বিপন্নতার মানব মুখরাজনীতি

শিক্ষক যখন ক্রোধের বলি

-শ্রী বিনয় দত্ত 

 

গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর কথা মনে আছে? যাকে ২০০১ সালের ১ নভেম্বর চট্টগ্রামের জামাল খান রোডে নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন, চট্টগ্রামের নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ। আসামিদের মধ্যে আটজন ছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য এবং অন্য তিনজন ছিলেন একই কলেজের অধ্যাপক। সবার বিচার প্রক্রিয়া কিন্তু এখনো সম্পন্ন হয়নি।

নারায়ণগঞ্জের স্কুল শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের কথা মনে আছে? ২০১৬ সালের মে মাসে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এনে তাকে কান ধরে উঠবস করানো হয়েছিল। সেলিম ওসমান সেই ঘৃণ্য কাজ করলেও তার কোনো বিচার হয়নি বা কোনো শাস্তিও হয়নি। গোটা দেশের অসংখ্য সুবোধ সম্পন্ন মানুষ শ্যামল কান্তি ভক্তের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, কানে ধরে ওঠবস করার ভিডিও-ছবি পোস্ট করেছিলেন। শামীম ওসমান নিজে আর ক্ষমা চাইনি। নারায়ণগঞ্জের পি আর সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে আনা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগও কিন্তু প্রমাণিত হয়নি। শামীম ওসমান কেমন আছে তা সবাই জানেন।

হুমায়ুন আজাদ। বাংলাদেশের অন্যতম প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক। তার বিরুদ্ধেও কিন্তু উগ্রবাদী মোল্লারা মিছিল করেছিল। ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ (২০০৪) লেখার জন্য তাকে ২০০৪ সালে জনসম্মুখে চাপাতি দিয়ে কোপানো হলো।

আহমদ শরীফ। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা দার্শনিক, শিক্ষক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও উগ্রবাদী মোল্লারা রাজপথে নেমেছিল। আকিমুন রহমান। বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও শিক্ষক। ‘বিবি থেকে বেগম’ লেখার জন্য তার বিরুদ্ধেও উগ্রবাদী মোল্লারা রাজপথে মিছিল করেছিল। কারণ তারা সত্য বলেছেন। সত্য রোদের মতো উজ্জ্বল। সেই সত্য উগ্রবাদীদের পছন্দ হয়নি। পছন্দ না হলেই তারা মিছিল করে। বিক্ষোভ করে। হত্যার হুমকি দেয়। সর্বশেষ হত্যা করে। আর রাষ্ট্র তা দেখে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কী পরিমাণ শিক্ষকদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তার হিসাব কি আছে? নেই। কেন নেই? কারণ কোনো সরকারই তা চায় না। ক্ষমতায় যে সরকারই আসে তারা সবসময় নেগোসিয়েশন চায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, গত বিশ বছরে যে পরিমাণ শিক্ষক লাঞ্ছনা, নির্যাতন, হত্যার ঘটনা ঘটেছে তা অন্য সময় এতটা ঘটেনি। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, কোনো না কোনোভাবে ‘ধর্মীয় অবমাননা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ শব্দগুলো জুড়ে দিতে পারলেই শেষ। এই কাজ গত ২০ বছরে সবচেয়ে বেশি হয়েছে।

কর্মস্থল থেকে প্রশাসন সবাই তখন হাত ছেড়ে দেয়। ঘটনা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করে না। শ্যামল কান্তি ভক্ত থেকে শুরু করে স্বপন কুমার বিশ্বাস সব জায়গায় একই স্ক্রিপ্ট। আহমদ শরীফ থেকে আকিমুন রহমান কারো ক্ষেত্রে সরকার কখনো ঘটনার গভীরে যায়নি। উপরিতল দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই জন্যই উগ্রবাদীরা সাহস পেয়েছে।

শ্যামল কান্তি ভক্ত, হৃদয় মণ্ডল, আমোদিনী পাল প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ‘ধর্মীয় অবমাননা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হানার বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। স্বপন কুমার বিশ্বাস ক্ষেত্রেও মিথ্যা প্রমাণিত হবে নিশ্চিত। কারণ তিনি তো ‘ধর্মীয় অবমাননা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার বিষয়ে কিছুই বলেননি। তার ছাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছে। সেই স্ট্যাটাস ডিলিট করাকে কেন্দ্র করে স্বপন কুমার বিশ্বাস যখন পুলিশকে ফোন দেন তখনই মুসলমান ছাত্ররা ‘অধ্যক্ষ ওই ছাত্রের পক্ষ নিয়েছেন’বলে রটনা প্রচার করে দেয়। পরবর্তীতে পুলিশ আসে। পুলিশের উপস্থিতিতে স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালার পরিয়ে তাকে ক্ষমা চাওয়ানো হয়।

