তর্পণে প্রণত মসীশাশ্বত সনাতন

ভগিনী নিবেদিতা: স্বামীজীর বজ্র

(স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ)

(প্রথম পর্ব)

স্বামীজী সম্পর্কে একটি কবিতায় একজন এই অপূর্ব কথাগুলি লিখেছেন:

“ঠাকুরের দুরন্ত তনয়।
তুমি যে চঞ্চল বড় বজ্র লয়ে খেলা কর।”

বাস্তবিক, দুরন্ত বিবেকানন্দের আবিৰ্ভাৱ যেন বৃত্রহন্তা দেবেন্দ্রের মতোই। বৃত্র অশুভের প্রতীক, স্বার্থপরতার বিগ্রহ, ভোগের মূর্তি। অশুভকে ধ্বংস করতে হলে, স্বার্থপরতাকে নির্মূল করতে হলে, ভোগলিপ্সাকে উৎপাটন করতে হলে প্রয়োজন এমন চরিত্র, যা “বজ্রের উপাদানে গঠিত”। ‘বজ্রের উপাদান’ অর্থাৎ যা বজ্রের মতো অপরাজেয়, বজ্রের মতো দুর্নিবার, বজ্রের মতো চূড়ান্ত আত্মবিলয় থেকে যা উদ্ভুত। স্বামী বিবেকানন্দ কখনো কখনো নিজেকে বজ্র বলতেন।

তিনি চাইতেন, তাঁর দেশের মানুষেরা যেন সকলেই বজ্র হয়ে ওঠে। তাঁর দেশের কিছু মানুষ অবশ্যই তাঁর সেই আকাঙ্খাকে পূর্ণ করেছিলেন; কিন্তু যিনি তাঁর দেশের মানুষ নন, বহু দূর বিদেশের এক নারী, তিনি স্বামীজীর দেশের মানুষকে ভালবেসেছিলেন; ভালবেসেছিলেন তাঁর দেশকে, তাঁর দেশের মাটিকে, তাঁর দেশের ধর্ম, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে – তাঁর দেশের সকল কিছুকে। স্বামীজীর বজ্র হয়ে ওঠার আগ্নেয় আহ্বানে সেই নারী অক্ষরে অক্ষরে নিজের জীবন দিয়ে সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি শুধু স্বয়ং বজ্র ওঠেননি, নিজেকে ‘স্বামীজীর বজ্র’ করেও তুলেছিলেন। সেই বিদেশিনী বিবেকানন্দের মানসকন্যা ভগিনী নিবেদিতা – পূর্ব জীবনে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল।

স্বামীজীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কিছুকাল পরের কথা। লন্ডনে স্বামীজীর একটি ক্লাসে আরো অনেকের সঙ্গে মার্গারেটও উপস্থিত আছেন। শ্রোতারা নানা প্রশ্ন করছেন স্বামিজীকে। সহসা স্বামীজী বলে উঠলেন: “জগতে আজ কিসের অভাব জানো? জগৎ চায় এমন বিশজন নরনারী যারা সদর্পে পথে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, ‘ঈশ্বরই আমাদের একমাত্র সম্বল।’ কে কে যেতে প্রস্তুত?” বলতে বলতে স্বামীজী আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। শ্রোতৃমন্ডলীর দিকে তাকিয়ে তিনি যেন
বিশেষ কারো কাছ থেকে তাঁর প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশা করছিলেন। মার্গারেটের মনে হল – স্বামীজী কি তাঁর কাছ থেকে উত্তর প্রত্যাশা করছেন? তাঁর ধর্মযাজক পিতা মৃত্যুর আগে তাঁর সহধর্মিণীকে বলেছিলেন, তাঁদের জ্যেষ্ঠ সন্তান মার্গারেটের কাছে একদিন ইশ্বরের আহ্বান আসবে। সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়া জন্য তিনি যেন মার্গারেটকে সাহায্য করেন। মার্গারেটের বয়স তখন দশ বছর মাত্র। আঠাশ বছরের মার্গারেটের কি তখন মনে পড়েছিল তাঁর পিতার সেই অন্তিম বাক্যগুলি? মনে পড়েছিল কি তাঁর জন্মের আগে ইশ্বরের কাছে তাঁর গর্ভধারিণীর প্রার্থনা – সন্তানকে তিনি ঈশ্বরের কাছেই উৎসর্গ করবেন? সেই আহ্বানই কি তিনি শুনছেন ভারতীয় সন্ন্যাসীর বজ্ররগম্ভীর শব্দগুলিতে? মার্গারেটের মনে হলো – তিনি উঠে দাঁড়ান এবং স্বামীজীকে বলেন, ‘হ্যাঁ আমি প্রস্তুত। ‘ শুনলেন, স্বামীজীর বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ আবার সরব হয়েছে। স্বামীজী বললেন: “কিসের ভয়?” – এবারও কি তাঁর ইঙ্গিত মার্গারেটের প্রতিই? আবার গম্ভীরতর হল স্বামীজীর কণ্ঠ। দৃঢ়তর প্রত্যয়ের সঙ্গে স্বামীজী বললেন: “যদি ঈশ্বর আছেন, একথা সত্য হয় তবে জগতে আর কিসের প্রয়োজন? আর যদি একথা সত্য না হয়, তবে আমাদের জীবনের ফলই বা কি?”

