সাদাকালো রঙমাখা

‘ভারতবর্ষের সঙ্গীতঃ তত্ত্বে ও অনুভবে’ – একটি সরল নিরীক্ষণ – ৩

(পূর্বের সংখ্যার পর)

– বিশাখদত্ত

 

বৈদিক যুগের সঙ্গীতকেই বলি মুখ্যত ‘সামগান’। সামগানের সমকালে আরও দু’ধারার সঙ্গীতের চল ছিল। তারা যথাক্রমে ‘গ্রামেগেয়গান’ ও ‘অরণ্যগেয়গান’। তখনকার সময়ের লোকসঙ্গীতই হল গ্রামেগেয়গান আর অরণ্যগেয়গান উদ্ভূত হয়েছিল বেদের আরণ্যক অংশ থেকে। তিনটি ধারাই বৈদিক কালের ও তাদের স্বতন্ত্র ব্যকরণ প্রকরণও ছিল। সামগানকারী ব্রাহ্মণদের ‘সামগ’ বলা হত। সামগানের ঋত্বিককে বলা হত ‘উদগাতা’। সাধারণত যাগযজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্য করে যজ্ঞাঙ্গ হিসেবে অপরিহার্য্য রূপে সামগানের রেওয়াজ ছিল। ‘স্তোত্রিয়’ বলা হত এই সকল সামগীতকে। তবে যজ্ঞাদি কর্ম ছাড়াও যে সামগান হত তেমন নিদর্শনও আছে। সামগানের পৃথক পৃথক শাখা-প্রশাখা ছিল, ছিল নানান রীতির সাম, ছিল অসংখ্য গায়নশৈলী। আজকের দিনে যেমন আমরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগরাগিণীর ক্ষেত্রে ঘরানা বিচারে ভিন্ন ভিন্ন উপস্থাপন প্রণালী দেখি- এও তেমনই ছিল, ছিল আরও বিরাট পরিসরে ও আরও বেশী ধারায় বিভাজিত হয়ে। সাম শুধু গীত হত তা নয়, সাম আবৃত্তির মত ছন্দবদ্ধ আকারে পাঠও হত।

আদিতে আমাদের সঙ্গীতে ক’টি স্বরের প্রচলন ছিল এ নিয়ে কথা হোক অল্প করে। বৈদিক সূক্তসমূহে প্রযুক্ত উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত স্বরের চিহ্নকে তিনটি স্বর হিসেবে ধরে নিই আমরা অনেকেই। আমরা বলি বৈদিক কালে এই তিন স্বরের প্রচলন ছিল ও সঙ্গীতের ক্রমবিকাশের ধারায় আমরা আজ তিন স্বরের গণ্ডি ভেঙে সাত স্বরে আসতে পেরেছি। এই ধারণার যথার্থতা নিয়ে দ্বিধা আছে। উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত তিনটি চিহ্নের প্রয়োগ তিনটি স্বরস্থান নির্দেশক, এবং একই সাথে তারা তিন গ্রামও (তার, মন্দ্র ও মধ্যম)। এই তিন স্বরস্থান দেখিয়ে বৈদিক মন্ত্রপাঠ আজও শোনা যায়। কোথাও আবার পাঁচ স্বরস্থানের উল্লেখ আছে। উপরিল্লিখত তিনটি ছাড়াও ‘প্রচিত’ ও ‘নিঘাত’ নামে আরও দুটি স্বরস্থান রয়েছে। তবে সামগানে সাত স্বর ব্যবহৃত হত বলেই ঐতিহাসিক অভিমত। আজকের ষড়জ-ঋষভ-গান্ধারাদি নাম ছিল না তাদের। সামগানের সাতস্বর যথাক্রমে- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, মন্দ্র, ক্রুষ্ঠ, অতিস্বার্য। স্বর সমূহের চলাচল ও প্রকৃতি কেমন ছিল এই নিয়ে সুবিস্তৃত আলোচনা হয়েছে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসবিদদের লেখায়। সেই গান কিভাবে গাওয়া হত তার একটা চিত্রপট ইতিহাসের নানান উপাত্ত দিয়ে বানিয়ে নিতে পারলেও বা সেই ইতিহাসের নানাবিধ প্রামাণ্যতা নিয়ে চুলচেরা যৌক্তিক বিশ্লেষণ দাঁড় করালেও, আমাদের বোধের জগতকে তা তৃপ্তি দিতে পারে না। কেন না সঙ্গীত কথা দিয়ে প্রকাশ করার জিনিস নয়। সঙ্গীত সুরের জিনিস। সঙ্গীত সুরে তালে মানে বিশ্লিষ্ট ও ব্যখ্যাত হবে সর্বোত্তম ভাবে। আমরা বৈদিক কালের সঙ্গীতের নানা শ্রেণী ও আয়োজন নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারলেও কেমন ছিল সেই গানের সুর, কেমন ছিল সেই যুগের সাত স্বরের ধ্বনি- এ নিয়ে কিছু কূলকিনারা করতে পারিনি, যা সম্ভবও নয়। সামগানের সাত স্বরই হুবহু আজকের সাতস্বর হয়েছে কি না এটা সুনিশ্চিত করে বলতে পারার কোন সুযোগ নেই। হতে পারে তারা একেবারেই আলাদা। বলে রাখা ভাল, আমরা কিন্তু সাত স্বরের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছি কালক্রমে। সেটা পরে আলোচনা হবে।

