। মানুষ তার এইসব প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপকে বর্তমান-কাল ছাড়িয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের কল্পরাজ্যে ভাবায়, তাকে ভাষা দেয়, তার অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে নানারকম। সেই অভিব্যক্তির একটি ধারা সঙ্গীত। এখানে সূচনা মাত্র।    

 

(লেখক পরিচিতি – মার্গসঙ্গীত শিক্ষার্থী। বাংলা ভক্তিগীতি, বিশেষত শাক্তপদাবলী ও শাক্তধারার সঙ্গীত নিয়ে মননশীল মানুষ। সাহিত্য ও দর্শন অনুরাগী।)

(পরবর্তী সংখ্যা)

Leave a Reply