মার্গারেট কথাগুলো শুনলেন। তাঁর সত্তায় উথালপাথাল শুরু হলো, কিন্তু তখনই সেই রুদ্র আহ্বানে সাড়া দেওয়া হলো না। সেদিনের মতো ক্লাস শেষ হলো। কিন্তু স্বামীজীর কথাগুলো মার্গারেটের কানে অবিকৃত ঝঙ্কৃত হতে লাগল। ভগিনী নিবেদিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ জীবনীকার প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা অনবদ্য লিখেছেন: “মার্গারেট নিরন্তর দগ্ধ হইতে লাগিলেন।”

এই দহনজ্বালা ভয়ঙ্কর। এ সাধারণ অগ্নির দহনজ্বালা নয়, এ নাগরাজের অমোঘ দংশনজ্বালা। অগ্নিদহন-জ্বালা দিকে উদ্ধার পাওয়া যায়, কিন্তু এই দংশনের অভিজ্ঞতা হলে পুনরায় পূর্বের অবস্থায় প্রত্যাবর্তন অসম্ভব। মার্গারেটেরও তাই হল। তার কানে সর্বদা বাজতে লাগল স্বামীজীর বজ্রনাদ: “ওঠো, জাগো, শ্রেষ্ঠ আচার্যগণের সমীপে উপনীত হয়ে পরম সত্যকে উপলব্ধি কর।”

মার্গারেট যেদিন প্রথম স্বামীজীকে দর্র্শন করেছিলেন সেদিন তিনি স্বামীজীর মুখে শুনেছিলেন, “একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মানো ভাল, কিন্তু তারই গণ্ডির মধ্যে মৃত্যু অতি ভয়ঙ্কর।” মার্গারেটের কি মনে হয়েছিল যে, একথা তাঁরই উদ্দেশে উচ্চারিত? আরেকদিন স্বামীজী বললেন: “ইংরেজরা একটি দ্বীপে জন্মগ্রহণ করে এবং চিরকাল ঐ দ্বীপেই বাস করতে চায়।” সেদিন মনে হয়, মার্গারেটের আর বুঝতে বিলম্ব হয়নি যে, এবার স্বামীজীর উদ্দিষ্ট সরাসরি তিনিই, আহ্বান তাঁকেই। এই আহ্বান তাঁর স্বদেশের গণ্ডিকে অতিক্রম করার, নিজের ধর্মবিশ্বাসকে অতিক্রম করার, তাঁর নিজের জীবন, নিজের ভবিষ্যৎকে নিঃশেষে নিবেদন করার। এই আহ্বান নিছক বিশ্বাস (‘faith’) থেকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধিকে (‘realization’) বরণ করার। তাঁর নিশ্চয়ই মনে পড়ছিল প্রথম দর্শনের সময় স্বামীজীর মুখে তিনি শুনেছিলেন, ‘বিশ্বাস’ শব্দটি তাঁর পছন্দ নয়, তাঁর বিশেষ পছন্দ ‘উপলব্ধি’ শব্দটি।