প্রশ্ন হলো, এত বড় একটা ঘটনা কেউই বিষয়টা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব নিলেন না কেন? মিথ্যা জেনেও পুলিশ কেন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করল? পুলিশ কেন ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার আগে শিক্ষককে লাঞ্ছিত হতে দিল? তবে কি আমরা ধরে নেব, দেশে সর্বত্র উগ্রতা ছড়িয়ে গিয়েছে? ধরে নেব, সরকার যেমন চাইছে তেমনই হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ৪ নভেম্বর ২০১৮ হেফাজতের সাথে বৈঠক করল। এই এক বৈঠক উগ্রবাদীদের সাহস অসীম করেছে। যে হেফাজত মূলত ধর্মভিত্তিক দল ছিল তাদের যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথে বৈঠকে দেখা যায় তখন উগ্রবাদীরা আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে না। তারা গোটা দেশ দখলে নেমে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখায়। তখনো কিন্তু দেশের মন্ত্রী-আমলারা প্রতিবাদ করেনি। নিশ্চুপই ছিল।

গোটা দেশে সাংস্কৃতিক সমাবেশ, পথনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখবেন না অথচ ওয়াজ মাহফিলের সমাবেশ দেখবেন সর্বত্র। এতে করে উগ্রবাদীরা সাহস পাই। তারা ধরে নেয় সরকার তাদের পক্ষেই আছে।

যে দেশে রসরাজ, উত্তম বড়ুয়া, বিপ্লব চন্দ্র শুভ, ঝুমন দাশদের নিরাপদে জেলে পচে মরতে হয় সেই দেশে উগ্রবাদীরা ধরেই নিবে সরকার তাদের পক্ষে। সেই দেশে শিক্ষকদের বিজ্ঞান পড়ানোর জন্য জেলে যেতে হবে। অথবা শিক্ষকদের বাড়িঘর পাশের বাড়ির লোক দখলে নেবে।

অরুণ কুমার বসাক। পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে বাংলাদেশের একমাত্র ইমেরিটাস অধ্যাপক। ১৮ বছর ধরে তার জমি দখল করে আছে ফেরদৌস নামের একজন দখলদার। অধ্যাপক বসাক গত ১৮ বছরে অসংখ্যবার এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তার জমি তিনি দখলমুক্ত করতে পারেননি।

যে দেশে হেফাজতের নির্দেশে ২০১৭ সালে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তিত হয়ে যায় সেই দেশে উগ্রবাদীরা ধরেই নেয় সরকার তাদের পক্ষে। এই দেশে ধর্মান্ধতার করাতকলে বহু আগে বলি হয়েছে সংস্কৃতি। এখন বলি হচ্ছে শিক্ষা। আর সরকার নিশ্চুপে দেখছে। শিক্ষকেরা এখন বিজ্ঞান পড়াতে ভয় পান। বিজ্ঞান যে বিবর্তনের কথা বলে সেই বিবর্তন পড়াতে গেলেই ধর্মান্ধ জাতি না বুঝে অনুভূতি প্রবণ হয়ে পড়ে। শুধু বিজ্ঞান কেন দেশের সব শিক্ষকই এখন ক্লাসে পড়াতে ভয় পান। কখন তাদের কোন কথা রেকর্ড করা হয়, কখন তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটকা পড়েন, কখন তারা নিজেদের ছাত্র দ্বারা লাঞ্ছনার শিকার হন, নির্যাতনের শিকার হন এমনকি শিক্ষার্থীর হাতে মারা যান। এমন ঘটনাও দেশে ঘটেছে।

সাভারের হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার (৩৫)। ২৫ জুন ২০২২। মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলছিল। সেই সময় প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলেরা খেলা দেখছিল। উৎপল কুমার সরকার মাঠেই উপস্থিত ছিলেন। দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী স্ট্যাম্প নিয়ে উৎপল কুমার সরকারকে মারধোর করে। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে ২৭ জুন তিনি মারা যান।

