আঙিনা

দেশ – ১১

– ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়

AM o FM

এখানে AM o FM রেডিও নিয়ে আলোচনা করব। TV আসার পর রেডিও শোনার চল কমে গেল। অনেকের বাড়ি থেকে হারিয়েই গেল। এর কিছু বছর পর রেডিও ফিরে এল FM নাম নিয়ে।

AM রেডিওতে ( Amplitude Modulation)সিগন্যালকে (কোনো গান বা কথা ) একটা হাই ফ্রিকোয়্ন্সী ক্যারিয়ার ওয়েভ এ মুড়ে আকাশের দিকে ছোঁড়া হয়। বায়ু মন্ডলের বিভিন্ন স্তর আছে। ট্রপোস্পিয়ার, স্ট্রাটোস্পিয়ার, আয়োনোস্পিয়ার ইত্যাদি। হাই ফ্রিকোয়েন্সী রেডিও ওয়েভ আয়োনোস্পিয়ার থেকে রিফ্ল্কেটেড ব্যাক হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। আয়োনোস্পিয়ারের আয়োনাইজড বা চার্জ পার্টিকলে গুলো খুব নয়েজ সৃস্টি করে। মনে থাকতে পারে বিদেশে খেলার ধারাবিবরনীর সময় ঘ্যার ঘ্যার আওয়াজ হত।

FM (Frequencymodulated) এ একটা উঁচু টাওয়ার থেকে সিগন্যাল ছোঁড়া হয় এবং ডাইরেক্ট রেডিও তে রিসিভ করা হয় (Without any Reflection). তাই এর সিগন্যাল কোয়ালিটি খুব ভাল হয় , Noise free. তবে বেশী দূর অবধি শোনা যায়না। কলকাতার FM অনুস্ঠান বর্ধমানে শোনা যাবেনা।

আর একটি রিলেটেড তথ্য এখানে দিচ্ছি, আশা করি খারাপ লাগবে না।

স্যার আর্থার সি ক্লার্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশ রেডিও অপারেটর হিসেবে কাজ করছিলেন। তখন এক দেশ থেকে নিজের দেশের অন্য এলাকায় বা অন্য দেশে যুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্য AM রেডিও পদ্ধতিতেই হত ( Ionosphere Reflection). কোনো স্থানের ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে অবস্থিত স্থানে ( গ্লোবের এক প্রান্ত থেকে Diametrically opposite ‌অপর প্রান্তে ) ডাইরেক্ট রেডিও সিগন্যাল পাঠানো যেত না। মাঝখানে অবস্থিত তিন চার জায়গায় সিগন্যাল রিসিভ করে ফের পাঠানো হত। একে বলা হয় রিলে সিস্টেম। পুরোনো লোকজনের মনে থাকতে পারে আমরা ছোটোবেলায় যখন বিদেশে হওয়া খেলার ধারাবিবরনী শুনতাম , বলা হত রিলে করে শোনানো বা প্রচার করা হচ্ছে। এটা সেই রিলে সিস্টেম। কয়েকবার রিসিভ ও ট্রান্সমিট করা হত।

ক্লার্ক সেইসময় ভাবলেন এইভাবে কয়েক হাত বদল হয়ে তথ্য এলে কেউ ডাবল ক্রশ ( কেউ শত্রুপক্ষ কে খবর বেচে দিতে পারে) করতে পারে। যদি একটা কৃত্রিম উপগ্রহ ( Artificial Sattelite) আমরা আয়নোস্পিয়ার থেকে দূরে এমনভাবে রাখতে পারি যাতে সেটা পৃথিবীর সাথে একই স্পীডে ঘুরতে থাকে।

লন্ডনের ওপর এরকম একটা সাটেলাইট রাখা হল। তাহলে ওটা সবসময লন্ডনের ওপর থাকবে। আর যেহেতু ওটা অনেক দূরে রাখা , তাই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তথ্য ডাইরেক্ট রিফ্লেক্ট করে পাঠানো যাবে কোনো রিলে ছাড়াই। ক্লার্ক ওনার জীবদ্দশায় দেখে গেছেন যে ওনার আইডিয়া অনুযায়ী কৃত্রিম সাটেলাইট পাঠিয়ে কম্যুনিকেশন সিস্টেমে বিপ্লব ঘটেছে। অবস্থা এখন এমন দাড়িয়েছে যে এখন বিশ্ব জুড়ে রিসার্চ চলছে যে কি করে অকেজো সাটেলাইট গুলোকে নামিয়ে এনে মহাকাশ সাফ করা যায়।..এটা আমায় বলেছিল আমেদাবাদের বিখ্যাত ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রফেসর ডঃ প্রবাল চ্যাটার্জি দু বছর আগে।