দংশনের অব্যর্থ প্রতিক্রিয়ায় মার্গারেট তখন চূড়ান্ত অস্থিরতার মধ্য দিন কাটাচ্ছিল। এই অস্থিরতার মধ্যে স্বামীজীর আহ্বানে তাঁর নবজন্ম গ্রহণের আর্তি নিহিত ছিল। যখন তাঁর প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক রাত্রি, প্রতিটি মূহুর্ত, সেই আর্তিতে উদ্বেল হয়ে উঠেছে তখনই এল স্বামীজীর কাছ থেকে একটি পত্র। সেন্ট জর্জেস রোড, লন্ডন থেকে লেখা ৭ জুন, ১৮৯৬ তারিখের সেই পত্রে স্বামীজী মার্গারেটকে লিখলেন:

‘কল্যাণীয়া মিস নোবল,
“……..জগৎকে আলো দেবে কে? আত্মোৎসর্গই ছিলঅতীতের নীতি, এবং হ্যাঁ – যুগ যুগ ধরে তাই চলতে থাকবে। যাঁরা জগতে সর্বাপেক্ষা সাহসী ও বরেণ্য, তাঁদের চিরদিন ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়” আত্মোৎসর্গ করতে হবে। অনন্ত প্রেম ও করুণায় পূর্ণ শত শত বুদ্ধের আবির্ভাবের প্রয়োজন।

”জগতের ধর্মগুলি আজ প্রাণহীন ব্যঙ্গমাত্রে পর্যবসিত। জগৎ চায় চরিত্র। জগতে আজ সেইরকম লোকেদেরই প্রয়োজন, যাদের জীবন প্রেমপ্রদীপ্ত এবং সম্পূর্ণ স্বার্থশূন্য। সেই প্রেম প্রতিটি বাক্যকে বজ্রের মতো শক্তিশালী করে তুলবে।……

” তোমার মধ্যে একটা জগৎ-আলোড়নকারী শক্তি রয়েছে, ধীরে ধীরে আরো অনেক শক্তি আসবে। আমরা চাই – জ্বালাময়ী বাণী এবং তার চেয়েও বেশি জ্বলন্ত কর্ম।

” হে মহাপ্রাণ, ওঠো, জাগো। জগৎ যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে, তোমার কি নিদ্রা সাজে? এসো, আমরা আহ্বান করতে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত নিদ্রিত দেবতা জাগ্রত না হন, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরের দেবতা এই আহ্বানে সাড়া না দেন। জীবনে এর চেয়ে বড় আর কি আছে, এর চেয়ে মহত্তর আর কোন কাজ আছে?…”

একি পত্র, না রণভেরী। প্রত্যেকটি শব্দের মধ্যে যেন দ্রিমি দ্রিমি করে বেজে চলেছে ত্রিপুরান্তক মহাকালের ডমরুধ্বনি। যে ধ্বনিতে উঠছে সেই আহ্বান – না, আর নিদ্রা নয়, ওঠো, জাগো। দানব তোমার দুয়ারে সমাগত। সেই দানব তোমার মায়া, তোমার সুখস্বপ্ন, তোমার স্বার্থপরতা, তোমার আত্মমগ্নতা। ছিঁড়ে ফেল তোমার অবিদ্যার শৃঙ্খল। বীর্যের মন্ত্রে, শৌর্যের প্রেরণায় তোমার ক্ষুদ্র গন্ডি ভেঙে তুমি বাইরে এসে দাঁড়াও। নিজের ক্ষুদ্র অহংকে নিবেদন করে দাও বৃহৎ অহং-এর নিঃসীমতায়।

মার্গারেটের সঙ্কল্প স্থির হয়ে গেল – তিনি আত্মোৎসর্গ করবেন। ‘শিবগুরু’র ডমরুধ্বনি তাঁর হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল। একদিন স্বামীজী তাঁকে মন্ত্রদীক্ষা দান করলেন।

 

(স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ – স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক নিবাস-এর সম্পাদক, বাগ্মী ও সুলেখক)

সৌজন্যে – ‘রাখাল বেণু’…. ‘ভগিনী নিবেদিতা সার্ধশতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ’

(ক্রমশ)

Leave a Reply