প্রশ্ন হলো, উৎপল কুমার সরকারকে যখন স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করা হচ্ছিল তখন মাঠে অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ছিলেন। তারা কেন নিশ্চুপ দেখছিলেন? তারা কেন উৎপল কুমার সরকারকে বাঁচাননি? কেন তারা এই ধরনের জঘণ্য ঘটনা ঘটতে দিলেন? তার মানে হচ্ছে, মানুষ অনেক বেশি মাত্রায় হিংসাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ, শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক সবাই বলছেন, উৎপল কুমার সরকার ভালো মানুষ ছিলেন।

হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান বলেছেন, উৎপল কুমার সরকার শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হওয়ায় তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আচরণগত সমস্যা নিয়ে কাউন্সিলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নিতেন। (২৭ জুন ২০২২, প্রথম আলো) তার মানে হলো, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শেখানো বা আচরণগত পরিবর্তন আনা অপরাধ? যার কারণে উৎপল কুমার সরকারকে জীবন দিতে হলো। কেন এমন হলো, কারণ এর আগে কোথাও শিক্ষকদের পক্ষে কোনো কাজ হয়নি।

যখন হৃদয় মণ্ডলকে অন্যায়ভাবে হেনস্তা করা হলো, তখনও সরকার নীরব ছিল। তারা কোনো ব্যবস্থা নেইনি। বরং তাকে জেলে যেতে হয়েছে এবং ১৯ দিন পর তিনি কারামুক্ত হয়েছেন। আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে যখন মিথ্যা অভিযোগ করা হলো, গণমাধ্যম সাথে সাথে সেই মিথ্যা অভিযোগ লুফে নিল। সরকার তখনো নিশ্চুপ ছিল। শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্র বিষয়গুলো সহজে সমাধান না করে চুপ করে বসে ছিল। যদি ধর্মান্ধ উগ্রবাদীরা ক্ষেপে যায়? এই ভয়। এতে যে কাল হয়েছে তা এখন বুঝতে পারছে সবাই। সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, খেলাধুলা, মনন, সভ্যতা সব জায়গায় এখন মূল বিষয় বাদ দিয়ে ধর্ম প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত্রতত্র ধর্মের ব্যবহারে একদিকে যেমন ধর্ম ব্যবসায়ী বেড়েছে তেমনি বাকি সবকিছু গৌণ হয়ে গিয়েছে। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন তার শিক্ষককে দেখেন তখনই পা ধরে সালাম করেন, সম্মান জানান। সেই শিক্ষা এখনকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেই। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এখন রাজনীতি, ধর্মের বলি হচ্ছে। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থে। এই স্বার্থ, এই উগ্রতা, এই বোধশূন্য মানসিকতা রাক্ষসের মতো সব গিলে খাচ্ছে আর আমরা যথারীতি দেখছি।

 

লেখক পরিচিতি:

শ্রী বিনয় দত্ত। মুক্তমনা কথাসাহিত্যিক এবং প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক।
জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। বাবা শ্রী অনিমেষ চন্দ্র দত্ত ও মা শ্রীমতী মিনু দাশ।
ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে তার অবস্থান সদৃঢ়।
লেখালেখির শুরু ছেলেবেলাতেই। ২০০৫ সাল থেকে লেখক হিসেবে নিজেকে তৈরি করার লক্ষ্যে সক্রিয় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, চিত্রনাট্য, মুক্তগদ্য লেখেন। এছাড়া সামাজিক সংকট ও সমস্যা নিয়ে জাতীয় দৈনিক, অনলাইন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লেখালেখি করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিয়মিত গবেষণায় যুক্ত আছেন। মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র বিষয়ে দেশের স্বীকৃত জার্নালে তার একাধিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
গল্পগ্রন্থ: ‘চিলতে মেঘ ও কুহুকেকার গল্প’, [চৈতন্য, ২০১৭]
উপন্যাস: ‘অমৃতায়ন’, [পুথিনিলয়, ২০১৮]
সমকালীন কথনমালা: ‘এই শহর সুবোধদের’, [পুথিনিলয়, ২০১৯]
সমকালীন কথনমালা: ‘আরোপিত এই নগরে’, [পুথিনিলয়, ২০২০]
সমকালীন কথনমালা: ‘অর্বাচীনের আহ্নিক’, [পুথিনিলয়, ২০২২]

স্বীকৃতি: ‘আবুল মনসুর আহমদ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা পুরস্কার ২০২০’-এ প্রথম স্থান অর্জন।

Contact: [email protected]

Leave a Reply