স্কেল নির্ধারণ বা প্রথম স্বর নির্ণয়ের জন্য সামগান ও গ্রামেগেয়গানে যথাক্রমে বীণা ও বেণুর ব্যবহার হত বলে জানা যায়। বেণু অর্থাৎ বাঁশী পৃথিবীর আদিমতম বাদ্যযন্ত্র। বৈদিক সঙ্গীতে বিবিধ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল। বিভিন্ন রকমের তন্তুবাদ্য ও চর্মবাদ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় পুরাতন গ্রন্থে। বীণা ছিল অনেক প্রকারের। যার কোন নমুনা হাজার বছরের কাল পরিক্রমায় ধরে রাখা যায়নি।

বৈদিক সঙ্গীতের পরে আমরা এসে যাচ্ছি ‘গান্ধর্ব সঙ্গীত’ এর আলোচনায়। যা বৈদিক যুগের সাথে তূলনামূলক আলোচনায় আধুনিকই বলা যায় আবার হয়ত বা সামগানের কাল থেকেই এটি বিদ্যমান ছিল- যা নিয়ে সংশয় আছে। গ্রামেগেয়গান লৌকিক সঙ্গীত হিসেবে উদ্ধৃত থাকলেও তা হয়ত অনার্য্য জাতিগোষ্ঠীর গান ছিল না। অনার্য্য জনগনের গান নিয়ে প্রথম আলোচনা এই গান্ধর্বসঙ্গীত দিয়ে শুরু। গান্ধর্ব গান গন্ধর্ব জাতি থেকে উৎপন্ন হয়েও দেবতা ও আর্য্য জাতির প্রিয়- এমন কথা নাট্যশাস্ত্রে লিখিত হয়েছে। এই ধরণের উক্তি থেকে ধারণা করা যায়- এই গান এই ভূমিরই কিন্তু অনার্য্য জনগোষ্ঠীর, তবে একে নিম্নবর্গীয় সঙ্গীত বলা হয়নি। কিন্তু বিশেষরূপে কারা ছিল এই গন্ধর্ব জাতি তা নিয়ে কোন আলোচনা পাইনি এখনো। গান্ধর্ব-সঙ্গীতের স্রষ্ঠা ও প্রসারক হিসেবে যদিও অনেকের নামোল্লেখ আছে। এই সঙ্গীতই রাগ-রাগিণী, তাদের জাতি-প্রকৃতি প্রভৃতির প্রথম সূত্রপাত করে ও আধুনিক ষড়জাদি স্বরের আকর বলে বোদ্ধাদের মত রয়েছে। সামগানের সাতস্বরের সাথে আমরা বর্তমানের সাতস্বরের সম্পর্ক নির্ণয় করতে অপারগ হলেও, গান্ধর্ব সঙ্গীতের সাথে তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাচ্ছি। যদি আলোচনার নিরীখে ধরে নিই সামগান ও গান্ধর্বগান দুটো স্বতন্ত্র সঙ্গীতমার্গ হিসেবে বিদ্যমান ছিল, তবে বলা যায় আধুনিক ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের সরাসরি যোগসূত্র গান্ধর্বগানের সাথেই আছে, অথবা ভিন্ন ভাষায় লিখলে- আমাদের বর্তমান সঙ্গীত গান্ধর্বসঙ্গীতেরই উত্তরসূরী।

 

(লেখক পরিচিতি – মার্গসঙ্গীত শিক্ষার্থী। বাংলা ভক্তিগীতি, বিশেষত শাক্তপদাবলী ও শাক্তধারার সঙ্গীত নিয়ে মননশীল মানুষ। সাহিত্য ও দর্শন অনুরাগী।)

 

(পরবর্তী সংখ্যা)

Comment here