শয়াল বা ভর –

শীতকালে গ্রামে খুব ঠান্ডা পড়ে। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়। সেইরকম এক শীতের সকালে আমাদের বাড়ির পেছনের দিক থেকে হৈ হট্টগোল শোনা গেল। কাকা, কাকীমাদের সাথে আমিও গেলাম। আগে একটা পর্বে লিখেছিলাম আমাদের পেছন দিকে চক্কোত্তি দের বাড়ি।

চক্কোত্তিরা দু ভাই মদন ও মোহন, বৌ ছেলে মেয়ে নিয়ে বাস করে। দাওয়াতে বসে আছে মদনের বৌ সাবিত্রী, চোখ লাল, অনবরত বকে যাচ্ছে। লোক জন বেশীর ভাগ মহিলা, এক এক করে কি সব ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে যাচ্ছে, সাবিত্রী কোনোটার উত্তর দিচ্ছে কোনোটার দিচ্ছে না। মনে আছে ঠাকুমা এক সময় এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন হ্যা মা, ছোট খোকার সোনার আংটি টা কে চুরি করল? উত্তর এল নদী নিয়ে নিয়েছে। ঠাকুমা ফিরে এসে বলতে লাগলেন আমি জানতাম খোকা নিজেই হারিয়েছে।

পরে কেউ আমাকে বলেছিল। সাবিত্রীর যেটা হল তাকে বলে শয়াল বা ভর। কোনো দেবতা বা আত্মা শরীরে এসে ভর করে। এটা এখন থেকে মাঝে মাঝেই হতে থাকবে। এক কাকা বললেন এবার মাধবপুরের চড়কের মেলা জমে যাবে। চড়কের মেলায় অনেকের ভর হয়। অনেক দূর বলে আমার যাওয়া হয়নি। তবে সাবিত্রীর ওপর কোনো দেবীর ভর হয়েছিল। এই ভর ব্যাপার টা অতি প্রাচীন গ্রামীন প্রথা বা রিচুয়াল।

পৃথিবীর অনেক দেশে যেমন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জগুলি, দক্ষিন আমেরিকার দেশ গুলি এবং অবশ্যই আফ্রিকান দেশগুলোতে Voodoo ( ভুডু) কালচার বিদ্যমান। ভুডু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ভুডু প্রথায় নির্দিষ্ট দিনে উদ্দাম নৃত্য গীত, মন্ত্রোচ্চারন বা সর্প কে সামনে রেখে স্পিরিট বা আত্মা কে আহ্বান জানানো হয়। কোনো নির্দিষ্ট লোকের ওপর আত্মার ভর হয়। বলা হয় লোক টি Trans e চলে গেছে, নিজের মধ্যে নেই আর।

রোমান ক্যাথলিক প্রথা এবং আফ্রিকান ব্ল্যাক ম্যাজিকের সংমিশ্রন হল ভুডু। ভুডু প্রথায় মৃত্যু কে বলা হয় দৃশ্যমান জগত থেকে অদৃশ্যমান জগতের যাতায়াত। কোথাও পড়েছিলাম রেজিনগর বলে একটি জায়গায় স্বয়ং পীরবাবা নাকি অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে প্রতি মঙ্গল আর শনিবার সেখানে আবির্ভূত হন! — না, অবশ্যই সশরীরে নয়। তিনি ওই দু’দিন ভর করতেন আমিনাবিবিকে। আমিনাবিবির মাধ্যমে মানুষজনকে রোগ-শোক-বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত করতেন, ভূত-ভবিষ্যৎ ব’লে দিতেন। আর বাৎলে দিতেন সমস্যা সমাধানের সহজতম পথ। তাঁর অমন আবির্ভাবের ফলেই তো ওই অজ্ঞাত-অখ্যাত এবং একেবারেই অপরিচিত গ্রামটি কেমন বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল! ওই গ্রামের নাম তখন লোকের মুখে মুখে ফিরত।

ভর –

সাতডিকরীর সদানন্দকে ভর করতেন মা কালী। দেবী নাকি সপ্তাহে দু’বার আসতেন। নির্দিষ্ট দিন দু’টিতে সদানন্দ তাঁর গণনা ঘরের দরজা বন্ধ ক’রে ধ্যানে বসতেন। মা কালীর স্তব করতে করতেই হঠাৎ অজ্ঞান হ’য়ে যেতেন। বাইরের থেকে শোনা যেত গোঁ গোঁ শব্দ। অপেক্ষমান জনতা বুঝত, সদানন্দের ভর হলো। মেয়েরা শঙ্খ-ধ্বনি করত আর সবাই জোড় হাত কপালে ঠেকাত দেবীর উদ্দেশ্যে।

ঝাড়গ্রামের ধনপতি মুর্মু কিন্তু ওই ধ্যান-ট্যানের ধারে কাছেও যেতেন না। ওঁর ভর হ’ত জাহেরার থানে, পরবের দিনে। হঠাৎ করেই ভর হ’ত। আর, ভর করতেন স্বয়ং মারাংবুরু। জাহেরার থানে পূজানুষ্ঠান দেখতে দেখতে ধনপতি হঠাৎ দুলতে শুরু করতেন। ওঁর চোখে-মুখে তখন রক্ত লাফাত। শরীরে আসত অসম্ভব শক্তি। ঝাঁপিয়ে পড়তেন সাজানো নৈবেদ্যর উপর, আর দু’হাতে তুলে খেতে আরম্ভ করতেন উৎসর্গীকৃত মুরগী ইত্যাদি।

উপস্থিত জনতার মধ্যে গুঞ্জন উঠত:– “মওয়াল হলেক বটে গ্য। মওয়াল হলেক বটে।” ধামসা, মাদল বেজে উঠত আরও জোরে। দ্রুত তালে নেচে উঠত সাঁওতাল পুরুষ-রমণীরা। কাঁচা মুরগী চিবুতে চিবুতে ওদের সঙ্গে নাচতে শুরু ক’রে দিতেন ধনপতিও।

ধনপতি চিৎকার করতে থাকেন। দু’হাত তুলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে যেন কিছু একটা বলতে চাইতেন। উৎসুক জনতা কান পেতে যেন কিছু শোনার চেষ্টা করত। দু’চারজন ধরে নিয়ে যেত তাঁকে। তারা আরও কিছু শুনত, কিছু গণনা করাত। ধনপতি ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে গণনা করতেন, ভূত-ভবিষ্যৎ ব’লে দিতেন। ধনপতি ইত্যাদির ভর হওয়ার সাথে আফ্রিকা বা ক্যারিবিয়ান দ্বীপের ভুডু কালচারের অবিশ্বাস্য মিল পাওয়া যায়।

এই মিল আদিম মানুষের মধ্যেকার মিল।

যেমন প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের শিকার পদ্ধতির মধ্যে দেখা যায়। কোনো কোনো পন্ডিত ভরকে একরকম যোগ-নিদ্রা বলে চালাবার চেস্টা করেছেন। যদিও ভর ও যোগনিদ্রার মধ্যেকার দূরত্ব , উত্তর মেরু ও দক্ষিন মেরুর দূরত্বের থেকেও বেশী। ডাক্তাররা বলেন যে হঠাৎ হঠাৎ শরীরের যে কোনো অংশ অসাড় হয়ে যেতে পারে। সেখানে সূঁচ ফুটালে টের পাওয়া যায় না, আগুনের ছ্যাঁকা দিলে কোনো উপলব্ধি নেই, এমন কি সময়ে সময়ে নাড়ির স্পন্দনও পাওয়া যায় না।

ওঁরা বলেছিলেন — ওরা সবাই হচ্ছে আসলে এক একজন হিস্টিরিয়া রোগী। আর এটাকে বলে এ্যমনেশিয়া। আমার এ ব্যাপারে নিজস্ব মত হল যে আমরা ভর ব্যাপারটা Uncontrolled Fission Reaction (Atom Bomb) ও Controlled Fission Reaction এর সাথে তুলনা করতে পারি। ভর হওয়ার যত কেস শুনেছি সব Uncontrolled. আত্মা না হিস্টিরিয়া জানা নেই।

Controlled way তে আত্মা নামানো বা ডাকা কে বলে প্লানচেট। বাঙালীশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত প্লানচেট করে আত্মা দের ডাকতেন। পুত্র শমীন্দ্রনাথ, নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, সুকুমার রায় প্রভৃতি অনেক প্রয়াত মানুষদের আত্মাদের ডাকতেন ও কথা বলতেন। এ নিয়ে অনেক প্রামান্য বই আছে। 

একে কি বলবেন ? হিস্টিরিয়া? এ্যানি বেসান্ত বা থীয়োসফিক্যাল সোস্যাইটির কার্য্যকলাপ কে কি বলবেন? 

(ক্রমশঃ)

 

(লেখক পরিচিতি – অবসরপ্রাপ্ত পেট্রফিসসিস্ট: ব্যাঙ্গালোরের প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেট্রোলিয়াম বিভাগের প্রাক্তন ফ্যাকাল্টি)

Comment here